ক্ষুদ্রঋণের কালো থাবা, বিকল্প হতে পারে করযে হাসানা : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাগলা ঘোড়া তাবৎ দুনিয়া দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে বেদম গতিতে। এর লাগাম টেনে ধরার বা একে থামানোর আপাতত বৈষয়িক কোনো শক্তি আছে বলে মনে হয় না। অবস্থা এই দাড়িয়েছে যে, সুদী লোন ছাড়া বড় মাপের কোনো কিছু করার কল্পনাই করা যায় না। ফলে অভিশপ্ত এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে সকল মানুষের জীবন। এর মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনুস হাজির হোন মাইক্রো ক্রেডিট [গরপৎড় ঈৎবফরঃ] বা ক্ষুদ্রঋণের আপদ নিয়ে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো তো সাধারণত মোটা অংকের সুদী লোন বিত্তবানদেরকেই দিয়ে থাকে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও ছোটখাটো উদ্যোক্তা বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ প্রচলিত ব্যাংকগুলো থেকে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। এতেকরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের কিছু একটা করার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। তাই দেশের বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্বল্প পরিসরে উদ্যোক্তারাও যেন কোনো কিছু করতে পারে সে লক্ষ্যেই ড. মুহাম্মদ ইউনুস হাজির করেন মাইক্রো ক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ ভাবনার রঙ্গিন ফানুস। এ ক্ষেত্রে তিনিও হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন সেই অভিশপ্ত সুদকেই। অভাবগ্রস্থ মানুষের অভাবকে কাজে লাগিয়ে চড়া সুদে কড়া শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঝুকিমুক্ত লাভজনক ব্যবসা পরিচালনার নাম ক্ষুদ্রঋণ। এ জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ব্যাংক। এরপর বেঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠে আশা, ব্র্যাক ইত্যাদি নামের ক্ষুদ্রঋণের নামে সুদী লোন বিতরণকারী অনেক সমিতি বা প্রতিষ্ঠান। যেগুলো এ দেশে এনজিও নামেই সমধিক পরিচিত। ইত্যবসরে ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে পেয়ে যান বিশ^নন্দিত পুরস্কার ‘নোবেল পুরস্কার’। বিশে^র সবচে সম্মানিত এ পুরস্কার প্রাপ্তি তাকে ও তার ক্ষুদ্রঋণ ভাবনাকে এনে জগতজুড়া খ্যাতি ও পরিচিতি। হৈচৈ পড়ে যায় সারা বিশে^। বিশেষ করে আমাদের এ দেশে। ভাবনার দুয়ার খোলে যায় সারা দুনিয়ার তাবৎ অর্থনীতিবিদদের। নতুন করে ভাবতে শুরু করেন বিশে^র বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদগণ। ইউনুস বন্দনায় নেমে পড়েন তার বিরোধীরাও। তার এ আবিষ্কার উম্মার জন্য ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দেয়। ক্ষুদ্রঋণের কল্যাণে সুদের কালো থাবা বিত্তবান ও শহরের সীমানা প্রাচীর টপকিয়ে গরীব-অসহায় ও গ্রামীণ জনপদের উঠানেও হানা দেয় বজ্র গতিতে। ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র বিমোচনের মনকাড়া ও চটকদার শ্লোগানের আড়ালে চড়া সুদের নষ্ট জাল ছড়িয়ে দেয় গ্রামীণ জনপদগুলোতে। সে জালে পা দিয়ে সাবলম্বী হয়েছে এমন লোকের অস্তিত্ব আছে কি না তা বলা মুশকিল। আর সর্বশান্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা অসংখ্য। ডেনমার্কের প্রখ্যাত সাংবাদিক টম হাইনেমান (ঞড়স ঐবরহবসধহহ) কর্তৃক নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ‘ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ’ (ঈধঁমযঃ রহ গরপৎড় উবনঃ) নামক প্রামাণ্য চিত্রের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ‘ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্রবিমোচনে পুরোপুরি ব্যর্থ। দারিদ্রবিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের ইতিবাচক কোনো ভূমিকা নেই। বাংলাদেশের হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ৬৭ শতাংশই ব্যয় করে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা দারিদ্রবিমোচনে কোনো ভূমিকাই রাখে না। তাই ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্রবিমোচন সম্ভব নয়।’ দেশের দুর্যোগপ্রবণ ৮ জেলার খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি (ডঋচ) পরিচালিত এক জরিপের প্রতিবেদনে এ তিক্ত সত্য ফুটে উঠেছে। দেশের দুর্যোগপ্রবণ রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সুনাগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় জরিপ চালানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ঊট) আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপের প্রতিবেদনে ‘দারিদ্রবিমোচনে দরিদ্র ব্যক্তিদের সম্পদ প্রদানে’র উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হতদরিদ্র ব্যক্তিদের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। এদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দেনাগ্রস্ত শুধু স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর কাছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ২৯ শতাংশ হতদরিদ্র চিকিৎসা বাবদ খরচ করে ও ১৭ শতাংশ দৈনন্দিন খাবার কেনে। এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণের ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মৃতের সৎকার, বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠান ও জরুরি সঙ্কট মুকাবিলায়।’ হতদরিদ্রদের ঋণের উৎস সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘৬০ শতাংশ মানুষ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের থেকে ঋণ নেয়। দাদনের ঋণ নেয় ১০ শতাংশ। এছাড়া ১৪ শতাংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে, ৭ শতাংশ ব্র্যাক থেকে, ১২ শতাংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে আর মাত্র ১ শতাংশ সাধারণ ব্যাংক থেকে।’ বিশিষ্ট কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্রবিমোচন করে না, বরং সামন্ত সমাজের ভূমিদাসের মতো এ যুগের মানুষকে গ্রামীণ ব্যাংক একধরণের ঋণদাসে পরিণত করেছে। দারিদ্রবিমোচনের এ পথ অনুসরণ করার ফলে আমাদের উন্নতির কোনো দিশা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ^ব্যবস্থার মধ্যেই সংখ্যালঘুর ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া নিহিত। এই গরিব করা ও গরিব রাখার ব্যবস্থা বহাল রেখে গরিবদের ঋণ দিয়ে ও উচ্চ হারে সুদ নিয়ে কিভাবে গরিবি মোচন হবে? এই অস্বাভাবিক ও বিকৃত চিন্তাকেই আমরা সদলবলে লালন করে আসছি।’ একজন মুমিন-মুসলমান হিসাবে কোনো কিছু করার আগে তা কুরআন-হাদীসের আয়নায় যাচাই করাই আমাদের প্রথম কর্তব্য। এরপর অন্যান্য দিক বিবেচ্য হবে। ক্ষুদ্রঋণেও তাদের হাতিয়ার হচ্ছে সুদ। যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। আর সুদের ভয়াবহতার কথা কুরআন মাজীদে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের ময়দানে দন্ডয়মান হবে সে ব্যক্তির মতো যাকে শয়তান আসর করে মতিচ্ছন্ন করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে, ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদী লেন-দেনের মতোই। অথচ আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে করেছেন বৈধ আর সুদ করেছেন হারাম। [ সূরা বাকারা : আয়াত ২৭৫]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি সুদ পরিহার না কর, তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৭৯]
সাহাবী সামুরা ইবেন জুনদাব রা. এর বর্ণনায় সুদের ভয়াবহতা বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আজ রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, দু’জন লোক আমার নিকট আগমন করে আমাকে এক পবিত্র ভূমির দিকে নিয়ে চলছে। যেতে যেতে আমরা এক রক্তের নদীর পাড়ে দাঁড়ালাম। এ সময় দেখতে পেলাম একজন লোক নদীর মাঝে দাঁড়ানো। আরেকজন লোক নদীর পাড়ে দাঁড়ানো। পাড়ে দাঁড়ানো লোকটির সামনে অনেকগুলো পাথর। নদীর মাঝের লোকটি পাড়ের দিকে আসতে ইচ্ছা করলে পাড়ের লোকটি তার মুখে স্বজোরে এমনভাবে পাথর নিক্ষেপ করে যে, লোকটি পুনরায় আগের জায়গায় পৌঁছে যায়। সে যতবারই পাড়ে আসতে চায়, ততবারই তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। ফলে সে আগের যায়গায় চলে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, এ লোকটি কে যার মুখে পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছে? উত্তরে বলা হলো, এ হচ্ছে সুদখোর ব্যক্তি। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২০৮৫]
অন্য বর্ণনায় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের সাক্ষি ও সুদের লেখকের উপর। [আবু দাউদ : হাদীস নং ৩৩৩৩; ইবনে মাজা : হাদীস নং ২২২৭]
সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বাচনিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, সুদের গুনাহের ৭৩টি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নি¤œস্তরের গুনাহ হলো, স্বীয় মাতার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সমপর্যায়ের গুনাহ। [মুস্তাদরাকে হাকীম : হাদীস নং ২২৫৯]
সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালা রা. এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, জেনে শুনে সুদের একটি দেরহাম গ্রহণ করা ৩৬ বার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া থেকেও ভয়ানক গুনাহ। [আহমাদ : হাদীস নং ২১৯৫৭]
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর আলোকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, সুদ অর্থ আয়ের একটি জঘন্য ও অভিশপ্ত পথ। সুদখোরের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা! এর সাথে যে কোনোভাবে জড়িত সকলকেই অভিশাপ করেছেন রহমতের মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তাই একজন মুমিন সুদের মতো জঘন্য কোনো কারবারে জড়াতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ^ব্যস্থার এ যুগে সুদের সংস্পর্শের বাইরে থেকে মানুষ চলবে কি করে? ব্যবসা-বানিজ্য ইত্যাদি চালাবে কি করে? আমরা বলব, এর বিকল্প হতে পারে করযে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণ। করযে হাসানা অতিপূণ্যময় একটি আমল এবং মানবতার কল্যাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী। ঋণদাতা কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে অতিভাগ্যবান মানুষ। সাহাবী আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর কোনো জুলুম করে না। তার সাহায্য ত্যাগ করে না। যে তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে থাকেন। আর যে কোনো মুসলমানের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের দিনের বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করে দিবেন। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২৪৪২; মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ২৫৮০]
ঋণ দেওয়া মূলত হাজতমান্দ ও মুখাপেক্ষীকে সাহায্য করা। টাকার অভাবে তার উপর যে বিপদ নেমে আসতো ঋণ দিয়ে সে বিপদ দূর করা। তাই ঋণের ব্যাপারটিও বর্ণিত হাদীসের আওতায় অবশ্যই পড়বে। কাজেই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আল্লাহ তাআলা ঋণদাতার প্রয়োজন পূরণ করে দিবেন এবং কিয়ামতের ময়দানে তার বিপদ দূর করে দিবেন। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা যার প্রয়োজন পূরণ করে দিবেন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে বিপদ দূর করে দিবেন, তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে হতে পারে? অন্য এক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো একজন মুসলমান অন্য মুসলমানকে একবার ঋণ দিলে এ ঋণদান আল্লাহর রাস্তায় সে পরিমাণ সম্পদ দু’বার সদকা করার সমতুল্য হয়। [মাআরিফুল কুরআন : সংক্ষিপ্ত, সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৫, পৃ. ১৩৫] কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি খাতক অভাবগ্রস্থ হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। [ সূরা বাকারা : আয়াক ২৮০]
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর ম্যাসেজ হলো, করযে হাসানা খুবই পুণ্যময় একটি আমল ও অতি উত্তম ইবাদত। খাতক ঋণ আদায়ে অক্ষম হলে তা মাফ করে দেওয়া আরও ভাল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আল্লাহর এই আজব দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়াত কম নয় যারা ঋণ নেওয়ার পর তা আদায়ের কথা বেমালুম ভুলে যায়। অনেকেই আবার সামর্থ্য থাকা সত্তেও ঘোরাতে ঘোরাতে ঋণদাতার বারোটা বাজিয়ে দেয়। কেউ কেউ তো পুরো টাকাটাই মেরে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আহত-নিহত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। ফলে মানুষের মনে করযে হাসানার ব্যাপারে এক ধরণের নেতিবাচ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ সকল ফটকাবাজদের কারণে সমাজের ভাল মানুষগুলো বিপদের সময় করযে হাসানা পায় না। এ জন্য ইসলামী শরীআতের পক্ষ থেকে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয় শ্রেণীর জন্য রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। এ সকল নির্দেশনা মেনে চললে অনাকাঙ্খিত এ সঙ্কট দূর হবে ইনশাআল্লাহ। এ সঙ্কট সৃষ্টির পেছনে ঋণগ্রহীতাই যেহেতু প্রধানত দায়ী, তাই তার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেই আগে আলোচনা করা যাক। ১. ঋণগ্রহীতার এ কথা সর্বদাই মাথায় রাখা উচিত যে, ঋণ একটি বোঝা। ঋণগ্রস্ততা অনেক সময় দুশ্চিন্তা, অশান্তি ও অনৈতিকতার কারণ হয়। এ জন্য মানুষের কর্তব্য হলো, আল্লাহর কাছে ঋণগ্রহণ থেকে পানাহ চাওয়া এবং দুআ করা তিনি যেন ঋণগ্রহণ ছাড়াই তার সকল প্রয়োজন পূরণ করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আল্লাহর কাছে ঋণগ্রহণ থেকে পানাহ চেয়ে দুআ করতেন। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ৮৩২; ৬৩৬৯]
২. ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তবিকই প্রয়োজন আছে কি না, থাকলে সেটা কোন পর্যায়ের, ঋণগ্রহণ ছাড়া অন্য কোনোভাবে তা পূরণ করা সম্ভব কি না এবং ঋণগ্রহণ করলে সময়মতো তা পরিশোধ করা যাবে কি না এ বিষয়গুলো বিবেচনা করা খুবই জরুরী। বিশেষ প্রয়োজন ও সময়মতো পরিশোধের প্রবল ধারনা ছাড়া ঋণগ্রহণ জায়িয নয়। আর অন্যায় ও গুনাহের কাজে ঋণ নেওয়া আর ঋণকে জীবনের সাধারণ নিয়মে পরিণত করার তো প্রশ্নই আসে না। এ ক্ষেত্রে মুরুব্বীর সাথে পরামর্শ করে নেওয়া ভাল। এ কেবল করযে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে। সুদভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রে নয়।
৩. সময়মতো পরিশোধের পাক্কা নিয়ত রাখা এবং এর জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আর পরিশোধের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকা। বিশুদ্ধ নিয়ত, দুআ ও সত্যিকার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে থাকে। তিনি পরিশোধ বা মুক্তির ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু ঋণ নেওয়ার সময়ই পরিশোধ না করার নিয়ত রাখা বা ঋণ নেওয়ার পর পরিশোধ না করা কিংবা সম্পূর্ণ উদাসিন হয়ে পড়া খুবই অন্যায় ও গুনাহের কাজ। এতে কেবল আল্লাহর সাহায্যই হাতছাড়া হয় না, সম্পদের বরকতও নষ্ট হয়ে যায়। সাহাবী আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধের নিয়তে ঋণ নেয়, আল্লাহ তাআলা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করে দেন। আর যে আত্মসাতের উদ্দ্যেশে নেয়, আল্লাহ তা ধ্বংস করে দেন। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২৩৮৭] ৪. নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করা। না পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশ্যই পরিশোধ করবে। টালবাহানা, মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া, ছলচাতুরি করার কোনোই অবকাশ নেই। এগুলো তো যে কারো সাথেই নাজায়িয। সুতরাং বিপদকালে যে ঋণ দিয়ে বিপদমুক্ত করল, তার সাথে এমন করা আরও ভয়াবহ। সাহাবী আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (ঋণ আদায়ে) বিত্তবানের টালবাহানা জুলুম। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২৪০০]
৫. সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে ঋণদাতা থেকে কখনো কষ্টদায়ক আচরণ প্রকাশ পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরা ও পাল্টা জবাব না দেওয়া উচিত। কোনো উযর থাকলে ন¤্রভাবে বুঝিয়ে বলা উচত। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তি থেকে একটি উটনি ঋণ নিয়েছিলেন। সে তা চাইতে এসে কঠোর ব্যবহার করল। তখন উপস্থিত সাহাবাগণ তার সাথে অনুরূপ ব্যবহার করতে চাইলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে বাধা দিয়ে বললেন, ‘তাকে বলতে দাও। পাওনাদারের কিছু বলার অধিকার আছে।’ এরপর সাহাবাগণকে বললেন তাকে একটি উটনি কিনে দিতে। তাঁরা খুঁজে এসে বললেন, আমরা এর মতো উটনি পাইনি। শুধু এরচে উৎকৃষ্টই পেয়েছি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেটিই কিনে দাও। (জেনে রেখো) তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে ঋণ পরিশোধে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২৩৯০] ৬. ঋণদাতার জন্য দুআ করা এবং তার শোকরিয়া আদায় করা। এতে সে খুশি হবে এবং ঋণদানে উৎসাহ বোধ করবে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আবী রাবীআহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনাইনের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাছ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি তা পরিশোধ করলেন এবং আমার জন্য এই বলে দুআ করলেন, আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। ঋণের বিনিময় তো হলো পরিশোধ ও কৃতজ্ঞতা। [আহমাদ : হাদীস নং ১৬৪১০; সুনানে নাসাঈ : হাদীস নং ৪৬৮৩]
৭. ঋণ বান্দার হক, যা পরিশোধ করা জরুরী। অন্যথায় দাতার কাছ থেকে মাফ নিতে হবে। এ ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই। আল্লাহ তাআলা তা মাফ করবেন না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া উত্তম। মৃত্যুর আগে তো অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধের আগেই যদি কারো মৃত্যু এসে যায়, তবে কাউকে অসিয়ত করে যাওয়া আবশ্যক। আশা করা যায়, এতে সে মাফ পাবে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ঋণ ছাড়া শহীদের সকল গুনাহই মাফ করে দেওয়া হয়। [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ১৮৮৬]
সাহাবী সালামা ইবনুল আকওয়া রা. থেকে বর্ণিত, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় একজন মাইয়িতকে উপস্থিত করা হলো, উপস্থিত সাহাবাগণ তাঁকে জানাযা পড়ানোর অনুরোধ করলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তার উপর কি কোনো ঋণ আছে? লোকেরা বলল, জ¦ী না। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, সে কি কিছু রেখে গিয়েছে? লোকেরা বলল, জ¦ী না। তখন তিনি তার জানাযার নামায পড়ালেন। এরপর আরেকজন মাইয়িতকে উপস্থিত করা হলো, উপস্থিত সাহাবাগণ তাঁকে জানাযা পড়ানোর অনুরোধ করলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তার উপর কি কোনো ঋণ আছে? লোকেরা বলল, জ¦ী হাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, সে কি কিছু রেখে গিয়েছে? লোকেরা বলল, তিন দিনার রেখে গিয়েছে। তখন তিনি তার জানাযার নামায পড়ালেন। এরপর আরেকজন মাইয়িতকে উপস্থিত করা হলো, উপস্থিত সাহাবাগণ তাঁকে নামায পড়ানোর অনুরোধ করলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সে কি কিছু রেখে গিয়েছে? লোকেরা বলল, জ¦ী না। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তার উপর কি কোনো ঋণ আছে? লোকেরা বলল, তিন দিনার ঋণ আছে। তখন তিনি বললেন, তোমাদের সাথীর জানাযা তোমরাই পড়। এ কথা শুনে সাহাবী আবু কাতাদা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার জানাযার নামায পড়িয়ে দিন, তার ঋণ আমার জিম্মায় নিলাম। আমি তা আদায় করে দিব। তখন তিনি জানাযার নামায পড়ালেন। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২২৮৯]
কেউ মারা গেলে তার জানায় অংশ গ্রহণ করাটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল ছিল। উম্মাহকেও এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ তাকিদ দিয়েছেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো জানাযা হয়ে থাকলে দাফনের পরও তিনি তার জানাযা আদায় করেছেন। [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ৯৫৬; আহমাদ : হাদীস নং ৯০৩৭] এতদসত্তেও ঋণ পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা না করে যাওয়ার কারণে জানাযা উপস্থিত হওয়ার পরও তার জানাযা পড়াতে অসম্মতি জানিয়েছেন। মূলত এ অসম্মতির মধ্য দিয়ে তিনি উম্মতকে এ বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, করয বা ঋণের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কেউই যেন একান্ত ঠেকা ও পরিশোধের প্রবল ধারণা ছাড়া ঋণ না নেয়। নিতান্ত ঠেকায় পড়ে নিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করে ফেলবে। না পারলে মৃত্যুর আগে পরিশোধের ইন্তিজাম অবশ্যই করে যাবে। ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতারও কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। নি¤েœ তা উল্লেখ করা হলো।
১. একান্ত ঠেকায় পড়ে কেউ করয চাইলে সামর্থ্য থাকলে ও মুনাসিব মনে হলে করয দিবে। কারণ ঋণ দেওয়া মূলত হাজতমান্দ ও মুখাপেক্ষীকে সাহায্য করা। টাকার অভাবে তার উপর যে বিপদ নেমে আসতো ঋণ দিয়ে সে বিপদ দূর করা। এ জন্য কুরআন-হাদীসে মুখাপেক্ষী ও বিপদগ্রস্থকে সাহায্য করার যে সওয়াব ও ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তা এখানেও প্রযোজ্য হবে। ২. সময়মতো ঋণ পরিশোধে ঋণগ্রহীতা অক্ষম হলে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া বা মাফ করে দেওয়া অনেক বড় সওয়াবের কাজ। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি খাতক অভাবগ্রস্থ হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। [সূরা বাকারা : আয়াত ২৮০]
সাহাবী আবূ মাসউদ রা. এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জনৈক ব্যক্তির মৃত্যুর পর হিসাব নেওয়া হলে, তার কোনো নেক আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল বিত্তবান। কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশ ছিল, দেনা আদায়ে অক্ষমদের যেন মাফ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বললেন, অক্ষমকে মাফ করার সক্ষমতা তো তার চেয়ে আমার বেশি। এরপর তিনি ফেরেশতাদেরকে তাকে মাফ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ১৫৬১] সাহাবী আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অক্ষমকে সুযোগ দেয় বা আংশিক ঋণ কমিয়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়াতলে জায়গা দিবেন, যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। [তিরমিযী শরীফ : হাদীস নং ১৩০৬]
সাহাবী আবু কাতাদা রা. বলেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যার পছন্দ যে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের কঠিন বিপদসমূহ থেকে মুক্তি দিন, সে যেন অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সুযোগ দেয় বা মাফ করে দেয়। [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ১৫৬৩]
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো প্রমাণ করে অক্ষম ঋণদারকে সুযোগ দেওয়া বা পারলে একেবারে মাফ করে দেওয়া অত্যন্ত পুণ্যের কাজ ও পরকালে মুক্তির উসীলা। তাই সকল ঋণদাতার উচিত এ দিকে লক্ষ্য রাখা।
৩. নির্ধারিত সময়ের পরে তো বটেই, প্রয়োজনে সময়ের আগেও পরিশোধ তলব করা যাবে। তবে সর্বাবস্থায় ন¤্রতা ও ভদ্রতার পরিচয় দেওয়া কর্তব্য। কঠোরতা, গালিগালাজ, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত। সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহমত নাযিল করুন, যে সহৃদয় যখন বিক্রি করে, যখন ক্রয় করে এবং যখন নিজের হক তলব করে। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২০৭৬]
আব্দুল্লাহ ইবেন উমর ও আয়েশা রা. বলেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের প্রাপ্য হক তলব করে, সে যেন পবিত্রতার সঙ্গে তলব করে। [সহীহ ইবনে হিব্বান : হাদীস নং ৫০৮০]
৪. ভোগ্য ঋণ হোক বা ব্যবসায়ী ঋণ, মূলধনের অতিরিক্ত কোনো কিছুর শর্ত করা যাবে না। কারণ এটা সুদ। সুদের ভয়াবহতার কথা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এরূপ কেউ করে ফেললে যথা নিয়মে তওবা করে কেবল মূলধনই গ্রহণ করবে। বাড়তিটা গ্রহণ করবে না।
৫. খোটা দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে ঋণগ্রহীতাকে কষ্ট না দেওয়া। কারণ এতে ঋণদানের যে সওয়াব তা নষ্ট হয়ে যায়। এ জাতীয় অভ্যাস কারো থাকলে তা পরিহার করা অবশ্য কর্তব্য। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা খোটা ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের সদকাকে সে ব্যক্তির মতো নষ্ট করো না, যে নিজের সম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ^াস রাখে না। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এ রকম, যেমন একটি মসৃণ পাথরের উপর মাটি জমে আছে। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ে এবং সেটিকে পুনরায় মসৃণ পাথর বানিয়ে দেয়। এরূপ লোক যা উপার্জন করে তার কিছুই তাদের হস্তগত হয় না। আর আল্লাহ কাফেরদেরকে হেদায়াত দান করেন না। [সূরা বাকারা : আয়াত ২৬৪]
আমাদের এ দেশে এখন পর্যন্ত ব্যক্তি পর্যায়ে করযে হাসানা চালু থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু নেই। এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু করা গেলে দেশ ও জাতির কল্পনাতীত উপকার হবে। মানব ও মানবতা মুক্তি পাবে ক্ষুদ্রঋণের কালো থাবা থেকে। বিত্তবান দীনদার শ্রেণী উপরোক্ত নির্দেশনাগুলো মেনে করযে হাসানার অশেষ ফযীলতের দিকে তাকিয়ে একক বা যৌথ উদ্যোগে করযে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার জন্য এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেন। এটা করতে হবে কেবল বর্ণিত ফযীলত ও সওয়াবের আশায়। দুনিয়াবী কোনো উপকার বা লাভ-লোকসানের কথা মাথার বাইরে রাখতে হবে। সেই প্রতিষ্ঠানে ফযীলত ও সওয়াবের আশা নিয়ে অংশ নিতে যারা আসবে, মুনাসিব মনে করলে তাদেরকেও শরীক করবে। ঋণপ্রার্থীর অবস্থাভেদে ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ কম বেশি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য দুই বা দুইয়ের অধিক সাক্ষি রাখবে। সম্ভব হলে জামানত হিসাবে ঋণের সমমূল্যের কোনো কিছু বন্ধক রাখবে। তবে সে বন্ধকী বস্তু ব্যবহার করতে পারবে না। এসব দেখাশুনা ও তদারকী করার জন্য আলাদাভাবে কিছু লোক নিয়োগ দিবে। যাদের বেতন-ভাতার জন্য আলাদা ফান্ড থাকবে। সে ফান্ড থেকেই তাদের বেতন-ভাতা নির্বাহ করা হবে। ঋণ বিতরণ-আদায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে সরকারের সহযোগিতা নিবে। সরকারকেও এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। এ ছাড়াও কুরআন-হাদীস সমর্থিত আরও কোনো আইডিয়া থাকলে সেগুলোও কাজে লাগানো যেতে পারে। করযে হাসানার এ ধারা চালু করা গেলে জাতি মুক্ত হবে সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের রাহুগ্রাস থেকে। দারিদ্রবিমোচন হবে আবশ্যিকরূপে ইনশাআল্লাহ। উম্মাহ মুক্ত হোক সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের কালো থাবা থেকে। সুদমুক্ত ঋণের এ আগুন ছড়িয়ে পড়–ক সবখানে। করযে হাসানা বিকল্প হয়ে উঠুক উম্মাহর জীবনে।
লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight