জান্নাতীদের জান্নাতের অবস্থান ও সঙ্গী গ্রহণ : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

4 (4)

কাফেরদের জান্নাতের অংশ মুসলমানদের দেয়া হবে।
হযরত আবু  হুরায়রা রা. বলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দু’টি স্থান রয়েছে একটি জান্নাতে অপরটি জাহান্নামে। যখন কোন কাফের মারা যায় এবং জাহান্নামে চলে যায় তখন জান্নাতবাসী উক্ত কাফেরের জান্নাতের অংশের অংশীদার হয়ে যায়।

জান্নাতে অংশীদারিত্ব থেকে যারা বঞ্চিত থাকবে
হযরত আনাস রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি তার অংশীদারকে অংশ দেয়া থেকে বঞ্চিত করবে আল্লাহ পাক জান্নাতে তার অংশ বিনষ্ট করে দিবেন। [কানজুল উম্মাহ্]

জান্নাতে প্রবেশ করার পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতিরা জান্নাতে চলে যাবার পর তারা বলবেনÑ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাকের যিনি আমাদের থেকে যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা দুর করে দিয়েছেন।’’এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল হাশরের মাঠে আমরা যে বিভীষিকাময় অবস্থা দেখেছি তা থেকে আমাদেরকে নিরাপদ করেছেন। তারপর তারা বলবেনÑ নিঃসন্দেহে আমাদের রব অতি ক্ষমাশীল কৃতজ্ঞতা পরায়ণ।’’ তিনি আমাদের বড় বড় পাপরাশি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি আমাদের নেক  আমলের যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন। তিনি আমাদেরকে অতি আরাম দান করেছেন। [সিফাতুল জান্নাত, আবু নাঈম]
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান- প্রত্যেক জাহান্নামীকে তার জান্নাতের ঠিকানা দেখানো হবে। তখন তারা বলবে হায় আল্লাহ, যদি আমাদেরকে হেদায়েত দিতেন। সুতরাং জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকবে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন জান্নাতীকেও জাহান্নামের ঠিকানা দেখানো হবে। তখন তারা বলবে আল্লাহ পাক যদি আমাদেরকে হেদায়েত না দিতেন তাহলে আজ এই স্থানে যেতে হত। এই জন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন  [আহমাদ]

আম্বিয়া, শোহাদা এবং সিদ্দীকগণের জান্নাত
হযরত আবু দারদা রা. বলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনÑ আদন নামক জান্নাতে কেবল আম্বিয়ায়ে কেরাম, শোহাদায়ে এজাম এবং সিদ্দীকগণ প্রবেশ করবেন। এ জান্নাতে এমন সব নেয়ামাত থাকবে যেগুলো কোন মানুষ তো দেখেইনি এমন কি কারো ধারণাতেও নেই।’’ [ত্বিবরানী]

জান্নাতে শহীদগণের বাসস্থান
হযরত মিকদাম ইবনে মা’দী কারুবা রা.  বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনÑ আল্লাহ তায়ালার নিকট শহীদগণের ছয়টি নেয়ামাত রয়েছে। (১) রক্তের প্রথম ফোটাটি পরতেই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। (২) তাকে জান্নাতের স্থানটি দেখানো হয়। (৩) তাকে ঈমানের পোষাক পরিদান করানো হয়। (৪) তাকে কবরের আযাব থেকে নিরাপদ করা হয়। (৫) কিয়ামতের ভয়াল দিন তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। (৬) তার মাথার তাজের একটি মোতির মূল্য দুনিয়া এবং এর মধ্যস্থিত যা আছে তার চেয়ে অধিক মূল্যবান হবে। সত্তর জন হুরের সাথে তার বিয়ে হবে এবং তার সত্তর জন অতি নিকট আত্মিয়কে শাফায়াত করার অধিকার দেওয়া হবে এবং তার শাফায়াত কবুল করা হবে”। [মুসনাদে আহমদ]

এক শহীদের তিন হুরের সাথে বিয়ে
মুহাম্মদ ওর্য়ারাক বলেন যে, মোবারক নামে একজন হাবশী ছিল। সে খুব ভালো ভাল্ োকাজ করতো। আমি তাকে বলতাম, হে মোবারক তুমি কি বিয়ে করোনি ? তখন সে জবাব দিত যে, আমি আল্ল্হা পাকের নিকট আবেদন করেছি তিনি যেন আমাকে হুরের সঙ্গে বিয়ে দেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা কোন এক জিহাদে অংশ গ্রহন করলাম। শক্ররা আমাদের উপর আক্রমন করায় মোবারক শহীদ হয়ে গেল। আমি তার নিকট দিয়ে গমন করার সময় দেখতে পেলাম তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেহটি একদিকে পড়ে রয়েছে। তার পেটটি মোঁচড় দিয়ে রয়েছে এবং তার হাত মাথার নীচে রয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম আল্লাহ তায়ালা তোমাকে কতজন হুরের সাথে বিবাহ দিয়েছেন? সে মাথার নিচ থেকে হাত বের করে তিনটি আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করল। অর্থাৎ তিনটি হুরের সাথে। [রওজুর রায়াহীন]

আওলীয়া কেরামের অবস্থান
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের এক শাগরিদ বলেন ইমাম আহমদের ইন্তেকালের পর আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, তিনি খুব বিলাসিতা করে চলাফেরা করতেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম হে ভাই খবর কি? তিনি জবাব দিলেন ইহা দারুস্সালাম। এরা জান্নাতের খাদেম। আমি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম আল্লাহ তায়ালা আপনার সাথে কি ধরণের ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন আমাকে মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং সোনার পাদুকা আমাকে পরিধান করিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এরশাদ হয়Ñ এগুলো সে সমস্ত কথারই পুরস্কার যা তুমি বলেছিলে যে, কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম, হাদীস নয়। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আদেশ হয়, যেখানে ইচ্ছে যেতে পার, ঘোরাফেরা করতে পার। আমি জান্নাতে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম যে, সুফিয়ান ছওরী রহ: Ñএর দুটি সবুজ রঙ্গের ডানা। তিনি এক বৃক্ষ থেকে অন্য বৃক্ষে উড়ে বেড়াচ্ছেন এবং এই আয়াত পরছেনÑ ”সমস্ত প্রশংসা আল্ল্হা তায়ালার। যিনি আমাদের সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। যিনি আমাদেরকে জান্নাতের ওয়ারিশ করেছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা সেখানেই প্রবেশ করতে পারছি। সৎকর্মশীলদের জন্য ইহা বড় নিয়ামত।’’ আমি জিজ্ঞেস করলাম আব্দুল ওয়াহেদ ওয়ারাকা রহ. এর খবর কি? তিনি জবাব দিলেন তিনি নূরের দরিয়াতে নূরের কিস্তিতে আরোহন করে আল্লাহর যিয়ারতে গেছেন। আমি বিশর বিন হারেছ-এর অবস্থা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন হায় হায় তার উপমা আর কে হতে পারে? আমি দেখলাম আল্লাহ তায়ালা তার দিকে ফিরে বলতেছেন যে, ওহে তুমিতো জাননা যে, তোমার কি মর্জাদা। ওহে যা পানাহার করনি তা পানাহার করে নাও। [জান্নাত কি হাসীন মানাযের]

হযরত খাদিজা রা. হযরত মারইয়াম আ. এবং হযরত আছিয়া আ. এর মর্যাদা
হযরত ফাতেমা রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমাদের আম্মা খাদিজা রা. জান্নাতে কেমন অবস্থায় আছেন? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন চমকদার মোতি বা ইয়াকুতের সাথে অতিব সুন্দর আলোকোজ্জ্বল যবরজদের মহলে রয়েছেন। সেখানে অনর্থক কোন কথা নাই, নেই কোন ঝামেলা-ঝঞ্জাল। বিবি মারইয়াম, বিবি আছিয়াও সেখানে আছেন। বিবি ফাতেমা জিজ্ঞেস করলেন ইহা কি নলখাগড়ার মহল? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন না, বরং মতি, ইয়াকুত ইত্যাদি মিশ্রিত মহল। [মাজমাউয যাওয়াইদ]

নুরের চেয়ার এবং মোতির বৃষ্টি
ইমাম রবি ইবনে সুলায়মান রা. বলেন ইমাম শাফেয়ী রহ. -এর ইন্তেকালের পর তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ আপনার সাথে কি ব্যবহার করেছেন? তিনি বলেন আমাকে নূরের চেয়ারে বসিয়ে আমার উপর আলোকিত তাজা মোতির বৃষ্টি বর্ষণ করিয়েছেন। [জান্নাত কি হাসীন মানাযের]

নূরানী পোশাক এবং তাজ
এক বুযুর্গ বলেন যে, আমি শেখ আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবনে আলী ইবনে ইউসুফ সিরাজীকে তার ইন্তেকালের পর স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম জনাব এই সাদা পোষাকটি কি? তিনি বললেন ইহা ইবাদাতের সম্মান। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তাজটি কিসের জন্য? তাজটি হল ইলমের ইজ্জত। [প্রগুক্ত]

অর্ধেক জান্নাতের ওয়ারিশ
কোন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন যে, বাশার ইবনে হারিসের ইন্তেকালের পর স্বপ্নে তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ পাক আপনার সাথে কি রকম ব্যবহার করেছেন? তিনি বলেছেন আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং অর্ধেক জান্নাতের অধিকারী করে বলেছেন দুনিয়াতে তোমার  যথেষ্ট খানা-পিনাা ছিলনা। তাই এখন যা ইচ্ছা তাই পানাহার কর। আল্লাহ পাক আমাকে বলেন হে বাশার, আমি তোমাকে অন্যান্য মানুষের তুলনায় এতই সম্মান দান করেছিলাম। তুমি যদি আগুনের আংড়ায় সেজদা কর তবু তার হক আদায় হবেনা। এক বর্ণনায় তাও আছে যে, আল্লাহ তায়ালা বলেন আমি যখন তোমার প্রাণ সংহার করি সে সময় তোমার চেয়ে আর কোন প্রিয় বস্তু আমার ছিলনা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেমিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথেই থাকবেন
হযরত আয়েশা রা. বলেন একদা একব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনাকে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক ভালবাসি। আপনাকে আমার পরিবার পরিজনের চেয়েও অধিক ভালবাসি। এবং যে কোন জিনিস থেকে আপনি প্রিয়তর। আমি আমার ঘড়ে বসা ছিলাম। এমন সময় আপনাকে স্মরণ হল। আমার তড় সহ্য হচ্ছিলনা, আপনার নিকট চলে আসতে এবং আপনার দর্শন পেতে। কিন্তু যখন আমার মৃত্যু ও আপনার ইন্তেকালের কথা মনে পড়ল তখন আমি ভাবতে থাকলাম যে, আপনি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তখন আপনাকে নবীগণের শ্রেষ্ঠ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে আর আমি যখন জান্নাতে প্রবেশ করব তখন আমার ভয় হচেছ যে, আপনার দর্শন থেকে বঞ্চিত না হই। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নের আয়াত নিয়ে হযরত জিবরাঈল না আসা পর্যন্ত তাকে কোন উত্তর দিলেন না। ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনূগত্য করবে, যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন সে তাদের সঙ্গি হবে। তারা হলেন নবী, ছিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম।” [সুরা-নিসা ৬৯ ] [দূররে মানসুর]

2 মন্তব্য রয়েছেঃ জান্নাতীদের জান্নাতের অবস্থান ও সঙ্গী গ্রহণ : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. মায়েশা খাতুন says:

    এত বড় নেয়ামত রাখছেন আল্লাহ তাআলা! এ হিসেবে তো দুনিয়া কিছুই না। আল্লাহ তোমার খাটি গোলামী করে এই সমস্ত নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশের তাওফিক দাও। আর যার লেখায় আমার মনের মাঝে এই ভাব উদয় হয়েছে তাকেও জান্নাতুল ফেরদাউস নসবি কর। আমিন।

  2. সাইফুল says:

    Janant kar ki obosthan jante pere kushi holam. allah amader o nabi, saheedinder sathe hasor korio & jannate santite rakhio. ameen.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight