জীবনজিজ্ঞাসা

তারাবীহর কাযা প্রসঙ্গে
রাকিব হাসান, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: যদি কোন মারাত্মক সমস্যার কারণে কোন একদিন তারাবীহর নামায পড়তে না পারি, তাহলে কি পরের দিন ওই তারাবীহর কাজা পড়া যাবে? তারাবীহ না পড়লে কি পরের দিন রোযা রাখা যাবে? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: তারাবীহর নামায সুন্নাতে মুআক্কাদা। এর সময় ইশার পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। এসময়ের মধ্যে একান্ত কোনো ওজরের কারণে পড়তে না পারলে, পরে আর ওই নামাযের কাজা করা যায় না। পড়লে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। কেননা, সুন্নাত বা নফলের কোনো কাজা হয় না। এজন্য প্রত্যেকের কর্তব্য সময়মতো তারাবীহর নামায পড়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। যদি কেউ একান্ত সমস্যার কারণে তারাবীহর নামায পড়তে নাও পারেন, তাহলেও পরের দিন রোযা রাকবেন। কেননা, রোযার জন্য তারাবীহর নামায পড়া শর্ত নয়।

রমজানে মাইকে ডাকাডাকি প্রসঙ্গে
রুহুল আমীন, ভোলা, বরিশাল।
প্রশ্ন: রমজান মাসে সাহরী খাওয়া এবং সাহরী রান্না করার জন্য মসজিদের মাইক দিয়ে এলাকার লোকদের ডাকাডাকি করে ঘুম থেকে জাগানো জায়িয হবে কিনা? এতে কোনো অসুবিধা আছে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, রমজানে মাসে মসজিদের মাইক দিয়ে এলাকার লোকদেরকে সাহরী খাওয়া এবং সাহরী রান্না করার জন্য প্রয়োজন পরিমান ডাকাডাকি করা, সাহরীর সময় সূচি বলে দেয়া জায়িজ আছে। এতে কোন অসুবিধা নেই।
তবে ওই সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডাকাডাকি করা, হামদ, নাত, গজল বা জিকির ইত্যাদি আরম্ভ করে দেয়া ঠিক হবে না। এতে ব্যক্তিগত ইবাদতে বিঘœ সৃষ্টি হয়। এমনিভাবে অসুস্থ ব্যক্তির ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।

রাসূল সা. কে হাযির-নাযির মনে করার হুকুম প্রসঙ্গে
আলতাফ হুসেন, মাইজ বাড়ি, নোয়াখালি।
প্রশ্ন: জনৈক মাওলানা সাহেব বলেছেন এবং ফতাওয়াও দিয়েছেন যে, নবী করিম সা. হাযির-নাযির। এটাই তিনি বিশ্বাস করেন। এ ফাতাওয়াটা কতটুকু সত্য? হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত জানালে অত্র এলাকাবাসী উপকৃত হবে।
উত্তর: সর্বত্র হাযির-নাযির থাকা একমাত্র আল্লাহ তাআলার ছিফাত। কোন নবী বা ওলী সব জায়গায় হাযির-নাযির হতে পারেন না। আল্লাহ তাআলার ছিফাতের সঙ্গে বান্দাকে মিলানো কুফর ও শিরক। এ ধরনের বিশ্বাস দ্বারা ঈমান চলে যায়। হাদিস শরীফে এসেছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা আমার উপর দরুদ শরীফ পড়লে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তোমাদের নাম ও গোত্রসহ তা আমার নিকট পৌঁছানো হয়। [নাসাঈ শরীফ, ১:১৪৩]
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযির-নাযির কুরআন ও হাদিসে এর কোন প্রমাণ নেই। যারা এরকম বিশ্বাস রাখে, তারা গোমরাহ এবং বিদআতী। এটা শুধু হানাফি মাযহাবেরই নয় বরং সকল আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আকীদা। তাদের পিছনে নামায মাকরুহে তাহরিমী হবে। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন, [(১) শরিয়ত ইয়া জাহালাত, ৩৮০ পৃ.। মিশকাত শরীফ, ১:৮৬২, জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১: ২১৭, দারিমী শরীফ, ৪১৬, আহসানুল ফাতাওয়া, ১: ৩৪৭, মাহমুদিয়া, ১: ১১৮, কিফায়াতুল মুফতী, ১: ১৫০]
কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে প্রসঙ্গে
মানছুরা বিনতে হাবিব, নাজিরপুর, কলমাকান্দা।
প্রশ্ন: কিয়ামত বলে একটি দিন আছে তা অবশ্যই হবে। হাদিস ও অন্যান্য কিতাবসমূহে পাওয়া যায় ১০ ই মহররম এবং শুক্রবার কিয়ামত সংঘটিত হবে। তাহলে আমাদের তুলনায় অন্যান্য দেশের সময়ের সংগে অনেক পার্থক্য রয়েছে এবং আরবদেশে ১ দিন আগে এই পবিত্র দিন (১০ই মুহররম) পালন করা হয়। ফলে আরব দেশে কি আগে কেয়ামত সংঘটিত হবে? দয়া করে সঠিক উত্তর দিলে খুশি হব।
উত্তর: আল্লাহ পাক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর ক্ষমতার বাইরে কোন কিছুই নেই। তিনি ইচ্ছে করলে সারা বিশ্বে একই দিনে ১০ ই মুহররম কায়েম করে কিয়ামত কায়েম করতে পারেন। এতে কোন সন্দেহ নেই। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, দাজ্জাল দুনিয়ায় ৪০ দিন অবস্থান করবে। তার প্রথম দিন হবে এক বৎসরের সমতুল্য। ২য় দিন হবে ১ মাসের সমতুল্য। ৩য় দিন হবে ১ সপ্তাহের সমতুল্য। বাকী দিনগুলো সাধারণ দিনের মত হবে। সুতরাং হতে পারে আল্লাহপাক কেয়ামতের দিনকে অনেক বড় করবেন, সারা বিশ্বে একই দিনে ১০ ই মুহররম হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে অসম্ভব নয়।
তাছাড়া এটা এমন কোন বিষয় নয় যেটা জানা শরীয়ত আমাদের উপর ওয়াজিব বা ফরয করেছে। বরং আমাদের তো সর্বদা এই চিন্তায় থাকা দরকার। আমি কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছি। হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, একদা এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তরে বললেন, তুমি কেয়ামতের কথা জিজ্ঞেস করছো? তোমার ধ্বংস হোক; তুমি কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছো? উত্তরে লোকটি বলল, আমি কোন প্রস্তুতি নিতে পারি নাই। তবে আমি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসি। মোদ্দাকথা, আমাদের এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন থেকে বিরত থাকা উচিত এবং সেই বিচারের দিনের জন্য সর্বক্ষণ ফিকির রাখা এবং সাধ্যানুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া কর্তব্য। [মিশকাত, ২:৪৭৩ ও ৪২৬]

একই সঙ্গে একাধিক কবরে সওয়াল-জওয়াব হওয়া প্রসঙ্গে
তরিকুল ইসলাম, আমিন বাজার, সাভার, ঢাকা।
প্রশ্ন: হাদিস শরীফে আছে, মুরদাকে কবরে রেখে ৪০ কদম চলে আসার পর দুই জন ফেরেশতা আসে সওয়াল-জওয়াব করার জন্য। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই সময়ে যদি এক হাজার মুরদা দাফন করে তাহলে এক সাথে সবার সওয়াল জওয়াব কিভাবে নিবেন। বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক।
উত্তর: একই সময়ে দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে কিংবা একই স্থলে অনেক মৃত্যুকে দাফন করা হলে মুনকার নকীর ফেরেশতা মৃতদেরকে কিভাবে প্রশ্ন করবেন? এ কৌতুহল নিরসনে একাধিক উক্তি পাওয়া যায়।
১. মুনকার নকীর উভয় ফেরেশতার সাথে এ কাজের নিমিত্তে আরও অসংখ্য ফেরেশতা সহায়ক হিসেবে থাকেন। হযরত আযরাইল আ. যেমন তার সহযোগী অন্যান্য ফেরেশতা দ্বারা জান কবযের কাজ নেন, তদ্রুপ মুনকার নকীর ফেরেশতাদ্বয় নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সহযোগী ফেরেশতা বাহিনী মৃতদের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্ব সমাধা করেন।
২. অনেকে বলেন, সমগ্র দুনিয়া মুনকার নকীরের নখদর্পনে উদ্ভাসিত এবং দৃষ্টি ও ক্ষমতার আওতায়। যেমন, মালাকুল মউত হযরত আযরাঈল আ. এর ক্ষেত্রে। সুতরাং তাদের জন্য একই সময়ে অনেক মৃতকে সওয়াল করা অসম্ভব বা কঠিন কিছু নয়। উল্লেখ্য, এ ধরনের প্রশ্ন যেহেতু ঈমান আকীদার সাথে কোনই সম্পর্ক নাই এবং কবরে হাশরে এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করা হবে না বা এগুলো জানলে কোন সওয়াবও হবে না সুতরাং এর চেয়ে জরুরী যেসব বিষয় আছে তা জানার জন্য এবং আমল করার জন্য সময় ব্যয় করা উচিৎ।

গোসল করার সুন্নত তরীকা ও গোসলের পর উযুর হুকুম প্রসঙ্গে
আলহাজ্ব আবদুল করিম সাহেব, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: ফরজ গোসল করার নিয়ম কানুন কি? কোন পদ্ধতিতে ফরজ গোসল করতে হয় এবং মেয়েলোক ও পুরুষের আলাদা কোন পদ্ধতি আছে কি-না? আর গোসলের পর নামায পড়তে পুনঃউযু করতে হবে কি-না?
উত্তর: গোসর করার সময় প্রথমে ইস্তেঞ্জা করে নিবে, অতঃপর পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে উভয় হাত ধুয়ে নিয়ে শরীর ও কাপড় থেকে নাপাকী দূর করবে। তারপর হাত ভাল করে পরিষ্কার করে নিবে। অতঃপর নামাযের উযুর মত উযু করে নিবে। উযুর সময় ভালভাবে গড়গড়া করবে এবং নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছাবে। উযুর শেষে মাথায় পানি ঢালবে। অতঃপর ডান কাঁধে ও পরে বাম কাঁধে পানি ঢালবে। এভাবে তিনবার সম্পূর্ণ শরীর ভালভাবে ঘষে গোসল শেষ করবে।
মেয়েলোক এবং পুরুষ লোকের গোসলের নিয়ম একই। তবে মেয়েলোক খোপা বাঁধা থাকলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছলে তা খোলা জরুরী নয়। কিন্তু পুরুষের চুল সম্পূর্ণ খোলা রাখতে হবে। উপরন্তু মেয়েদের নাক ও কানের অলংকার পরার ছিদ্রে যাতে পানি পৌঁছে তা লক্ষ্য রাখতে হবে। [ফাতাওয়া দারুল উলুম, ১:১৪৬,# শামী, ১: ১১৯]

ধূমপায়ীর ইমামত প্রসঙ্গে
জহিরুল ইসলাম, ঠাকুরগাও।
প্রশ্ন: আমাদের নিকটবর্তী এক মসজিদের ইমাম সাহেব এক মুষ্টির ভিতরে দাড়ী কাটেন, লাহনে জলী কিরাআত পড়েন, এবং ধূমপান করেন। উক্ত ইমামের পিছনে নাময পড়া জায়েয হবে কি?
উত্তর: এক মুষ্টির ভিতরে দাড়ী কাটা হারাম। যে ব্যক্তি এ হারাম কাজে লিপ্ত হবে শরীয়তের অন্যান্য আহকাম পুরোপুরিভাবে পালন করা সত্ত্বেও সে ফাসিক বলে বিবেচিত হবে। আর ফাসিকের পিছনে নামাজ পড়া মাকরূহে তাহরীমীা। তদুপরি বিড়ি সিগারেট পান করা মাকরুহ। বিড়ি সিগারেট পান করার পর মুখ পরিষ্কার করা ব্যতীত মসজিদে যাওয়া নিষেধ। এর দ্বারা মানুষের এবং ফেরেশতাগণকে কষ্ট দেওয়া হয়। তাছাড়া এটা স্বাস্থের জন্যও খুব ক্ষতিকর। আর নামাজের কিরাআতে লাহনে জলি  পড়লে ক্ষেত্র বিশেষ নামাজ ফাসিদ হয়ে যায়। সুতরাং উল্লেখিত তিন প্রকার দোষে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইমাম পদে নিয়োগ করা বা বহাল রাখা জায়িয নয়। তার পিছনে নামাজ পড়া মাকরুহে তাহরীমী। এজন্য দ্রুত ঐ ব্যক্তিকে ইমামের পদ থেকে অপসারণ করে দীনদার মুত্তাকী-পরহেযগার ও সহীহ আকীদা সম্পন্ন আলেমকে ইমাম পদে নিয়োগ করা কমিটির অপরিহার্য দায়িত্ব। নতুবা মুসল্লীদের নামাযের ক্ষতির জন্য মুতাওয়াল্লী বা কমিটি দায়ী হবে। [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৫: ১০৫-১২২,# ফতাওয়ায়ে রহীমিয়া, ৪: ৩৫০, ফাতাওয়ায়ে শামী, ১: ৫৫০]

মসজিদের পার্শে¦ দাফন করা প্রসঙ্গে
ইকবাল হোসেন, আটপাড়া, ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন: মসজিদের পার্শ্বে দাফন করা উত্তম না কবরস্থানে? জানতে ইচ্ছুক।
উত্তর: মুসলিম মাইয়্যিতদের ওয়াকফকৃত গোরস্থানে দাফন করাই উত্তম। কারণ. কবরের কিছু হক এমন আছে, যা গোরস্থানে ছাড়া সহজে আদায় হয়। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে অন্য কোথাও নিজের বা পরিবারের কবরের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে রেখে থাকে, তাহলে এটাও জায়িয আছে। চাই সে জায়গা মসজিদের পার্শ্বেই হোক বা দূরে হোক। তবে মসজিদের ওয়াকফকৃত স্থানে চাই মসজিদের আশ-পাশে হোক বা দূরে হোক কবর দেয়া জায়িয নয়। হ্যাঁ, মসজিদের পার্শ্বে নিজস্ব জমিনের বা জমি ক্রয় করে অথবা অন্য কারো জমিতে মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে কবর দেয়াও উত্তম। [ফাতাওয়য়ে শামী, ২: ২৩৫# ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম, ৫: ৪০৭-৪০৭]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight