জান্নাতে প্রবেশের প্রাথমিক অবস্থা : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

সারওয়ারে কায়েনাত রাসূলুল্লাহ সা. জান্নাতের দরজা খুলবেন
রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন সমস্ত পয়গম্বর থেকে আমার অনুসারী বেশি উপস্থিত হবে। আমি সর্বপ্রথম জান্নাতের কড়া নাড়াব। [মুসলিম শরীফ]
রাসূলুল্লাহ সা. আরো ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজায় এসে দরজা খুলতে বলব। জান্নাতের দারোগা প্রশ্ন করবে, আপনি কে? জওয়াব দিব আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ কথা শুনে সে বলবে, আমাকে হুকুম করা হয়েছে আপনার জন্য খোলার, আর আপনার পূর্বে কারো জন্য যেন না খুলি। [মুলিম]
হুযূর সা. ইরশাদ করেন সর্বপ্রথম আমি যখন জান্নাতের কড়া নাড়াব তখন আল্লাহ তাআলা জান্নাতের দরজা খুলে আমাকে তাতে প্রবেশ করাবেন। আমার সাথে গরিব মোমিনগণ থাকবেন। এটা আমি অহংকার করে বলছি না। (তারপর ইরশাদ করেন,) আল্লাহর নিকট আমি পূর্বাপর সকলের চেয়ে প্রিয় হব। [তিরমিযী]
জান্নাত এবং জাহান্নামে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করবে
জাহান্নামীদের ভর্ৎসনা তিরস্কার করা হবে আর জান্নাতিদের সাদর অভ্যর্থনা জানানো হবে। জাহান্নামের দরজা পূর্ব থেকেই জেলখানারমত বন্ধ আর জান্নাতের দরজা খোলা থাকবে। ফেরেশতারা সবাই কাফেরদের খুবই লাঞ্ছনার সাথে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। তাদের কুফরীর স্তর অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা হবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
‘যখন তারা জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে তখন তার দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং তাদের জাহান্নামের রক্ষীরা বলবে, তোমাদের নিকট কি কোন রাসূল আসেননি? যিনি তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর আয়াতসমূহ আবৃত্তি করতো এবং তোমাদের আজকের দিনে উপস্থিত হওয়ার ভয় দেখাতো? জাহান্নামীরা তখন উত্তর দিবে হ্যাঁ, রাসূলগণ এসেছিলেন, কিন্তু কাফেরদের জন্য জাহান্নামের ওয়াদা অবশ্যই সত্যে পরিণত হবে। (তখন) তাদের বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর, তাতে চিরকাল অবস্থান কর, তা অহংকারীদের জন্য বড় নিকৃষ্ট ঠিকানা। [সূরা যুমার : ৮১]
জান্নাতীদের সম্পর্কেও পবিত্র কুরআনে এমনই ইরশাদ হয়েছে- অর্থাৎ আর যারা নিজেদের প্রভুকে ভয় করত, তাদের ভিন্ন ভিন্ন দলে বেহেশতের দিকে রওয়ানা করানো হবে।
ঈমান এবং তাকওয়া অনুযায়ী শ্রেণী বিভাগ হবে। সম্মান এবং স্তর অনুযায়ী মুমিনগণ ভিন্ন ভিন্ন জামাতে ভাগ হবে। তাদের স্তর, সম্মান এবং ইজ্জত অনুযায়ী জান্নাতের দিকে রওয়ানা করানো হবে। তাদের অভ্যর্থনার জন্য জান্নাতের দরজা পূর্ব থেকেই খোলা থাকবে। তারা জান্নাতের নিকটবর্তী হলে জান্নাতরক্ষীরা তাদের শান্তি এবং অনাবিল সুখের সুসংবাদ শুনাবেন। কুরআনে করীমের ইরশাদ হয়েছে- ‘যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করত তাদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকট পৌঁছবে তখন তার দরজাসমূহ খুলে যাবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা বলবে, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক. তোমরা আনন্দে থাক, চিরকাল থাকার জন্য জান্নাতে প্রবেশ কর। [সূরা যুমার : ৮৩]নিজের অনুসারীদের সামনে শয়তানের সাফাই
দুনিয়াতে শয়তান তার দলবল নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং হক ও ন্যায়ের পথ থেকে সরিয়ে র্শিক এবং কুফরি করায়, কিন্তু কেয়ামতের ময়দানে শয়তান নিজের ভুল পাল্টিয়ে উল্টা মানুষের উপর দোষ চাপিয়ে বলবে, তোমরা কেন আমার কথা মেনেছ আমি কি তোমাদের আমার কথা মানতে বাধ্য করেছিলাম?
কুরআনে করীমে ইরশাদ হয়েছে-
‘আর যখন ফয়সালা সমাপ্ত হবে তখন শয়তান বলবে (তোমাদের আমাকে মন্দ বলা উচিৎ নয়), নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছেন এবং আমিও তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলাম, কিন্তু আমি সে ওয়াদার খেলাপ করেছি, আর তোমাদের উপর তো আমি কোন জোর খাটাইনি, আমি শুধু তোমাদের ডেকেছি আর তোমরা (সেচ্ছায়) আমার কথায় সাড়া দিয়েছ। তাই তোমরা আমাকে তিরষ্কার করো না; বরং তোমরা নিজেদেরই তিরষ্কার কর। আমি তোমাদের সাহায্যকারী নই, তোমরাও আমার সাহায্যকারী নও; আমি তোমাদের এ কাজ কখনও পছন্দ করিনি, তোমরা এর পূর্বে (দুনিয়াতে) আমাকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয়ই জালেমদের জন্য মহাযন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। [সূরা ইবরাহীম : ২২]
শয়তানের বক্তব্যের মর্মার্থ হল- আমি তোমাদের হক পথ থেকে সরানোর জন্য কাজ করেছিলাম, চেষ্টা করেছিলাম। আমার কাজই ছিল এটা। তোমরা আমার কথা শুনলে কেন? তোমরা নিজেরাই অপরাধী। তোমরা নবীদের কথা মাননি, তাঁদের কথা শুননি কেন? আম্বিয়ায়ে কেরামের দেখানো সঠিক পথ অনুসরণ না করে আমার দেখানো মিথ্যা বাতিল পথের অনুসরণ করেছ। আমার কথায় কান দিয়েছ, এটা আমার দোষ নয়। কারণ আমি তোমাদের উপর কোন প্রকার জোর খাটাইনি যাতে তোমরা কুফরি এবং শিরিক করতেই হত। অতএব, আজকে আমাকে খারাপ বলে কি হবে, তোমরা নিজেরাই নিজেদের তিরষ্কার কর। আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারব না। অতএব এখন তোমাদের শাস্তি ভোগ করতেই হবে। দুনিয়াতে তোমরা আমাকে আল্লাহর শরীক বানাতে, প্রকৃতপক্ষে আমি তা পছন্দ করিনি। আজকে আমি তোমাদের আমাকে আল্লাহ তাআলার শরীক বানানোর কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছি।
উম্মতে মোহাম্মদি সর্বপথম জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সংখ্যায় বেশি হবে
মুসলিম শরীফে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, আমরা সবার শেষে দুনিয়াতে  এসেছি, আর কেয়ামতের দিন অন্য সকল সৃষ্টির পূর্বে আমাদের ফয়সালা হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা এখানে শেষে এসেছি। (আর) কেয়ামতের দিন প্রথমে যাব এবং সর্বপ্রথম জান্নাতে আমরাই প্রবেশ করব। [মেশকাম শরীফ]
অন্য এক বর্ণনায় আছে, হুযূর সা. ইরশাদ করেন, (কেয়ামতের দিন) জান্নাতিদের ১২০কাতার হবে। যার মধ্যে এ উম্মতের কাতার হবে ৮০ আর বাকী ৪০কাতার হবে সমস্ত উম্মত মিলিয়ে। [মেশকাত শরীফ]
সম্পদশালীরা হিসাবের কারণে জান্নাতে যেতে বাধাগ্রস্ত হবে
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেনে, গরিব অভাবগ্রস্ত লোকেরা ধনী-সম্পদশালী লোকদের পাঁচশ বৎসর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [তিরমিযী শরীফ]
হুযূর সা. ইরশাদ করেন, আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে বেশির ভাগ লোক মিসকীন। আর সম্পদশালীরা (হিসাবের জন্য) আটকে আছে। জাহান্নামীদের জাহান্নামে যাওয়ার হুকুম হয়ে গেছে আর আমি জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের বেশির ভাগই মহিলা। [বুখারি ও মুসলিম]
এ হাদীস শরীফে হুযূর সা. কেয়ামতের দিনের এক দৃশ্য বর্ণনা করেন, যা মহান আল্লাহ পাক তাঁকে দেখিয়েছেন। এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেল, সম্পদশালীরা জান্নাতে যেতে দেরী হবে। আবার এও বুঝা গেল, অভাব এবং সম্পদ না থাকার কারণে গরিবেরা ধনীদের পাঁচশ বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু এখানে এটা বুঝানো হয়নি, শুধু দরিদ্রতার কারণে জান্নাতে যাবে; বরং তার সাথে সাথে নেক আমলও থাকতে হবে। বদ আমলকারী দরিদ্ররাযেন এটা না বুঝে, আমরা অবশ্যই জান্নাতে যাব, আমাদের দরিদ্রতার ফযীলত রয়েছে। অবশ্যই দরিদ্রতার ফযীলত রয়েছে, তবে তার সাথে নেক আমলও থাকতে হবে। যে নেক আমলের কারণে জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত সে দরিদ্রতার কারণে সম্পদশালীদের আগে জান্নাতে চলে যাবে। অনেক লোক আছে যারা দরিদ্র আবার বদ আমলও করে, নামায রোযা থেকে গাফেল, তারা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত, তারা দুনিয়া-আখেরাত উভয় স্থানেই হতভাগা। কেননা তারা দুনিয়াতেও অভাবে কষ্ট ক্লেশে দিন কাটায় আবার আখেরাতেও আযাব ভোগ করবে। [তারগীব]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বির্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, (লোকেরা) কেয়ামতের দিন সবাই একত্রিত হবে। এরপর এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবে, এই উম্মতের (উম্মতে মোহাম্মদি) দরিদ্ররা কোথায়? তোমরা কি কি আমল করেছ? হিসাব দাও। তারা আরজ করবে, আপনি আমাদের দরিদ্রতা দিয়ে পরীক্ষা করেছেন, আমরা সবর করেছি (আপনার ইচ্ছায় আমরা খুশি ছিলাম)। আপনি সম্পদ ও ক্ষমতা অন্যদের দিয়েছেন আর আমাদের গরিব রেখেছেন। আল্লাহ জাল্লাহ শানুহু বলবেন, তোমরা সত্য বলেছ। (এরপর অন্য) সবার পূর্বে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর সম্পদশালী ও ক্ষমতাশালীরা হিসাব দেয়ার জন্য থেকে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম রা. আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সা. মোমিনগণ সেদিন কোথায় থাকবে? তিনি বলেন, তাদের জন্য নূরের চেয়ার রাখা হবে, মাথার উপর মেঘের ছায়া দেয়া হবে। অনেক বড় দিন মোমিনদের জন্য এক ছোট দিনের অংশের চাইতেও কম হবে।

চলমান…..

4 মন্তব্য রয়েছেঃ জান্নাতে প্রবেশের প্রাথমিক অবস্থা : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. ফাহিমা বিনতে আব্দুল কাদির says:

    আমি অনেক আনন্দিত যে আমি শেষ নবী উম্মত। আমি গর্বিত যে আমি মুসলিম। আমি আল্লাহর শুকরিয়া জানাই যে আমি ধনীদের থেকে ৫০০ বছর আগে জান্নাতে যাব ইনশাআল্লাহ। লেখিকা আপুকে হৃদয় থেকে ধন্যবাদ যে শয়তান আমাদেরকে কিভাবে ধোকা দেয় সাবলীলভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। শয়তানের ধোকা থেকে আমাদেরকে বেচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন

  2. Shariful Islam says:

    Onek upkari lekha. Thanks to writer.

  3. hafez atik says:

    Apnar lekhati pore amake one valor legese alhamdulillah.

  4. আল জান্নাত says:

    আল জান্নাতের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের সুন্দর মতামত পেয়ে আমরা লেখার অনপ্রেরনা পাই। আমাদের লেখায় আপনাদের হৃদয় ছুয়েছে এটা শুনে আমরা আনন্দিত। আপনাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight