গুনাহের ইহকালীন শাস্তি : মাওলানা মাকসুদুর রহমান

আমরা আল্লাহ তাআলার বান্দা। আল্লাহ তাআলা আমাদের মাবূদ। তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা রিযিকদাতা। তার অসংখ্য অগণিত নেয়ামত আমরা প্রতিমূহুর্তে ভোগ করছি। তাই বান্দা হিসেবে আমাদের একান্ত কর্তব্য হল, সদা তার হুকুমমত চলা এবং তার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তাআলা তার অনুগত্যের উপর আমাদের জন্য পুরুষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, আর অবাধ্যতা ও নাফরামনীর উপর দিয়েছেন বহু ইহকালীন ও পরকালীন শাস্তির হুমকি। গুনাহগারদের আসল শাস্তি তো আল্লাহ তাআলা আখেরাতেই জাহান্নামে প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- যারা কিয়ামতের দিন আমার সাক্ষাতের আশা করেনা বরং তারা পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট এবং তাতেই পরিতুষ্ট এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে উদাসীন, কেয়ামতের দিন তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। তাদের অতীত জীবনের কৃতকর্মের কারনে। [সূরা ইউনুস ৭-৮] কিন্তু গুনাহের কিছু কিছু শাস্তি আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন, বান্দাদের সতর্কতার জন্য যাতে তারা সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সৎপথে ফিরে আসে। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন- কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই  তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন তারা ফিরে আসে। লঘু শাস্তি দ্বারা উদ্দেশ্য দুনিয়ার শাস্তি, যা বিভিন্ন বিপদাপদ ও বালা মুসীবত রুপে মানুষের উপর অর্পিত হয়। তবে আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও করুণার বহিঃপ্রকাশ হল তিনি খুব কম গুনাহের উপরই বান্দাকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। অধিকাংশ গুনাহই তিনি  নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- তোমাদে উপর যে কোন বিপদ আসে তা তোমাদেরই হাতের কামাই। আর অনেকগুনাহ তিনি এমনিতেই ক্ষমা করে দেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন- যদি আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাদের যাবতীয় কর্মের উপর পাকড়াও করতেন তবে দুনিয়ার বুকে কোন প্রাণী তিনি  অবশিষ্ট রাখতেন না। কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সুযোগ দেন। সুতরাং গুনাহের কারনে মানুষের উপর যে সকল বিপদাপদ ও অশান্তি বিশৃঙ্খলা নেমে আসে, তার কিঞ্চিত বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো। আল্লাহ তাআলা সূরা শুরার ত্রিশ নং আয়াতে বলেন- তোমাদের উপর যে কোন বিপদ নেমে আসে তা তোমাদেরই হাতের কামাই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ঐ সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ। কারো গায়ে যখন কোন লাকড়ির আচড়  লাগে, কিংবা রগে যন্ত্রণা হয় বা পাথরে আঘাত লাগে, কিংবা পা পিছলে পড়ে যায়, সেটা তার গুনাহের কারণেই হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা যেগুলো ক্ষমা করেন তা আরো বেশি। [ইবনে কাছীর ৪/১৭৬] অর্থাৎ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র সকল বিপদাপদই মানুষের পাপের প্রতিদান রুপে আসে। আজ পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সবখানে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। দেশে দেশে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র, মারামারি ও হানাহানির সয়লাব। এ সবেরই কারণ মানুষের পাপাচার ও ঔদ্ধতা। আল্লাহ তাআলা সূরা রুমে ইরশাদ করেন- জলে স্থলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মানুষের পাপাচারের কারণে। মুফাসসিরীনে কেরাম এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, বিপর্যয় মানে অনাবৃষ্টি, খরা, মারামারি, হানাহানি, খাবারের বরকত চলে যাওয়া, রাষ্ট্রিয় জুলুমের শিকার হওয়া ইত্যাদি। কোন কোন আলেম বলেছেন, যে ব্যক্তি জুলুম করে সে সারা দুনিয়ার মানুষ জীবজন্তু ও পশু পাখির উপর জুলুম করে। কেননা, তার গুনাহের কারণে যখন অনাবৃষ্টি, খরা ইত্যাদি অন্যান্ন বিপদাপদ দেখা দেয় তখন দুনিয়ার সকল প্রাণীই কষ্ট পায়। তাই কেয়ামতের দিন এরা সবাই ঐ গুনাহের বিরুদ্ধে নালিশ করবে। [মাআরিফুল কুরআন]
বিশেষ করে বড় বড় কবীরা গুনাহ, যেমন হত্যা, ব্যভিচার, মদ্যপান, বেহায়াপনা, নামায না পড়া, যাকাত  না দেওয়া, ওযনে কম দেওয়া ইত্যাদী গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতে খুব ভয়াবহ রুপে প্রকাশ পায়। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, পাঁচ গুনাহের বিনিময় পাঁচ শাস্তি: ১.যে সম্প্রদায় ওয়াদা ভঙ্গ করে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর তাদের দুশমনকে চাপিয়ে দেন। ২.যে সম্প্রদায় আল্লাহর বিধান ছেড়ে ভিন্ন বিধানে ফায়সালা করে, তাদের মাঝে দারিদ্র বেড়ে যায়। ৩.যে জাতির মাঝে নির্লজ্জতা বেড়ে যায়, তাদের মাঝে ঘনঘন মহামারি দেখা দেয়। ৪.যারা ওযনে কম দেয় তাদের ফসল উৎপন্ন বন্ধ হয়ে যায়। ও তারা দূর্ভিক্ষের শিকার হয়। ৫. যারা যাকাত দেওয়া বন্ধ করে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বৃষ্টি দেওয়া বন্ধ করে দেন। [কুরতুবী ২২/১৩৩] আরেক হাদীসে হযরত ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন, যে সম্প্রদায়ের মাঝে সুদের প্রচলন বৃদ্ধি পায় তারা দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়। [মুসনাদে আহমদ-৩৭৫৪] হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যখন কোন নারী স্বামীর ঘর ব্যতীত অন্য কোথাও বস্রহীন হয়, তখন সে তার ও আল্লাহ তাআলার মাঝে অবস্থিত পর্দাকে ছিন্ন করে ফেলে। যখন কোন নারী স্বামীর মনোরঞ্জন ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সুগন্ধি ব্যবহার করে,  তবে তার জন্য আখেরাতের আগুন ও লাঞ্ছনা প্রস্তুত হতে থাকে। যখন মানুষ যিনাকে বৈধ মনে করে, মদপান করে ও গানবাদ্য শোনে, তা আসমানে আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। তখন আল্লাহ যমীনকে আদেশ করেন, এদেরকে সহ কাঁপতে থাক, তখন যমীন কাঁপতে থাকে। যদি তারা তাওবা করে ও নিবৃত হয় তাহলে তো ভাল, অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তাদের উপর যমীনকে ধ্বসিয়ে দেন। [মুসতাদরাকে হাকিম ৪/৮৫৭৫] হযরত আয়েশা রা. আরেক হাদীসে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, একসময় আমার কতিপয় উম্মতকে ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে, উল্টিয়ে দেওয়া হবে ও বিকৃত করে দেওয়া হবে। জিজ্ঞেস করা হল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা অবস্থায়ও? রাসূল সা. বলেন, যখন গান বাদ্যের ছড়াছড়ি ঘটবে, যিনা বৃদ্ধি পাবে, মদপান  করা হবে ও রেশমের কাপড় পরা হবে তখনই এগুলো ঘটবে। [আদদুররুল মানসুর ২/৩২৮]
এরকম আরো বহু হাদীস  রয়েছে যেগুলোর মধ্যে কোন পাপের উপর কোন আযাব আসে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। অতএব প্রথমত আল্লাহকে ভয় করা, অতঃপর পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে মানবজাতির উচিৎ যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বিরত থাকা এবং নিজেদের কৃতকর্ম দ্বারা নিজেদের উপরই গযব টেনে না আনা। তাছাড়া এগুলোতো হলো দুনিয়াবী কিছু বিপদাপদ ও ক্ষয়ক্ষতি। এগুলোর চেয়ে বড় ক্ষতি যেটা সেটা হল, গুনাহ করতে করতে একসময় মানুষের অন্তর পাথর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাতে মোহর এটে দেন। ফলে তার থেকে যাবতীয় নেক কাজের যোগ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সে কল্যাণের পথ থেকে চির বঞ্চিত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা সূরা আরাফের ১০০ নং আয়াতে ইরশাদ করেন- যারা কোন ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের পর তার উত্তারাধীকারী হয় তারা কি এ শিক্ষা লাভ করেনি যে, আমি চাইলে তাদেরকেও তাদের গুনাহের কারণে মুসীবতে ফেলতে পারি। আর আমি তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিব, ফলে তারা আর শোনতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সা. এক হাদীসে ইরশাদ করেন, বান্দা যখন কোন গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ  পড়ে, অতঃপর যদি সে তওবা করে বিরত হয় তাহলে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সে যদি গুনাহ করতে থাকে তবে তার অন্তরের কালিমা বাড়তে থাকে, একসময় পুরো অন্তর কালো হয়ে যায়, আর এই জং পরার কথাই আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বলেছেন- কখনও নয়, তাদের কৃতকর্মই তাদের হৃদয়ে জং ধরিয়েছে। অর্থাৎ গুনাহ করতে করতে মানুষের অন্তরে জং ধরে যায়। এভাবে একসময় সে ভালো কাজের তাওফিক পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। ফলে তার আর তাওবা করার সুযোগও বাকী থাকেনা। হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, গুনাহ যেমনিভাবে মানুষের শারীরিক কষ্ট ও শাস্তির কারণ হয় তেমনিভাবে গুনাহ আত্মিক রোগব্যধিরও কারণ হয়। কারো থেকে একটি গুনাহ সংগঠিত হলে সেটি আরেকটি গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়।  হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, গুনাহের একটি নগদ শাস্তি হল, এর দ্বারা সে আরেকটি গুনাহের শিকার হয়। এমনিভাবে নেক কাজের একটি নগদ পুরুষ্কার হল, এক নেককাজ আরেক নেক কাজের দিকে টেনে নেয়। [মাআরিফুল কুরআন ৭/৭০১] অতএব আমাদের অত্যাবশ্যকীয় করণীয় হচ্ছে, আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বিগত সকল পাপ কাজের জন্য খালেছ নিয়তে তাওবা করা এবং ভবিষ্যতেও যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। তবেই সুন্দর হবে সমাজ, সুন্দর হবে রাষ্ট্র, আমরা মুক্তি পাব দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ বিপদাপদ থেকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।
লেখক: কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক, শিক্ষার্থী- ইফতা ১ম বর্ষ, মারকাযুদ্দাওয়া

2 মন্তব্য রয়েছেঃ গুনাহের ইহকালীন শাস্তি : মাওলানা মাকসুদুর রহমান

  1. রবিউল says:

    খুব সুন্দর লেখা। গোনাহ যদি এতই ক্ষতির কারণ তাহলে আল্লাহ আমাকে সমস্ত গোনাহ থেকে হেফাজত কর।

  2. খুবই উপকারী লেখা। প্রত্যেটি মুসলমানের এ সমস্ত গোনাহ থেকে বেচে থাকা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight