জীবনজিজ্ঞাসা

অমুসলিম পরকালে নাজাত পাবে কি না প্রসঙ্গে
আলহাজ্ব আবদুল আলিম চৌধুরী, চৌধুরীপাড়া, ডি আই, টি রোড, খিলগাঁও।
প্রশ্ন: কোন অমুসলিম যদি উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয় এবং সমাজ সেবামূলক কাজ করে, তাহলে সে পরকালে নাজাত পাবে কি না? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
উত্তর: পরকালের নাজাত পাওয়ার বিষয়টি ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং যদি কেউ ঈমান ব্যতীত দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করে তাহলে যত ভালো কাজ করে থাকুক না কেন সে নাজাত পাবে না। কেননা, আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনানে ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার দরবারে গ্রহণযোগ্যধর্ম একমাত্র ইসলাম। [সূরা আলে-ইমরান]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অবলম্বন করে কস্মিনকালেও তা তার থেকে গ্রহণ করা হবে না। আর আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৫]
একটি উদাহরণ দ্বারা উক্ত বিষয়টি আরো স্পষ্ট রূপে বুঝা যাবে বলে আশা করি। যেমন, এক ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। কিন্তু কোন কারণে সে আইন পরিপন্থী কাজ যেমন, জুয়া, চুরি, বা অসামাজিক কাজ ইত্যাদি করে বসে। তাহলে এরূপ ব্যক্তির অন্তরে যেহেতু রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে তাই তার প্রতি দেশদ্রোহীর শাস্তি প্রয়োগ করা হবে না এবং তাকে দেশান্তরিত করাও হবে না। বরং তার শাস্তি হবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় সে সরকারের অনুগত প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি অত্যন্ত ভদ্র ও ন¤্র স্বভাবের অধিকারী হয় এবং কোন প্রকার অসামাজিক কাজে লিপ্ত না হয়। কিন্তু সরকারকে ও দেশকেই সে অমান্য করে তাহলে তাকে দেশদ্রোহী সাব্যস্ত করে দেশান্তরিত করা হবে অথবা ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হবে। ইসলামী আইনের বিষয়টি অনুরূপ। [আশরাফুল জাওয়াব, ৩৭৬]

জানাযার নামাযের পর একত্রিত হওয়া, দোয়া করা প্রসঙ্গে
নবী হোসেন, পাগাড়, টঙ্গী, গাজীপুর।
প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় প্রচলিত আছে যে, মৃত ব্যক্তির জানাযার নামায আদায় করার পরপরই কবরস্থ করার পূর্বে সবাই সম্মিলিতভাবে দু’আ করে থাকেন। এই দু’আর প্রথা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কিনা? কোন কোন আলেম বলেন, জানাযার নামায আদায়ের পরপরই কবরস্থ করার পূর্ব পর্যন্ত দু’আ বৈধ নয়। আবার কোন কোন আলেম বলেন, জানাযার নামাযের সালাম ফিরানোর পরপরই কবরস্থ করার পূর্বে কিছু পড়াশুনা এবং কবরস্থান জিয়ারত করে দু’আ করা বৈধ আছে। সঠিক সমাধান জানতে চাই।
উত্তর: জানাযার পরাটাই প্রকৃতপক্ষে মাইয়্যিতের জন্য মুসলমানদের তরফ থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট উৎকৃষ্ট সম্মিলিত দু’আ। জানাযার তৃতীয় তাকবীরের পর দু’আ পরে মাইয়্যিতের জন্য সকলে মিলে আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করে থাকে। কাজেই জানাযা পড়ে পুনরায় তার জন্য সম্মিলিত দু’আ করা নিষ্প্রয়োজন এবং এ ধরনের দু’আ করার কথা কুরআন-হাদীসে সাবিত নেই। বরং জানাযার পরে দু’আ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কারণ, এতে মাইয়্যিতকে দাফন করতে দেরী হয়ে যায়, যা শরীয়তে নিষেধ। এই একই কারণে জানাযার পর মাইয়্যিতের চেহারা দেখানো নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, এতেও দাফনে দেরী হয়।
উল্লেখ্য, জানাযার নামায পড়ে সকলে মিলে লাশ সামনে নিয়ে আবার দু’আ করার অর্থ হবে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মের দু’আর উপর সন্তুষ্ট না হয়ে নিজেরা একটা নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে নেয়া যা শরীয়তে নিন্দনীয় ও বিদ’আত। তবে সম্মিলিতভাবে না করে প্রত্যেকে মনে মনে দু’আ করতে কোন অসুবিধা নাই। তেমনিভাবে কবর দেয়ার পর যিয়ারত করেও দু’আ করতে পারে। [ফাতাওয়ায়ে শামী, ২: ২১২# ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া, ১: ২৫৬# আহসানুল ফাতাওয়া, ১: ৩৩৬]

উমুরী কাযা আদায় করার নিয়ম প্রসঙ্গে
মোর্কারম আলী, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: আমি আমার জীবনের সব কাজা নামায হিসাব করে রেখেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ হিসেবের খাতা হারিয়ে ফেলেছি। আর এখন আমার ওই কাযা ওয়াক্তগুলোর কথা স্মরণে নেই। এখন আমি যদি আনুমানিক কয়েকদিন ধরে নিই, যেমন, ১০ দিনের হিসাব ধরে ফজরের সকল কাজা নামাযের মধ্য হতে প্রথম কাজা নামাযটি আদায় করছি যদি এভাবে নিয়ত করে পড়ি, তাহলে কি নামায হবে? না হলে এখন করণীয় কী?
উত্তর: যেহেতু আপনার জীবনের কাজা নামাযের খাতা হারিয়ে গিয়েছে এবং ওই হিসাব পুরোপুরি আপনার স্মরণে নেই, তাই এখন আপনার করণীয় হল, অনুমান করে কয়েকদিন না ধরে বরং যে কয়দিনের ব্যাপারে আপনার প্রবল ধারণা হয়, সে কয়দিন ধরে আপনার হিসাব আরম্ভ করবেন এবং এভাবে নিয়ত করবেন যে, আমার জীবনের যত ফজরের নামায কাজা আছে, তার মধ্য থেকে প্রথম কাজা নামাযটি পড়ছি। এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের নাম বলে পড়তে থাকবেন। পড়তে পড়তে যখন দিলে সাক্ষী দিবে যে, এখন আর জীবনে কোনো কাজা নামায নেই, তখন পড়া সমাপ্ত করবেন। [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১: ১২১/ হিদায়া, ১৫৪/ ফাতাওয়ায়ে শামী, ২: ৬২]

জামা‘আতে নামায পড়ার সময় কারেন্ট চলে গেলে করণীয় প্রসঙ্গে
মাসুম বিল্লাহ, পানির ট্যাংকি সংলগ্ন, যশোর রোড, ঢাকা।
প্রশ্ন: অনেক সময় আমরা যখন জামা‘আতে নামায পড়তে দাঁড়াই, তখন নামাযের মধ্যে এক রাক‘আত বা দুই রাক‘আত অথবা তিন রাক‘আত পড়া শেষ হলে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন যদি আই পি এস অথবা জেনারেটরের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ওই অবস্থায় মুসল্লিগণের করণীয় কি আমরা মুসল্লীরা নামাযের নিয়ত ছেড়ে দিব? নাকি ওই অন্ধকারেই বাকি নামায শেষ করব?
উত্তর: ঘরে বা মসজিদে জামা‘আতের সাথে বা একাকী নামায পড়া অবস্থায় যদি বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে অন্ধকার হয়ে যায় এবং এ অন্ধকারের কারণে যদি কোনো ক্ষতিকর প্রাণীর ক্ষতির আশংকা না হয়, তাহলে ওই অবস্থায় কারো জন্য নামায ভাঙ্গা জায়েয হবে না। বরং ওই অবস্থায়ই নামায সমাপ্ত করবেন। এতে কারো নামাযের ক্ষতি হবে না। তবে ওই জায়গায় নামাযের বাইরে থাকলে, তার উচিত হবে সেখানে কোনোভাবে আলোর ব্যবস্থা করা, যাতে মুসলমানগণ ইতমিনানের সাথে নামায পড়তে পারেন।
উল্লেখ্য, যেখানে নামাযের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আশংকা থাকে, সেখানে কর্তৃপক্ষের উচিৎ নামাযে দাঁড়ানোর আগেই বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করে রাখা, যাতে নামাযের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলেও মুসল্লীদের কোনো পেরেশানী না হয়। [তাহাবী শরীফ, ১০৪ পৃ./ আদদুররুল মুখতার, ১ম খ. ৪৩৩ পৃ./ ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১১শ খ. ১২২ পৃ.]

দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির উপায় প্রসঙ্গে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, অর্জুনতলা, নোয়াখালী।
প্রশ্ন: আমি দশম শ্রেণীর একজন ছাত্রী। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করি এবং সময় মত সব কাজ সমাধা করার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রায়ই আমি মানসিক অশান্তিতে ভুগি। নানা দুশ্চিন্তা আমার ওপর ভর করে। অনেক চেষ্টা করেও আমি মনকে স্থির রাখতে পারি না। মানসিক অস্থিরতার কারণে মাঝে মাঝে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। যার কারণে আমি লেখা-পড়ায় খুব দুর্বল এবং মানসিকভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য কোনো দুআ আছে কি? উল্লেখিত সমস্যার জন্য আমার কী করা উচিত?
উত্তর: কী কারণে আপনার এত মানসিক অশান্তি, এত দুশ্চিন্তা বা এত অস্থিরতা তা আপনি বর্ণনা করেননি। তাই সুনির্দিষ্টভাবে তার সমাধান দেয়া সম্ভব হলো না। এজন্য ব্যাখ্যাসহ প্রশ্ন পাঠাবেন বলে আশা রাখি।
তবে মনে রাখবেন, মানুষের অশান্তি, দুশ্চিন্তা, এগুলো আল্লাহ তাআলার উপর থেকে মানুষের ভরসা ও আস্থা কমে যাওয়ার কারণেও হয়ে থাকে। তাই আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ণ মাত্রায় আস্থা ও ভরসা করার দ্বারা দুশ্চিন্তা কমে যায়। এ ছাড়া হাদিসে আছে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা এ দুআ পাঠ করলে দুশ্চিন্তা দূর হয়- আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল ইজযি ওয়াল কাছলি ওয়া আউযুবিকা মিনাল বুখলি ওয়াল জুবুনি ওয়া আউযুবিকা মিনাল গালাবাতিত দাঈনি ওয়া কাহরির রিজালি। [সূরা তালাক, ৩/ আবু দাউদ শরীফ, মিশকাত শরীফ, ২১৫]

নামাযে সূরাহর তারতীব প্রসঙ্গে
মুহাম্মদ. জোবায়ের এহসান, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ।
প্রশ্ন: খতমে তারাবীতে কুরআন খতমের দিনে নামাযের শেষ রাকাআতে শেষ সূরা নাস অতঃপর সূরা বাকারার কিছু অংশ পাঠ করার একটি রেওয়াজ হাফেজ সাহেবদের মাঝে চালু আছে। অথচ নামাযে সূরাহর তারতীব রক্ষা না করা মাকরুহ। সুতরাং, আমার প্রশ্ন হলো, উল্লেখিত সুরতে তারতীব রহিত হবে কি-না? হলে করণীয় কী? বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
উত্তর: হ্যাঁ, স্বাভাবিক অবস্থায় নামাযে কুরআনের তারতীবের খেলাফ তেলাওয়াত করলে নামায মাকরূহ হবে। তবে খতমে তারাবীহের ক্ষেত্রে মাসআলা ভিন্ন। তারাবীহতে কুরআন খতম হলে পরের রাকআতে সূরা বাকারার কিছু অংশ পড়া মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস রয়েছে, তিনি ইরশাদ করেন, উত্তম ওই ব্যাক্তি যে কুরআন খতম করে আবার আরম্ভ করে। তাই তারাবীহের ক্ষেত্রে এরূপ করা মাকরূহ হবে না। [ফাতাওয়ায়ে শামী,১:৫৪৭/ ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম, ৪: ২৬০]

বাচ্চাদেরকে টিকা দেয়া প্রসঙ্গে
সালমা আক্তার, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: (ক) বাচ্চাদেরকে টিকা দেয়া জায়েয কিনা?
(খ) আকীকার পশু জবেহ করার সময় বাচ্চার নাম উচ্চারণ না করলে অথবা ভুল নাম উচ্চারণ করলে আকীকা সহীহ হবে কি?
উত্তর: (ক) বাচ্চাদের টিকা দেয়া জায়েয আছে। তবে টিকা দিলে রোগ হয় না বা টিকা রোগ প্রতিরোধের পূর্ণ ক্ষমতা রাখে এরূপ বিশ্বাস করা ইসলাম পরিপন্থী। ছোট-বড় সকলের সুস্থতা-অসুস্থতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা থেকেই হয়। বস্তুত টিকা ইত্যাদি এক ধরনের তদবীর মাত্র। যা ফলদায়ক হওয়া বা না হওয়া এক মাত্র আল্লাহর হুকুমেই হবে। তাই তাতে উপকার হলে তা আল্লাহই দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং কোন উপকার না পেলে তাও আল্লাহর ফয়সালায়ই হয়েছে বলে ইয়াক্বীন করতে হবে।
(খ) হ্যাঁ, উল্লিখিত উভয় সূরতেই ওই বাচ্চার আকীকা সহীহ হবে। [সূরা আরাফ, আয়াত: ১৮৮/ সূরা ইউনুস, আয়াত: ৪৯/সূরা রা’আদ, আয়াত: ১৬]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight