জীবনজিজ্ঞাসা

মুহাম্মাদ সুলাইমান, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা
প্রশ্ন: গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত আছে যে, কারো হাত থেকে বা হাত লেগে কুরআন শরীফ মাটিতে পড়ে গেলে, কুরআন শরীফের ওজনে খাদ্য-শষ্য সদকা করতে হয়। আবার অনেক এলাকায় কুরআন শরীফের ওজনের কথা নেই, শুধু মসজিদে বা গরীবদের মাঝে দান-সদকা করাকে জরুরী মনে করা হয়। এ ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী কি?
উত্তর: কারো হাত থেকে বা হাত লেগে কুরআন শরীফ মাটিতে পড়ে গেলে, তার উপর জরুরী হলো আল্লাহর দরবারে তাওবা করা এবং মা প্রার্থনা করা। জরুরী মনে না করে অনির্দিষ্টভাবে গরীব-মিসকীনদের মাঝে কিংবা মসজিদে দানও করা যেতে পারে। দান-সদকা করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং বাধ্যবাধকতা আরোপ করা কিংবা জরুরী মনে করা শরী‘আত পরিপন্থী কাজ। কুরআন শরীফ ওজন করে খাদ্য-শষ্য সদকা করার প্রচলন তো আরো মারাত্মক গর্হিত কাজ। কেননা এটা কুরআন মাজীদের আদব পরিপন্থী এবং এতে কুরআন মাজীদকে বেইজ্জত করা হয়। সুতরাং এসব থেকে বিরত থাকা বাঞ্চনীয়।- ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১/২৪।

মুহাম্মাদ শামছুল আলম, সদর, ভোলা
প্রশ্ন: ফাটা প্লেটে বা ফাটা কাপ-গ্লাসে পানাহার করা জায়িয আছে কিনা? সমাজে এটাকে ভালো মনে করা হয় না। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি?
উত্তর: ফাটা প্লেটে বা ফাটা কাপ-গ্লাসে পানাহার করা মাকরূহ। কারণ ১. পানি পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ২. মুখে লেগে কেটে যাওয়ার ভয় থাকে। ৩. ফাটা স্থানে ময়লা, পোকা ও রোগ জীবাণু জমে থাকে, ফলে রোগ-ব্যাধি হওয়ার আশংকা থাকে। ৪. এটা সুস্থ বিবেক পরিপন্থী।- আবূ দাউদ শরীফ: ২/১৬৭, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১২৭।

মুহাম্মাদ মুনীরুল ইসলাম, ফুলপুর, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: কুরআনে কারীম তিলাওয়াতের ক্যাসেট উযু ছাড়া স্পর্শ করা যাবে কিনা?
উত্তর: তিলাওয়াতের ক্যাসেটের গায়ে যেহেতু কোনো আয়াত লেখা থাকে না, এবং তাতে ধারণকৃত আওয়াজও প্রকৃত কুরআনে কারীমের আওয়াজ নয়, বরং আওয়াজের প্রতিধ্বনি মাত্র, তাই তিলাওয়াতের ক্যাসেট কুরআনে কারীমের হুকুমে নয়। সুতরাং তা উযু ছাড়া স্পর্শ করতে কোনো অসুবিধে নেই। তবে  ক্যাসেটের গায়ে কোনো আয়াত লিখা থাকলে, হুকুম ভিন্ন হবে। এটা শুধু তিলাওয়াতের ক্যাসেট নয়, বরং যে কোনো ক্যাসেটের গায়ে কুরআনের কোনো অংশ লিখা থাকলে, তা উযু ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না।- আহসানুল ফাতাওয়া: ২/১৯, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/১৪৫।

মুহাম্মাদ আমীরুল ইসলাম, কচুয়া, চাঁদপুর
প্রশ্ন: সালাম শব্দ বলা ব্যতীত শুধু হাত দিয়ে ইশারা করে সালাম দেয়া এবং এভাবেই সালামের জবাব দেয়ার ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি?
উত্তর: সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে মুখে সালাম না বলে শুধু হাতে ইশারা করা শরী‘আত সম্মত নয়। বরং এটা সালামই নয়। বিধায় এর উত্তর দেয়াও ওয়াজিব নয়। কাজেই এমনটি করা যাবে না। এমনকি মুখে সালাম বলা অবস্থায়ও হাত দ্বারা ইশারা করা যাবে না। অবশ্য এ অবস্থায় উত্তর দেয়া জরুরী। তবে যাকে সালাম দিবে সে যদি বধির হয়, কিংবা এমন স্থানে থাকে যেখানে সালামের আওয়াজ পৌঁছানো সম্ভব নয়, তাহলে মুখে ‘আস্সালামু আলাইকুম’ বলার সাথে সাথে হাত দ্বারা ইশারা করে সালাম দেয়ার বিষয়টি তাকে বুঝানো যাবে। এ ছাড়া অযথা মুখ সালাম বলেও হাত দ্বারা ইশারা করা যাবে না।- আদ্-র্দুরুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ২/৫৯৩, উমদাতুল কারী: ২২/২৩০, তিরমিযী শরীফ: ২/৯৯, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ১০/৪৮২।

মুহাম্মাদ আনিসুর রহমান, বন্দর, নারায়ণগঞ্জ
প্রশ্ন: বাজারে বিদেশ থেকে আসা জবাইকৃত মুরগী, গরু, ছাগল ইত্যাদির গোশতের প্যাকেট পাওয়া যায়। প্যাকেটের গায়ে ১০০% হালাল লিখা থাকে। এসব প্যাকেটজাত গোশ্ত সাধারণতঃ ইউরোপিয় দেশগুলো থেকে আসে। প্যাকেটজাত এসব গোশ্ত খাওয়া হালাল হবে কিনা?
উত্তর: উল্লিখিত প্যাকেটজাত গোশ্ত সম্পর্কে যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, এগুলো কোনো মুসলমানের জবাই করা হালাল প্রাণীর গোশ্ত এবং কোনো মুসলমানের তত্ত্বাবধানে প্যাকেট করণ হয়েছে, তাহলে তা খাওয়া হালাল হবে। অন্যথায় নয়। তবে সর্বাবস্থায় এগুলো পরিহার করে আমাদের দেশে জবাইকৃত হালাল পশুর গোশ্ত কিনে খাওয়াই উত্তম।- ফাতাওয়া শামী: ৬/৩৪৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩০৯, হিদায়া: ৪/৩৮৫, আল-বাহরুর রায়িক: ৮/১৬৯, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির: ১০৪, জাওয়াহিরুল ফিকহ: ২/৩৯২, আহসানুল ফাতাওয়া: ৭/৪০৭।
মুহাম্মাদ রাশেদুল ইসলাম, সুজানগর, পাবনা
প্রশ্ন: জনৈক ব্যক্তি সৌদি আরব থেকে একটি চাদর এনেছেন। উক্ত চাদরে আয়াতুল কুরসী, কয়েকটি হাদীস এবং কালিমায়ে শাহাদাত ইত্যাদি লিখা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, উক্ত চাদর দ্বারা খাটের মধ্যে রাখা মৃত লাশ ঢাকা জায়িয হবে কিনা?
উত্তর: উক্ত চাদর দ্বারা মৃত লাশ ঢাকা জায়িয হবে না। কেননা, যে কোনো সময় উক্ত লাশ থেকে নাপাকী বের হয়ে চাদরটিতে লেগে আয়াতের বেইজ্জতী ও বেয়াদবী হতে পারে। তাছাড়া উযুহীন অবস্থায়  আয়াতের স্থানে যে কারো হাত লেগে যেতে পারে, যা মারাত্মক গুনাহ। অথচ এতে জীবিত-মৃত কারো কোনো উপকারিতা নেই। কাজেই এ ধরণের চাদর ক্রয়-বিক্রয় এবং যে কোনো কাজে ব্যবহার না করা বাঞ্চনীয়।- আদ্-র্দুরুল মুখতার: ১/৩২২, ফাতাওয়া শামী: ২/২৪৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩২৩, ফাতহুল কাদীর: ১/১৫০।

মুহাম্মাদ লুৎফুর রহমান, সাভার, ঢাকা
প্রশ্ন: অনেকে নাক সাফ করার জন্য কিংবা উযু করে হাত-মুখ মোছার জন্য ছোট হাত রুমাল ব্যবহার করে।  এ ধরণের রুমাল ব্যবহার করা যাবে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, ব্যবহার করা যাবে। তবে যদি কোনো ফ্যাশন করার কিংবা আভিজাত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে এ ধরণের রুমাল ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা মাকরূহ হবে।- আদ্-র্দুরুল মুখতার: ৬/৩২১, হিদায়া: ৪/৩৮৮, কিতাবুল ফিকহি আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আ: ১/৭০।

মুহাম্মাদ আশরাফ আলী, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
প্রশ্ন : কোনো মুসলমানের জন্য হিন্দুদের পূঁজা দেখতে যাওয়া বা তাদের কাজে যোগদান করা জায়িয আছে কি না ?
উত্তর : মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের পূঁজা দেখতে যাওয়া হারাম। আর তাদের কাজে যোগদান করা কুফরী। তবে যদি কেউ উপরের চাপে সেখানে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে তাদের নিদর্শনাবলী থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক থেকে কোনো প্রকার আমোদ-প্রমোদে না জড়ালে, জায়িয হবে।- কিফায়াতুল মূফতী ৯/৫৬, ফাতাওয়া শামী ৬/৭৫৪।

ফরীদ আহমাদ, মিরপুর-১০, ঢাকা।
প্রশ্ন : তাবীজ ব্যবহারের ব্যপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : ঝাড়-ফুঁক তাবীজ ইত্যাদি রাসূলে আকরাম (সা.) এর যুগেও ছিলো। কিছু শর্ত সাপেে এখনো এগুলো জায়িয আছে। যারা ঝাড়-ফুঁককে সম্পূর্ণরূপে শরী‘আত পরিপন্থী কিংবা অর্থহীন, শিরক বলেন, তাদের কথা সঠিক নয়।
শর্তগুলো হলো, ১. কোনো ধরনের কুফরী কালাম হতে পারবে না। ২. লোহা, তামা ইত্যাদি বেঁধে বিশেষ ধরনের পুটকা করা যাবে না। (৩) যে তাবীজে আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াত নেই সে ধরনের তাবীয হতে পারবে না। (৪) তাবীজকেই প্রকৃত রোগ মুক্তিদাতা বা সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না।- সহীহ মুসলিম ২/২২৪, ফাতাওয়া শামী ৬/৩৬৩, সুনানু আবি দাউদ ২/১৮৩, তিরমিযী শরীফ: ২/২৬।

মুহাম্মাদ শফিউল আলম, নান্দাইল, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: কোনো অমুসলিমের ঘরে রান্না করা গোশ্ত খাওয়ার ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী কি?
উত্তর: যদি অমুসলিম মেজবান বলে যে, এই গোশ্ত মুসলমান কর্তৃক জবাইকৃত হালাল পশুর কিংবা কোনো মসুলমান থেকে ক্রয় করা এবং তার কথা বিশ্বাসযোগ্য হয় সাথে সাথে সাধারণভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পবিত্র পাত্রে রান্না করা হয়, তাহলে তা মুসলমানের জন্য খাওয়া হালাল হবে। তথাপি না খাওয়াই উত্তম।- আদ্-র্দুরুল মুখতার: ৯/৪৯৭, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/১০০, আল-হিদায়া: ৪/৩৮৫, আল-জাওহারাতুন্-নায়্যিরাহ: ১/৩৬২।

মুহাম্মাদ নাঈমুর রহমান, গাজীপুর
প্রশ্ন: অনেক এলাকায় মাইকে কুরআন খতমের আয়োজন করা হয়। একে তাদের পরিভাষায় শবীনা বলা হয়। এক শ্রেণীর হাফেজ এ শবীনায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এভাবে মাইকে কুরআন খতম করা এবং করানো জায়িয আছে কিনা? একে নাজায়িয বলা হলে, তারা বলে তাহলে তো মাইকে কিরাআত পড়া এবং হদর তিলাওয়াতও নাজায়িয হওয়া চাই! তাদের এ কথায় আমাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে যায়। কাজেই এ ব্যাপারে শরী‘আতের সঠিক বিধান বিস্তারিতভাবে জানানোর বিনীত আবেদন করা গেলো!
উত্তর: মাইকে কুরআন খতম করা ও করানো দু’টিই নাজায়িয। যে তা করে এবং করায় উভয় শ্রেণীই গুনাহগার হয়। কারণ মাইকে কুরআন খতম করলে এলাকাবাসীর ইবাদাত ও আরামে ব্যঘাত সৃষ্টি হয়। তাছাড়া কুরআনে কারীমের তিলাওয়াতের আওয়াজ যাদের কানে পৌঁছে, তাদের উপর আদবের সাথে গুরুত্বসহকারে তিলাওয়াত শ্রবণ করা জরুরী। এর বিপরিত করা গুনাহ। অথচ এলাকাবাসী তাদের নিজ নিজ পেশা ও কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের পে এতো দীর্ঘ সময়ের তিলাওয়াত গুরুত্বের সাথে শ্রবণ করা সম্ভবপর হয় না। এতে কুরআনে কারীমের অবমাননা হয়। আর এর গুনাহ খতমকারী এবং আয়োজক সকলের উপর বর্তায়।
পান্তরে মাইকে কিরাত বা হদর তিলওয়াত সাধারণত কোনো অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে এবং একেবারে স্বল্প সময় হয়। তাই মাইকে কুরআন খতম নাজায়িয হওয়ার উল্লিখিত কারণসমূহ কিরাত ও হদর তিলাওয়াতে পাওয়া যায় না বিধায় এর অনুমতি আছে।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৯৮, খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ১/১০৩, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১/৫০৪, কিফায়াতুল মুফতী: ৩/৪০২।

মুহাম্মাদ সফিউল্লাহ, তেঘরিয়া
প্রশ্ন: ৭৮৬ দ্বারা কী বুঝায়? আমরা এর দ্বারা বিসমিল্লাহ বুঝি এবং বিভিন্ন লেখার শুরুতে তা লেখি। কিন্তু কেউ কেউ বলেন, এ সংখ্যা দ্বারা একটি মুর্তির নাম বুঝানো হয়। তাই তা কোনো কিছুর শুরুতে ব্যবহার করা যাবে না। এ েেত্র সঠিক বিষয় কী? বিস্তারিত জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।
উত্তর: ৭৮৬ দ্বারা বিসমিল্লাহ এর দিকে ইশারা করা হয়। কেননা আরবী বর্ণমালার মান অনুযায়ী বিসমিল্লাহ- এর মধ্যে থাকা বর্ণগুলোর মান সমষ্টি হয় ৭৮৬। এ সংখ্যা কোনো মুর্তি বা দেবতার নাম বুঝায় না। তবে যে কোনো ভালো কাজ আরম্ভ করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলে বা লিখে আরম্ভ করার সাওয়াব ৭৮৬ দ্বারা অর্জন হবে না। উপরন্তু বিসমিল্লাহ- এর পরিবর্তে ৭৮৬ লিখা সুন্নাতের বিপরিত আমল করার শামিল। কাজেই তা পরিহার করে পূর্ণ বিসমিল্লাহ লিখবে কিংবা মুখে বলবে। তবে কারো কারো মতে মুখে বিসমিল্লাহ বলে ৭৮৬ লিখে সেদিকে ইশারা করার অবকাশ আছে।- ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১৮/৩৫, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল, আফকে মাসায়িল আওর উনকা হল: ৮/৩৪৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight