জীবনজিজ্ঞাসা

জাল টাকা চালানো প্রসঙ্গে।
মুহা. শেখ ফরিদ, মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রশ্ন : আমি একজন দোকানদার। আমার কাছে কয়েকটা ১০০ ও ৫০০ টাকার জাল নোট জমা হয়েছে। নোটগুলো রেখে দিয়েছি যতœ করে। মাঝে মধ্যে চিন্তা করি যে, জাল টাকাগুলো চালিয়ে দিবো। কিন্তু বিবেক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই জানতে চাই যে, নোটগুলো কি চালিয়ে দিতে পারবো?
উত্তর : ইসলামের দৃষ্টিতে কাউকে ধোঁকা দেয়া সম্পূর্ণ নাজায়িয, কবীরা গুনাহ, ও হারাম। ১০০ ও ৫০০ বা যে কোন অংকেরই হোক না কেন, জাল টাকা মূলত কোনো টাকা নয়।বরং টাকার সূরতে সম্পূর্ণ ধোঁকা। বাস্তবে এর কোনো মূল্য নেই। সেটা শুধুই টাকার মত করে ছাপানো সাধারণ কাগজ মাত্র। এ কারণেই কেউ যদি বুঝে যে, এটা জাল টাকা, তাহলে সে তা কখনোই নিবে না। তাই বর্ণিত সূরতে আপনাকে যে, ১০০/৫০০ টাকার জাল নোট দিয়ে ধোঁকা দিয়েছে, এর জন্য সে মারাত্মক গুনাহগার হবে এবং কিয়ামতের দিন তাকে আপনার এ পাওনা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এ কারণে অন্য কাউকে ধোঁকা দেয়া আপনার জন্য জায়িয হবে না।
তাই আপনার নিকট থাকা জাল টাকাগুলো কোনক্রমেই চালিয়ে দেয়া জায়েয হবে না। বরং এ অবস্থায় আপনার করণীয় হলো ওই জাল টাকাগুলো পুড়ে বা ছিঁড়ে ফেলা, যাতে এর মাধ্যমে আর কেউ কাউকে ধোঁকা দিতে না পারে। আশাকরি, এ ত্যাগের কারণে আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে অন্যভাবে বরকত দান করবেন। [সূরা বাকারা, আয়াত, ১৮৮/ তিরমিযী শরীফ, ১: ২৩২, ২৪৪]

রাসূলে কারীম সা.-এর জানাযার নামায প্রসঙ্গে।
মুহা. বাবুল মিয়া, মল্লিকদাহ, পঞ্চগড়।
প্রশ্ন : রাসূলে কারীম সা. এর জানাযার নামাজ হয়েছিলো কি? জানাযা হলে কী নিয়মে হয়েছিলো এবং ইমামতি কে করেছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই রাসূলে কারীম সা. এর জানাযার নামাজ হয়েছিল। তবে তাঁর জানাযা অন্য সকলের মতো জামা‘আত আকারে হয়নি। বরং প্রত্যেকেই রাসূলে আকরাম সা. এর হুজরাখানায় প্রবেশ করে একাকী জানাযার নামায পড়ে বেরিয়ে এসেছেন। সর্বপ্রথম ফেরেশতাগণ তাঁর জানাযা পড়েছেন। এরপর মুসলমান জীনরা। এর পর ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম রা. তাঁর জানাযা পড়েছেন। এজন্যই তাঁর জানাযার কোনো ইমাম ছিল না।
[ হাওয়ালা : সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪র্থ খ-, পৃ-৩২১/ সীরাতুন্নবী, ২য় খ-, পৃ: ৪৮৭/ ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১৩ শ খ-, পৃ: ১৮৮)
ফাতাওয়ার কিতাবসমূহের অনুসরণ প্রসঙ্গে।
মুহা. আবু তাহের, পশ্চিম গাটিয়াডাঙ্গা।
প্রশ্ন : একজন মুসলমান কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুসরণ করে চললে কিয়ামতের ময়দানে নাজাত পাবে, নাকি ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী/ ফাতাওয়ায়ে শামী/ ফাতাওয়ায়ে কাজীখান ইত্যাদি অনুসরণে নাজাত পাওয়া যাবে?
উত্তর : একজন মুসলমানের ময়দানে নাজাত পেতে হলে কুরআন ও সহীহ হাদীসের পাশাপাশি ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ফাতাওয়ায়ে শামী, ফাতাওয়ায়ে কাজীখান ইত্যাদি সকল ফাতাওয়ার কিতাবও অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ সকল ফিক্বহ তথা মাসআলা-মাসায়িল কিতাবের অনুসরণ মূলত কুরআন হাদীসেরই অনুসরণ। কেননা, এ সকল ফাতওয়ার কিতাব হলো কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা। ফিক্বহ ছাড়া সরাসরি কুরআন ও হাদীসের মাসআলা বুঝা দুষ্কর। বরং সাধারণ লোকদের জন্য তা অসম্ভবের পর্যায়ে। এতে করে তাদের ভুল বুঝে গোমরাহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
[হাওয়ালা : সূরাহ তাওবা, আয়াত, ১২২, সূরা বাকারাহ, আয়াত, ১২৯/ সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৬৪/ সূরা জুমআ, আয়াত, ২।]
জামা‘আতে নামাজ পড়ার সময় কারেন্ট চলে গেলে করণীয় প্রসঙ্গে।
মুহা. আলাউদ্দিন, লালমোহন, ভোলা।
প্রশ্ন : অনেক সময় আমরা যখন জামা‘আতে নামাজ পড়তে দাঁড়াই, তখন নামাজের মধ্যে এক রাক‘আত বা দুই রাক‘আত অথবা তিন রাক‘আত পড়া শেষ হলে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন যদি আই. ডপ. এস. অথবা জেনারেটরের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ওই অবস্থায় মুসল্লীদের করণীয় কী? তখন কি আমরা মুসল্লীরা নামাযের নিয়ত ছেড়ে দিব? নাকি ওই অন্ধকারেই বাকি নামায শেষ করব?
উত্তর : ঘরে বা মসজিদে জামা‘আতের সাথে বা একাকী নামায পড়া অবস্থায় যদি বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে অন্ধকার যদি কোনো ক্ষতিকর প্রাণীর ক্ষতির আশংকা না হয়, তাহলে ওই অবস্থায় কারো জন্য নামাজ ভাঙ্গা জায়েয হবে না। বরং ওই অবস্থায়ই নামায সমাপ্ত করবেন। এতে কারো নামাজের ক্ষতি হবে না। তবে ওই জায়গায় নামাজের বাইরে কেউ থাকলে, তার উচিত হবে সেখানে কোনোভাবে আলোর ব্যবস্থা করা, যাতে মুসল্লিগণ ইতমিনানের সাথে নামাজ আদায় করতে পারে। উল্লেখ্য, যেখানে নামাজের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আশংকা থাকে, সেখানে কর্তৃপক্ষের উচিত নামাজে দাঁড়ানোর আগেই বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করে রাখা, যাতে নামাজের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলেও মুসল্লীদের কোনো পেরেশানী না হয়। [হাওয়ালা : তাহাবী শরীফ, ১০৪ পৃ/ আদদুররুল মুখতার, ১ম খ-, ৪৩৩ পৃ/ ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১১ শ খ-, ১২২ পৃ]
বাচ্চাদের টিকা দেয়া প্রসঙ্গে।
আবু খাদিজা মুবাশশিরা, ঢাকা।
প্রশ্ন: (ক) বাচ্চাদেরকে টিকা দেয়া জায়িয কিনা? (খ) আকীকার পশু জবেহ করার সময় বাচ্চার নাম উচ্চারণ না করলে অথবা ভুল নাম উচ্চারণ করলে আকীকা সহীহ হবে কি?
উত্তর : (ক) বাচ্চাদের টিকা দেয়া জায়েয আছে। তবে টিকা দিলে রোগ হয় না বা টিকা রোগ প্রতিরোধের পূর্ণ ক্ষমতা রাখে এরূপ বিশ্বাস করা ইসলামপরিপন্থী। ছোট-বড় সকলের সুস্থতা-অসুস্থতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা থেকেই হয়। বস্তুত টিকা ইত্যাদি এক ধরনের তদবীর মাত্র। যা ফলদায়ক হওয়া বা না হওয়া আল্লাহরই হুকুমে হবে। তাই তাতে উপকার হলে তা আল্লাহই দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং কোন উপকার না পেলে তাও আল্লাহর ফায়সালায়ই হয়েছে বলে ইয়াক্বীন করতে হবে। (খ) হ্যাঁ, উল্লিখিত উভয় সূরতেই ওই বাচ্চার আকীকা সহীহ হবে। [হাওয়ালা : সূরা আরাফ, আয়াত,  ১৮৮/ সূরা: ইউনুস, আয়াত, ৪৯/ সূরা: রা‘আদ, আয়াত: ১৬]
বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা প্রসঙ্গে।
দেলাওয়ার হোসেন, ঢাকা।
প্রশ্ন :  বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা কি জায়েয হবে? অনেক বীমা কোম্পানীতে বিভিন্ন রকম বীমা করে তার থেকে বোনাস প্রহণ করে থাকেন তা কি হালাল হবে?
উত্তর : না, বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা জায়েয হবে না এবং বোনাস ভোগ করা জায়েয হবে না। আমাদের জানা মতে, এদেশের কোনো বীমা কোম্পানীই সুদমুক্ত নয়। তাই এ সকল বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা বা তাদের প্রদত্ত বোনাস বা লভ্যাংশ গ্রহণ করা বা ভোগ করা হালাল হবে না। বরং তা সম্পূর্ণ হারাম ও সুদের অন্তর্ভুক্ত।
[হাওয়ালা : সূরা: বাকারা, আয়াত, ২৭৫-২৭৮/ সূরা: আলে ইমরান, আয়াত, ১৬১/ আহসানুল ফাতাওয়া, ৮ম খ-, পৃ:-৯০]
কুরবানীদাতার ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করা প্রসঙ্গে।
হুমায়ুন কবীর রিয়াজ, সুবিদাখালী, পটুয়াখালী।
প্রশ্ন : আমার মামা আমেরিকায় থাকেন। তিনি প্রতি বৎসর কুরবানীর ঈদে আমাদের দেশে পশু কুরবানী করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হলো, মাঝে মধ্যে তিনি আমেরিকায় আমাদের থেকে একদিন পড়ে ঈদের নামাজ পড়েন। এ জন্য তার আমেরিকায় ঈদের নামাজ পড়ার পর আমাদের পরে পশু কুরবানী করতে হয়। যার জন্য একটু সমস্যায় পড়তে হয়।
এ সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় আছে কি? আমরা যদি তার আমেরিকায় ঈদের নামাজ পড়ার আগেই দেশে ঈদের নামাজের পর পশু কুরবানী করি, তাহলে কি তার পক্ষ থেকে এ কুরবানী আদায় হবে? নাকি দাতা মামার আমেরিকায় ঈদের নামাজ পড়ার পরই আমাদের দেশে তার দেয়া পশু কুরবানী করতে হবে?
উত্তর: উল্লিখিত ক্ষেত্রে শরীয়তের মাসআলা হলো- কুরবানীর পশু যে দেশের যে স্থানে আছে ওই স্থানে ঈদের নামাজ হয়ে গেলে সেখানকার সকল পশু কুরবানী করা সহীহ হবে। চাই কুরবানীদাতা এদেশে থাক বা অন্য দেশে থাক। অথবা সে ঈদের নামাজ আগে পড়–ক বা পরে পড়–ক, তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
সুতারং বর্ণিত সুরতে আপনার মামা আমেরিকায় ২/১ দিন পর ঈদের নামাজ পড়লেও এদেশে ২/১ দিন আগে পশু কুরবানী যেখানে আছে, সেখানে ঈদের নামাজ হয়ে গেলে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করতে পারবেন। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। তা সহীহ হবে।
[হাওয়ালা : বুখারী শারীফ/ মুসলিম শরীফ/ মিশকাত শরীফ, ১২৭/ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৫ম খ-, পৃ. ২৯৫]
নামাজে বৈঠক না করে দাঁড়িয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে।
মুহাঃ হাফিজুর রহমান, তেজগাঁও, ঢাকা।
প্রশ্ন : (ক) চার রাক‘আত বিশিষ্ট নামাজে কেউ যদি ভুল করে ২য় রাক‘আতে না বসে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে তাকে কী করতে হবে? (খ) কেউ যদি ভুল করে ৪র্থ রাক‘আত বা শেষ বৈঠকে না বসে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে তিনি কিভাবে নামাজ শেষ করবেন?
উত্তর : (ক) চার রাক‘আত বিশিষ্ট ফরজ, সুন্নত ও নফল প্রত্যেক নামাজে দ্বিতীয় রাক‘আতে বৈঠক করা ওয়াজিব। যদি কেউ ভুলে প্রথম বৈঠকে না বসে তৃতীয় রাক‘আতের জন্য দাঁড়িয়ে যান, তাহলে তার করণীয় হলো, ওয়াজিব তরক করার কারণে নামাজ শেষে সিজদায়ে সাহু আদায় করতে হবে। তাহলে নামাজ সহীহ হয়ে যাবে। আর তা না করলে ওই নামাজ আবার পড়তে হবে।
(খ) ৪র্থ রাক‘আতে শেষ বৈঠক করা ফরজ। তাই যদি কেউ ৪র্থ রাক‘আতে শেষ বৈঠক না করে পঞ্চম রাক‘আতের জন্য ভুলে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে পঞ্চম রাক‘আতে সিজদা করার আগ পর্যন্ত যদি এ ভুলের কথা স্মরণ হয়, তাহলে সাথে সাথে বসে শেষ বৈঠক করে নামাজ শেষে সিজদায়ে সাহু করবেন। আর যদি পঞ্চম রাক‘আতের সিজদা করার পর স্মরণ হয়, তাহলে আরো এক রাকআত মিলিয়ে মোট ছয় রাক‘আত পড়ে সিজদায়ে সাহু করে নামাজ শেষ করবেন। এ ক্ষেত্রে পুরো নামাজ নফল বলে গণ্য হবে। তাই নামাজ যদি ফরজ বা সুন্নত হয়, তাহলে ওই নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।
তবে যদি শেষ বৈঠক করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে এ অবস্থায় সেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে। তাই তা পুনরায় পড়তে হবে না।
[হাওয়ালা: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খ-, পৃ:-১২৫/ ফাতাওয়ায়ে শামী, ২য় খ-, পৃ:- ৭৭/ বাদায়েউস সানায়ে, ১ম খ-, পৃ:-৪০২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight