জাহান্নামের পরিচয়

পূর্ব প্রকাশিতের পর……

সংকলনে : মাওলানা আব্দুল মতিন :

এক. ঈমানদারের অবস্থা
হাদিস শরীফে আছে, যখন কোন মুমিন ব্যক্তির মৃত্যু অতি সন্নিকট হয়, তখন একদল স্বর্গীয় ফেরেশতা আসমান হতে সূর্যের ন্যায় আলোকদীপ্ত চেহারা নিয়ে জমিনে অবতীর্ণ হন। এ ছাড়া তারা জান্নাতের সুঘ্রাণযুক্ত কাফনের কাপড়ও নিয়ে আসেন। তারাই আজরাইল এবং তাঁর অনুচরবৃন্দ।
তৎপর মালাকুল মউত তথা আজরাইল আ. মৃত্যু বরণকারীর মস্তকের কাছে উপস্থিত হয়ে বলেন- ‘হে পবিত্র রূহ! তোমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছি, চল, আল্লাহর অসীম রহমত ও দয়ার নিকটে, তিনি তোমাকে সাদরে গ্রহণ করবেন। তিনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ মালাকুল মউতের এই কথা শুনে রূহ নীরবে নশ্বর দেহ হতে বের হয়ে আসবে। রূহ বের হওয়া মাত্র মালাকুল মউত তাকে নিয়ে উর্ধ্বাকাশে উঠে যাবেন। তিনি রূহ নিয়ে প্রথম আসমান শেষ করে দ্বিতীয় আসমানে উঠতে না উঠতেই তাদের আগমনের অপেক্ষায় সপ্তম আসমানের দরজা খুলে রাখা হবে। বস্তুত উক্ত ঈমানদার ব্যক্তির নাম ইল্লিয়্যিন নামক পবিত্র স্থানে ইতিপূর্বেই লেখা হয়ে থাকবে। অতঃপর আজরাইল আ. তার রূহ নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হবেন। আল্লাহ তা’আলা তখনই আদেশ করবেন- ‘হে আজরাইল! মৃত ব্যক্তির রূহ মাটির নি¤েœ রক্ষিত তার দেহের কাছে নিয়ে যাও। কেননা আমি তাদেরকে মাটি হতে সৃজন করেছি, আবার মাটি হতেই উঠিয়ে নেব।’
এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
‘আমি তোমাদেরকে এই মাটি দ্বারাই পয়দা করেছি, দ্বিতীয়বার এই মাটিতেই প্রত্যাবর্তন করাব এবং সর্বশেষ এই মাটি হতে পুনরুত্থান করে হাশরের ময়দানে দণ্ডায়মান করব।’ [সূরা তোয়া-হা : ৫৫]
আল্লাহ তা’আলার এই আদেশ প্রাপ্তি মাত্র আজরাইল আ. উক্ত ব্যক্তির রূহ নিয়ে পুনঃ কবরে প্রত্যাবর্তন করবেন। তৎপরে মুনকার ও নকীর নামে দুই ফেরেশতা এসে তার রূহের নিকট প্রশ্ন করতে আরম্ভ করবে। রূহ যখন ফেরেশতাদ্বয়কে সরল-সঠিক জবাবে সন্তুষ্ট করে দিবেন তখন আল্লাহ তা’আলা অনতি দূর হতে আওয়াজ দিয়ে বলবেন :
‘হে ফেরেশতাদ্বয়! আমার প্রিয় বান্দা ঠিকই বলেছে, তাকে আর কোন প্রশ্ন করতে হবে না। তোমরা জান্নাত হতে বিছানা এনে আমার বান্দার কবরে বিছিয়ে দাও, যেন তাকে কবরে থেকে কোন প্রকার কষ্ট পোহাতে না হয়। আর জান্নাত হতে অতি উত্তম পরিধানের বস্ত্র এনে তাকে পরিয়ে দাও এবং তার কবর হতে জান্নাত পর্যন্ত একটি দরজা খুলে দাও যেন আমার বান্দা কবরে থেকে জান্নাতের সুগন্ধিপ্রাপ্ত হয়ে জান্নাতের অনুপম সুখ লাভ করতে পারে।’
আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাগণকে আরও হুকুম করবেন- ‘হে ফেরেশতাগণ! আমি আমার বান্দার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি, কাজেই আমার বান্দার সীমার চতুর্দিক পর্যন্ত তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও যেন সে কবরে কোনরূপ কষ্ট অনুভব করতে না পারে।’
ফেরেশতাগণ উক্ত ঈমানদার ব্যক্তির যাবতীয় সুখ-শান্তির জন্য এই সকল কাজ করে শেষ করলে ইত্যবসরে একজন অপূর্ব লাবণ্যময়ী চেহারার আকৃতি বিশিষ্ট শ্বেত বর্ণের সুগন্ধিযুক্ত পোশাক পরিধান করে উক্ত ঈমানদার ব্যক্তিকে সুসংবাদ প্রদান করে তার কাছে উপস্থিত হবে। মৃত ঈমানদার ব্যক্তি এরূপ অপূর্ব সুন্দর চেহারাযুক্ত লোকটিকে দেখে বলবে- ‘আপনি কে? আপনার ন্যায় এরূপ অপূর্ব সৌন্দর্যময় শ্রীমান জীবনে আর একজনও তো দেখিনি। বলুন আপনি কে?’ তদুত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলবে, ‘আমি হলাম আপনার নেক আমল।’

দুই. কাফেরের অবস্থা
মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তি কাফের বা পাপী হলে তার মৃত্যুর পূর্বক্ষণে আসমান হতে একদল ফেরেশতা শাস্তিজনিত বস্ত্রাদি নিয়ে জমিনে অবতীর্ণ হবে এবং উক্ত পাপী মৃত্যু বরণকারীকে তা পরিধান করাবে, ফলে মৃত্যু বরণকারীর মৃত্যু যন্ত্রণা এতে অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। অতঃপর মালাকুল মউত উক্ত ব্যক্তির মস্তকের কাছে বসে মেশিনে ইক্ষু পিষবার ন্যায় অসহনীয় কষ্ট সহকারে তার রূহ বের করবে। রূহ বের করার সময় উক্ত ব্যক্তি এরূপ নির্মম আর্তনাদ আরম্ভ করবে যে, মানব-দানব ছাড়া অন্যান্য সকল সৃষ্টজীব শুনতে পাবে। এতদ্ব্যতীত তার রূহ বের করা হলে আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর যাবতীয় সৃষ্টজীব তার প্রতি লা’নত বা অভিসম্পাত বর্ষণ করতে থাকবে। এমনকি ফেরেশতাগণ তার রূহ নিয়ে আসমানে পৌঁছবার পূর্বে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যাদেশ করবেন-
‘হে ফেরেশতাগণ! উক্ত পাপী ব্যক্তির অপবিত্র রূহ নিয়ে আসমানে এসো না বরং তাকে কবরে তার মৃতদেহের কাছে নিয়ে রাখ।’
ফেরেশতাগণ তখন উক্ত ব্যক্তির রূহ কবরে তার মৃতদেহের কাছে পৌঁছিয়ে দিবে। অতঃপর মুনকার ও নকীর দুই ফেরেশতা মেঘের ন্যায় তীব্র গর্জন সহকারে সূর্যের ন্যায় দীপ্ত চক্ষুদ্বয় রাঙাতে রাঙাতে ভয়াবহ আকৃতি ধারণ করে উক্ত ব্যক্তির সম্মুখে হাজির হবে। মুনকার ও নকীর দুই ফেরেশতা ঐ ভয়ংকর আকৃতিতে উক্ত ব্যক্তিকে বসিয়ে দাঁত কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করবে, তোমার রব (প্রভু) কে? তদুত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলবে- হায় হায়! আমার তো জানা নেই। আবার তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমার দ্বীন কি? সে বলবে, হায় হায়! আমার জানা নেই। আবার তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলবে, হায় হায়! আমার জানা নেই। যখন এ প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হবে, তখন আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে, সে মিথ্যা বলেছে, সে তার রব সম্পর্কে জানতো, কিন্তু মানতো না। যে দ্বীনের উপর সে ছিল তা সম্পর্কে সে জানে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত সম্পর্কেও সে জানে, কিন্তু আজাবের ভয়ে এখন সে অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলছে, সে কিছুই জানে না, এখন তার জন্য আগুনের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং জাহান্নামের দরজা খুলে দাও। দরজা খুলে দিলে সেদিক থেকে উত্তপ্ত হাওয়া আসতে থাকবে। তার কবর এমন সংকীর্ণ করে দেয়া হবে যে, তার এক পাশের হাড় অন্য পাশে চলে যাবে। তার নিকট এক ব্যক্তি আসবে, যার চেহারা হবে কুৎসিত, কাপড়-চোপড় হবে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত। তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসতে থাকবে। সে তাকে বলবে, বিপদের কথা শুনে নাও। এ সে দিন যে দিন সম্পর্কে তোমার সাথে ওয়াদা করা হয়ে ছিল। সে বলবে, তুমি কে? বাস্তবে তোমার চেহারা সুরতের যা অবস্থা, তাতে তুমি এ বিপদের সংবাদ দেয়ারই যোগ্য। উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার বদ আমল। এটা শুনে সে কেয়ামতের পর এর চেয়ে কঠিন আজাব ভোগ করার ভয়ে বলবে, হে প্রভু! তুমি কেয়ামত কায়েম করো না। [মিশকাত শরীফ]
এক বর্ণনায় আছে, যখন কোন মুমিনের রূহ বের করা হয়, তখন আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানের ফেরেশতা এবং সেসব ফেরেশতা, যারা আসমানে আছে, সকলে তার প্রতি রহমত প্রেরণ করে, তার জন্য আসমানের দরজা খুলে দেয়া হয়। দরজায় নিয়োজিত ফেরেশতারা আল্লাহর নিকট আরজ করে, তার রূহ আমাদের দিক থেকে নিয়ে আসমানে উঠানো হোক। আর কাফেরের ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তার রূহ রগসহ বের করা হয় এবং আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানের সব ফেরেশতা তার উপর অভিশাপ দিতে থাকে। তার জন্য আসমানের সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং প্রত্যেক দরজায় নিয়োজিত ফেরেশতারা এই দু’আ করে যেন তার রূহ তাদের দিক থেকে উর্ধ্বে আরোহণ করানো না হয়। [মিশকাত শরীফ]

কবরে মুমিনের নামাজের ধ্যান
হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন মুমিন ব্যক্তিকে কবরে দাফন করে দেয়া হয় তখন তার মনে হয় যেন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। যখনই তার রূহ ফিরিয়ে দেয়া হয় তখনই সে চোখ মলতে মলতে উঠে বসে এবং (ফেরেশতাদের) বলে, আমাকে ছাড়, আমি নামাজ পড়বো। [ইবনে মাজাহ]
মোল্লা আলী কারী রহ. লেখেন যে, সে সময় মৃত ব্যক্তি নিজেকে দুনিয়াতেই মনে করে বলবে, সওয়াল-জবাব রাখ, আগে আমাকে ফরজ নামাজ আদায় করতে দাও। আমার নামাজের সময় চলে যাচ্ছে। তারপর লেখেন, এ কথা সেই বলবে, দুনিয়াতে যে পাবন্দীর সাথে নামাজ আদায় করেছে এবং সব সময় নামাজের খেয়ালে থাকতো।
এ থেকে বেনামাজীর শিক্ষা নেয়া এবং নিজের অবস্থা চিন্তা করা উচিত। তাদের খুব ভালভাবে চিন্তা করা উচিত, হঠাৎ যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে তখন অবস্থা কি হবে?

কবরে মুমিন পেরেশানীমুক্ত থাকবে এবং তাকে জান্নাত দেখানো হবে
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিঃসন্দেহে মুর্দা কবরে পৌঁছে নির্ভয়ে এবং পেরেশানীমুক্ত অবস্থায় উঠে বসে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি দুনিয়াতে কোন দ্বীনের উপর ছিলে? সে উত্তর দেয়, আমি দ্বীন ইসলামের উপর ছিলাম। তারপর প্রশ্ন করা হবে, ইনি কে? (তার ব্যাপারে তোমার বিশ্বাস কি? যাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল)। সে উত্তর দিবে, তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্য মোজেজা নিয়ে আমাদের নিকট এসেছিলেন, আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছি। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি আল্লাহকে দেখেছ? সে জবাব দিবে, দুনিয়াতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারে না (আমি কিভাবে দেখবো?)।
তারপর তার সামনে দোজখের একটি জানালা খুলে দেয়া হবে। এ জানালা দিয়ে সে দেখবে, দোজখের অগ্নিশিখা একটি অপরটিকে গ্রাস করছে। (যখন সে দোজখের এ অবস্থা দেখবে) তখন তাকে বলা হবে, দেখ আল্লাহ তা’আলা তোমাকে কেমন মুসিবত থেকে বাঁচালেন। তারপর তার জন্য জান্নাতের একটি দরজা খুলে দেয়া হবে, যা দ্বারা সে জান্নাতের সৌন্দর্য এবং সেখানে থাকা অন্যান্য সব সামগ্রী দেখবে। তারপর তাকে বলা হবে, এ জান্নাত তোমার ঠিকানা। কেননা, তুমি ঈমানের সাথে জীবন অতিবাহিত করেছ, ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছ এবং ঈমানের সাথেই কেয়ামতের দিন তোমাকে কবর থেকে উঠানো হবে। ইনশাআল্লাহ।

নাফরমান ব্যক্তির পেরেশানী
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নাফরমান ব্যক্তি ভয় ও শংকা নিয়ে কবরে উঠে বসবে। তাকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি দুনিয়াতে কোন দ্বীনের উপর ছিলে? সে জবাব দিবে, আমার জানা নেই। অতঃপর তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তাঁর ব্যাপারে তোমার আকীদা কি? সে জবাব দিবে, তাঁর ব্যাপারে লোকেরা যা বলেছে, আমিও তাই বলেছি। অতঃপর তাকে দেখানোর জন্য জান্নাতের দিকে একটা জানালা খুলে দেয়া হবে, যা দ্বারা সে জান্নাতের সৌন্দর্য এবং সেখানে থাকা আরাম-আয়েশের সব সামগ্রী দেখতে পাবে। তখন তাকে বলা হবে, দেখ তুমি আল্লাহর নাফরমানী করেছ, তাই আল্লাহ তোমাকে কেমন নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করেছেন। তারপর তার সামনে দোযখের একটি জানালা খুলে দেয়া হবে, যা দ্বারা সে দোযখের অবস্থা দেখবে। সে দেখতে পাবে, দোযখের এটি অগ্নিশিখা অন্য অগ্নিশিখাকে গ্রাস করছে। তারপর তাকে বলা হবে, এটাই তোমার ঠিকানা। তুমি এদিন সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয়ের জীবন যাপন করেছ। সন্দেহের অবস্থায়ই তোমার মৃত্যু হয়েছে, ইনশাআল্লাহ কেয়ামতের দিন সন্দেহ নিয়েই তুমি উঠবে। [মিশকাত, ইবনে মাজাহ]

চলবে…

2 মন্তব্য রয়েছেঃ জাহান্নামের পরিচয়

  1. মামুন says:

    জাহান্নামের পরিচয় বিভাগ টি সব চেয়ে ভালো লাগলো এই পত্রিকার । আশা করব চালিয়ে জাবেন ।

  2. সহিদুল ইসলাম says:

    মাশাআল্লাহ পড়ে খুব ভালো লাগলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight