জীবনজিজ্ঞাসা

মুহা: আবুল কালাম
ফরিদাবাদ, ঢাকা।
প্রশ্ন: গোসল করার সময় পানি ব্যবহারের সর্বোত্তম পদ্ধতি কোনটি? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: শরীরের কোথাও নাপাক কিছু থাকলে তা পানিদ্বারা পরিষ্কার করতে হবে। তারপর অযূ করবে। উত্তমরূপে গড়গড়াসহ কুলি করবে। এরপর ডান কাঁধে তিনবার পানি ঢালবে। অতঃপর বসে বাম কাঁধ তিনবার এবং সর্বশেষ মাথায় তিনবার পানি ঢেলে সর্ব শরীর উত্তমরূপে ধূয়ে দিবে। ইহাই গোসলের সুন্নত পদ্ধতি। (আলমগিরী)
আবুল খায়ের, বারহাট্টা, নেত্রকোনা
প্রশ্ন: আমাদের মসজিদে আমরা চার থেকে সাড়ে চার শো লোক জুমার নামায পড়ি। খুতবার পর ইমাম সাহেব বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ কাতার ঠিক করে নাও। যার কারণে কাতার বাঁকা থাকবে সে দায়ী থাকবে। কিন্তু অনেক সময় মুসল্লী বেশি হওয়ার কারণে কাতার ঠিকমত সোজা করা যায় না। এদিকে নামায শুরু হয়ে যায়। এতে যারা নামায পড়েন তারা দায়ী হবেন কী? ইমাম সাহেবের উক্তিটি শুনে অনেকে বলে, আমার নামাযের দায়িত্ব ইমাম সাহেবের উপর অর্পন করলাম। এতে কি ইমাম সাহেব দায়ী হবেন? না যারা পড়েন, তারা দায়ী হবেন। বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: জামাতে দাঁড়ানোর সময় কাতার সোজা করা প্রত্যেক মুসল্লীর দায়িত্ব। কারো ত্রুটি বা গাফলতির জন্য কাতার সোজা না হলে সেই গোনাহর ভাগী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই হবেন। ইমাম সাহেব নামাযের কাতারের ত্রুটির জন্য দায়ী হবেন না।
মুহা: বেলায়েত হোসেন
বি- ২২১, খিলগাঁও, ঢাকা।
প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনের ‘তওবাতুন-নাসূহা’ শীর্ষক আয়াতটি কখন কি পরিস্থিতিতে নাযিল হয়েছিল? শানে নুযূলসহ বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর: “তওবাতুন- নাসূহা” অর্থ আন্তরিক তওবা। তাফসীরবিদ হযরত আতা ইবনে রাবাহ রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বণর্না করেন যে, হযরত নবী কারীম সা. ওয়াহশীর নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পর তিনি বলেছিলেন, আমি বিশ্বাসে মুশরেক। ব্যভিচার, মদ্যপানের ন্যায় ভয়ানক সব পাপকর্মে লিপ্ত। আমি বিলক্ষণ জানি যে, যারা এসব কাজকর্মের সাথে জড়িত আল্লাহ পাক তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয় যে, তবে যারা তওবা করে ঈমান আনে এবং নেক আমল করে।
ওয়াহশী  বললেন, এটা এমন কঠিন একটি শর্ত যা পূরণ করা আমার ন্যায় এক পাপী বান্দার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। আমি ঈমান আনার পর হয়ত বা আমলে- সালেহ বা নেক আমল নাও করতে পারি। এর আগেই আমার মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। এই মুহূর্তেই আর একখানা আয়াত নাযিল হলো, আল্লাহ পাক একমাত্র শেরেকির গুনাহ মাফ করবেন না, এছাড়া যাকে ইচ্ছা তার অন্য সব গুনাহ মাফ করে দিবেন।
ওয়াহশী বললেন, আয়াতে তো স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। কিন্তু আমাকে ক্ষমা করার ইচ্ছে যদি তাঁর না হয় তাহলে আমার উপায় কি হবে?
এর পরই তওবাতুন নাসূহা সম্পর্কিত আয়াতটি নাযিল হয়। এরপর ওয়াহশী আর দ্বিরুক্তি না করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ইসলাম কবূল করলেন। পরবর্তীতে সাহাবীগণ হযরত নবী কারীমের সা. নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আয়াতটি কি শুধুমাত্র ওয়াহশীর রা. এর জন্য প্রযোজ্য, নাকি সকল উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য? জবাবে আল্লার নবী সা. বললেন, এটি ক্ষমার সুসংবাদ এবং এটি সমগ্র উম্মতে মুহাম্মদীর সা. জন্যই প্রযোজ্য। (তাফসীরে বগভী)
মুহা: মোস্তফা কামাল
রামপুরা, ঢাকা।
প্রশ্ন: চট্টগ্রামের বিখ্যাত বুযূর্গ হযরত মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী রহ. জীবনী, আদর্শ ও অবদানের কথা অনুগ্রহ করে জানাবেন।
উত্তর: হযরত মাওলানা সুলতান আহমদ নানূপুরী ছিলেন বাংলার একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম, বুযূর্গ এবং দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার আন্দোলনের পুরুধা পুরুষ। ১৩৩২ হিজরির শাবান মাসের শুক্লপক্ষে উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন ধর্মপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। কথিত আছে যে, তাঁর পঞ্চম পূর্বতন পুরুষ হযরত আকবর শাহ আফগানিস্তান থেকে এসে এই গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এখনও ধর্মপুর গ্রামের এক বাঁশবাগানে তাঁর কবর বিদ্যমান।
শিশুকালে স্থানীয় মক্তবে ওবায়দুল হক মিয়াজীর নিকট তাঁর শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি। মক্তব শিক্ষার পর গর্জ্জনীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাস্টার আবদুল গফুরের তত্বাবধানে এবং তার পর নানুপুর কালুমুন্সির হাটস্থ মাদরাসা ওবায়দিয়াতে নি¤œমাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে চট্টগ্রাম শহরস্থ দারুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৩৫৬ পাটনার ইসলাহুল মুসলেমীন মাদরাসায় ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করেন। অতঃপর দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হয়ে উচ্চ শিক্ষার সনদ লাভ করেন। অতঃপর আরও কিছুকাল দেওবন্দে অবস্তান করে অন্যান্য বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি বিশ্ববিখ্যাত বুযূর্গ হযরত মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর নিকট আধ্যাত্মিক তালীম গ্রহণ করতে শুরু করেন। ১৩৬৬ হিজরিতে বাবুনগর মাদরাসায় হাদীসের উস্তাদরূপে কর্মজীবন শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল অবস্থায় স্বীয় মুরশিদ হযরত মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়ালে চট্টগ্রামের মুফতি আজীজুল হক সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। মুরশিদের নির্দেশক্রমেই হিজরী ১৩৮০ সনে নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে এই মাদরাসাটি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দ্বিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হযরত নানুপুরী রহ. নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসা ছাড়াও ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে আরও কয়েকটি উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। এছাড়াও তিনি হাজার হাজার আলেম ও আগ্রহী মানুষকে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ দান করে গেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি ছিলেন সুন্নতের অনুসারী। দেশের চলমান ইসলামী আন্দোলনেরও একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৯৯৭ সনের ১৬ আগস্ট মোতাবেক ১১ রবিউস সানী ১৪১৮ হিঃ তারিখে এই মহান সাধক পুরুষের ইন্তেকাল হয়।
মুহা: আবু হাসান সুমন
বাইশধার, ঠাকুরাকোনা, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: বাবা, মা পীর সাহেবকে তাজিমের উদ্দেশ্যে পা-চুম্বন করা জায়েয কিনা? পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান দিয়ে কৃতার্থ করবেন।
উত্তর: কদমবুছি বা পদচুম্বন নামক যে রীতিটি সমাজে প্রচলিত আছে এটা সচরাচর মানুষের পায়ে সেজদা করার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করা হয়। কেননা, সেজদা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত মানুষের পায়ে তাজীমবশতঃ সেজদা করা হারাম। হারাম একটি কাজের সাথে সামঞ্জস্য হওয়ার আশঙ্কায় অধিক সাবধানী আলেমগণ এটাকে নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করে থাকেন। জনৈক বহিরাগত সাহাবী কর্তৃক হযরত নবী করীম সা. এর পায়ে চুমু দেওয়ার যে ঘটনাটি হাদীসের কিতাবে রয়েছে, সেটিকে একটি ব্যতিক্রমি ঘটনা রূপেই হাদীস তত্ত্ববিদগণ উল্লেখ করে থাকেন। অবশ্য অধিকাংশ আলেমই কিছু শর্তসাপেক্ষে কদমবুছি জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন। যেমন, শুধুমাত্র সম্মানপ্রদর্শন ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে হতে হবে। কদমবুছির সাথে মাথা নত করা চলবে না। (শরহে মেশকাত)
এম মিজানুর রহমান
সাংবাদিক, হেমায়েতপুর, পাবনা।
প্রশ্ন: সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নেই। বাক্যটি নিয়ে কয়েকজনের মধ্যে তর্ক হয়েছে। আপনার নিকট এ বাক্যটির ব্যাখ্যা চাচ্ছি। অনুগ্রহপূর্বক অবশ্যই জানাবেন।
উত্তর: প্রাণীজগতের তথা সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে মানুষের অবস্থান সবার উপরে এতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নাই। পবিত্র কুরআনে মানুষকে যে আল্লাহপাক সমগ্র সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবচাইতে বেশি সম্মানিত এবং সর্বাপেক্ষা সুন্দর অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন একথা স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে। হাদীস শরীফের ভাষায় মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্ট জগতের সেরা। আলোচ্য পঙ্ক্তিটি দ্বারা যদি সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মানুষকে প্রদত্ত এইসব অনুপম বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা থাকে, তবে তাতে দি¦মত প্রকাশ করার অবকাশ কোথায়?
মুহাম্মাদ জামাল হুসাইন, চরফ্যাশন, ভোলা
প্রশ্ন: বর্তমানে রোগীর শরীরে অন্যের দেহের রক্ত পোশ করা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অপারেশনের রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত দেয়া অনেকটা অপরিহার্য বিষয়। লোকজন মহৎ কাজ মনে করে স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে এগিয়ে আসে। এ রক্তদান কার্যক্রমের ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী? কারো দেহে অপরের রক্ত পোশ করার পর তাদের মাঝে এমন রক্তিয় সম্পর্ক স্থাপন হয়ে যায় কি না যদ্বারা উভয়ের মাঝে বিয়ে অবৈধ হয়ে যায়?
উত্তর: কারো দেহে রক্তের একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে তাকে রক্ত দেয়া জায়িয আছে। তবে কোনো অবস্থাতেই রক্ত বিক্রি করা বা রক্ত দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয নেই। অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেও বিনিময় ছাড়া রক্ত পাওয়া না গেলে একান্ত প্রয়োজনে বিনিময় দিয়ে হলেও রক্ত গ্রহণ করা জায়িয আছে। আর এর মাধ্যমে দু’জনের মাঝে রক্তের কোনো সম্পর্ক স্থাপন হয় না বিধায় তাদের মাঝে এ কারণে বিয়ে হারাম অবৈধ হয় না।- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩৫৫, জাওয়াহিরুল ফিক্হ: ২/৩৮, ৪০, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল: ১/৩২২।
মুহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান, দোহার, ঢাকা
প্রশ্ন: কুরআনে কারীমের আয়াত না লিখে শুধু তরজমা ছাপানো জায়িয আছে কিনা বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: কুরআনে কারীমের শুধু তরজমা ছাপানো জায়িয নেই। অবশ্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজনে এক-দুই আয়াতের তরজমা ছাপানোর অনুমতি আছে। এ ক্ষেত্রেও তরজমার অংশটুকুতে কুরআনে কারীমের হুকুম প্রযোজ্য হবে। তরজমার স্থানে উযূ ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না এবং অংশটুকু যথাযথ আদবের সাথে হেফাজত করা জরুরী।- আদ্-র্দুরুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ১/৪৮৬, ফাতহুল কাদীর: ১/২৪৮, জাওয়াহিরুল ফিকহ: ১/৯৭, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৬৫-৬৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight