জান্নাতের বালাখানার বর্ণনা : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

al-jannatbd

প্রশিদ্ধ তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন, জান্নাতের ভূমি হবে রৌপ্যের। হযরত সাহল বিন সাদ রা. বলেন, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, জান্নাতের যমীন হবে গড়াগড়ি খাওয়ার জায়গা। তা হবে কস্তুরীর। তোমাদের জন্তুগুলোর গড়াগড়ি খাওয়ার জায়গার ন্যায়।

জান্নাতের দেয়াল হবে সোনা রুপা ও কস্তুরীর
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, জান্নাতের চারটি দেয়ালের একটি ইট স্বর্ণের, আরেকটি রৌপ্যের। এর দরজাগুলো ইয়াকুত ও মোতির।

জান্নাতের আশে পাশে সাতটি প্রাচীর আটটি পুল
হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, জান্নাতের চর্তুপার্শ্বে রয়েছে সাতটি প্রাচীর আটটি পুল। এগুলো জান্নাতকে ঘিরে রেখেছে। প্রথম চারটি দেয়াল রোপ্য নির্মিত, দ্বিতীয়টি স্বর্ণের, তৃতীয়টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মিশ্রিত। চতুর্থটি মোতির, পঞ্চমটি  ইয়াকুতের, ষষ্ঠ দেয়াল যবরযদ পাথরের এবং সপ্তমটি নূর দ্বারা নির্মিত যা আলোকউজ্জল হয়ে আছে। দু’দেয়ালের মাঝখানের দূরত্ব পাঁচশ বছরের ব্যবধান। এর রয়েছে আটটি দরজা, দরজাগুলো হলো ইয়াকুতের এবং যাবরযদ পাথরের। দরজার উভয় অংশের ব্যবধান চল্লিশ বছরের  দূরত্ব পরিমাণ।
জান্নাতের দেয়ালের ব্যবধান
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একটি দেয়াল নির্মাণ করেছেন। দেয়ালটির এক ইট স্বর্ণের আরেকটি রৌপ্যের। অতঃপর এর মধ্যে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত করেছেন। আল্লাহ পাক জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ করেছেন। ফেরেশতারা যখন জান্নাতকে আলোক উজ্জল দেখলেন তখন তারা বলতে লাগলেন, হে জান্নাত! বাদশাহহ অর্থাৎ মুসলমানদের আগমনের জন্য তোমার সুসংবাদ।
জান্নাতের যমীন রৌপ্যের আয়নার ন্যায় ঝকঝকে
হযরত আবু জামিল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন যে, জান্নাতের যমীন কিসের  তৈরী? তিনি জওয়াব দিলেন যে, অতি শুভ্র রৌপ্য দ্বারা জান্নাতের যমীন  তৈরী। দেখতে যেন আয়নার মত। হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, জান্নাতের একটি ইট স্বর্ণের আরেকটি ইট রৌপ্যের। এর দরজাগুলো অতি উজ্জল মোতি ও ইয়াকুতের। সাধারণ কংকরগুলো চমকদার মোতির এবং মাটি জাফরানের।

উহুদ পাহাড় হবে জান্নাতের একটি পার্শ্ব
হযরত সাহল ইবনে যুবাইর রা. থেকে  বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, উহুদ পাহাড় জান্নাতের রুকন সমূহের একটি রুকন।
উহুদ পাহাড় হবে জান্নাতের দরজায়
হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, উহুদ পাহাড় আমাকে ভালবাসে আমিও উহুদ পাহাড়কে ভালবাসি। ইহা জান্নাতের দরজা সমূহের কোন এক দরজায় থাকবে। [জামে সগীর]
আদন নামক জান্নাতের যমীন, কংকর এবং নির্মাণ
হযরত আনাস রা. বলেন, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আদন স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন। এর একটি ইট শুভ্র উজ্জল মোতির, আরেকটি লাল ইয়াকুতের, আরেকটি সবুজ যবরযদ পাথরের। এর মশলা কস্তুরীর, শুকনো যাফরানের ঘাস। কংকরগুলো হবে উজ্জল মোতির আর মাটি হবে আম্বরের। [দুররে মানছুর]
জান্নাতের ঋতু ছায়া এবং বাতাসের বিবরণ
জান্নাতে না থাকবে গরম না থাকবে ঠা-া, আর না চন্দ্র সূর্য। আমর ইবনে মাইমুম রা. বলেন, জান্নাতের ছায়ার দৈর্ঘ হবে সত্তর হাজার বছর ভ্রমণের সম পরিমাণ। হযরত শুয়াইব ইবনে জাইহান রা. বলেন, আমি এবং হযরত আবুল আলীয়া রহ. সূর্যোদয়ের সময় কোথাও যেতে ঘর  থেকে বের হলাম। তখন তিনি আমাকে বলেন যে, জান্নতের আলো এ রকম হবে। হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, জান্নাত হবে নাতিশীতোষ্ণ। এর মধ্যে থাকবেনা কোন গরম আর না শীত। [সিফাতুল জান্নাত, আবু নাঈম]
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতবাসী লোকেরা গরম ও ঠা-া অনুভব করেন না। হযরত মালেক রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন,  যখন দক্ষিণা বাতাস জান্নাতে বইতে থাকবে তখন মিশকের ঠিকি লেগে যাবে। [ওয়াছফুল ফিরদাউস]
জান্নাতের রং বিবরণ, জান্নাতের রং শুভ্র
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, তোমরা সাদা রং গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে সাদা করে তৈরী করেছেন। তারপর তোমাদের জীবিত লোকেরা যেন সাদা পোশাক পরিধান করে এবং মৃতদের কাফনেও সাদা কাপড় দিও। [কামিল ইবনে আদ্দি]
হযরত ওসমান ইবনে যায়েদ রা. বলেন, নবী কারীম সা. জান্নাতের আলোচনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন, কাবা ঘরের রবের শপথ, জান্নাত এক ধরনের ফুলের সমাহার যা মৌ মৌ গন্ধে বিভোরকারী। আর ঔজ্জ্বল্যকারী নূর। [সিফতুল জান্নাত, আবু নাঈম]
হযরত আমের ইবনে সায়ীদ স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, নখের সাথে লেগে সামান্য বস্তু সদৃশ জান্নাতের নেয়ামতের কোন জিনিস প্রকাশ হয়ে পড়লে আকাশ ও যমীনের পার্শ্বসমূহ আলোকিত হয়ে উঠবে। আর জান্নাতিদের মধ্যে কেউ যদি এক পলক পরিমাণ প্রকাশিত হয়ে যান, তাহলে তাদের আলোতে চন্দ্র সূর্যের আলোও ম্লান হয়ে যাবে। যেমন ম্লান করে দেয় সূর্যের আলো তারকার আলোকে। [তিরমিযী]
হযরত যামিল ইবনে ছাম্মাক এর পিতা হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর নিকট জিজ্ঞেস করেন যে, জান্নাতের আলো কি রকম? তিনি বলেন, তুমি কি সূর্যোদয়ের সময়টি দেখনি যা সে প্রথম উদিত হয়? জান্নাতের নূরও সেরকমই হবে। তবে এর মধ্যে থাকবে না সূর্যের তাপ আর থাকবে না এতে শীতলতা। [সিফাতুল জান্নাত, আবু নাঈম]

অগ্রে প্রশ্চাতে নূর চমকাবে
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তুমি (মুহাম্মদ সা.) দেখবে যে, মুসলিম নর নারীর নূর তাদের ডানে বামে দৌঁড়াতে থাকবে।
জান্নাতির শরীরের ঔজ্জল্য
হযরত মুহাম্মদ ইবনে কাব রা. বলেন, জান্নাতে বিদ্যুতের ন্যায় একটি ঝলক দেখা যাবে তখন নীচের দরজার জান্নাতিদের পক্ষ থেকে বলা হবে তা কি ছিল? তাদেরকে জানানো হবে ইহা অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের জান্নাতি লোকদের কোন একজন। তিনি এক মহল থেকে অন্য মহলে গমনকালে এ ঝলক দেখা যায়।
হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া রা. থেকে বর্ণিত নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, জান্নাত হবে শুভ্র উজ্জল। অধিবাসীরা হবে সাদা বর্ণের, বসবাসকারী নিদ্রা যাবে না। সেখানে নেই কোন সূর্য, নেই কোন চন্দ্র। আর অন্ধকার রজনীও হবে না। না শীত হবে আর না গরম।

জান্নাতের সকাল বিকাল এবং দিবা রজনী
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তাদের আহার্য সকাল বিকাল সরবরাহ করা হবে। [মারইয়াম-৬২] উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে হযরত যাহ্হাক রা. বলেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের জন্য চক্করদারী এ রকম ঘর তৈরী করেছে, যেমন ভাবে দুনিয়াতে চক্কর দিয়ে থাকে চন্দ্র, সূর্য এবং রাত দিন। শুধু পরকালীন আলো এরকম হবে যে, যাতে আল্লাহ পাক সকাল দুপুর এবং বিকালেই নির্ধারিত করে রেখেছেন। সুতরাং মানুষ সকাল দুপুর ও সন্ধ্যা বেলায়ই সব ধরনেই স্বাদ উপভোগ করে থাকে, সেহেতু আল্লাহ তাআলা যখন তার বন্ধুদের প্রবল আকাক্সক্ষা তেজদীপ্ত করবেন এবং পানাহারের প্রবল আখাক্সক্ষা দান করবেন তখন তাদের সম্মুখে সাকাল সন্ধ্যাকে আবর্তন করে দিবেন। [ছিফাতুল জান্নাত]
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতে সকাল সন্ধ্যা হবে না। তবে এই অনুমানে জান্নাতি লোকের নিকট খাবার দাবাড় পরিবেশন করা হবে। [সিফাতুল জান্নাত]
সকাল সন্ধ্যা তো বটেই, এমনকি অন্যান্য সময়ের ন্যায় আরো দুটি সময় হবে। সেখানে অন্ধকার বলতে কিছুই থাকবেনা; বরং সার্বক্ষণিক আলোর মেলা চলবে। হযরত যুহাইর ইবনে মুহাম্মদ বলেন, জান্নাতে কোন রাত নেই। জান্নাতিরা সব সময়ই আলোতে বসবাস করবে। রাত পরিমাণ পর্দা ছেড়ে দেয়াতেই বুঝা যাবে এখন রাত আবার দিনের পরিমাণ পর্দা ছেড়ে দিলে বুঝা যাবে এখন দিন।

জান্নাতের প্রদীপ ও ঝাড়বাতীর বর্ণনা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সা. কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, জান্নাতিদের বাতি কেমন হবে? হুজুর সা. বললেন, আরশের সাথে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি হবে উপর দিক থেকে জান্নাতি লোকদিগকে আলো ছড়াবে। এর আলো দিনে নিভে যাবে না। এর আলোতে জান্নাতি লোকের চোখের জ্যোতিরও কোন ক্ষতি হবেনা। [কামিল ইবনে আদ্দি১/১১৯]

জান্নাতের সুগন্ধির বর্ণনা
জান্নাতের সুঘ্রাণ কতদূর থেকে পাওয়া যাবে? হযরত আবু বকর রা. বলেন, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন,  জান্নাতের সুঘ্রাণ শত বছর দূর থেকে উপলব্ধি করা যাবে। কোনো কোনো বর্ণনায় চল্লিশ বছরের কথাও রয়েছে। নেহায়া: ২/৪৯৪]

3 মন্তব্য রয়েছেঃ জান্নাতের বালাখানার বর্ণনা : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. Rahatul Jannat says:

    আপু! অনেক সুন্দর লিখেছেন। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুন। আসলে সকল মানুষই চায় যেন জান্নাতে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের যে জিনিসের লাভ জানে তার দিকেই ছুটে। আপনি যে সুন্দর করে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাতে তো আমার মনে হচ্ছে দুনিয়া ছেড়ে শুধু আখেরাতের কাজে মগ্ন হয়ে জান্নাতে চলে যাই। আল্লাহ আপনকে হায়াতে তায়্যিবা দান করুন। আরো খেদমত করার তাওফিক দিন। আমিন।

  2. কবির আহমদ says:

    মেডাম এত দুর্লব অথচ হৃদয়গ্রাহী জান্নাতের নিয়ামতের কথা আপনি কোথা থেকে লেখেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য এত নিয়ামত তৈরি করে রেখেছেন! আল্লাহ আমাদেরকে তোমার পথে পরিচালিত কর আর এসব নিয়ামত বিশিষ্ট জান্নাত দান কর। আমিন।

  3. Sahjada says:

    Onek sundor lekha, a lekha dara sokol k Faida dan koron. ameen.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight