জামাল ও তার কম্বল: রাহাত ইবনে মাহবুব

কাক ডাকা ভোর।  সূর্যি মামা সবে মাত্র কীরণ বিলাতে শুরু করেছে। ঘন কুয়াশার কারণে চারদিক বেশ ধোঁয়াটে। তাই সূর্যি মামার সদ্য ছড়ানো মিষ্টি রুদ্দুর অতটা সুবিধা করতে পারছে না। কমলাপুর রেলষ্টেশনের আবর্জনা ভরা প্লাটফর্মের এক কোণে ছেড়া একটা ছালার বস্তা গায়ে জড়িয়ে নিশ্চুপ বসে আছে জামাল। অসহনীয় ঠান্ডার তীব্রতায় থর থর করে কাঁপছে ওর পুরো শরীর। চোখ দুটো টকটকে লাল বর্ণের। দেখেই বোঝা যায় গতরাতে ভালো ঘুম হয়নি বেচারার। তাই চোখের এই অবস্থা। কিছু দূরেই কজন মিলে আগুন জ্বেলে তাপ নিচ্ছে। দৃশ্যটা জামালের চোখ এড়ালো না। এক চিললে সুখের হাসি ফুটে উঠলো ওর মুখে। জামালও যোগ দিল তাদের সাথে। আগুনের তাপে ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরীরের ভাজ গুলোকে ছাড়াতে লাগলো। আশপাশ থেকে আরো বেশ কিছু পথ শিশু এসে আগুন পোহাতে লাগলো। প্রায় সব ছেলেদের অবস্থা করুণ। শীতের জন্য গরম জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা নেই। কেনার মত সামর্থ তাদের নেই।
মাঝে মধ্যে কিছু জনদরদী সেবা সংস্থা আর উদার মনের অধিকারী লোকজন এসে ওদের মাঝে শীতের কাপড় বিলিয়ে যায়। সেগুলোর উপর ভরসা করেই ওদের দিন কাটাতে হয়। বড় আজব ওদের ভাগ্য। দান করা গরম কাপড়-চোপড় কিংবা শীত সামগ্রিও সবার ভাগ্যে জোটে না। গত মৌসুমে জামালের কপালে আবার একটা মোটা-সোটা কম্বল জুটেছিল। যেটা গায়ে দিয়ে খুব আরামেই হয়তো তার শীতটা কেটে যেত। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ঐ যে কথায় আছে না, গরীবের কপালে সুখ সয় না। জামালের ব্যাপারেও এমনটাই ঘটেছিল। কম্বলটা পাওয়ার কিছুদিন বাদেই সেটা চুরি হয়ে যায়। এরপর? এরপর আর কি, জামালকে শীত পার করতে হয় ছেড়া ছালা গায়ে জড়িয়ে।
জামালসহ আর দশজনের মত কলিমও এক পথ শিশু, আস্ত একটা বদের হাড্ডি। প্লাটফর্মে থেমে থাকা ট্রেন যাত্রীদের পকেট মেরে নিজের পকেট ভারী করেই দিন গুজরান করে। বেপরোয়া ঝগড়াটে, মারামারির হাতও বেশ পাকা। কলিমও জামালদের সাথে আগুন পোহাচ্ছে। তাপ নিতে নিতেই সে জামালের কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, ঐ জামাইল্যা আইজগা কুনোহানে যাইস না কিন্তু। জামাল মুখ ঘুরিয়ে কলিমের দিকে তাকাল। চেহারায় ওর স্পষ্ট প্রশ্নে ছাপ। কলিম হয়তো বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। তাই আবার বলতে লাগলো, আরে ব্যাটা! আইজগা স্টিশানে কারা জানি আইবো। আইয়্যা নাকি আমাগোরে কম্বল দিবো। কথাটা শুনে মুহূর্তেই জামালের চোখ-মুখ জ্বল জ্বল করে উঠলো। কিন্তু এই জ্বলজ্বলে খুব বেশিক্ষণের জন্য স্থায়ী হলো না। কারণ, কলিম ছেলেটা যে মোটেও ভালো না সেটা ও খুব ভালো করেই জানে। তা ছাড়া কলিমের চুরি চামারির বিষয়টাও ওর জানার বাইরে নয়। তাই কলিমের কাছ থেকে কম্বল বিতরণের খবরটাও ওর কাছে কেমন খচকা মনে হচ্ছে।
সন্ধ্যায় ক’জন জোয়ান ছেলে-মেয়ে সুবিধা বঞ্চিত পথ শিশুদের মাঝে বিতরণ করার জন্য শীতবস্ত্র নিয়ে পৌঁছলো কমলাপুর রেল স্টেশনে। কম্বল বিলিয়ে দিলো জামাল কলিমের মত পথ শিশুদের মাঝে। জামালের কপালেও একটা কম্বল মিললো। কিন্তু কপালের নামতো গোপাল। রাত একটু গভীর হতেই স্টেশন এরিয়া ধীরে ধীরে নীরব হয়ে এলো। প্লাটফর্মে রাত কাটানো ছেলেগুলো আজ খুব খুশি। খুশি তো হাবারই কথা। অল্প ক’জন বাদে প্রায় সবারই কাছে একটা করে নতুন কম্বল। আজ ঠিক কত দিন পর যে ওরা একটু আরাম করে ঘুমাতে পারবে তা হয়তো ওদের নিজেদেরও অজানা। ঠোটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে ঘুমের ইন্তেযামে ব্যস্ত সবাই। জামালের মনটাও আজ খুব প্রফুল্ল। আরে ওর কাছেও যে আছে একখানা নতুন কম্বল। জামালও ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কলিম কোথা থেকে যেন ছুটে এসে দাঁড়ালো ওর পাশে। জামাল হাসিমুখে ওকে জিজ্ঞাসা করলো, কিরে কলিম? এমনে দৌঁড়তে দৌঁড়তে কইত্তে আইলি? কলিমের মুখে কোন উত্তর নেই। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গেল জামালের কাছে। এরপর প্রচ- জোরে জামালের বাম চওয়ালে একটা ঘুষি। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো জামাল ছেলেটি। ধপাস করে বসে পড়লো প্লাটফর্মের পাকা ফোরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কলিম ওর কম্বলটা বুকে জড়িয়ে দে ছুট। জামাল গালে হাত দিয়ে চুপ-চাপ বসে আছে। চোখ দুটো জ্বলে টলমল করছে। মুখের ভেতর কিছু একটার নোনতা স্বাদ টের পাচ্ছে ও। মাড়ি থেকে রক্ত বের হচ্ছে হয়তো। একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এল জামালের বুক ফেটে। বিয়োগের দীর্ঘশ্বাস। মনে মনে ভাবলো ও এবারের শীতটাও বুঝি ছেঁড়া ছালা গায়ে জড়িয়ে পার করতে হবে তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight