খেলাধুলা : ইসলামী দৃষ্টিকোণ : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

বিশ্ব এখন বিশ্বকাপ জ্বরে প্রবলভাবে আক্রান্ত। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়; বরং একটু বেশিই আক্রান্ত মনে হয়। ভিনদেশী পতাকা আর জার্সি বিক্রির ধুম পুরো দেশে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে, খেত-খামারে, পুকুরে, খালে-বিলে সর্বত্রই শুধু ভিনদেশী পতাকা আর পতাকা। কে কার চেয়ে বড় পতাকা বানাতে পারে এ নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা। এ পর্যন্ত (১৭ জুন ২০১৮) প্রিয় দলের পতাকা টানাতে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছে ৩ জন। [প্রথম আলো, ১৭ জুন ২০১৮]
এভাবে প্রায় প্রতিবারেই কিছু মানুষের প্রাণ ঝরে যায় বিশ^কাপ উন্মাদনায়। চায়ের টেবিল, পড়ার টেবিল, খাওয়ার টেবিল, চাকরির টেবিল, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের আড্ডা সর্বত্রই বিশ^কাপ ঝড়। তর্ক-বিতর্ক। জানবাহন, হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট, শহর-গ্রাম সর্বত্রই কেবল বিশ^কাপ পাগলামী আর আবেগ। বিশ^কাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ যেন দুই শিবিরে বিভক্ত। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে যুক্তি, পরিসংখ্যান, দুর্বলতা ইত্যাদি দিয়ে ঘায়েল করার কসরত করছে অবিরাম। এই উন্মাদনা, পাগলামী, আর আবেগের আগে আমাদের ভাবা উচিত ছিল আমি একজন মুসলিম। তাই আমার ইসলাম এ ব্যাপারে কি বলে? আমি একজন মুমিন। তাই এই উন্মাদানা, পাগলামী আর আবেগের ব্যাপারে আমার ঈমান কি বলে? ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম। তাই মানুষের ফিতরাত তথা স্বভাবজাত চাহিদাকে ইসলাম স্বীকার করেছে অকপটে। মুল্যায়ন করেছে যথাযথভাবে। তবে সেই স্বভাবজাত চাহিদার পাগলা ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়নি; বরং এর লাগাম টেনে ধরে দিয়েছে সীমারেখা। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তার চৌহদ্দি। তো মানবের স্বভাবজাত চাহিদাগুলোর অন্যতম হলো খেলাধুলা। এই খেলাধুলাকে ইসলাম নিষেধ করে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষ উৎসাহ দিয়েছে সমধিক। সাহাবী হযরত সালমা ইবনে আকওয়া রা. বলেন, একজন আনসারী সাহাবী দৌড়ে খুবই পারদর্শী ছিলেন। দৌড় প্রতিাযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। একদা তিনি ঘোষণা করলেন, আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে কেউ প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এ ব্যাপারে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। এ প্রতিযোগিতায় আমি জয়ী হলাম। [সহীহ মুসলিম সূত্রে মাআরিফুল কুরআন : ৭/৮]
অন্য বর্ণনায় আছে, আবু জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে রোকানা তার পিতা প্রখ্যাত কুস্তিগীর রোকানা থেকে বর্ণনা করেন, একদা রোকানা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কুস্তি খেলায় অবতীর্ণ হলে তিনি রোকানাকে পরাভূত করেন। [আবু দাউদ : হাদীস নং ৪০৭৮; মাআরিফুল কুরআন : ৭/৮]
এক বর্ণনায় এসেছে, একদা কিছু হাবশী যুবক মদীনা মুনাওয়ারায় সামরিক কলাকৌশল অনুশীলন কল্পে বর্শা ইত্যাদি দিয়ে খেলা করতে ছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আম্মাজান আয়েশা রা. কে নিজের পিছনে দাঁড় করিয়ে তাদের এ খেলা উপভোগ করাচ্ছিলেন আর তাদেরকে উৎসাহ দিয়ে বলতেছিলেন, তোমরা খেলাধুলা আব্যাহত রাখ। [বায়হাকী; কানজুল উম্মাল সূত্রে মাআরিফুল কুরআন : ৭/৮]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি এটা পছন্দ করি না যে, তোমাদের ধর্মে শুষ্কতা ও কঠোরতা পরিলক্ষিত হোক। [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৮]
এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা মাঝে মধ্যে (বিনোদন, খেলাধুল কিংবা অন্য কোন বৈধ উপায়ে) হৃদয়কে বিশ্রাম ও আরাম দিবে। [আবু দাউদ সূত্রে মাআরিফুল কুরআন : ৭/৮]
সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাসের বাচনিক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মুমিনের শ্রেষ্ট ও কল্যাণকর খেলা সাতার কাঁটা আর নারীর শ্রেষ্ট ও উপকারী খেলা সুতা কাঁটা। [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৭]
বর্ণিত হাদীসগুলোর আলোকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলা শুধু জায়িযই নয়; ক্ষেত্র বিশেষ তা প্রশংসিত ও পছন্দনীয় বটে। তবে এর সীমা রেখা ও চৌহদ্দি অতিক্রম করা যাবে না এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। কারণ প্রত্যেক বিষয়েরই একটি সীমারেখা আছে। যা লঙ্গিত হলে সাধারণ মুবাহ ও বৈধ কাজ তো অনেক পরের কথা; নেক আমল ও মুস্তাহাব কাজও জায়িয থাকে না; বরং তা হয়ে যায় আপত্তি ও প্রতিবাদের উপযুক্ত। হাল যামানায় এই খেলাধুলার অবস্থা এই যে, এখন তা আর ¯্রফে খেলাধুলা নয়; বরং তা জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে; এমনকি জীবনের অনেক প্রয়োজন ও বাস্তব সমস্যার চেয়েও তা বহু গুণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেন গোটা জাতির এটিই এখন একমাত্র কাজ। ফলে গোটা জাতি ও দেশ খেলাধুলার উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে পড়েছে। অথচ এই সর্বগ্রাসী মত্ততা ও উন্মাদনা যে ব্যক্তিগত, জাতীয় ও পরকালীন জীবনের জন্য কি পরিমাণ ক্ষতিকর তা কেউ তলিয়ে দেখে না। নি¤েœ সেই ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ। ১. যখন বিশেষ কোনো খেলা বিশেষত ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ^কাপের আয়োজন হয়, তখন গোটা জাতি ও দেশ এর উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে আল্লাহ-রাসূল, নামায-রোযা, ইবাদত-বন্দেগী ও পরকালকে বেমালুম ভুলে যায়। হয়ে উঠে আল্লাহ ও পরকাল বিমুখ। অথচ খেলাধুলায় এভাবে মত্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এ ব্যাপারে রয়েছে বিশেষ সতর্কবাণী ও কঠিন শাস্তির ঘোষণা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘এক শ্রেণীর মানুষ এমন রয়েছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে ‘লাহওয়াল হাদীস’ তথা অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে করে ঠাট্টা বিদ্রুপ। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ [সূরা লুকমান : আয়াত ৬]
অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তাফসীরবিদগণ এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, অনর্থক গল্প, উপন্যাস ও কিস্যা-কাহিনীসহ যে সকল বিষয় মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে সবই ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর অন্তর্ভুক্ত। [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৪]
২. সময় মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সময়ের গুরুত্ব কারো অজানা নয়। কারো দি¦মতও নেই এ ব্যাপারে। কেবল মাত্র ইসলামই নয়, পৃথিবীর সকল ধর্ম, মতবাদ ও ইজমাই সময়ের গুরুত্ব দিয়েছে যারপর নাই এবং উপদেশ দিয়েছে সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর। এ কথা সবাই জানে ও বুঝে যে, যে মুহূর্তটি চলে গেল তা আর ফিরে আসবে না। এ কথাও সবাই বুঝে যে, সময়ের অপচয় মানে জীবনেরই অপচয়। আর কোনো বিবেকবান মানুষ কি জীবনের অপচয় করতে পারে? অন্তত একজন মুমিন তা পারে না। কারণ সে মনে-প্রাণে বিশ^াস করে যে, জীবনের মহামূল্যবান সম্পদ সময়ের হিসাব তাকে দিতে হবে। এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহর দরবারে। অথচ নির্মম ও নিদারুণ বাস্তবতা হলো, খেলাধুলার এই উৎসব উপলক্ষ্যে আমরা নির্দয়ভাবে আমাদের মহামূল্যবান সময় ধ্বংশ করে চলছি। এই অমূল্য সম্পদ ধ্বংসের মহোৎসব শুরু হয় বিশ^কাপ শুরুর অনেক আগে থেকেই। চলতে থাকে বিশ^কাপ শেষ হওয়ার পর পর্যন্ত। খেলা দেখার টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঙ্গালী হুজুগ ও উন্মাদনার যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তার কোনো নজীর সমকালীন বিশে^ পাওয়া দুরহ ব্যাপার। হাড় কাঁপা তীব্র শীতের মাঝে টানা ৭২ ঘন্টা খোলা আকাশের নিচে দাড়িয়ে থেকে টিকিট সংগ্রহ করেছে অনেকে। কোনো কোনো পত্রিকা তার সম্পাদকীয় ভাষ্যে এ হুজুগ ও উন্মাদনায় গরম বাতাস দিয়ে বলেছে, টিকিট সংগ্রহ নিয়ে এ রকম পাগলামী আর উন্মাদনা অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না। বাঙ্গালীর আবেগ বলে কথা। (পাক্ষিক ক্রীড়া জগত, ৩৪ বর্ষ, সংখ্যা ১৪; মাসিক কিশোর কণ্ঠ, জানুয়ারী ২০০৭ ঈসায়ী) এক কথায় বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে অসংখ্য মানুষের বিপুল পরমাণ সময় ধ্বংসের এক মহা আয়োজন হয়। অথচ সময়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুটি নিআমত এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার। একটি হলো সুস্থতা, অপরটি হলো অবসরতা।’ [বুখারী : হাদীস নং ৬৪১২; তিরমিযী : হাদীস নং ২৩০৪, শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৯৭৬৮]
অপর একটি বর্ণনায় আছে, সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে নছীহত করছিলেন এই বলে, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে গনিমত মনে কর। ১. বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে। ২. অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। ৩. দারিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে। ৪. কর্ম ব্যস্থতার পূর্বে অবসর সময়কে। ৫. আর মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।’ [শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৯৭৬৭; আল আদাব : হাদীস নং ৮০৯] মুমিনের হৃদয়ে যখন বারবার এ বাণীগুলোর শব্দ ও মর্ম বাজতে থাকবে, তখন ধীরে ধীরে সময়ের মর্যাদা ও গুরুত্ব তার ভিতর সৃষ্টি হবে। ফলে সে সময় অপচয় ও নষ্ট করা থেকে বেঁচে থাকবে। ৩. বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে কি পরিমাণ অর্থের অপচয় হয় তার কিঞ্চিৎ ধারণা নেয়া যাবে নিচের রিপোর্টগুলো থেকে। ২০০৬ সালের বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি রিপোর্ট পেশ করেছিলেন থনটন নামের এক বৃটিশ হিসাব কর্মকর্তা। ঐ রিপোর্টে তিনি বলেছেন, বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ১ দশমিক ২৬ পাউন্ড, যা খেলায় অংশ গ্রহণ করে যে আয় হয় তার দ্বিগুণ। সেন্টার ফর ইকোনমিক আ্যন্ড বিজনেস রিচার্সের হিসাব মতে ২০০২ সালের বিশ^কাপে শুধুমাত্র ইউরোপীয় দেশগুলোর মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড। [প্রথম আলো : ১৯ জুন ২০০৬]
২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ^কাপের আয়োজক দেশ হিসাবে বাংলাদেশ রাষ্টীয় পর্যায়ে কি পরিমাণ অর্থের অপচয় করেছে, তার কিছুটা অনুমান করা যায় নিচের রিপোর্ট থেকে। বঙ্গবন্ধু ও মিরপুর জাতীয় স্টেডিয়াম এবং রাস্তা-ঘাট মেরামতের জন্য বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) বরাদ্দ দিয়েছে ১২ কোটি টাকা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দিয়েছে আড়াই কোটি টাকা। রাস্তা-ঘাট সংস্কারের জন্য সরকারী তহবীল থেকে ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানান, ৫টি স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য ব্যয় হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা। আইন শৃংখলা রক্ষার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে দেয়া হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। [সাপ্তাহিক কাগজ : বর্ষ ৩, সংখ্যা ৬]
বিএনপি এর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেছেন, এ আয়োজনে ৩৫০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। [কালের কন্ঠ : ২০ ফেব্রয়ারী ২০১১]
আয়োজক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের যদি এ পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়ে থাকে, তাহলে সমগ্র বিশে^র কি পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে, তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। অথচ অপচয়ের ব্যাপারে এসেছে কঠোর সতর্কবাণী। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,‘আত্মিয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থ ও মুসাফিরকে তাদের হক দিয়ে দিন এবং কখনই অপচয় করবেন না। নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই (দোসর)। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ [সূরা ইসরা : আয়াত ২৬-২৭]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা খাও, পান কর। তবে অপচয় করবে না। কেননা অপচয়কারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা খাবে, পান করবে, পরিধান করবে এবং সদকা করবে, তবে অপচয় ও অহংকার করবে না।’ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘ইচ্ছে মতো খাবে, ইচ্ছে মতো পরবে। তবে দুটি কাজ থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকবে, ১. অপচয় ও ২. অহংকার।’ [বুখারী : ২/৮৬০]
৪. বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে পতিতাবৃত্তি সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। যে দেশ এ খেলার আয়োজন করে, সে দেশে অসংখ্য পতিতা ছড়িয়ে পড়ে। দর্শক, সমর্থক ও খেলোয়ার ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের জন্য পতিতা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। ২০০৬ সালের আসরে যুক্তরাষ্ট অভিযোগ করেছে যে, বিশ^কাপকে কেন্দ্র করে পতিতাবৃত্তির জন্য হাজার হাজার নারী পাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসের আদম পাচার বিষয়ক উপদেষ্টা জন মিলার বলেছিলেন, বিশ^কাপ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। নারী পাচারের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। বিশ^কাপের সময় যৌনকর্মের জন্য হাজার হাজার নারী পাচার হচ্ছে। [দৈনিক ইত্তিফাক : ৭ জুন, ২০০৬]
২০১৪ সালের ফুটবল বিশ^কাপের আয়োজক দেশ ব্রাজিল সরকার ঘোষণা করেছিল, এই আসরে পতিতাবৃত্তি ও যৌনকর্মের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি ডলার আয় করবে। [দৈনিক ইনকিলাব : ৬ জুন ২০১৪]
এই পতিতাবৃত্তি ও অবৈধ যৌনকর্ম এক ভয়াবহ অপরাধ। পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচার মূলত সতর্কতার বাধা ডিঙ্গিয়ে সতীত্বের বিপক্ষে চরম সীমায় উপনীত হওয়া ও আল্লাহর বিধানাবলীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণার নামান্তর। ব্যভিচার স্বয়ং একটি বৃহৎ ও ভয়াবহ অপরাধ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচারের কাছেও যেওনা। নিশ্চয় ব্যভিচার অশ্লীল ও নিকৃষ্টতম কাজ এবং যৌন সম্ভোগের কদর্য পথ।’ [সূরা ইসরা : আয়াত ৩২] সাহাবী হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. এর এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যভিচার থেকে সতর্ক করে বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচারকে ভয় কর। কারণ তার ৬টি অশুভ পরিণাম রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে আর তিনটি আখেরাতে। দুনিয়ার তিনটি হলো ১. দেহের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। ২. চিরস্থায়ীভাবে অভাব অনটন আসে। ৩. আয়ূকাল হ্রাস পায়। আর পরপারের তিনটি হলো, ১. আল্লাহর অসন্তুষ্টি। ২. বিচার দিবসের হিসাবে মন্দ পরিণাম। ৩. দোযখের স্থায়ী আযাব।’ [শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৫০৯১]
সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বাচনিক অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যভিচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন, ‘তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কিয়ামত দিবসে পরম দয়ালু আল্লাহ কথাও বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। ১. বৃদ্ধ ব্যভিচারী। ২. মিথ্যুক শাসক। ৩. অহংকারী ফকীর।’ [আস সুনানুল কুবরা : নাসাঈ : হাদীস নং ৭১০০; শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৫০২]
সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বাচনিক অন্য এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘চার শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন এবং তাদের উপর নেমে আসে আল্লাহর ক্রোধ। ১. বারবার শপথকারী ব্যবসায়ী। ২. দাম্ভিক ফকীর। ৩. বৃদ্ধ ব্যভিচারী। ৪. অত্যাচারী শাসক।’ [আস সুনানুল কুবরা : নাসাঈ : হাদীস নং ৭১০১; সহীহ ইবনে হিব্বান : হাদীস নং ৫৫৫৮]
তা ছাড়া ব্যভিচার বা অবৈধ যৌন সম্ভোগ নিজের সাথে বয়ে নিয়ে আসে আরও শত শত অপরাধ এবং এর অশুভ ফলাফল প্রকাশ পায় সমগ্র মানবতার বির্পযয় ও ধ্বংশের আকারে। পৃথিবীতে যত হত্যা ও লুণ্ঠনের মতো জঘণ্য ঘটনাবলী সংগঠিত হয়েছে বা হয়, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ঘটনার কারণ কোনো নারী ও তার সাথে অবৈধ সর্ম্পক। এ ছাড়াও ব্যভিচার নারী-পুরুষকে নিক্ষেপ করে সুমহান মর্যাদার আসন থেকে নোংরা নর্দমায়। মানব সমাজকে রূপান্তর করে পশুর সমাজে। মূলত এ কারণেই মানবিক অপরাধ সমূহের যেসব শাস্তি কুরআন-হাদীসে নির্ধারিত রয়েছে তন্মধ্যে ব্যভিচারের শাস্তি সবচে ভয়াবহ ও কঠোরতর। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,“ব্যভিচারী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষের প্রত্যেককে বেত্রাঘাত কর একশ করে। তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ^াসী হয়ে থাকলে আল্লাহর এ বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের দয়ার উদ্রেক না হয়। আর মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের এ শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। [সূরা নূর : আয়াত ২]
আয়াতে বর্ণিত ব্যভিচারের এ শাস্তি কেবল অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য। বিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যা। যা অসংখ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সাহাবী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, ‘আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি (হযরত মায়িয রা.) হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে এসে বললেন, তিনি ব্যভিচার করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজের উপর চারবার সাক্ষ্য দিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে রজম তথা প্রস্তরাঘাতে হত্যার নির্দেশ দিলেন আর তিনি ছিলেন বিবাহিত।’ [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ৬৮১৪; সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ১৬৯১]
৫. বিশ^কাপ, আই পি এল, এশিয়াকাপ ইত্যাদি বড় ধরনের খেলা উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় মিসওয়ার্ল্ডকাপ বা সুন্দরী প্রতিযোগিতা। খেলায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো থেকে প্রথমে একজন করে সুন্দরী বাছাই করা হয়। এরপর তাদের মাঝে হয় চুড়ান্ত প্রতিযোগিতা। এ পর্বে যে নির্বাচিত হয়, তাকে দর্শক, খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদেরকে আকর্ষিত করার জন্য অর্ধনগ্ন অবস্থায় বিশ^কাপের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আসর এবং অনেক সময় খেলার সময় প্রদর্শন করা কয়। পর্দা ও মানবিকতার সকল বাঁধন ছিন্ন করে চরম নির্লজ্জতা ও পাশবিকতায় মেতে উঠে প্রতিযোগী ও দর্শকরা। অথচ মানব সংসারে পর্দার গুরুত্ব ও উপকারিতা অনস্বীকার্য। লঙ্গনের শাস্তি ও ক্ষতি অসহনীয়। পালনের শান্তি ও উপকারিতা বরণীয়। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নারীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এই বিধান তোমাদের (পুরুষদের) এবং তাদের (নারীদের) অন্তরের জন্য অধিক পবিত্রতার কার্যকর উপায়।’ [সূরা আহযাব : আয়াত ৫৩]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা, ও মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন স্বীয় চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত ও বিরক্ত করা হবে না।’ [সূরা আহযাব : আয়াত ৫৯]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আপনি মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে আর হেফাযত করে স্বীয় যৌনাঙ্গকে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্রতার উপায়। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত। এভাবে আপনি মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারাও যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে আর হেফাযত করে স্বীয় যৌনাঙ্গকে। (এ ব্যবস্থা তাদের জন্যও অধিকতর পবিত্রতার উপায়)। [সূরা নূর : আয়াত ৩০]
সাহাবী উকবা বিন আমের থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা পর নারীদের কাছে যেও না।’ [বুখারী : ২/৭৮৭, মুসলিম : ২/২১৬]
অন্য এক হাদীসে আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কোন পুরুষ কোন বেগানা নারীর সাথে একান্তে অবস্থান করলে তাদের তৃতীয় জন হয় শয়তান।’ [তিরমিযী : ১/২২১]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “যে পুরুষ পর নারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেয় এবং যে নারী কুদৃষ্টির জন্য নিজেকে অন্যের সামনে পেশ করে তাদের উভয়ের উপর আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।” [শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৭৩৯৯]
সাহাবী আবু উমামা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন ‘যে মুসলমান কোনো রূপসীর রূপ লাবণ্যে দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে স্বীয় চোখ অবনত করে ফেলে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ইবাদত করার তওফীক দিবেন যার স্বাদ সে অনুভব করতে পারবে।” [মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নং ২২২৭৮]
অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের দুটি দল জাহান্নামী। তাদেরকে আমি দেখিনি। একটি হলো তারা যাদের হাতে থাকবে গরুর লেজের মতো চাবুক, তা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। অপর দলটি হলো সে সকল নারী যারা পোশাক পরেও নগ্ন। তারা পর পুরুষকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করবে। নিজেরাও আকৃষ্ট হবে পর পুরুষদের দিকে। এ সমস্ত নারীরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ এত এত দূর থেকেও পাওয়া যাবে। [মুসলিম : হাদীস নং ২১২৮, ২/২০৫]
৬. গান-বাজনাও বিশ^কাপের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এ ছাড়া এ অনুষ্ঠানের কল্পনাও করা যায় না। অথচ ইসলামে গান-বাজনা হারাম ও ভয়াবহ অপরাধ। এ ব্যাপারে এসেছে বড় কঠোর ও নির্মম হুঁশিয়ারী। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এক শ্রেণীর লোক এমন রয়েছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে ‘লাহওয়াল হাদীস’ তথা অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে করে ঠাট্টা-বিদ্রুপ। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ [সূরা লুকমান : আয়াত ৬]
সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, জাবের রা. ইমাম বুখারী, বায়হাকী, ইবনে জারীর রহ. প্রমুখ আয়াতে উল্লেখিত ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর তাফসীর করেছেন গান-বাজনা করা। [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৪]
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা গান-বাজনা করবে বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। আল্লাহ তাআলা এদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন আর কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শুকরে পরিণত করে দিবেন।’ [তবারানী-কাবীর : ৩৪১৯; শুআবুল ঈমান : বায়হাকী : হাদীস নং ৪৭৫৯; ইবনে মাজা : ২/৪০২০; ইবনে হিব্বান : হাদীস নং ৬৭৫৮] এছাড়াও বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস রয়েছে, যাতে গান-বাদ্য হারাম ও নাজায়িয বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে রয়েছে বিশেষ সতর্কবাণী ও কঠিন শাস্তির ঘোষণা।
৭. বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে মাদকদ্রব্য সেবনের মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। আগে থেকেই হিসাব করে বলে দেওয়া হয় এবার কি পরিমাণ মাদকদ্রব্য সেবন করা হবে। অথচ এই সর্বগ্রাসী মাদক ডেকে আনে ইহকাল-পরকালের ভয়াবহ বিপর্যয়। তাই ইসলামে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, পুজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। এতে তোমরা (ইহকাল ও পরকালে) সফল হবে। নিশ্চয় শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্ধেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি এ কাজগুলো পরিহার করবে? [সূরা মায়েদা : আয়াত ৯০-৯১]
সাহাবী ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী পদার্থই হারাম। আর যে কেউ নেশা সৃষ্টিকারী পদার্থ সেবন করবে, তার চল্লিশ দিনের নামায নষ্ট হয়ে যাবে। এরপর যদি সে তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন। (এভাবে তিনবার তার তাওবা কবুল করবেন। এরপর) যদি চতুর্থবার আবার সেবন করে, তাহলে সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা নিজের উপর অপরিহার্য করে নিয়েছেন যে, তাকে তিনি ‘তীনাতুল খাবাল’ পান করাবেন। জিজ্ঞাস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তীনাতুল খাবাল কি? তিনি বললেন, তীনাতুল খাবাল হলো, জাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ। এরপর তিনি আরও বলেন, যে কেউ এমন কোন শিশুকে মাদকদ্রব্য সেবন করাবে, যে মাদকের হারাম হওয়া সম্পর্কে জানে না, আল্লাহ তাআলা নিজের উপর অপরিহার্য করে নিয়েছেন যে, তাকেও তিনি “তীনাতুল খাবাল” পান করাবেন। [আবু দাউদ : ২/৫১৮, হাদীস ৩৬৮০; মুসলিম : হাদীস নং ২/১৬৭; তিরমিযী : ২/৮; ইবনে মাজা : হাদীস নং ২৪২]
আরেক বর্ণনায় এসেছে ‘সাহাবী দাইলাম হিময়ারী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা এক শীত প্রধান রাষ্ট্রের নাগরিক, আমাদের কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে হয়। আমরা গম দিয়ে এক ধরণের পানীয় তৈরী করি। (এবং তা পান করি) যার দ্বারা আমরা কাজের শক্তি সঞ্চার করি এবং শীতের মুকাবিলা করি। এ কথা শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, সেটা কি নেশা সৃষ্টি করে? আমি বললাম, হাঁ, নেশা সৃষ্টি করে। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বর্জন কর। আমি বললাম, লোকেরা তো তা বর্জন করবে না। এ কথা শুনে তিনি বললেন, বর্জন না করলে তাদের সাথে যুদ্ধ কর। অর্থাৎ যদ্ধু করে হলেও তা বর্জনে তাদেরকে বাধ্য কর। [আবু দাউদ : ২/৫১৮, হাদীস নং ৩৬৮৩]
অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, পরম দয়ালু আল্লাহ তাআলা অভিশাপ করেছেন মাদকের উপর, মাদক সেবনকারীর উপর, পরিবেশনকারীর উপর, বিক্রয়কারীর উপর, ক্রয়কারীর উপর, প্রস্তুতকারীর উপর, যার নির্দেশে প্রস্তুত করা হয় তার উপর, বহনকারীর উপর, যার নিকট বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় তার উপর এবং তার উপর যে মাদকদ্রব্য বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগ করে। [মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নং ৫৭১৬; তিরমিযী : ১/২৪২; আবু দাউদ : ২/৫১৮, হাদীস নং ৩৬৭৪; ইবনে মাজা : হাদীস নং ২৪২]
৮. বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে জুয়ার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। আগে একটি ম্যাচে ম্যাচের আগে একবারই বাজি ধরার সুযোগ থাকত। এখন ঘরে বসে টেলিভিশনে খেলা দেখে দেখে বাজি ধরা হয় অসংখ্যবার। অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে, এখন প্রতি বলে, গোলে বলে বাজি ধরা হয়। বিশ^কাপকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ডের বাজিকর কাবগুলোর ব্যবসা হয়ে উঠে রমরমা। ২০০৬ সালে শুধুমাত্র ইংল্যান্ডেই বাজির লেনদেন ছিল ৭০০ কোটি পাউন্ড। [ইত্তিফাক : ১জুন ২০০৬]
পাঠক লক্ষ্য করুন! যদি একটি দেশের পরিসংখ্যানকৃত লেনদেনের পরিমাণই এত হয়, তাহলে সে দেশেরই যে লেনদেনগুলো পরিসংখ্যানে আসেনি, সেগুলো এবং বিশে^র অন্যান্য দেশগুলোর বাজির লেনদেনের পরিমাণ এক সাথে যোগ করলে এর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাড়াবে? অথচ এই জুয়া ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও নাজায়িয। [সূরা মায়েদা : আয়াত ৯০-৯১]
এ ছাড়াও জুয়ার দুনিয়াবী ক্ষতিও মারাত্মক। খেলায় বাজি ধরে সর্বশান্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা সমাজে নেহায়াত কম নয়। এ নিয়ে পারিবারিক কলহে অনেক সংসার ও পরিবারও হুমকির মুখে। বিশ^কাপের ক্ষতিকর দিকগুলোর মধ্যে আরো রয়েছ, শিক্ষাঙ্গণ, অফিস-আদালত, ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি হয় বেহাল দশা। কর্মে দেখা দেয় চরম অবহেলা। প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেমে আসে স্থবিরতা। এর দায়ভার বহন করতে গোটা জাতিকেই। আশা করি বিশ^কাপের আলোচিত ক্ষতির দিকগুলো জাতির জাগ্রত বিবেকগুলোকে নাড়া দিবে। বাধ্য করবে এ সকল ম্যাচের ভিতরের বিভৎস চিত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে এবং খোদাভীরু ও পরকালমুখী হতে।
লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া মিফতাহুল উলূম মাদরাসা, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight