গোনাহের পরিণাম রিযিক হতে বঞ্চিত হওয়া : মুফতি তাকি উসমানী

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : যে ব্যক্তি গোনাহ হতে ইস্তেগফার করে এবং আবার সে গোনাহ করতে থাকে অর্থাৎ গোনাহ পরিত্যাগ না করে বরাবর গোনাহ করেই যাচ্ছে, পাশাপাশি ওই গোনাহ থেকে ক্ষমাও চাচ্ছে; এই ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনের সাথে বিদ্রুপকারী।  [শোআবুল ইমান, হাদীস নং- ৭১৭৮]
ইস্তেগফারের সাথে সাথে গোনাহ করা ক্ষতিকর
এটা অত্যন্ত ঘৃণিত ও নিন্দিত কাজ যে, গোনাহ থেকে ইস্তেগফার তথা ক্ষমাও চাচ্ছে আবার পরিত্যাগও করছে না; বরং লাগাতার গোনাহ করেই যাচ্ছে। এ জন্যে আমি বারবার তাগিদ দিয়ে বলেছি, তাওবা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরি হল : মানুষ লজ্জিত হবে, ওই গোনাহ তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করবে এবং ভবিষ্যতে তা পুনরাবৃত্তি না করার কঠিন সঙ্কল্প করবে; তবেই তাওবা পূর্ণতা পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি গোনাহ করে যাচ্ছে, সে অনুতপ্ত হয়নি, আর ওই গোনাহ ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রস্তুতিও নেই; এর পাশাপাশি সে ‘আসতাগফিরুল্লাহও’ বলছে। তো এই ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে উপহাস ও বিদ্রুপ করছে। মোল্লা জামি রহ. তো এই কথাই বলেছেন : ‘হাতে তাসবিহ, মুখে তাওবার শব্দ, কিন্তু অন্তরে গোনাহের ইচ্ছা। তো এ ধরনের ইস্তেগফারের কারণে আমাদের গোনাহও হাসে যে, এটা কেমন ব্যক্তি যে গোনাহ ছাড়েনি, অথচ নিজেকে তাওবা ও ইস্তেগফারকারী মনে করে। ’
এই হাদীসটি সনদের বিচারে দুর্বল হলেও অর্থের দিক দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সহিহ। যে ব্যক্তি বারবার গোনাহ করে সাথে সাথে ইস্তেগফারও করে তো এই তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এ বিষয়ে অন্য আরেকটি হাদীস রয়েছে; যা সনদের বিচারে এর থেকে অনেক মজবুত। তা হচ্ছে-
‘যে ব্যক্তি গোনাহের ওপর ইস্তেগফার করে সে প্রতিনিয়ত গোনাহকারী হিসেবে গণ্য হবে না।’ [তিরমিযি শরিফ, হাদীস নং- ৩৪৮২, আবু দাউদ শরিফ, হাদীস নং-ন ১২৯৩]
নেক বান্দাদের একটি গুণ
এই দুনো হাদীসের সম্পৃক্ততা মূলত কুরআনে কারীমের একটি আয়াতের সাথে। যাতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।’ [আলে ইমরান- ১৩৫]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা স্বীয় নেক বান্দাদের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন : তারা সে সব লোক যারা প্রথমে চেষ্টা করে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্যে। কিন্তু কখনো যদি কোনো লজ্জাজনক কথা বের হয়ে যায় অথবা সে নিজের জানের ওপর জুলুম করেছে, অর্থাৎ কোনো গোনাহ করে ফেলেছে, তাহলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আল্লাহর কাছে স্বীয় গোনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে জানে যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কে গোনাহ ক্ষমা করবে? এজন্য সে আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করে। কোনো ভুল হয়ে গেলে আল্লাহকে স্মরণ করে, গোনাহের ক্ষমা চায় এবং যা করেছে জেনে বোঝে তা বারবার করে না।
এই আয়াতের মধ্যে বলে দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা যেহেতু মানুষকে এভাবে বানিয়েছেন যে,  তার মধ্যে গোনাহের যোগ্যতা ও ক্ষমতা রয়েছে, তাই কখনো না কখনো কোনো ভুল বা অপরাধ মানুষ থেকে হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দা এমন যে, যখন কোনো ভুল বা অপরাধ হয়, তখনি আল্লাহকে স্মরণ করে, তাওবা-ইস্তেগফার করে আর সে কাজ পুনর্বার করে না; বরং তা একেবারে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করে। এটাই কুরআনে কারীমের নির্দেশ। যাতে ‘ইসরার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ পাপী ব্যক্তি ওই পাপের ওপর অবিচল ও অটুট থাকে না যে, তা আমি আবার অবশ্যই করব এবং হঠকারিতা প্রদর্শন করে না।  কটি হাদীসে নবী কারিম সা. বলেন : ‘যে ব্যক্তি গোনাহের ওপর ইস্তেগফার করে সে প্রতিনিয়ত গোনাহকারী হিসেবে গণ্য হবে না।’
তাওবার শর্ত
একাধিকবার গোনাহ করার পরও যদি বান্দা ইস্তেগফার করে তবে সে আর গোনাহের ওপর অবিচল থাকল না।
এটা উপরের হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে। আর প্রথমে আমরা একটি হাদীস পড়েছি, যাতে উল্লেখ হয়েছে : কোনো ব্যক্তি যদি গোনাহ পরিত্যাগ না করে বরং গোনাহের ওপর অবিচল থাকে; এবং সাথে সাথে সে ইস্তেগফারও করে, তাহলে এই ব্যক্তি যেন আল্লাহর সাথে উপহাস করছে। আর পরের হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, ইস্তেগফার করলে গোনাহের ওপর অবিচল মনে করা হবে না। তো বাহ্যদৃষ্টে দুই হাদীসের বক্তব্যের মাঝে স্পষ্ট বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। এই দুই হাদীসের মর্ম বুঝতে হলে তাওবা ও ইস্তেগফারের আসল রূপ জানতে হবে। প্রকৃত তাওবা ও ইস্তেগফার হচ্ছে যাতে নিম্নের তিনটি শর্ত পাওয়া যায় :
১. অতীতের গোনাহের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া, গোনাহের কারণে পেরেশান, চিন্তাগ্রস্ত থাকা এবং গোনাহের অমঙ্গলতা ও ভয়াবহতা তার অন্তরে স্থান পাওয়া। ২. ওই গোনাহ তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করা। ৩. ভবিষ্যতের জন্য পাকাপোক্ত অঙ্গিকার করা যে, দ্বিতীয়বার এই কাজ করব না।
এই তিনটি বিষয় পাওয়া গেলে তাওবা পরিপূর্ণ হবে। আর এর ওপরই আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে, যে ব্যক্তি এমন তাওবা করবে সে নিষ্পাপ হয়ে যাবে। নবী কারিম সা. ইরশাদ করেন : গোনাহ হতে তাওবাকারী ওই ব্যক্তির মতো যার কোনো গোনাহ নেই। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৪২৪] তার গোনাহ আমলনামা হতে মুছে দেওয়া হয়। এটাই আসল ও প্রকৃত তাওবা।
দ্বিতীয় আরেকটি তাওবা; যাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য কিছুটা সুযোগ রেখেছেন। যেমন : একব্যক্তি কোনো অপারগতা ও অক্ষমতার কারণে একটি গোনাহে লিপ্ত; সে ওই গোনাহে লজ্জিত, অনুতপ্ত এবং তা পরিত্যাগ করতে চাচ্ছে, পরিত্যাগ করার চেষ্টায়রত; কিন্তু কোনো কারণে ছাড়তে পারছে না। মনে করুন, একব্যক্তি একটি হারাম চাকরিতে আছে; যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। এখন মনে মনে লজ্জিত যে উপার্জন আমি করছি তা হালাল নয়, হারাম। আর ভেতরে ভেতর খুব অনুতপ্ত, তৎসঙ্গে চেষ্টায় রয়েছে যে, সুযোগ পেলে এটা ছেড়ে হালাল কোনো চাকুরি নিব। কিন্তু সাথে সাথে তা ছাড়তে পারছে না। ছেড়ে দিলে ছেলেমেয়ে উপোস থাকবে; আর অন্য কোনো হালাম উপার্জনও পাওয়া যাচ্ছে না; শত মুসিবতের মধ্যে ঘিরে আছেÑ এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে : ‘যে ব্যক্তি গোনাহের ওপর ইস্তেগফার করে, সে প্রতিনিয়ত গোনাহকারী হিসেবে গণ্য নয়।’
ইস্তেগফারকে জীবনের রক্ষাকবচ বানান
এ অবস্থায় যদি সে ইস্তেগফার করতে থাকে, আল্লাহ তাআলার দরবারে বলতে থাকে, হে আল্লাহ! এই পাপকাজ যা আমি করছি, এই কাজের ওপর আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। এই কাজ আমি ছাড়তেও প্রস্তুত; কিন্তু অপারগতার কারণে ছাড়তে পারছি না, তাই হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ইস্তেগফার করছি, মাফ চাচ্ছি। তো এমন ব্যক্তিদের জন্য নিরাশার পরিবর্তে হুজুর সা. এই সুসংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি এভাবে ইস্তেগফার করতে থাকে, যদিও এখনো তা পরিত্যাগ করে নি, চেষ্টায় আছে; সে গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে নাÑইনশাআল্লাহ। কেননা, সে যা করছে তা নির্ভয়ে ও নির্লজ্জতায় নয়; বরং লজ্জা ও অনুতাপের সাথে করছে; এবং ছাড়ার চেষ্টায়ও আছে। সে যে ইস্তেগফার করছে, এটা অসম্ভব কিছু নয় যে, আল্লাহ তাআলা এই ইস্তেগফারের বদৌলতে তাকে ক্ষমা করে দিবেন।
আর প্রথম হাদীসের মধ্যে যা বলা হয়েছে তা তৃতীয় আরেকটি প্রকার। তা গোনাহে লিপ্ত ওই ব্যক্তি, যে কোনো অপারগতা কিংবা অক্ষমতার কারণে নয়, নিজের ইচ্ছায় গোনাহ করছে; যখন ইচ্ছা তখনি গোনাহ ছাড়তে পারে; তা সত্ত্বেও অন্তরে কোনো লজ্জা নেই, সে অনুতপ্তও না, তা পরিত্যাগ করার কোনো ইচ্ছাও নেই, অথচ বলে : আমি তাওবা করছি আর মুখে মুখে উচ্চারণ করেÑ আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি……. তো এখানেই লজ্জাও নেই, আর গোনাহ ছাড়ার কোনো চেষ্টাও নেই, শুধু মুখে বলে : আস্তাগফিরুল্লাহ।
এই ব্যক্তির ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে, এ কেমন যেন আল্লাহ তাআলার নিদর্শনের সাথে ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করছে; এটা ইস্তেগফার নয়, নিরেট উপহাস। একব্যক্তিকে ধরে আপনি মারপিট শুরু করলেন, চড়-থাপ্পড় দিলেন, আর মুখে বললেন, ভাই মাফ করে দিন। এটা ঠাট্টা নয় তো কী? একজন মানুষের সাথে এমন করলে সে এটাকে নিশ্চিত ঠাট্টা মনে করবে; তাই আল্লাহর নাফরমানিও করা হবে, আর অন্তরে কোনো ভয় নেই, লজ্জা ও অনুতপ্ত হওয়ার কোনো নাম-গন্ধও নেই, এবং তা ত্যাগ করার চেষ্টাও করছে না, অথচ কোনো অপারগতা নেই, তদুপরি সে বলছে : আস্তাগফিরুল্লাহ! তো এটা আল্লাহর সাথে ঠাট্টা ও উপহাসের নামান্তর। আল্লাহ হেফাজত করুনÑ আল্লাহর সাথে ঠাট্টা করা অত্যন্ত কঠিন, মারাত্মক ও সঙ্গিন গোনাহ। আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতে সব মুসলমানকে হেফাজত করুন; আমিন।
সারকথা, এই হাদীস ওই লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; যারা বলে, কখনো গোনাহ ছাড়ার কল্পনাও করি নি, অনুতপ্তও হয় না, বরং উল্টো আত্মম্ভরিতা দেখায়। এ কাজকে জায়েয, বৈধ ও হালাল করার চেষ্টায় থাকে আর শক্তি থাকা সত্ত্বেও গোনাহ ছাড়ে না। সুতরাং এই ব্যক্তি নিয়মিত গোনাহ করার পাশাপাশি ইস্তেগফার করলেও কোনো লাভ হবে না।
অবশ্য যদি তার অন্তরে অনুতপ্ততা থাকে, লজ্জিত হয়, আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, ইস্তেগফার পড়ে দোয়া করে : হে আল্লাহ! আমি গোনাহ ছাড়তে চাই কিন্তু ওমুক অপারগতার কারণে পারছি না, হে আল্লাহ! তুমি আামকে শক্তি দাও, তাওফিক দাও; এই গোনাহের ওপর আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত। এবং সে নিয়মিত ইস্তেগফার করতে থাকে; তাহলে ইনশাআল্লাহÑ আল্লাহর দরবারে তার ইস্তেগফার কবুল হবে। এটাই হচ্ছে দুই হাদীসের মাঝে পার্থক্য।
গোনাহের পরিণতি রিযিক হতে মাহরুমি
হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : অনেক সময় বান্দাকে আল্লাহ তাআলা রিযিক হতে বঞ্চিত করে দেন, ওই গোনাহের কারণে যা সে করেছে। [ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ৮৭]
অর্থাৎ গোনাহের পরিণাম কখনো দুনিয়াতেও প্রকাশ পায়। আর তা হচ্ছে মানুষকে রিযিক হতে মাহরুম বা বঞ্চিত করা হয়। এটা জরুরি নয় যে, সর্বদা এমনটি হবে; বরং কখনো কখনো এমন হয় যে, গোনাহের কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে রিযিক থেকে বঞ্চিত করে দেওয়া হয়। আর গোানহের প্রকৃত ক্ষতি ও আসল সাজা তো আখেরাতে হবে। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : ‘কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আ¯¦াদন করাব, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। [সেজদা- ২১]
অর্থাৎ কখনো কখনো আমি আখেরাতের শাস্তির পূর্বে দুনিয়াতেও আযাবের কিছু নমুনা দেখিয়ে থাকি, যেন তার ভেতর যদি জ্ঞান-বুদ্ধি কিছু থাকে তবে সম্ভবত সে ফিরে আসতে পারে। তাহলে আখেরাতে তাকে আযাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়বে না। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে : ‘তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কী করবেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক! আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্যদানকারী, সর্বজ্ঞ।’ [নিসা- ১৪৭]
অর্থাৎ তোমরা যদি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় কর, আর সঠিক অর্থে মুমিন হও, তো আল্লাহ তোমাদেরকে আযাব দিয়ে কী করবেন? এজন্যে দুনিয়াতে কখনো কখনো আযাবের নমুনা প্রদর্শন করেন, যেন গোনাহগার বান্দারা ফিরে আসতে পারে।
যখন কারো রিযিকে ঘাটতি দেখা দেয়, দুর্ভিক্ষ কিংবা রিযিকে সঙ্কীর্ণতা অনুমিত হয়, তো এ কারণে বুযুর্গরা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের ইস্তেগফার করা উচিৎ এবং আল্লাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে বলবে, হে আল্লাহ! রিযিকের এই সঙ্কীর্ণতা নিশ্চয় আমার কোনো বদআমলির পরিণাম। হে আল্লাহ! স্বীয় রহমতে এই বদআমলকে মাফ করে দিন। সুতরাং কোনো মুসিবত আসলে তাওবা ও ইস্তেগফার করা বাঞ্ছনীয়।
রিযিকের অর্থ ব্যাপক
কিন্তু এখানে স্মরণ রাখা উচিৎ, হুজুর সা. এই শব্দ ব্যবহার করেছেন যে, কখনো কখনো গোনাহের কারণে রিযিক হতে বঞ্চিত করে দেওয়া হয়। ‘রিযিক’ শব্দটি সাধারণত খানাপিনা ও টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং আমরা এর বাহ্যিক মর্ম এটা বুঝব যে, গোনাহের কারণে পয়সার আমদানি হ্রাস পাবে। কিন্তু আরবি ভাষায় রিযিকের মর্ম কেবল খানাপিনার বস্তুর সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। আরবিতে রিযিক বলা হয় ‘প্রদান করা বা দেওয়া’। একব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে যে কোনো জিনিস দিলে তাকে ‘রিযিক’ বলা হয়। আর যখন আল্লাহ তাআলার দিকে রিযিকের সম্পর্ক করা হয়, তখন তাতে সকল প্রকার দান-অনুদান এসে যায়; কেবল টাকা-পয়সা ও খানাপিনার বস্তু রিযিক নয় বরং কারো কাছে কোনো জ্ঞান থাকলে এটাও আল্লাহর রিযিক। কারো কোনো নৈপুণ্য বা গুণ এটাও আল্লাহর রিযিক। কেউ সুস্থতার অধিকারী, তাও আল্লাহর রিযিক। কেউ আনন্দে আছে, এটাও আল্লাহর রিযিক।
মানবীয় সকল পূর্ণতা ও উৎকর্ষই রিযিক
রিযিক শুধু খানাপিনা এবং টাকা-পয়সার সাথে নির্দিষ্ট নয়। মানুষের মাঝে যত রকমের পূর্ণতা পাওয়া যায়, তা সবই আল্লাহর দান ও রিযিক। কোনো ব্যক্তি মেধাবী, তো তার এ মেধাও আল্লাহর দান, সুতরাং তাও আল্লাহর রিযিক। তার আকল বা জ্ঞান-বুদ্ধি রয়েছে, এটাও আল্লাহর দান, সুতরাং আকলও আল্লাহর রিযিক। তো যখন বলা হল, গোনাহের কারণে অনেক সময় রিযিক হতে বঞ্চিত করে দেওয়া হয়Ñ এর দ্বারা কেবল খানাপিনা ও টাকা-পয়সার বিষয় নয়; বরং প্রত্যেক প্রকার রিযিক অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলা কখনো এমন করেন যে, গোনাহের কারণে খানাপিনাতে কমতি করেন না, খানাপিনাতে ডুবে থাকে, অনেক খায় ও পান করে, আয়-রোজগার আগের থেকেও বাড়ছে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা অন্য কোনো জিনিস তাকে দিয়েছিলেন, তা উঠিয়ে নেন, ছিনিয়ে নেন। সুস্থতা নিয়ে অসুস্থতা দেন। অবকাশ ও চিন্তামুক্ততা হরণ করেন, তাই দুশ্চিন্তা ও পেরেশানিতে নিক্ষিপ্ত হয়। ইলম দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন ছিনিয়ে নিলেন। নৈপুণ্য দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন ছিনিয়ে নিলেন। জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছিলেন, তাও ছিনিয়ে নিলেন। সুতরাং দুনিয়াতে গোনাহের সাজা ও শাস্তি এ ধরনের বিভিন্ন আকৃতি ও রূপ ধারণ করে প্রকাশ পায়।
অতএব, আখেরাতে গোনাহের যে শাস্তি পাওয়া যাবে, তা তো স্বীয় স্থানে বিরাট ক্ষতিকর বিষয়; আর দুনিয়াতে যে শাস্তি দেখা যায়, তা আল্লাহ তাআলা গোনাহের কারণে তাকে প্রদত্ত নেয়ামত ও দৌলত ছিনিয়ে নেন। টাকা-পয়সার কোনো কমতি নেই, বিশাল বিশাল বাড়ি আছে, ফ্যাক্টরি চলছে, দামি গাড়ি আছে, ব্যাংক-ব্যালেন্স আছে, সবই আছে কিন্তু সুস্থতা নেই। এই সুস্থতা না থাকার কারণে এই সব বস্তু অনর্থক ও মূল্যহীন, এগুলো দ্বারা কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারছে না; সবকিছু থেকে বরকত উঠে গেছে। এটা গোনাহের ক্ষতি।
জ্ঞান, নৈপুণ্য ও রিযিক
অনেক সময় এমন হয় যে, জ্ঞান ও নৈপুণ্য কিংবা কোনো পারদর্শিতা দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এসব চলে গেছে, আর কিছু বাকি নেই। আর কখনো এমন হয় যে, গোনাহের ফলে বুঝশক্তি উল্টে যায়, আল্লাহ তাআলা বুঝশক্তি ও আকল ছিনিয়ে নেন। আমি তোমাকে আকল দিয়েছিলাম, ভালো-মন্দের পরিচয় লাভ করে ভালোকে গ্রহণ করা আর মন্দকে ছাড়ার জন্যে। কিন্তু তুমি তোমার আকলকে সঠিকভাবে ব্যহার করো নি, মন্দ ও খারাপ কাজে ব্যহার করেছ; তাই এখন আমি তোমার ভালো-মন্দের পার্থক্য-ক্ষমতা ছিনিয়ে নিচ্ছি। এর পরিণামে খারাপ কাজও ভালো লাগতে শুরু করে, আর মানুষ গোনাহের পর গোনাহ করতেই থাকে। এটাকে কুরআনে কারীমে এভাবে চিত্রিত করা হয়েছে : কখনও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। [মুতাফফিফিন : ১৪]
তার অন্তরে আল্লাহ তাআলা মরিচা লাগিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলমানকে হেফাজত করুন। মরিচা লাগিয়ে দেওয়ার কারণে অন্তরে ভালো কথাই আসে না। মন্দের কল্পনা চিন্তাশক্তি থেকে মুছে যায়। বুঝ উল্টে যায়। ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো মনে করে। এখন দেখুন, আপনি পরীক্ষা করে দেখুন, পূর্বকালে যখন আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে মানুষের মাঝে দীনদারির প্রাধান্য ছিল, তখন গোনাহকে কী পরিমাণ খারাপ মনে করা হত! কোনো সুদখোর থাকলে পুরো সমাজ বলত, ভাই এ লোক তো সুদ খায়!, কেউ গানবাদ্যের কাজ করলে সারা দুনিয়ায় খবর হয়ে যেত এই লোক গায়ক। আর এখন এসব শিল্প হয়ে গেছে! এখন সে ব্যক্তি শিল্পী ও তারকা, শিক্ষিত এবং বড় ভাগ্যবান। মানুষ আকাক্সক্ষা করে যেন সুদের আয়-রোজগার হয়; কেননা তাতে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। সুতরাং গোনাহকে গোনাহ মনে করার অনুভূতি ও ধারণাও মুছে যায়। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষের গোনাহের কারণে আকল ছিনিয়ে নিয়েছেন, বুঝ উল্টো হয়ে গেছে। সুতরাং গোনাহের একটি পরিণাম ও পরিণতি এটাও।
গোনাহের কারণে অন্তরে মরিচা পড়ে
এই পরিণাম ও প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচার রাস্তাও এটা যে, মানুষ গোনাহ হতে তাওবা করবে এবং ইস্তেগফার করবে। যখন তাওবা করবে, ইস্তেগফার পড়বে, তখন ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তার বুঝশক্তি ফিরিয়ে দিবেন। একটি হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন : ‘যখন মানুষ ইমান আনে কিংবা মুমিন ছিল বালেগ হয়েছে, তখন তার অন্তর আয়নার মতো পরিষ্কার থাকে। যাতে কোনো নাপাকি নেই, কোনো দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকে না; সে যখন প্রথমবার গোনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। গোনাহের পর সে যদি তাওবা করে, ইস্তেগফার পড়ে, অনুতপ্ততার কথা প্রকাশ করে, তো সে কালো দাগ মুছে যায়। কিন্তু গোনাহের পর যদি তাওবা করে নি, আরেকটি গোনাহ করে, তো তার অন্তরে আরেকটি কালো দাগ পড়ে। আবার গোনাহ করলে তৃতীয় দাগ পড়ে। এভাবে সে গোনাহ করতে থাকলে কালো দাগও বাড়তে থাকে এবং পুরো অন্তরকে বেষ্টন করে ফেলে। বেষ্টনের পর তা মরিচার রূপ ধারণ করে। এর ফলে তার অন্তরে গোনাহকে গোনাহ মনে করার অনুভূতি শেষ হয়ে যায়।’ [মুসলিম- ৩২৫৭]
আপনাকে এখন কী বলব? কেমন লোকদের সন্মুখীন হতে হয়। আজকের এ সমাজেও যেসব জিনিস মুসলমানরা অত্যন্ত খারাপ ও কলঙ্কজনক মনে করে, এমন খারাপ কাজের ব্যাপারে আমার নিজ কানে অনেককে বলতে শুনেছি, এটাতো গর্বের বিষয়। তারা গোনাহের বিষয়ে আমাদের সামনে গর্ব করে যে, আমরা এমন করেছি! এটাই  ‘রানা’ যাকে কুরআনে কারিম ‘রানা’ বলে ব্যক্ত করেছে যে, দাগ বাড়তে বাড়তে পুরো অন্তরকে কালো করে দিয়েছে এবং মরিচার আকৃতি ধারণ করেছে।
সুতরাং বারবার বলি, ভুল কার থেকে প্রকাশ পায় না? কিন্তু যখন কোনো ভুল হয়ে যায়, তো তৎক্ষণাৎ আল্লাহর তরবারে তাওবা কর, ইস্তেগফার পড়, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর। গোনাহের কারণে আল্লাহ তাআলা কখনো দুনিয়াতেও রিযিক হতে বঞ্চিত করেন। এই রিযিক বাহ্যিকও হতে পারে, আবার অভ্যন্তরীণও হতে পারে। এখন আমি যা বললাম, এটা অভ্যন্তরীণ রিযিক।
নেক কাজের আগ্রহও রিযিক : সুফিয়ায়ে কেরাম আরেকটি মর্ম বর্ণনা করেন যে, যখন কারো ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আগ্রহ পয়দা হয়, আকাক্সক্ষা দেখা দেয় যে, আমি নেক কাজ করব, ইবাদত করবÑ এটাও আল্লাহর দান এবং তাঁর রিযিক। অনেক সময় গোনাহের কারণে এই দানও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নেক কাজের আগ্রহ থাকে না, ভালো কাজের প্রতি টান সৃষ্টি হয় না, সৎকাজের আকাক্সক্ষা হয় না। এবং এই গোনাহের পরে ওই নেক কাজ করা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, যা সে আগে করত। এটাও গোনাহের একটি পরণতি।
সুফিয়ায়ে কেরামের দু অবস্থা : বসত ও কবজ : আপনি হয়ত শুনে থাকবেন যে, সুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, মানুষের দু’টি অবস্থা হয় : একটাকে ‘বসত’ আরেকটিকে ‘কবজ’ বলে। ‘বসত’ এর অর্থ, মেজাজ ও অভ্যাসে একধরনের আকাক্সক্ষা, প্রফুল্লতা ও উত্তেজনা। আর ‘কবজ’ এর অর্থ, অন্তর সঙ্কীর্ণ হওয়া, আর সঙ্কীর্ণ হওয়ার কারণে নেক কাজ করতে পারে না। এটাও আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হয়। তো কবজের হালত দেখা দিলে মেজাজে অলসতা পয়দা হয়, উৎফুল্লতা দেখা দেয় না, দেহে বল পাওয়া যায় নাÑ এ অবস্থাও গোনাহের কারণেই হয়ে থাকে। সুতরাং যখন কোনো নেক কাজ করতে গেলে অলসতা দেখা দেয় তখন প্রথমেই ইস্তেগফার পড়- আস্তাগফিরুল্লাহা…..। হে আল্লাহ! আামকে মাফ করে দিন। আমার এই অলসতা অবশ্যই আমার কোনো গোনাহের পরিণাম। হে আল্লাহ ওই গোনাহ ক্ষমা করে দিন; যেন আমার এই অলসতা দূর হয়ে যায়।
অনেক লোক দেখে যে, মেজাজে অলসতা দেখা দিচ্ছে, বিভিন্ন নেক কাজের প্রতি মেজাজ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। এরূপ হলে তৎক্ষণাৎ বল আস্তাগফিরুল্লাহি…। হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন। আমার এই অলসতা আমার কোনো পাপের ফসল। তাহলে কবজের এই হালত বসতের হালতে রূপান্তরিত হতে পারে, যদি কোনো মানুষ তাওবা ও ইস্তেগফারের আমল করে। এজন্যেই সুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, কবজের হালতে খুব বেশি ইস্তেগফার পড়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া বাঞ্ছনীয়।
ইস্তেগফার রিযিকের দরজা খুলে
আমি একটি কিতাবে পড়েছি, যেসব ওলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিস এবং ফুকাহাদের সামনে কোনো মাসআলা আসল, আর সে মাসআলা অত্যন্ত কঠিন, সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না, মেজাজে একধরনের খিটখিটে ভাব এসে গেছে, কিছুই বোঝে আসছে না যে, এর সমাধান কী হবে? উত্তর কী? এমন স্থানেই বুযুর্গরা বলেন, প্রথম কাজ ইস্তেগফার পড়, আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জানবিও ওয়া আতুবু ইলাইহ। ইস্তেগফার করবে কেন? একারণে যে, যে কথা বোঝে আসছে না তার কারণ হল, আল্লাহ তাআলা যে বুঝশক্তি দিয়েছিলেন, তা ছিনিয়ে নিয়েছেন। অবশ্যই কোনো বদআমলির কারণে ছিনিয়ে নিচ্ছেন। কোনো গোনাহের কারণে ছিনিয়ে নিচ্ছেন। প্রথমে ইস্তেগফার করে নাও, তারপর ইনশাআল্লাহ বন্ধন খুলে যাবে। এটা কেবল দীনি ইলমের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য ইলম এবং ময়দানেও হতে পারে। যেমন : একব্যক্তি ডাক্তার। তার কাছে এক রোগী আসল। ডাক্তার বুঝতে পারছে না যে, তার কী চিকিৎসা করবে? তার রোগটা কী? চিন্তা করছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না বিষয়টি কী? সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। এই স্থানেও যদি ইস্তেগফার করে আস্তাগফিরুল্লাহা…। হে আল্লাহ! আমি গোনাহ হতে ক্ষমা চাচ্ছি। কেননা, আমার এই বন্ধন ও না পারা, আমার কোনো গোনাহের কারণেই। ইস্তেগফার করলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তাআলা বন্ধন খুলে দিবেন।
তাছাড়া দুনিয়ার যে কোনো বিষয়ে বাধার সন্মুখীন হলে, বন্ধন লেগে গেলে, সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যে, কী করবে? সন্দেহ ও দ্বন্দ্বের মধ্যে নিপতিত। তো এই অবস্থায় আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার পড় আস্তাগফিরুল্লাহা…। হে আল্লাহ! এই বন্ধন আমার কোনো বদআমলির ফল। এ কারণে ইস্তেগফার করছি, ক্ষমা চাচ্ছি। অসম্ভব কিছু নয় যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতে বন্ধন খুলে দিবেন।

অনুবাদক : মুফতি মুহিউদ্দিন কাসেমী,

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ গোনাহের পরিণাম রিযিক হতে বঞ্চিত হওয়া : মুফতি তাকি উসমানী

  1. Md. Al Amin says:

    আলহামদুলিল্লাহ্ খুব সুন্দর একটি প্রবন্ধ । জাযাকাল্লাহু খাইরান ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight