জান্নাত কোথায় অবস্থিত ? : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

26807.imgcache

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান, হুজুর সা. হযরত জিবরাইল আ. কে আরেকবার তার আসল ছুরতে দেখেছিলেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। [নাজম ১৩-১৫]
বিশেষ আলোচনা : বড়ই বৃক্ষকে বলা হয় সিদরুন, মুনতাহা বলা হয় চুড়ান্ত গন্তব্য স্থানকে। সুতরাং হাদীস শরীফে এসেছে যে, সপ্তম আকাশে ইহা একটি বড়ই বৃক্ষ। উর্ধ্ব জগৎ থেকে যে সমস্ত বিধি বিধান এবং রিযিক আসে সেগুলো প্রথম সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে। তারপর সেখান থেকে ফেরেশতারা মর্তলোকে নিয়ে আসেন। এমনিভাবে যে সমস্ত আমল উধর্ব জগতে যায় সেগুলোও সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে। অতঃপর সেখান থেকে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। ইহার উদাহরণ হলো জাগতিক পোষ্ট অফিসের ন্যায়, যেখান থেকে চিঠিপত্র আদান প্রদান হয়। এই স্থানের শ্রেষ্ঠত্বের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন এর নিকটেই রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। মাওয়া অর্থ বসবাসের জায়গা। যেহেতু জান্নাত পূণ্যবানদের বসবাসের জায়গা। এ জন্যই ইহাকে জান্নাতুল মাওয়া বলা হয়। আল্লাহ পাক ইরশাদ ফরমান : তোমাদের রিযিক এবং তোমাদের সাথে যা ওয়াদা করা হয়েছে তা রয়েছে আসমানে। [যারিযাত] প্রশিদ্ধ তাবেয়ী মুফাসসির হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন -মা তুআদুনা- দ্বারা জান্নাত বুঝিয়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বলেছেন, নবী কারীম সা. এরশাদ ফরমান, ‘ওয়া ইন্নাল জান্নাতা ফিসসামা’ জান্নাত আকাশে।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. বলে যে, আমি নবী কারীম সা. কে বলতে শোনেছি যে, জান্নাতের অজস্র দরজা আছে। এ গুলোর প্রত্যেকটির মাঝখানের দরজার ব্যবধান আসমান ও যমীনের মধ্যখানের সমান। এ সমস্ত দরজাসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দরজা হলো ফেরদাউস দরজা। তার উপর রয়েছে  আরশ।
জান্নাতের দরজা সব চেয়ে উপরে এবং আরশের নিচে। তাই মানুষ যখন আল্লাহ তাআলার নিকট দোআ করে রাসূল সা. ইরশাদ ফরমান, সে যেন আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করে।
এক হাদীসে নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, হাফেজে কুরআনকে আল্লাহ  তাআলা বলবেন, কুরআন পাক তেলাওয়াত করে যাও এবং উপড়ে চড়তে থাক। তোমার স্থান সেখানেই হবে যেখানে তুমি শেষ আয়াত পাঠ করবে। [আবু দাউদ হা- ১৪৬৪]
জান্নাত সৃষ্টি হয়ে গেছে
আল্লাহ পাক ইরশাদ ফরমান- আল্লাহর মাগফেরাতের দিকে দৌঁড়ে যাও। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন যা তৈরি করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। [আল ইমরান-১৩৩]
মেরাজ রজনীতে হুজুর সা. জান্নাত দেখেছেন
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, আমি জন্নাতের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করে আমি একটি নহরের নিকট পৌঁছলাম। এর উভয় তীরে স্তরে স্তরে মোতি সাজানো ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম ইহা কি? জিবরাঈল আ. বললেন ইহা কাউছার নহর। ইহা আপনাকে আপনার রব দান করেছেন। [বুখারী ১১/৪৬৪]
শুধু জান্নাত চাই: একটি বিস্ময়কর কাহিনী
হযরত মোহাম্মদ ইবন সাম্মাক রহ. বলেন যে, বনী উমাইয়ার মধ্যে মুসা ইবনে মোহাম্মদ ইবনে সুলায়মান হাশেমী খুবই আরামপ্রিয় লোক ছিলেন।  তিনি রাত দিন ভাল ভাল পানাহার, উত্তম পোষাক, সুন্দরী দাসী নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়ানো ছাড়া  দ্বীন দুনিয়ার আর কোন কাজ করতেন না। আল্লাহ পাক তাকে সুন্দর চেহারাও দান করেছিলেন। যে কেউ তাকে দেখত মনের অজান্তেই ছুবহানাল্লাহ বলে উঠত। তার চেহারা এতই সুন্দর ছিল যেন চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চাঁদ। মোটকথা, আল্লাহ পাক তাকে জাগতিক সবধরনের নিয়ামতই প্রদান করেন। বছরে তার তিন লাখ তিন হাজার দিনার আয় হত। এ সমস্ত টাকা পয়সা আরাম আয়েশের জন্য উড়াত। বসবাসের জন্য এক আলীশান মহল তৈরি করেছিল। এর উভয় দিকেই দরজা জানালা ছিল। একদিকের দরজা জানালাগুলো খোলা থাকত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। সকাল বিকাল লোকেরা এখানে এসে আড্ডা মারত। অপর দিকেরগুলো ছিল কুঞ্জনিস্বর্গ। এ দিকে বসে বসে বাগ বাগিচা দেখে সে দিল ঠাণ্ডা করত। বালাখানার অভ্যন্তর ভাগে হাতির দাঁতে নির্মিত গম্বুজ রৌপ্যের কলীক জড়িত স্বর্ণ দ্বারা গিল্টি করা ছিল। এতে ছিল একটি অতি মূল্যবান সিংহাসন। সে এতে উজ্জল দীপ্তিময় হয়ে বসত এবং শরীরে অতি মূল্যবান মোতি জড়িত পাগড়ি পড়ত। এর আশে পাশে তার বন্ধু বান্ধবরা এবং পেছনে চাকর নকররা দাঁড়িয়ে থাকত। আর গম্বুজের বাইরে নর্তকী গায়িকারা থাকত। এ সমস্ত নর্তকী গায়িকাদের মাঝখানে একটি পর্দা থাকত যখন ইচ্ছা করত সে তাদের দেখত। আর মনে যখন প্রবল বাসনা জাগত পর্দাটি সড়িয়ে ফেলত আর তখনই তারা গাইতে আরম্ভ করত। বন্ধ করতে চাইলে ইশারা করত তৎক্ষণাৎ চুপ হয়ে যেত। মোদ্দাকথা, এ কাজেই তার দিন অতিবাহিত করত। রাতের বেলা তার বন্ধুরা নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেলে সে যার সাথে ইচ্ছা তার সাথেই নির্জনবাস করত। সকাল বেলা সে দাবা ও পাশা খেলোয়ারদের একত্রিত করে তাদের সম্মুখে কোন অসুস্থতার বা মৃত্যুর অথবা এমন কোন বস্তুর আলোচনা করত যা তাদেরকে চিন্তায় ফেলে রাখে অলিক কিছু গল্ল গুজব বলতে। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন পোষাক এবং রকম বেরকমের সুগন্ধিময় বস্তু ব্যবহার করত। এভাবে সে সাতাশ বছর অতিবাহিত করল। এক রাতের ঘটনা, সে তার প্রাত্যহিক নিয়মমত রং তামাশায় মত্ত ছিল। এভাবে রাতের কিছু অংশ কাটিয়ে দিল। হঠাৎ করে সে ভীতিজনক বৃষ্টির আওয়াজের ন্যায় একটি আওয়াজ শোনতে পেল। আওয়াজ শোনে তার অন্তর আঁতকে উঠল এবং রং তামাশা ছেড়ে সে উক্ত আওয়াজের দিকে মনযোগ দিল। তারপর গায়িকাদের নাচ গান বন্ধ করতে নির্দেশ দিল। তারপর সে গম্বুজের বাইরে তার মুখ বাড়িয়ে আওয়াজ শোনতে আগ্রহী হলো। এ অবস্থায় সে তার চাকর বাকরদের নির্দেশ দিল যে, আওয়াজ দাতাকে ধরে নিয়ে এসো এবং নিজে শরাব পানে মত্ত হয়ে গেল। গোলামেরা আওয়াজটি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে সেখান পর্যন্ত পৌঁছে দেখতে পেল যে, একজন যুবক মানুষ অত্যন্ত দূর্বল। তার গর্দান একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার রং পাংশু বর্ণ এবং ঠোট শুকিয়ে  গেছে। উসকো খুশকো চুল, পিঠের সাথে পেট লেগে আছে এবং জীর্ণ শীর্ণ কাপড় পরিধান করে খালি গায়ে মসজিদে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে মুনাজাত ও তেলাওয়াত করছে। তারা তাকে মসজিদ থেকে বের করে আরামপ্রিয় লোকটির নিকট নিয়ে গেল। তারা তার সাথে কোন কথাবার্তা বলল না। তাকে নিয়ে মালিকের সম্মুখে হাজির করল। কে সে? চাকরেরা আরজ করল এই সেই আওয়াজ দাতা যার আওয়াজ আপনি শোনতে পেয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করল সে কোথায় ছিল? তারা বলল সে মসজিদে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল তুমি কি পড়ছিলে? সে বলল আমি আল্লাহর কালাম পড়ছিলাম। সে বলল তাহলে আমাকে একটু শোনাও তো? সে আউযুবিল্লাহ বিসমিল্লাহ পড়ে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পাঠ করল-ইন্নাল আবরারা লাফি নাঈম। আলাল আরা ইকি ইয়ানযুরুন—-। তারপর তাকে বলল, আরে… তুমি তো ধোঁকায় পড়ে আছো। সেখানকার নিয়ামতের কথা কি বলব? তোমার এগুলোতো মাটির তৈরি আর সেখানে রয়েছে আরো উঁচু উঁচু সিংহাসন। এগুলোর আস্তর হবে রেশমের এবং কার্পেটের। আর অতি মূল্যবান বিছানাতে থাকবে বালিশ। এতে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে দুটি ঝর্ণা বহমান। সেখানকার সব ধরনের ফল ফলাদি দু প্রকার। ফলফলাদি খেতে কেউ বাধা প্রদান করবেনা। বেহেশতি লোকেরা সীমাহীন শান্তিতে বসবাস করবে। সেখানে কোন অনর্থক কথা বার্তা শোনবেনা। সেখানে উঁচু উঁচু খাট এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বালিশগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাববে। থাকবে মখমলের গালিচা। সার্বক্ষণিক ছায়া এবং ফোয়ারাতে বসবাস করবে। এ সমস্ত প্রদিদান খোদাভীরু লোকদের জন্য। এখন কাফেরদের কথা শোনুন। তাদের জন্য থাকবে আগুন। আর তাতে সব সময়ের জন্য তাদের থাকতে হবে। শাস্তি কখনো হালকা হবেনা। সেখানে অনন্তকাল পড়ে থাকতে হবে। তারা মুখ বাকালে বলা হবে আযাব ভোগ কর। তাদের উপর হরেক রকম আযাব আপতিত হবে। আরামপ্রিয় হাশেমী লোক এ সমস্ত শোনার পর দূর্বল হয়ে গেল এবং যুবক লোকটির উপরে লুটেপড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করল এবং তার পাশে উপস্থিত সমস্ত লোকদিগকে বলল, তোমরা চলে যাও এবং নিজে যুবক লোকটিকে নিয়ে ঘরের মেঝেতে একটি চাটাইয়ের উপর বসে  গেল। এবং যৌবনের রঙ্গিন দিনগুলো চলে যাওয়ায় সে অনুশোচনা ও নিজের উপর নিজেকে তিরষ্কার করতে লাগল। যুবকটি তাকে উপদেশ দিয়েই চলল। সকাল পর্যন্ত তারা এভাবেই কাটাল। হাশেমী লোকটি আল্লাহ পাকের সাথে প্রতিশ্র“তি দিল যে, সে আর কখনো আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করবেনা। সে সকলের সামনে তাওবা করে মসজিদে বসে গেল। এভাবে সে সব সময় আল্লাহ পাকের ইবাদত করতে থাকল। তৎসঙ্গে তার যাবতীয় স্বর্ণ রৌপ্য কাপড় চোপড় বিক্রি করে ছদকা করে দিল। সমস্ত কর্মচারীকে বিদায় করে অবৈধ যত মালামাল ছিল সব নিজ নিজ মালিকের নিকট ফেরত দিল। অন্যান্য মালামাল বিক্রি এবং দাস দাসী মুক্ত করে দিল। অতঃপর সে মোটা কাপড় পরিধান করে নিল এবং আটার রুটি খেতে আরম্ভ করল। তারপর অবস্থা এমন হয়ে গেল যে, সমস্ত রাতই সে জেগে কাটাত এবং দিনের বেলা রোযা রাখত। নেককার লোকেরা তার কাছে এসে বলত আরে ভাই নিজেকে একটু আরাম দাও। আল্লাহ বড় দয়ালু। বান্দা অল্প কাজ করলেই তিনি প্রচুর প্রতিদান দিয়ে থাকেন। সে জবাব দিত ভাই আমি সব বড় বড় গোনাহ করেছি রাত দিন আল্লাহ পাকের নাফরমানিতে কাটিয়েছি। এ কথা বলেই সে খুব ক্রন্দন করত। শেষ পর্যন্ত মোটা কাপড় পরিধান করে পদব্রজে এবং খালি পায়ে হজ্জ করতে বের হল এবং একটি মাত্র পিয়ালা এবং আহারের জন্য একটি মাত্র পাত্র ব্যতীত সঙ্গে করে আর কিছ্ইু নিল না। এভাবেই সে হাটতে হাটতে মক্কায় গিয়ে হজ্জ সমাপ্ত করে কিছু দিন সেখানে থাকার পর ইন্তেকাল করল। মক্কা থাকাকালীন সময় সে রাতের বেলা হাজরে আসওয়াদ এর পাশে গিয়ে ক্রন্দন করত এবং তার অতীত জীবনের কথা স্মরণ করে আহাজারী করত এবং বলত হে পরওয়ার দিগার! হে আমার মাওলা! আমি পাপের মধ্যে কতদিন ডুবেছিলাম। হে আল্লাহ আমার রব! আমার সমস্ত পূণ্যকর্ম তো চলেই গেল। এখন অবশিষ্ট রইল আমার অপমান ও ক্ষতি। এখন আমি যেদিন আপনার সাথে সাক্ষাৎ করব এবং আমার আমলনামা যেদিন খোলা হবে এবং আমার হিসাবের খাতা পত্র পাপে ভর্তি হয়ে প্রকাশ হবে সেদিন কি হবে এবং কিভাবে মুখ দেখাব? হে আমার মাওলা আপনি ছাড়া এখন আমি আর কার কাছে কাকুতি মিনতি করব এবং কার কাছে যাব? এখন আমি কার উপর ভরসা করব? মাওলা! আমিতো জান্নাত চাওয়ার মত উপযোগী নই, আমি  আপনার সীমাহীন রহমতের সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে এই  আবেদন করি যে, দয়া করে আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন। আপনিই ক্ষমাশীল। সমাপ্ত

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ জান্নাত কোথায় অবস্থিত ? : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. মাসউদুল কাদির says:

    লেখাটি পড়ে তো আমার নিজের জান্নাতে চলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে। আপু আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। কত সুন্দর লেখা উপহার দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight