জীবনজিজ্ঞাসা

পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার
মো. খাইরুল ইসলাম, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
জিজ্ঞাসা : পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার জায়িয কি-না?
জবাব : পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার জায়িয নয়। তবে রৌপ্যের আংটি এক তোলার এক তৃতীয়াংশের সামান্য কম পরিমাণ ব্যবহার করতে পারে। রাজা-বাদশা কাজী ও মুতাওয়াল্লীর জন্য সীল মহর হিসেবে রৌপ্যের আংটি ব্যবহার করা জায়িয। [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৫: ৯৭, হিদায়া, ৪: ৪৪১]
ওরস করার হুকুম
মো. রবিউল ইসলাম, ভোলা।
জিজ্ঞাসা : বর্তমান যামানায় অনেক পীর সাহেব নির্ধরিত সময় ওরস করে এবং মুরিদরা সেখানে গরু-ছাগল নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের যোগ দেয়া ঠিক হবে কি-না? এবং এই ধরনের ওরস করা জায়িয কি-না?
জবাব : ওরস বলতে আমরা বুঝি কোন পীরের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে তার মাযারে কয়েকদিন ব্যাপী বিভিন্ন ধরনের অনষ্ঠান করা এবং খানা-পিনার ব্যবস্থা করা। এ ব্যাপারে প্রথম কথা হচ্ছে এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে কোন ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু বা তার স্বরণে কোন দিবস পালন করা জায়েয নয়। যদিও তিনি ওলী বা কুতুব হন। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার কবরকে তোমরা ঈদ বা মেলা বানাবে না। আমার কবরকে তোমরা পূজা বা মূর্তি বানাবে না। তাই এধরনের ওরস পালন করা শরীয়তে জায়িয নয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে অধিকাংশ ওরসে পুরুষ-মেয়ে বিনা পর্দায় একসাথে একত্রিত হয় এবং সেখানে অনেক শরীয়ত বিরোধী ও অসামাজিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এসব ওরসে শরীক হওয়া বা পালন করা হারাম। উল্লেখ্য যে, সাহাবায়ে কেরাম এবং
তাবিয়ীনের যুগে এসবের কোন প্রচলন ছিল না। আর এখনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রেওয়ায বা কোন নবীর কবরে কিংবা কোন সাহাবায়ে কিরামের কবরস্থলে কোন ওরস হয় না। সুতরাং এটা আমাদের দেশের একটা বিদআতী রুসুম। [খাইরুল ফাতাওয়া, ৫৭৩]

কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে খাওয়া
মো. সুহাইল আহমদ, বারিধারা, ঢাকা।
জিজ্ঞাসা : বিয়েতে আনুষ্ঠানিকতা করা কি? প্রচলিত নিয়মে কমিউনিটি সেন্টারে চেয়ার ও ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া হয়, এটি জায়িয কি না?
জবাব : দ্বীনদার ও আত্মীয়-স্বজন বা দ্বীনদার লোকদের কোন মজমায় বিবাহ হওয়া সুন্নত। পরহেজগার ও দ্বীনদার লোকদের যত বড় মজমা হবে বিবাহে ততই বরকত হবে। আর এ মজমা মসজিদে হওয়া আরেকটি সুন্নত।
বিবাহ উপলক্ষ্যে শরীয়াতের দৃষ্টিতে মেয়ের পিতার উপর বিবাহের অনুষ্ঠান করার কোন দায়িত্ব নেই। বরং স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পর স্বামী তার সামর্থ অনুসারে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরকে ওলিমা খাওয়াবে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো ওলিমা অনুষ্ঠানে যেন শরীয়ত পরিপন্থি কোন কাজ না হয় এবং অতি আড়ম্বর না হয়। কারণ হাদীসে পাকে স্বল্প ব্যয়ের বিবাহকে অতি বরকতপূর্ণ বলা হয়েছে।
আমাদের দেশে বরযাত্রীদের কনের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার যে প্রথা প্রচলিত আছে এবং এ ব্যাপারে যে বাধ্যবাধকতা আছে তা সম্পূর্ণ নাজায়িয। [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৭, ৩১৮]
বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে বিবাহের যে অনুষ্ঠানে করা হয় এতে শরীয়াত
পরিপন্থী অনেক কাজ সংঘটিত হয়। যেমন, টাকার অপচয়, বেপর্দাভাবে মহিলাদের সমাগম, গান-বাদ্য ইত্যাদি। কমিউনিটি সেন্টারে বিবাহ অনুষ্ঠানের সবচাইতে আপত্তিকরা বিষয় হচ্ছে এতে সাধারণত যশ ও সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে, অথচ হাদীস শরীফে এ উদ্দেশ্যে কোন কাজ করার জন্য মারাত্মক শাস্তি হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। এর আরেকটি জঘন্যতম দিক হচ্ছে, এ ধরনের অনুষ্ঠান সাধারণত মানুষকে আল্লাহ তাআলার (যিকির) স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে দেয়। আর যে সকল কাজ যিকরুল্লাহ থেকে অমনোযোগী করে দেয়, হাদীস শরীফে সেগুলোকে জুয়া আখ্যা দেয়া হয়েছে। কাজেই এসকল অনুষ্ঠান মোটেও জায়িয হতে পারে না। [ইসলামী শাদী ২৩১-২৩২]
তবে ওলিমা অনুষ্ঠানের জন্য নিজ বাড়িতে স্থান সংকুলান না হলে অপারগতার কারণে কমিউনিটি সেন্টারে ওলিমা অনুষ্ঠান করা জায়িয হওয়ার জন্য শর্ত হলো তা উল্লিখিত শরীয়ত পরিপন্থী কোন কাজ সহ অন্য কোন নাজায়িয বিষয় হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে। [সূরা মায়িদা ৯১, লুকমান ১৮, আরাফ ৩১, সুনানে বাইহাকী ৬: ১০০, কাশফুল খাফা ২: ২২৭, মিশকাত ২: ২২৫, ২৭৮, ২৬৮, ইসলামী শাদী ২৩২, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ৭: ৩১৮]
পিতা-মাতার অবাধ্য স্ত্রীর হুকুম
জহিরুল ইসলাম, পূর্বধলা, ময়মনসিংহ।
জিজ্ঞাসা : আমি বিয়ে করেছি বিগত কয়েক মাস পূর্বে। আমার স্ত্রী বিয়ের পর থেকে আমার আব্বা-আম্মার কথা শুনছে না। এমন কি আমার মত মতও চলছে না। কয়েক বার বিচার করার পরও সে শুধু ক্ষমা চেয়ে যাচ্ছে। কয়েক বার ক্ষমা করা হয়েছে। তারপরও ঠিক হচ্ছে না। আমি এখন স্ত্রীর ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিতে পারি?।
জবাব : বৈধ কাজে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর যিম্মায় ওয়াজিব। স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষেও মুরব্বী হিসাবে শশুর-শাশুড়ির খেদমত করাও ভাল। তবে স্ত্রীকে তার শশুর-শাশুড়ির খেদমতে বাধ্য করার অধিকার স্বামীর নেই। সুতরাং আপনার আনুগত্যের জন্য বার বার বুঝানোর পরেও যদি আপনার সহীহ বোঝ বা পরামর্শ না মানে, আপনার পিতা-মাতার মান ইজ্জতও রক্ষা করছে না, সে জন্য ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার জন্য সর্বোত্তম পন্থা হল, প্রথমে তাকে কুরআন-হাদীস দ্বারা তার কর্তব্য ও ভুল দিক বুঝিয়ে দিন। আপনি নিজে না পারলে কোন আলেম বা আলেমার সহযোগিতা নিবেন। এ নসিহতেও কাজ না হলে আপনি তার থেকে বিছানা পৃথক করবেন। এতেও কাজ না হলে উভয় পক্ষের দু‘জন মুরুব্বীকে বসিয়ে তাদের মাধ্যম ঘটানো নিষ্পত্তি করে নিন। এতেও ফায়দা না হলে তালাক দেয়া আপনার জন্য বৈধ হবে।
তালাক দেয়ার নিয়ম : স্ত্রী যখন পবিত্র থাকবে অর্থাৎ হায়েয শেষ হয়ে পাক হবে এবং আপনি তার সঙ্গে মেলামেশা থেকে বিরত থাকবেন, তখন শুধু একটি তালাক দিবেন একথা বলে যে, আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম। এর সাথে বায়েন ইত্যাদি বলবেন না। ইদ্দৎ শেষ হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর খোরপোষ ও মহরানা আদায় করে দেবেন। এ সুরতে ইদ্দতের ভিতরে বা পরে যদি স্ত্রী অনুতপ্ত হয় বা সংশোধন হয়ে আপনার নিকট থাকতে চায়, আর আপনিও গ্রহণ করতে চান, তাহলে সহজে তা করতে পারবেন। [ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম, ৯: ৩৮-৩৪, রুদ্দুল মুহতার/ নফউল মুফতি,৩৪০]
কোন আলেমকে গালি দেয়া
মো. মিযানুর রহমান, বগুড়া।
জিজ্ঞাসা: কোন মুসলমান ব্যক্তি যদি কোন আলেমকে গালি দেয়, তাহলে তার স্ত্রী তালাক হবে কি-না?
জবাব : কোন মুসলমান অন্য মুসলমানকে বিনা কারণে অন্যায়ভাবে গালিগালাজ করলে ঈমান হারা হয়ে যায় না। ঈমানদারই থাকে। তবে গুনাহগার হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন মুসলমানকে গালি দেয়া বা সমালোচনা করা ফাসিকী কাজ এবং ঝগড়া হানাহানী করা কুফরী কাজ। [বুখারী শরীফ ১ : ১২]
পক্ষান্তরে শুধুমাত্র আলেমে দ্বীন ও ইলমে দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষবশত অবজ্ঞা, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য ও তিরস্কারসূচক মনোভাব নিয়ে কোন আলেমকে গালি দিলে গালিদাতার ঈমান নষ্ট হয়ে সে মুরতাদ বেঈমান সাব্যস্ত হবে। নতুনভাবে কালিমা পড়ে এরূপ ব্যক্তির ঈমান দোহরাতে হবে। বিবাহিত হলে, ঈমান গ্রহণের পর তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক নতুনভাবে পুনঃস্থাপন করা জরুরি হবে। তেমনিভাবে পূর্বে ফরজ হজ করে থাকলে তা আবার দোহরাতে হবে। [আহসানুল ফাতাওয়া, ১: ৩৯, আল-আশবাহ ওয়ান্নাযায়ির]
তিন হাজার টাকার চেক আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করা
জনাব আশিকুর রহমান, মহাখালী, ঢাকা।
জিজ্ঞাসা : কোন লোক তার তিন হাজার টাকা দামের ব্যাংক চেক নগদ পঁচিশ শত টাকায় বিক্রি করেছে। এটা তার জন্য জায়িয হয়েছে কি-না?
জবাব: টাকা পয়সার এই লেন-দেন অর্থাৎ, বেচা-কেনা বা ভাঙ্গানো যেহেতু বাইয়ে সরফ বা টাকা পয়াসার বেচা-কেনা যার জন্য শর্ত হল ক. উভয় দিক সমান হতে হবে, কম বেমি করলে জায়িয হবে না। খ. উভয় দিক থেকে নগদ পরিশোধ করা অথচ উল্লিখিত লেন-দেনে চেকের টাকা নগদ হচ্ছে এবং উভয় দিক সমান নয়। সুতরাং উহা জায়িয হবে না, এমনকি উক্ত সুরতে তিন হাজার টাকার চেকের স্থলে পঁচিশ শত টাকার চেক হলেও একদিকে বাকী হওয়ায় উক্ত লেন-দেন সহীহ হবে না।
মাতা-পিতার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত
মো. রুহুল আমিন, গাজীপুর।
জিজ্ঞাসা : মাতা-পিতার পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত এবং স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত, একথা  কুরআন-হাদীস সম্মত কি?
জবাব : মাতা-পিতার পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত এ বিষয়ে সহীহ বর্ণনা হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়। তবে স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর
বেহেশত এরূপ সরাসরি কোন হাদীস না থাকলেও এর ভাবার্থ হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়। যার দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তানের জন্য মাতা-পিতার বাধ্যগত হওয়া এবং স্ত্রীর জন্য স্বামীর বাধ্যগত হওয়া জরুরি।
আর যদি মাতা-পিতা ও স্বামী আল্লাহ তাআলার নাফরমান হয়, তাহলেও যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শরীয়াতের বরখেলাফ কোন হুকুম না দেয় ততক্ষণ তাদের কথা মান্য করা জরুরি। আর যদি তারা আল্লাহ ও রাসূলের  হুকুমের বরখেলাফ কোন হুকুম দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মানা জরুরি। মা-বাবার ও স্বামীর হুকুম মেনে আল্লাহর হুকুমের নাফরমানি করা কখনও জায়িয হবে না। [মিশকাত শরীফ ২: ৪২১, সূরা আনকাবুত ৮, তিরমিযী শরীফ ১: ২১৯]
খুতবার সময় দানবাক্সা চালানো
হাফেজ আমিনুল ইসলাম, হাসাড়া, মুন্সিগঞ্জ
জিজ্ঞাসা : আমাদের মসজিদে বহুদিন ধরে জুমআর দিন একটি নিয়ম চালু আছে যে, ইমাম সাহেব যখন জুমআর খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়ান তখন সামনের কাতারগুলোতে দানবাক্স চালিয়ে দেয়া হয়। আর পেছনের কাতারগুলোতে খাদেম নিজেই রুমাল বা থলে হাতে হেঁটে হেঁটে টাকা ওঠান। খুতবা চলাকালীন এভাবে দানবাক্স চালানো এবং রুমাল দিয়ে টাকা ওঠানো কি ঠিক হচ্ছে?
জবাব : জুমআর নামাজের খুতবা চলাকালীন সকল কাজকর্ম থেকে বিরত থেকে খুতবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। এ সময়ে দানবাক্স চালিয়ে হোক বা কাতারে কাতারে থলে হাতে বা রুমাল নিয়ে হেঁটে হেঁটে অথবা অন্য যে কোনো উপায়ে হোক টাকা ওঠানো ও টাকা দেয়া নাজায়েয।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি খুতবা চলাকালীন কংকর সরালো সেও অনর্থক কাজ করলো। অন্য হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি অনর্থক কাজ করলো তার জুমআই শেষ হয়ে গেলো। তাই খুতবা চলাকালীন কোনো অবস্থাতেই দান-অনুদান তোলা যাবে না। [সহীহ বুখারী : ১/১২৭; বাদায়িউস সানায়ি : ২/২০৩; ফাতহুল কাদীর : ২/৬৬]

2 মন্তব্য রয়েছেঃ জীবনজিজ্ঞাসা

  1. সাকলায়েন হোসাইন says:

    আমার পরিচিত এক আত্মীয় আছে তার তিনজন সন্তান রয়েছেন কিন্তু আজ বিয়ের এতদিন পরে তিন এক নারীর সাথে প্রেম করছেন যা তার সন্তান ও স্ত্রি ভালো চোখে দেখছেন না এমনকি পুরো পরিবারের অন্নরাও তার উপর হতাশ এখন আমাদের কি করনিও?

    • আল জান্নাত says:

      বিষয়টা যে ধর্মীয় দিক থেকে এবং সামাজিকভাবে খারাপ ও জঘন্য্ তা তাকে ভালোভাবে ভালোভাবে বোঝান। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা কখা বুঝিয়ে বলুন। তিনি যাদেরকে মুরব্বী মানেন তাদের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করুন। সবচেয়ে ভালো হয়, তাকে কিছুদিনের জন্য তাবলীগে পাঠান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight