ছোট গল্প : বড় আপু :- মুস্তাকিম আমীর

সেই বেলা তিনটা থেকে বার তের বছরের একটি কিশোর হেঁটে চলছে দিনাজপুর শহরের রাস্তার ফুটপাত ধরে। খুঁজে ফিরছে মহাজন পাড়া উত্তর ফরিদপুর এর ৩৩ নং বাড়িটা। কিন্তু তিন চার ঘণ্টা খুঁজেও বাড়িটার সন্ধান পায়নি। এদিকে দিনমণি তার আলো গুটিয়ে বিদায়ের হাতছানি দিয়ে লুকিয়ে গেছে পশ্চিমাকাশে। প্রকৃতি তিমিরের চাদরে আবৃত হওয়ার সাথে সাথে প্রকৃতিতে নেমে এসেছে হাঁড় কাঁপানো কনকনে শীত। সে সাথে যোগ হয়েছে পশ্চিমা হিম শীতল হাওয়া। মাঘের হাঁড় কাঁপানো কনকনে শীত আর পশ্চিমা হিম শীতল হাওয়া এক সাথে পেয়ে বসেছে কিশোরটিকে। কাঁপছে সে থরথর করে। কারণ কিশোরটির গায়ে কোনো গরম কাপড় নেই। পরনে কেবলই স্কুলড্রেসÑ ঘিয়া রংয়ের প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পিঠে ঝুলে আছে স্কুল ব্যাগ।
কিশোরটির নাম নাহিদ। দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার একেবারে ঘোর মফস্বলে তার বাড়ি। গোলাপগঞ্জ বহুমুখী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সে।
আজ বৃহস্পতিবার বার। হাফ স্কুল। বেলা একটায় স্কুল ছুটি হয়েছে। হাতে একটা লম্বা সময় পেয়ে নাহিদ বাড়িতে না গিয়ে বাসে চড়ে চলে এসেছে তাদের জেলা শহর দিনাজপুরে।
গত সপ্তাহে বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ‘কলম বন্ধু’ বিভাগে নাহিদ একটি ঠিকানা পায়। ঠিকানাটি হলোÑ ‘লায়লা রওশন বন্যা, বাড়ি নং ৩৩, উত্তর ফরিদপুর, মহাজন পাড়া দিনাজপুর।” ঠিকানার পর লেখাÑ ‘বয়স ১৭, পেশা: ছাত্রী, শখ: মনের মতো একটি ছোট ভাই পাওয়া।” এটা পড়ার পরই নাহিদের মনে পড়ে যায় বড় আপু নুসরাতের কথা। তার কিশোর দু’নয়নের পর্দায় ভেসে ওঠে বড় আপু নুসরাতের মুখোচ্ছবি। নাহিদের দু’নয়নে উছলে আসে অশ্রুর প্লাবন। কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায়।
নাহিদের বড় আপু নুসরাত এখন আর এই দুনিয়ায় নেই। পাষ- স্বামী আর শশুর  শাশুরীর বহুমুখি নির্যাতনের শিকার হয়ে তার প্রাণপাখি দেহ পিঞ্জির হতে উড়ে চলে গেছে  দূরে। অনেক দূরে। পরপাড়ে। যেখান থেকে আজ পর্যন্ত কোনো প্রাণপাখি ফিরে আসেনি এবং আসবেও না।
নাহিদরা ছিলো এক ভাই এক বোন। বোনটিই বড়। বাবা নাজিমুদ্দিন একজন দিনমজুর। দিনে আনেন দিনে খান। সঞ্চয় থাকে না কিছু। তাই সংসারে টানাপোড়েন লেগেই থাকে। তা সত্ত্বেও বাবা নাজিমুদ্দিন ছেলে মেয়ে দু’টিকে স্কুলে পড়ান। শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান। নিজের মতো তাদেরকে মূর্খ বানাতে চান না।
নুসরাত রূপে গুণে ছিলো অনন্যা, অতুলনীয়া। লেখা পড়াতেও খারাপ না। ক্লাশের প্রথম স্থান তার দখলে না থাকলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান তার দখলেই থাকতো সর্বদা। কিন্তু কপালের লিখন না যায় খ-ন এস এস সি পর্যন্ত তার আর যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। কথায় আছেÑ ‘হরিণীর দুশমন তার নরম গোশত, আর গরীবের দুশমন তার রূপ সৌন্দর্য। ” বলতে গেলে নুসরাতের রূপ সৌন্দর্যই তাকে এস এস সি পর্যন্ত যাওয়ার গতিকে থমকে দেয়। তার  রূপ অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনকাড়া হওয়ায় পাড়ায় বখাটেদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে যায় তার উপর। তাই পাড়ার একাধিক বখাটের পক্ষ থেকে প্রথমে প্রেমের আবেদন নিবেদন আসতে থাকে। রাজি না হওয়া পরবর্তিতে ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, এমনকি হত্যার হুমকি ধমকিও আসতে থাকে পাড়ার সোনার ছেলে(!)দের পক্ষ থেকে।
বাবা নাজিমুদ্দিন ভেবে দেখেনÑ বর্তমানে দিনকাল ভালো না। যেভাবে এই স্বাধীন দেশটাতে ধর্ষণ, ব্যভিচার, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণ দিন দিন বেড়েই চলছেÑ তাতে ঘরে বিয়ে উপযুক্ত সুন্দরী মেয়ে রাখা মোটেও নিরাপদ নয়। আল্লাহ না করুনÑ যদি মেয়েটার কোনো কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে গলায় রশি দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। আর দেশের প্রশাসনের কাছে তো ন্যায় বিচারের আশা করা মোটেও যায় না। এদেশে নারী নির্যাতন আইন আছে ঠিক, তবে আইনের প্রয়োগ  নেই। এদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা নারী হওয়া সত্ত্বেও দেশের নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর গরীব হলে তো কথাই নেই। গরীবদের জন্য যেন এদেশে আইন তৈরীই হয়নি। যদিও বা ‘আইনের চোখে সবাই সমান” বুলিটি আওড়ানো হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তার পুরোটাই উল্টো।
অনেক ভেবে চিন্তে বাবা নাজিমুদ্দিন মেয়ে নুসরাতের বিয়ে দেয়ার সিদ্ধন্ত নিয়ে নেন। কিন্তু বাবা নাজিমুদ্দিনের একার পক্ষে কি সম্ভব মেয়ের বিয়ে দেয়া। হ্যাঁ, সম্ভব হতো, যদি যৌতুক নামের বিষ ফোঁড়াটি এই সমাজে পচন না ধরাতো এবং থাকতো যদি এদেশে আল্লাহর আইন, সৃষ্টির সেরা মহা মানব রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুপম আদর্শ। মানুষেরা যদি তারকার মতো সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণ অনুকরণ করতো। আফসোস এদেশটা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া এবং এদেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও এদেশে চালু নেই আল্লাহর আইন, নবীর শাসন। নেই সেই মহা মানবের অনুপম আদর্শের অনুসরণ অনুকরণ। মানুষ এখন চির শাশ্বত বিধান মহা গ্রন্থ আল-কুরআনের সংবিধান ছেড়ে মানব রচিত সংবিধান দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তা কি আদৌ সম্ভব?
এদেশের মানুষেরা আজ ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বরণ করছে পাশ্চাত্যের নোংরা অসভ্যতা। পাশ্চাত্যের সাদা চামড়া ওয়ালারা এবং প্রতিবেশি ব্রাহ্মণ্যবাদিরা এদেশে আমদানি করছে সভ্যতার নামে অসভ্যতা, শিক্ষার নামে কুশিক্ষা, আধুনিকতার নামে অধার্মিকতা। বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, অশ্লীলতা আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। যার ফলে মানবতা আজ ভুলুণ্ঠিত, অবহেলিত। সিংহভাগ মুসলমানরা আজ ভুলতে বসেছে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, অনুপম আদর্শ, সভ্যতা-সংস্কৃতি, তাহযিব-তামাদ্দুন। কাজেই দেশে আজ সংঘঠিত হচ্ছে অপরাধ ব্রা-ের সব কিসিমের আইটেম।
নুসরাতের বাবা নাজিমুদ্দিন মেয়ের বিয়ে দেন পাশের গ্রামের শমশের আলীর পুত্র আকবর আলীর সাথে। যৌতুক হিসেবে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং একটা চায়না ফনিক্স বাইসাইকেল। আর ছয় মাস পর এক জোড়া দুধেল গাভী দেয়ার কথা। মেয়ের সুখের জন্য বাবা নাজিমুদ্দিন তার নিজের যে দশকাঠা আবাদি জমিন ছিলো তা বিক্রি করে যৌতুকের পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং বিয়ের যাবতীয় খরচের আঞ্জাম দেন।
যে সুখের জন্য বাবা নাজিমুদ্দিন জমি বিক্রি করে মেয়েকে পাত্রস্থ করেন সে সুখ নুসরাতের জীবনে আসে না। বরং তার জীবনে নেমে আসে অশান্তি। স্বামী এবং শশুর শাশুরীর নির্মম নির্যাতন নিপীড়নের স্টীম রোলারে পিষ্ট হতে হয় প্রতি নিয়ত। বিয়ের তিন মাস যেতে না যেতে স্বামী আকবর আলী নুসরাতকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে বাপের বাড়ি থেকে দুধেল গাভী জোড়া নিয়ে আসার জন্য। নুসরাত স্বামীর এ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। সে জানে এবং খুব ভালোভাবেই জানে যে, তার বাবার ‘বাড়ি ভিটা’ ছাড়া এখন আর কোনো সহায় সম্পদ নেই যে, তা বিক্রি করে দুধেল গাভী জোড়া কিনে দিয়ে তার স্বামীর আব্দার পূরণ করবে।
আব্দার পূরণ না হওয়ায় স্বামী আকবর আলী শুরু করে নুসরাতের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নির্যাতনে তার স্বামীর সাথে শশুর শাশুরিও শরিক হয়।
নুসরাত নির্যাতনের প্রতিবাদ না করে সব মুখ বুজে সহ্য করে যায়। এছাড়া যে তার আর কোনো উপায় নেই। কারণ এ দুনিয়ায় মেয়েদের রয়েছে দু’টি জীবনÑ একটি বাবার ঘরে, অপরটি স্বামীর ঘরে। বাবার ঘরের জীবন বিয়ের পর আর থাকে না। থাকে শুধু স্বামীর ঘরের জীবন। এ জীবন ছেড়ে সে যদি চলে যায়, তাহলে তাকে যেতে হবে পরপাড়ে। কিন্তু নুসরাত বাঁচতে চায়, তবে তা নিজের জন্য নয়Ñ তার গর্ভের নিষ্পাপ নবজাতকের জন্য। দেখতে চায় নবজাতকের মুখ। শোনতে চায় নবজাতকের মুখ থেকে ‘মা’ ডাক। তাই তো সে শত নির্যাতন সহ্য করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে স্বামীর ঘরে।
কিন্তু নুসরাতকে আর বাঁচতে দেয় না মানুষরূপি পশুরা। নির্যাতনের পরিমাণ দিন দিন বাড়াতে বাড়াতে একদিন এসিড দিয়ে ঝলসে দেয় নুসরাতের শরীর। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নুসরাত। এ দুনিয়ার আলো বাতাস থেকে বঞ্চিত হয় নুসরাতের গর্ভের নিষ্পাপ নবজাতটিও।
নুসরাতের বাবা নাজিমুদ্দিন বাদি হয়ে নারী নির্যাতন ও হত্যা মামলা করেন। কিন্তু ন্যায় বিচার পাওয়া তো দূরের কথা সাধারণ বিচারও পাননি। বরং জীবন নাশের হুমকি ধমকিও আসতে থাকে বিবাদির পক্ষ থেকে। তার উপর ‘যেদিকে আছে টাকা সেদিকে ঘোরে আইনের চাকা। ” অবশেষে কিছুই করতে পারেন না তিনি। শুধু দু’চোখে মেয়ে হারানো বেদনাশ্রু ঝরাতে হয় তাকে।
বড় আপুর নির্মম মৃত্যুতে নাহিদ পাগলের মতো হয়ে যায়। আর কোনো দিন বড় আপু তাকে কাছে টেনে নেবে না। আব্বু আম্মু শাসালে বড় আপুর কোলে গিয়ে লুকাতে পারবে না। আর কোনো দিন তার কপালে বড় আপু ¯েœহের চুম্বন এঁকে দেবে না।
নাহিদ যখন পত্রিকায় দেখে যে, একটি মেয়ে খোঁজ করছে মনের মতো একটি ছোট ভাইকে। ছোট ভাই পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছে মেয়েটি। তখনি ‘বড় আপু’ পাওয়ার জন্য, বড় আপুর কোলে মাথা রাখার জন্য, বড় আপুকে ‘আপু’ বলে ডাকার জন্য নাহিদের মনটা ব্যকুল হয়ে ওঠে। সে জন্য আজ নাহিদ ছুটে এসেছে বড় আপুর সন্ধানে।
নাহিদ প্রথমে লায়লা রওশন বন্যা নামের মেয়েটির কাছে মেয়েটির ছোট ভাই হওয়ার প্রস্তাবটি জানাতে চেয়েছিলো পত্রের মাধ্যমে। কিন্তু তার কিশোর মন তাতে সায় দেয়নি। তার কিশোর মন তাকে বলেছিলোÑ নাহিদ! পত্রের মাধ্যমে নয়; বরং তুমি নিজেই ঠিকানা অনুযায়ী চলে যাও মেয়েটির কাছে। বড় আপু বলে ডাক তাকে। দেখবে, সে তোমাকে ছোট ভাইয়া বলে বুকে টেনে নেবে। তোমাকে ¯েœহ সোহাগে ভরিয়ে দেবে। মনে হবে সে তোমার বড় আপু নুসরাত। নাহিদের কিশোর মনের ‘বড় আপু’ পাওয়ার তীব্র তামান্নায় তাকে আজ নিয়ে এসেছে বড় আপুর সন্ধানে তাদের জেলা শহর দিনাজপুরে।
নাহিদ অজপাড়া গাঁয়ের কিশোর। কোনোদিন দেখার ভাগ্য হয়নি এই বিশাল শহর। শহর সম্পর্কে তার ধারণা নেই। শহর সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাই যখন সে বাস থেকে নেমে শহরটার দিকে দৃষ্টি দেয় তখন রীতিমত অবাক হয়ে যায়। সে মনে করেছিলোÑ শহর আর কত বড় হবেÑ তাদের গোলাপগঞ্জ হাটের চেয়ে হয়তো চার পাঁচ গুণ বড় হবে। কিন্তু এতো বড় যে হবে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
নাহিদ বাস থেকে নেমে ভাবেÑ এত বড় শহরে আমার মতো অজপাড়া গাঁয়ের ছেলের পক্ষে কি সম্ভব বাড়িটা বের করা? তাহলে কি আমাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হবে? ফিরে যাওয়ার কথাটা ভাবতেই তার কিশোর হৃদয়টা যেন ব্যথায় টনটন করে ওঠে। মুখ ফুটে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসেÑ না, আমাকে ব্যর্থ হওয়া যাবে না। যে করেই হোক আমাকে এ মিশনে সফল হতেই হবে। নাহিদ আরো ভাবেÑ আমি তো রিকশা নিয়েও যেতে পারি। রিকশা ওয়ালা তো অবশ্যই ঠিকানাটা চিনবে। কিন্তু পরক্ষণই একটি ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলেÑ সে লোক মুখে শোনেছেÑ ‘শহরের রিকশা ওয়ালারাই নাকি ‘ছেলে ধরা’। এরাই নাকি ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলে। তারপর তাদেরকে ভারতে পাচার করে। ” এ কথা তার মনে হতেই গা শিউরে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়Ñ রিকশা নয় পায়ে হেঁটেই বাড়িটার সন্ধান করবে। তাছাড়া পকেটের স্বাস্থ্যের কথাও একবার ভেবে দেখে সে। তার কাছে যা টাকা আছে তা যদি রিকশা ওয়ালাকে দিয়ে দেয় তাহলে বাড়ি ফিরে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া থাকবে না। তখন দেখা দিবে আরেক নতুন বিপদ।
নাহিদ আরো ভাবেÑ এখন তো মাত্র তিনটা বাজে। হাতে সময় প্রচুর। অবশেষে যদি বাড়িটা খুঁজে নাও পাই তবুও অন্তত আমাদের জেলা শহরটাতো দেখা হবে। আর ভাগ্য যদি আমার অনুকুলে থেকেই থাকে তাহলে হয়তো বাড়িটা পেয়েও যেতে পারি। এ রকম সাত পাঁচ ভেবে নাহিদ হাঁটা শুরু করে দেয় রাস্তায় রাস্তায়, ওলিতে গলিতে। তাকায় শুধু ডান বায়ের আকাশ চুম্বি বিল্ডিং গুলোর দিকে। আর মনে মনে ভাবেÑ যদি পেয়ে যাই বাড়িটা এবং সে সাথে মেয়েটাকেও, তাহলে আমি বড় আপুকে কালকেই নিয়ে যাবো আমাদের বাড়িতে। তারপর আব্বু আম্মুকে ডেকে বলবোÑ আব্বু আম্মু! দেখ, কাকে নিয়ে এসেছি! তখন আব্বু আম্মু বড় আপুকে দেখে দারুণ খুশি হবে।
আবার কখনও ভাবেÑ বাড়িটা যদি খুঁজে না পাই, অথবা খুঁজে পেলাম কিন্তু মেয়েটা আমাকে ছোট ভাই হিসেবে গ্রহণ না করে। অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে হওয়ার কারণে আমাকে ঘৃণা করে, গরীব হওয়া কারণে দূরে ঠেলে দেয়, তাহলে তো আমার এ ত্যাগ, এ পরিশ্রম পুুরোটাই ব্যর্থ। আর বাড়িতে গিয়ে আব্বু আম্মুকে স্কুল থেকে কোথায় গিয়েছিলামÑ এর কইফিয়ত দিতে হবে। কইফিয়ত দিতে তো পারবো না অবশেষে আর কিÑ বকুনিই শোনতে হবে। নাহিদ এসব ভাবে আর ডানে বায়ে তাকিয়ে হাঁটে।
সূর্য পশ্চিমাকাশে হারিয়ে গিয়ে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে। তারপরও যখন নাহিদ তার কাঙ্খিত বাড়িটা খুঁজে পায় না, তখন বাড়িটা খুঁজে বের করার আশা ত্যাগ করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। কিন্তু এ কি? কোথায় সেই টার্মিনাল? কোথায় এসেছে সে? কোনো রাস্তা দিয়ে এসেছে? কিছুই তার মনে নেই। তাহলে সে কি বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না? এ কথা ভাবতেই ছ্যাত করে ওঠে তার বুকটা। তার মনে যতটুকু সাহস শক্তি ছিলো তাও যেন নিঃশেষ হয়ে যায়।
নাহিদ ভাবেÑ এই বিপদ সংকুল মুহূর্তে কী করণীয় তার। কী করবে এখন সে। আজকের রাতটা শহরেই কাটাবে নাকি বাড়ি ফিরে যাবে? কিন্তু কোনোটাই যে তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর ভাবতে পারে না নাহিদÑ কেঁপে ওঠে তার হৃদপি-। দু’চোখে নেমে আসে অশ্রু। মুখ ফুটে বেরিয়ে আসেÑ হে আল্লাহ! তুমি সর্ব শক্তিমান! জীবন মরণ তোমার হাতে। এই বিপদ মুহূর্তে সাহায্য কর তুমি আমাকে। উদ্ধার কর এই বিপদ থেকে। হে আল্লাহ! হে সর্ব শক্তিধর! তুমি বলে দাও আমি এখন কী করবো? এ রকমভাবে আল্লাহকে ডাকে আর হাঁটে। কিন্তু ঠিক মতো হাঁটতে পারে না। খুবই কষ্ট হয় তার। খিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সেই সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে এসেছে তারপর আর পেটে কিছুই ঢুকেনি।
ঠা-ায় নাহিদের শরীর যেন অবশ হয়ে যায়। আর হাঁটতে পারে না। এই বুঝি পড়ে যাবে। শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে যায়। এই বুঝি প্রাণপাখি দেহ পিঞ্জির হতে উড়ে চলে যাবে।
একটি বাড়ির দিকে তাকাতেই নাহিদের দু’চোখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। মুখ ফুটে বেড়িয়ে আসে আলহামদু লিল্লাহ। হারিয়ে যাওয়া শক্তিও যেন ফিরে পায় সে। বাড়িটার গেটে ন্যাম প্লেটে লেখাÑ ‘বাড়ি নং ১৯, উত্তর ফরিদপুর, মহাজন পাড়া দিনাজপুর। ”
১৯ নং বাড়িটার যখন সে সন্ধান পেয়েছে তখন ৩৩ নং বাড়িটার সন্ধান সে অবশ্যই পেয়ে যাবে। আড়াই তিনশ গজ সামনে এগুতেই নাহিদ পেয়ে যায় তার কাঙ্খিত বাড়িটা। খয়েরি রংয়ের ত্রিতল বাড়ি। এনার্জি বাল্পের সাদা আলোয় অপূর্ব দেখাচ্ছে বাড়িটাকে। নীল রং এর লোহার গেট। নাহিদ কাছে গিয়ে নক করে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সারা পায় না। নাহিদ আরো দু’বার নক করে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পায় না। কোনো সাড়া শব্দও আসে না। বাড়িতে কোনো মানুষজন নেই নাকি Ñভাবে নাহিদÑ থাকলে তো অবশ্যই সাড়া পাওয়া যেত। তাহলে কি ঘুমিয়ে পড়েছে? কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়াটাতো স্বাভাবিক নয়। এখন তো মনে হয় সাতটা কিংবা সাড়ে সাতটা বাজে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বাড়িতে কোনো মানুষ নেই। কিন্তু এতো বড় বাড়িতে একটি লোকও থাকবে নাÑ তা হয় না।
হঠাৎ সে দেখতে পায় গেটের বাম পাশের পিলারে একটি সুইচ। এটা যে কলিং বেলের সুইচ তা সে বুঝতে পারে না। অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে বুঝবেই বা কী করে? তবে সুইচটা কেনো এখানেÑ তার মনে কৌতূহল জাগে। কৌতূহল বসত টিপ দেয় সুইচটাতে। বেজে ওঠে কলিং বেল। এক মিনিটও হয়নি তার আগেই বড় গেটটার মধ্যে একটি মিনি গেট নড়ে ওঠে। খুলে যায় মিনি গেটটা। মিনি গেট দিয়ে বের হয়ে আসেন এক মধ্য বয়স্ক মহিলা। মহিলাটি জিজ্ঞেস করেনÑ ‘এই খোকা! কাকে চাও?’
নাহিদ উত্তর দেয়Ñ ‘এই বাড়িতে কি লায়লা রওশন বন্যা নামের কোনো মেয়ে থাকে?’
মহিলাটি বলেনÑ ‘হ্যাঁ, থাকে। আমি ওর আম্মু। কি প্রয়োজন তোমার ওর কাছে? আমাকে বলতে পার। ’
নাহিদ বলেÑ ‘আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই। ’ আন্টি অনুগ্রহ করে ওকে কি ডেকে দেয়া যাবে?
মহিলাটি এবার ভালোভাবে নাহিদের প্রতি তাকান। দেখেন, কিশোরটির পরনে স্কুল ড্রেস। শীতে কাঁপছে থরথর করে। নাহিদ যে শীতে থরথর করে কাঁপছে মহিলাটি এতক্ষণ তা লক্ষ্যই করেননি। মহিলাটি নাহিদকে বলেনÑ ‘এসো বাবা, ভেতরে এসো। আমার সাথে এসো।’ বলে মহিলাটি চলতে থাকেন। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে।
লায়লা রওশন বন্যা তখন পড়তেছিলো তার রিডিং রুমে। এমন সময় তার আম্মু একটি ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করেন তার রিডিং রুমে। বন্যা কিছু বলার আগেই তার আম্মু বলে ওঠেনÑ মামণি! তোমার সাথে এই ছেলেটি দেখা করতে চায়। এর সাথে কথা বলো। আমি আসছি। এ বলে বন্যার আম্মু রুম থেকে বের হয়ে যান।
নাহিদ পলক না পড়া দু’চোখে তাকিয়ে থাকে বন্যার দিকে। একরাশ বিস্ময় তার চোখে মুখে। কী আশ্চার্য! এ মেয়েটা যে আমার বড় আপু নুসরাতের মতোই দেখতে! বড় আপুর চেহারার সাথে হুবহু মিল এই মেয়েটার!
‘এই খোকা কোত্থেকে এসেছো?’ জিজ্ঞেস করে বন্যা। কিন্তু নাহিদ কিছুই বলে না। শুধু বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে থাকে বন্যার দিকে।
বন্যা আবার জিজ্ঞেস করেÑ ‘এই খোকা কোত্থেকে এসেছো তুমি? বাড়ি কোথায় তোমার?’
নাহিদ এবারো বন্যার কথার কোনো উত্তর দেয় না। তবে সে ব্যাগ থেকে একটি পত্রিকা বের করে বলেÑ ‘এই লেখাটা কি আপনার?’
বন্যা পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দেখে বলেÑ ‘হ্যাঁ, এই লেখাটা আমার। কিন্তু…।’ কিন্তুর পর আর বন্যাকে বলতে দেয় না নাহিদ। তার কাছ থেকে কথা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে বলেÑ ‘আপনি কি সত্যিই একটা ছোট ভাই চান?’
নাহিদের কথা শোনে বন্যা কিছুই বলতে পারে না। একরাশ বিস্ময় তার চোখে মুখে। বিস্ময়ের প্রচ- ধাক্কায় কিছুক্ষণ যেন বোবা হয়ে গেছে সে।
নাহিদ আবার বলেÑ ‘আপনাকে কি ‘বড় আপু’ বলার অধিকারটুকু আমাকে দিবেন?’
বন্যা বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নিয়ে নাহিদকে কাছে টেনে নেয়। তার চোখে নেমে আসে নোনাজল। আনন্দের অতিশয্যে কেঁদে ফেলে সে। নাহিদকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে। কপালে ¯েœহের চুম্বন এঁকে দিয়ে বলেÑ ‘হ্যাঁ, ভাইয়া! আজ থেকে তুমি আমার ছোট ভাই, আর আমি তোমার বড় আপু…। ’

লেখক: শিক্ষক, গল্পকার ও প্রবন্ধকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight