জীবনজিজ্ঞাসা

কুরবানীর পশুর সাথে কিংবা সতন্ত্রভাবে আকীকা প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ মারুফ হাসান, রানাভোলা, তোরাগ, ঢাকা।
প্রশ্ন: কুরবানীর গরুর সাথে অথবা পৃথক ভাবে কুরবানীর দিনে ছাগল দিয়ে আকীকা দেওয়া জায়েয আছে কি?
কুরবানীর সাথে আকীকা দিলে ছেলেদের জন্য দুই ভাগ এবং মেয়েদের জন্য এক ভাগ। আর আকীকা ছাগল দিয়ে দিলে ছেলেদের জন্য দুইটি এবং মেয়েদের জন্য একটি ছাগল দিলে আকীকা আদায় হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হল, কিছু দিন আগে এক হুজুর বললেন যে, কুরবানীর গরুর সাথে আকীকা দিলে ছেলেদের বেলায়ও এক ভাগেই আকীকা আদায় হয়ে যাবে। আর ছাগল দিয়ে আকীকা দিলে দুটি ছাগলই লাগবে।
উক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সঠিক উত্তর জানতে ইচ্ছুক।
উত্তর: ছাগল দ্বারা আকীকা করার ক্ষেত্রে সম্ভব হলে ছেলের জন্য দুটি আর মেয়ের জন্য  একটি জবেহ করা ভাল। আর কুরবানীর গরুর সাথে শরীক হওয়ার ক্ষেত্রে ছেলের জন্য দুই অংশ এবং মেয়ের জন্য এক অংশ দিলে ভাল।
তবে কেউ যদি ছেলের পক্ষ থেকে একটি বকরী দ্বারা আকীকা করে অথবা কুরবানীর গরুর সাথে এক অংশে ছেলের আকীকার জন্য শরীক হয় তাও জায়েয় আছে।
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত আলেমের উক্তিটি আংশিক ভাবে সঠিক হলেও পূর্ণভাবে সঠিক বলা যায় না। [ ফাতাওয়া রহীমিয়া ২:৯৪ বেহেশতী যেওর ৩: ৪২-৪৩]
একটি গরুতে সাত শরীক আকীকা করা প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ রাকিব, ফতেহপুর, সদর, সিলেট।
প্রশ্ন: আমাদের গ্রামে একজন ইমাম সাহেব বললেন যে, আকীকার নিয়ম হলো ছেলের জন্য দুইটি ও মেয়ের জন্য একটি বকরী বকরী আকীকা করা সুন্নত। অতঃপর তিনি বললেন যে, যদি সাত শরীকে গরু কুরবানী হয়, তাহলে ছেলের জন্য  দুই অংশ ও মেয়ের জন্য এক অংশ দ্বারা আকীকা করা সুন্নত। আর যদি কুরবানী ছাড়া অন্য সময়ে আকীকা করা হয়, তখন ছেলের জন্য একটি পূর্ণ গরু অথবা দুইটি বকরী দ্বারা আকীকা করতে হবে। এক্ষেত্রে গরুর দুই অংশ দ্বারা আকীকা হবে না। এ নিয়ে সমাজে দ্বিধাদ্বন্ধ চলছে। অতএব এর শরয়ী সঠিক বিধান কি এবং কুরবানী ও গায়রে কুরবানীর ক্ষেত্রে আকীকার হুকুম গরুর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন? না কি এক?
উত্তর: ইমাম সাহেব যে মাসআলা দিয়েছেন, তার এ মাসআলা সঠিক হয়নি। কিতাব অনুযায়ী সঠিক মাসআলা হল এই যে, যেমনিভাবে একটি গরুতে সাতজন শরীক হয়ে কুরবানী করতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে একটি গরুতে সাতজন শরীক হয়ে আকীকাও করতে পারবে। তাতে কোন অসুবিধা নেই কুরবানীর সময় ও অন্য সময় এক্ষেত্রে বরাবর। তবে কোন শরীক শুধু গোশতের জন্য শরীক হতে পারবে না। বরং আকীকা বা ওলীমা বা কুরবানীর কোন একটির নিয়্যতে শরীক হতে হবে। আর বকরীর ব্যাপারে সঠিক সমাধান এই যে, একজন বালকের জন্য দুইটি বকরী দ্বারা আকীকা করা সুন্নত। হ্যাঁ, তবে যদি কারো সামর্থ্য না থাকে, তাহলে একটি বকরী দ্বারা আকীকা করলেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। [কিফায়াতুল মুফতী ৮: ২৬৩]
কুরবানীর গোস্তের বন্টন প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ রাহাত ইবনে মাহবুব, মির্জানগর, সুনাইমুড়ি, নোয়াখালী।
প্রশ্ন: আমরা জানি কুরবানীর গোস্ত তিনটি ভাগে ভাগ করতে হয়, কিন্তু আমাদের গ্রামের একজন বলল, গরীবদের কুরবানীর গোস্ত দিলেও চলে, না দিলেও চলে। এ ব্যাপারে শরীয়তের বিধান জানতে চাই।
উত্তর: কুরবানী দাতার জন্য কুরবানীর গোস্ত বন্টন করার মুস্তাহাব পন্থা হল তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য,  এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য হাদিয়া দিবে এবং আরেক ভাগ গরীব মিসকীনদেরকে দান করবে। এটা মুস্তাহাব বা উত্তম। সুতরাং কেউ সম্পূর্ণ গোস্ত নিজের জন্য রাখতে পারে। তাতে কুরবানীর কোন ক্ষতি হবে না। [ আদদুররুল মুখতার ৬: ৩২৮]
নিয়্যতকৃত কুরবানীর পশু বিক্রি করা প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ আহসান হাবীব, খেড়িহর, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।
প্রশ্ন: জনৈক ব্যক্তি তার নিজস্ব একটা গরু কুরবানী করার নিয়্যত করেছিল। কিন্তু কুরবানীর পূর্বেই গরুটি মারাত্মক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে, যার কারণে গরুটি বিক্রি করে ফেলতে হয়েছে। এখন কি উক্ত ব্যক্তির কুরবানী করতে হবে? এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক।
উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় উক্ত ব্যাক্তির কুরবানী করার নিয়্যতের কারণে কুরবানী ওয়াজিব হয়নি। শুধু নিয়্যতের কারণে কোন কিছু ওয়াজিব হয় না। হ্যাঁ, যদি তার উপর আগে থেকেই কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। সে ক্ষেত্রে নিয়্যত ব্যতীতই তার যে কোন একটা কুরবানী দিতে হবে। তাই তার উপর যদি পূর্ব থেকেই কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে, তাহলে কোন জানোয়ার খরিদ করে কুরবানী করে দিতে হবে। উক্ত জানোয়ার  দ্বারা কুরবানী দেয়া তার উপর জরুরী নয়। যদি পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব না হয়, তাহলে শুধু এরূপ নিয়্যতের কারণে তার উপর কোন কিছু ওয়াজিব হয়নি। তবে যদি তার ইচ্ছা হয়, তাহলে নফল হিসাবে একটা কুরবানী করতে পারে। [ ফাতাওয়া শামী ৬:৩২১, ফাতাওয়া রহীমিয়া ২:৮৪]
মীরাস বন্টন না হওয়া অবস্থায় কুরবানী পদ্ধতি প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, শিবপুর, নবীনগর, বি-বাড়ীয়া।
প্রশ্ন: পিতা মারা যাওয়ার পর সাহেবে নেসাব (অর্থাৎ যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক) কয়েকজন ভাই একত্রে বাস করে। তারা তাদের মিরাস এখনোও বন্টন করেনি।
এখন প্রশ্ন হল- তাদের সকলের পক্ষ থেকে একটি কুরবানী দিলেই চলবে কিনা? জানতে ইচ্ছুক।
উত্তর: বর্ণনা অনুযায়ী তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে পৃথক কুরবানী অর্থাৎ একটি করে বকরী বা গরু, উটের সাত ভাগের এক ভাগ কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব। সুতরাং একটি বকরী বা সাত ভাগের এক ভাগের মধ্যে সকলে শরীক হয়ে কুরবানী দিলে তাদের জন্য সহীহ হবে না।
উল্লেখ্য, মীরাস বন্টনে দেরী করা অন্যায়। ইন্তিকালের দিনই বা দু একদিনের মধ্যেই মীরাস বন্টন করে নেয়া ওয়াজিব। তারপরে তারা একত্রেও থাকতে পারে বা পৃথক পৃথকও থাকতে পারে। তবে পর্দা রক্ষার জন্য পৃথক হয়ে বসবাস করা উত্তম। আমাদের দেশে সকলে মিলে একত্রে বসবাস করাকে ভাল মনে করা হয়, এটা মূলত উত্তম নয়। [ আহসানুল ফাতাওয়া ৭:৪৮৬/ আদ্দুররুল মুখতার ৬:৩১৬]
পেনশনের টাকা দ্বারা হজ্জ করা প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ সুমন ভুঁইয়া, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ, কক্সবাজার।
প্রশ্ন: পেনশনের টাকা দ্বারা হজ্জ করা যাবে কি-না?
উত্তর: পেনশনের টাকা সর্বসম্মতিক্রমে হালাল। এতে কোন খারাবী বা গুনাহ নেই। তাই এটা গ্রহণ করা যাবে এবং এর দ্বারা হজ্জও আদায় করা যাবে। আপনার উপর হজ্জ ফরজ হয়ে থাকলে আপনি উক্ত টাকা গ্রহণ করে হজ্জে যাবার নিয়্যত করে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করুন। [আহসানুল ফাতাওয়া ৪: ২৬০, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল ১: ২৫০, ফাতাওয়া রহীমিয়া ৫: ১৪৭]
জমি ও ব্যবসা সামগ্রী থাকা অবস্থায় হজ্জের হুকুম প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, আউলিয়াপুর, সদর,পটুয়াখালী।
প্রশ্ন: কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ ক্যাশ না থাকলেও কি হজ্জ ফরয হতে পারে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর: হ্যাঁ, প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত নগদ ক্যাশ না থাকলেও কোন ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরয হতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তির নিকট অতিরিক্ত জমা-জমি, প্লট ও ব্যবসার সামগ্রী ইত্যাদি রয়েছে, তা হতে কিছু বিক্রি করলে হজ্জের খরচ হয়ে যায় এবং অশিষ্ট দ্বারা উক্ত ব্যক্তি ফিরে আসা পর্যন্ত নিজ পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনীয় হাজত পূর্ণ হয়ে যায়। তাহলে এমন সব ব্যক্তিবর্গের উপর উক্ত সম্পদ বিক্রি করে হজ্জ করা ফরয। সুতরাং নগদ ক্যাশ হাতে না থাকলেও হজ্জ ফরয হতে পারে। [ আহসানুল ফাতাওয়া ৪: ৫৩২, মু’আল্লিমুল হুজ্জাজ৮১]
মহিলার জন্য জমি বিক্রি করে হজ্জ করা প্রসঙ্গে
সাদিয়া জাহান নূর, ওয়েস্টার্নপাড়া, দরগাহ রোড, সদর, ভোলা।
প্রশ্ন: জনৈক মহিলার স্বামী ও উপার্জনশীল পুত্র আছে। উক্ত মহিলার ব্যক্তিগত কিছু জমিও আছে যা বিক্রি করলে হজ্জের খরচ হবে। উল্লেখ্য, তার অন্য কোন সম্পদ নেই। এমতাবস্থায় তার হজ্জ করার ব্যাপারে শরীয়তের ফয়সালা কি?
উত্তর: হ্যাঁ, উক্ত মহিলার ঐ সম্পত্তি বিক্রি করে যদি তার নিজের ও সফরসঙ্গী স্বামী বা কোন মাহরামের হজ্জ সফরের জন্য যথেষ্ট হয়, তাহলে তার উপর হজ্জ করা ফরয হবে। কেননা, এমতাবস্থায় উক্ত জমি তার নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুর অন্তর্ভুক্ত নয়।
উল্লেখ্য যে, মহিলার উপর হজ্জ ফরয হওয়ার জন্য নিজের পাথেয় এবং নিজ খরচে হজ্জযাত্রী মাহরাম না পাওয়া গেলে স্বামী বা মাহরাম সঙ্গীর পাথেয় থাকা জরুরী। তা না হলে তার উপর হজ্জ ফরযই হবে না। যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোন মাহরাম না পাওয়া যায় তথাপিও গায়রে মাহরাম কোন পুরুষ বা কোন মহিলার সাথে হজ্জে যেতে পারবে না। সেই অবস্থায় বদলী হজ্জ করানোর জন্য ওসীয়্যত করা কর্তব্য। [ ফাতাওয়া শামী ২: ৪৬২/ ফতাওয়া আলমগীরী ১: ২১৯]

ঈদের নামাযে মাসবূক হওয়া প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ, শামুকখোলা, লোহাগাড়া, নাড়াইল।
প্রশ্ন: যদি কেউ ঈদের নামাযে মাসবূক হয় তাহলে সে কেমন করে ছুটে যাওয়া নামায আদায় করবে?
উত্তর: (ক) যদি কেউ প্রথম রাক’আতের অতিরিক্ত তাকবীরের পর ইমামের ইকতিদা করে, তাহলে সে প্রথমে তাকবীরে তাহরীমা বলে অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি বলবে। যদিও ইমাম কিরাআত আরম্ভ করে দিয়ে থাকে।
(খ) আর যদি কেউ ইমামকে প্রথম রাক’আতের রুকূ অবস্থায় পায়, তাহলে সে তাকবীরে তাহরীমার পরে অতিরিক্ত তাকবীর বলে রুকূতে যাবে। আর যদি তার আশংকা থাকে যে, অতিরিক্ত তাকবীর বলতে গেলে ইমামকে রুকূ অবস্থায় পাবে না, তাহলে সে প্রথমে রুকূতে যাবে। রুকূতে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত তাকবীরগুলো হাত উঠানো ব্যতীত আদায় করবে। আর যদি তাকবীরগুলো শেষ করার পূর্বেই ইমাম রুকূ থেকে উঠে যায়, তাহলে অবশিষ্ট তাকবীরগুলো তার জন্য মাফ হয়ে যাবে।
(গ) আর যদি সে দ্বিতীয় রাক’আতে শরীক হয়ে দ্বিতীয় রাক’আতের অতিরিক্ত তাকবীরগুলো বলতে পারে, তাহলে সে ইমামের দুই দিকে সালাম ফিরানোর পর উঠে দাঁড়াবে এবং কিরাত শেষ করে রুকূতে যাওয়ার পূর্বে অতিরিক্ত তাকবীরগুলো আদায় করে রুকূর তাকবীর বলে রুকূতে  যাবে। কারণ, এটা তার দ্বিতীয় রাক’আত আর ইমামের সঙ্গে যে রাক’আত পড়েছে, তা প্রথম রাক’আত গণ্য হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight