জীবনজিজ্ঞাসা

যাকাত কে? কাকে? কখন দিবে?
শরীফুল আলম, সাভার, ঢাকা।
প্রশ্ন: যাকাত কার উপর? কখন ওয়াজিব হয়? যাকাত এর হকদার কারা? যাকাত রমযান মাসেই কি আদায় করতে হয়? নাকি অন্য কোন মাসে আদায় করলেও চলে?
উত্তর:  সাবালক সজ্ঞান মুসলমান নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়ার পর চান্দ্র মাস হিসেবে ঠিক একবছর কার অতিক্রান্ত হলে যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
নিসাবের পরিমাণ: ঋণ ও মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ কিংবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য, অথবা তৎসমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার মালের মালিক হলে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত আদায় করতে হয়। যাদের সাথে দাতার জন্মগত সম্পর্ক আছে, যেমন পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী প্রমূখ এবং দাতার সাথে যাদের জন্মগত সম্পর্ক আছে, যেমন ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী ইত্যাদি, তাদেরকে যাকাত ফিতরা দেয়া যায় না। অনুরূপভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে, স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত-ফিতরা দিতে পারে না। অমুসলীম ও ধনী ব্যক্তিকে দান করলেও যাকাত ফিতরা আদায় হয় না। তা এমন সব গরীব ও ফকীর মিসকীনকে দিতে হবে, যাদের নিকট নেসাব পরিমাণ মাল নেই। ধর্মীয় খেদমতে রত নিঃস্ব ও দরিদ্র ব্যক্তিবর্গকে যাকাত-ফিতরা দান করলে ধর্মীয় খিদমতের সহযোগিতা হিসেবে অধিক সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়।
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সময়টি যদি রমযান মাস না হয়ে অন্য কোন মাস হয় তাহলে সে মাসেই যথা তারিখে সমুদয় মালের যাকাতের সম্পূর্ণ হিসাব নিকাশ করে যাকাতের পরিমাণ বের করা জরুরী এবং আদায়ের ক্ষেত্রেও রমযানের অপেক্ষা না করাই উত্তম। কারণ, কোন লোক রমযান আসার পূর্বে যদি ফরয যাকাত আদায় না করেই ইন্তেকাল করে, তাহলে যাকাতের ফরয তার জিম্মায় থেকে যাবে। তবে ওয়াজিব হওয়ার পূর্বেই যদি রমযানে যাকাত অগ্রিম আদায় করে তাতেও কোন দোষ নেই। এভাবে সারাজীবন অগ্রিম যাকাত দিতে থাকলেও কোন অসুবিধা নেই। [আহসানুল ফাতাওয়া, ৪. ২৫৫# কিফায়াতুল মুফতী, ৪. ২৬২# আলমগীরী, ১. ১৮৭-১৯২]

ঈদের আগে বা পরে ফিতরা দেয়ার হুকুম কি? ইসলামী সংগঠনকে ফিতরা দেয়া যাবে কিনা?
শামছুল হুদা, হালুয়াঘাট, ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন: সৌদিতে ফিতরা নেয়ার যোগ্য লোক খুব কম। প্রবাসী বাঙ্গালীরা নিজ দেশে উপযুক্ত প্রার্থীর নিকট ঈদের ২/৩ দিন পূর্বে কিংবা ৫/৭ দিন পরে ফেতরা পৌঁছালে ফিতরা আদায় হবে কি? অথবা ঈদের নামাযের পূর্বে প্রার্থীকে পৌঁছানোর নিয়্যতে আলাদা রেখে দিলে পরে পাঠানোর সুযোগ আছে কি? দেশের ইসলামী সংগঠনকে ফিতরা দেয়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, এভাবে দিলেও সদকায়ে ফিতর আদায় হয়ে যাবে। এতে কোন গুনাহ হবে না। তবে উত্তম হলো ঈদের নামাযের পূর্বেই ফিতরার টাকা গরীবদের নিকট পৌঁছে দেয়া। পূর্বে আলাদা করে রেখে পরে পাঠিয়ে দিলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে।
সহীহ ইসলামী সংগঠনকে ফিতরা দেয়া যাবে যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, তারা ফিতরার টাকা সঠিক খাতে অর্থাৎ, গরীব মিসকীনদেরকে মালিক বানিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, সহীহ ইসলামী সংগঠন হওয়ার শর্ত হলো, তাদের ঈমান আকীদা সহীহ হতে হবে। আমল সহীহ হতে হবে এবং হক্কানী উলামাদের দ্বারা এটা পরিচালিত হতে হবে। যদি এসব ঠিকমত পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরকে যাকাত-ফিতরার টাকা দেয়া যায় এবং তারা সে টাকা গরীব মিসকীনদের খাতে ব্যয় করবে। [ফাতাওয়া শামী, ১. ১৯২-১৯৪# আল বাহরুর রায়িক, ২. ২৫৫]

ঈদের নামাযে মাসবূক হওয়া প্রসঙ্গে
মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ, শামুকখোলা, লোহাগাড়া, নাড়াইল।
প্রশ্ন: যদি কেউ ঈদের নামাযে মাসবূক হয় তাহলে সে কেমন করে ছুটে যাওয়া নামায আদায় করবে?
উত্তর: (ক) যদি কেউ প্রথম রাক’আতের অতিরিক্ত তাকবীরের পর ইমামের ইকতিদা করে, তাহলে সে প্রথমে তাকবীরে তাহরীমা বলে অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি বলবে। যদিও ইমাম কিরাআত আরম্ভ করে দিয়ে থাকে।
(খ) আর যদি কেউ ইমামকে প্রথম রাক’আতের রুকূ অবস্থায় পায়, তাহলে সে তাকবীরে তাহরীমার পরে অতিরিক্ত তাকবীর বলে রুকূতে যাবে। আর যদি তার আশংকা থাকে যে, অতিরিক্ত তাকবীর বলতে গেলে ইমামকে রুকূ অবস্থায় পাবে না, তাহলে সে প্রথমে রুকূতে যাবে। রুকূতে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত তাকবীরগুলো হাত উঠানো ব্যতীত আদায় করবে। আর যদি তাকবীরগুলো শেষ করার পূর্বেই ইমাম রুকূ থেকে উঠে যায়, তাহলে অবশিষ্ট তাকবীরগুলো তার জন্য মাফ হয়ে যাবে।
(গ) আর যদি সে দ্বিতীয় রাক’আতে শরীক হয়ে দ্বিতীয় রাক’আতের অতিরিক্ত তাকবীরগুলো বলতে পারে, তাহলে সে ইমামের দুই দিকে সালাম ফিরানোর পর উঠে দাঁড়াবে এবং কিরাত শেষ করে রুকূতে যাওয়ার পূর্বে অতিরিক্ত তাকবীরগুলো আদায় করে রুকূর তাকবীর বলে রুকূতে  যাবে। কারণ, এটা তার দ্বিতীয় রাক’আত আর ইমামের সঙ্গে যে রাক’আত পড়েছে, তা প্রথম রাক’আত গণ্য হবে।

কোন আলেমকে গালী দেয়া প্রসঙ্গে
মোঃ মিযানুর রহমান, বগুড়া।
প্রশ্ন: কোন মুসলমান ব্যক্তি যদি কোন আলেমকে গালি দেয়, তাহলে তার স্ত্রী তালাক হবে কি- না?
উত্তর: কোন মুসলমান অন্য মুসলমানকে বিনা কারণে অন্যায়ভাবে গালিগালাজ করলে ঈমান হারা হয়ে যায় না। ঈমানদারই থাকে। তবে গুনাহগার হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন মুসলমানকে গালি দেয়া বা সমালোচনা করা ফাসিকী কাজ এবং ঝগড়া হানাহানী করা কুফরী কাজ। (বুখারী শরীফ১: ১২)
পক্ষান্তরে শুধুমাত্র আলেমে দ্বীন ও ইলমে দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ বশত: অবজ্ঞা, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য ও তিরস্কার সূচনা মনোভাব নিয়ে কোন আলেমকে গারী দিলে গালীদাতার ঈমান নষ্ট হয়ে সে মুরতাদ বেঈমান সাব্যস্ত হবে। নতুনভাবে কালিমা পড়ে এরূপ ব্যক্তির ঈমান দোহরাতে হবে। বিবাহিত হলে, ঈমান গ্রহণের পর তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক নতুনভাবে পুনঃস্থাপন করা জরুরী হবে। তেমনিভাবে পূর্বে ফরজ হজ্জ করে থাকলে তা আবার দোহরাতে হবে। ( আহসানুল ফাতাওয়া, ১: ৩৯, আল- আশবাহ ওয়ান্নাযায়ির)

পেট হতে অতিমাত্রায় গ্যাস বের হলে করণীয় প্রসঙ্গে
জুনাইদ, নন্দীবাড়ী, (মধ্যপাড়া), মুক্তাগাছা।
প্রশ্ন: আমি ইস্তিঞ্জা করার পর উযু করে নামায পড়তে দাঁড়াই, কিন্তু বার বার গ্যাস বের হওয়ায় আমি বারবার উযু করতে বাধ্য হই। কিন্তু সবসময় উযু করা সম্ভব হয় না। একবার উযু করার পর বারবার গ্যাস বের হয়। এতে আমার করণীয় কি? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
উত্তর: যদি নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর পূর্ণ এক ওয়াক্তই আপনার এই অবস্থা থাকে এবং এতটুকু সময় না পাওয়া যায়, যে সময় আপনি উক্ত ওয়াক্তের ফরয ও ওয়াজিব নামায আদায় করতে পারেন, তখন আপনাকে শরীয়তের ভাষায় মাযূর বলা হবে। আর মাযূরের হুকুম হল, প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর নতুনভাবে উযু করে নামায আদায় করতে হবে এবং যতক্ষণ ঐ ওয়াক্ত থাকে, গ্রাস বের হওয়ার কারণে উযু নষ্ট হবে না। সুতরাং ওয়াক্তের মধ্যে ঐ উযু দিয়ে সব ধরনের নামায পড়তে পারবেন এবং এক ওয়াক্ত চলে গেলে ঐ ওয়াক্তের উযু দ্বারা অন্য ওয়াক্তের কোন নামায আদায় করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত মাসআলা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন সঠিকভাবে জানা যায় বা দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, সত্যিই তার গ্যাস বের হয়ে থাকে। আর তা জানার পদ্ধতি হল আওয়াজ শুনতে পাওয়া বা দুর্গন্ধ পাওয়া বা অন্য কোনভাবে তার দৃঢ়বিশ্বাস হওয়া যে, ঠিকই তার গ্যাস বের হয়। অন্যথায় যদি শুধু বাতাস বের হওয়ার মত মনে হয় এবং সন্দেহ হয় তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা উচিত, বরং এই অবস্থায় সময় মত শান্তভাবে নামায পড়ে নিবেন। কেননা, এধরনের অবস্থা কোন কোন সময় শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে যা নিছক ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, শয়তান মানুষকে আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরানোর জন্য এ ধরনের অনেক কিছু করে থাকে। এখন আপনি আপনার অবস্থা অনুযায়ী মাযূর কিনা তা ঠিক করে নিন। বাস্তবে যে অবস্থা হয়, সে অনুযায়ী আমল করতে পারেন। [মিশকাত শরীফ, ১:৪০# আদ্দুররুল মুখতার, ১:৩০৬# হালবী কবীর, ১:১৩৩# হিদায়া, ১:৬৭-৬৯]

মুক্তাদীর জন্য তাশাহহুদ পড়া জরুরী প্রসঙ্গে।
ওবায়দুল্লাহ, মুন্সিরহাট, মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা।
প্রশ্ন: আমরা জানি ইমামের কিরাআত মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট। সে মতে আমার জিজ্ঞাসা হল ইমামের কিরাআত যদি মুক্তাদির জন্য যথেষ্ট হয় তাহলে ইমামের তাশাশহুদ মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট হবে না কেন?
উত্তর: হাদীসে এতটুকুই পাওয়া গেছে যে, ইমামের কিরাআত মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট। যেমন হাদীস শরীফে আছে, যে ব্যক্তির ইমাম থাকে, তার ইমামের কিরাআতই তার জন্য কিরাআত।[মুসলিম শরীফ]
এমনিভাবে এ ব্যাপারে আরো অনেক হাদীস আছে। কিন্তু তাশাহহুদের ব্যাপারে এরকম কোন হাদীসে নেই বিধায় তাশাহহুদে মুক্তাদীকে ভিন্নভাবেই পড়তে হবে। এমনিভাবে কিরাআত ব্যতীত অন্যান্য সকল দু’আ-তাসবীহ মুক্তাদীদের পড়তে হবে। [শামী, ১: ৪৭০ পৃ:]

বিনিময়ের মাধ্যমে অন্যের দ্বারা সাওয়াব রিসানী প্রসঙ্গে।
রায়হান আহমেদ বাবু, মাওনা চৌরাস্তা, গাজীপুর, শ্রীপুর।
প্রশ্ন:আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যে, মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজন মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনার্থে উলামায়ে কিরামদের দ্বারা কুরআন খতম বা বিখিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে দু’আ করায়ে থাকে এবং তাদের জন্য খাবার-দাবারের আয়োজন ও টাকা-পয়সার লেনদেন করে। শরীয়তে দৃষ্টিতে এর হুকুম কি? জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর: কোন মানুষের ইন্তেকালের পর তার সাওয়াব রিসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ পড়িয়ে টাকা দেয়া-নেয়া, খানা খাওয়া সবই নাজায়েয। আর যেহেতু টাকা বা কোনরূপ বিনিময় নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করলে স্বয়ং তিলাওয়াতকারীই উক্ত তিলাওয়াতের কোন সওয়াব পায় না। তাহলে তিনি মৃত ব্যক্তির রূহে কি পৌঁছাবেন? কেননা মৃতের রূহে সাওয়াব পৌঁছাতে হলে প্রথমত: তিলাওয়াতকারীর সাওয়াব পেতে হবে। তারপর তিনি সে সাওয়াব মৃতকে বখশিশ দিবেন। কিন্তু তিনি বিনিময় গ্রহণ করার কারণে (যা শরীয়তে হারাম) সাওয়াব থেকে মাহরুম হচ্ছেন, তাই অন্যের জন্য সাওয়াব রিসানীর প্রশ্নই উঠে না। তাই ঈসালে সাওয়াবের জন্য খতম পড়ার বিনিময়ে টাকা পয়সার লেন-দেন ও দাওয়াত খাওয়া সবই নাজায়েয। সুতরাং খতম নিজেরা পড়বে এবং এমন লোক দ্বারা পড়াবে, যাদের সাথে আগে থেকে মুহাব্বত আছে। যাতে করে তারা বিনিময় ছাড়া কুরআন শরীফ পড়ে দেন। [ফাতাওয়ায়ে শামী, ৫: ৩৯, ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩: ৩৮৫]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight