কেন আসে রমযান মাস? আল্লামা তাকী উসমানী

ইসলামের বাইরে দৃষ্টি দিলে দেখবেন, পৃথিবীর সকল মতবাদ আগাগোড়া মানুষের মস্তিষ্ককে সম্বোধন করে। আর ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা সম্বোধন করে শুধু তার হৃদয়কে। হৃদয় ও মস্তিষ্ক প্রত্যেকটির আছে আলাদা রাজত্ব। প্রত্যেকেই তার রাজত্বের একক অধিপতি। আর এই দুই রাজা (মস্তিষ্ক ও হৃদয়) শুধু এক নয়, তারা এক রাজ্যে অবস্থান করতে পারে না; বরং অনেক সময় পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে।
পান্তরে ইসলাম একই সময়ে মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে এমনভাবে সম্বোধন করে, উভয়ের মাঝে কোন বিরোধ, দড়ি টানাটানি হয় না; বরং এর পরিবর্তে এরা উভয়েই নিজ নিজ সীমার মাঝে থেকে পাশাপাশি চলে এবং পরিশেষে পরস্পর মিলিত হয়ে এমনভাবে একাকার হয়ে যায়, যেমন দু’টি নদীর প্রবাহমান ধারা এসে একই মোহনায় মিলিত হয়। এটাই হচ্ছে সে স্তর, যেখানে হৃদয়ের মাঝে ‘সৌহার্দ্য সম্প্রীতি’র সাথে চিন্তা-ভাবনারও যোগ সৃষ্টি হয়। আর মস্তিষ্ক চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি প্রেম-প্রীতিরও সমঝদার হয়ে যায়।
এ সূক্ষ্ম বাস্তবতা সামনে রেখে, যা ব্যক্ত করার চেয়ে অধিক অনুধাবন করার বিষয়Ñ যদি কোন মানুষ কুরআনে কারীমের সে সকল আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, যাতে চিন্তা-ভাবনাকে মস্তিষ্কের পরিবর্তে অন্তরের বৈশিষ্ট্য আখ্যা দেয়া হয়েছে, তাহলে এ আসমানী কালামের অলৌকিকতার সামনে ভাষা ও সাহিত্যের গোটা জগতকে মস্তকাবনত দেখা যাবে। আল্লাহু আকবার।
সারকথা, ইসলামী শিা-দীায় চিন্তাবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তির অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। কারণ এ দু’টোর কোনো একটিকেও যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলে এর পুরো সৌন্দর্যই বিনষ্ট হয়ে যাবে। আকাইদ ও ইবাদত-ব্যবস্থা যদি বুদ্ধি ও বিচারের শাসন থেকে স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে কুসংস্কার ও দেব-দেবীর ধর্ম অস্তিত্ব লাভ করে।
পান্তরে বিবেক-বুদ্ধিকে যদি ওহীর শিাভিত্তিক আকাইদ ও ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, তাহলে এক শুষ্ক অন্তঃসারশূন্য ধর্মনিরপেতায় গিয়ে সমাপ্ত হয়, যা বস্তুজগতের ওপারে তাকানোর যোগ্যতা রাখে না। উভয় অবস্থার পরিণতি ও ফলাফল হচ্ছে বঞ্চনা। কোথাও দেহের বৈধ চাহিদাগুলো থেকে, কোথাও আত্মার প্রকৃত দাবি ও আবেদন থেকে।
যখন থেকে সেক্যুলারিজম প্রতিরোধের তাগিদে ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিা ও দর্শনের উপর আমাদের এ কালের লেখক-চিন্তাবিদগণ অধিক জোর দিতে আরম্ভ করেন, তখন থেকেই কিছু কিছু লোক সচেতনভাবে কিংবা অসচেতনভাবে আকাইদ ও ইবাদতকে দ্বিতীয় স্তরে নামিয়ে দিয়েছেন এবং সেগুলোর প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। যার অবধারিত ফল এই হয়েছে, মানুষ একটি অর্থজীবী প্রাণী (ঊপড়হড়সরপ অহরসধষ) হয়ে থাকে। তার যাবতীয় চেষ্টা ও দৌড়-ঝাঁপ শুধুই এ দেহের লালন-পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল, যা একদিন না একদিন মাটির সাথে মিশে যাবে, তার মাঝে আধ্যাত্মিক উন্নতির ওই সকল সোপানে উন্নীত হওয়ার কোনো চিন্তাই নেই, যা প্রকৃতপে মানবকে পশু থেকে আলাদা করে এবং যার দ্বারা সে মাটিতে মিশে গিয়েও অমর হয়ে থাকে।
যারা বৈষয়িক উন্নতি ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণকেই জীবনের সর্বোচ্চ চাওয়া পাওয়া মনে করে, তাদের অভ্যন্তরীণ জীবনের প্রতি সামান্য উঁকি দিয়ে দেখুন, তারা সুখ-শান্তির যাবতীয় উপকরণ একত্র করেও হৃদয়ের প্রশান্তির মহাদৌলত থেকে কত রিক্ত হস্ত।
কারণ তারা নিজেদের চতুর্পার্শে¦ যে জগত রচনা করেছে, তা জগতের সকল ধন ভা-ার এনে তাদের পদপ্রান্তে স্তূপ করে রাখতে সম হলেও আত্মার স্থিরতা ও হৃদয়ের প্রশান্তি দান করতে সম নয়। এ হচ্ছে আল্লাহর সাথে পরিচয়হীন জীবনের এক অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। এ জীবনের অনুরাগী এক অজানা অস্থিরতার শিকার হয়ে থাকে, যার এক মর্মান্তিক দিক এটাও, তাদের জানা থাকে না কী কারণে তারা এত অস্থির-বেকারার।
মানুষ এ বিশ্বজগতের সৃজনকারী ও স্বত্বাধিকারী নয়। সে তো এক মহান সত্তার সৃষ্টি মাখলুক। তার জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে বন্দেগী। তাই মানুষের স্বভাবগত চাহিদা হচ্ছে, কোনো অমর অবিনশ্বর সত্তার সামনে সে সেজদাবনত হবে, তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের সামনে নিজের হীনতা ও অমতার সম্বল নিবেদন করবে, দুঃখ-দুর্দশায় তাঁরই নামের আশ্রয় গ্রহণ করবে এবং জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে তাঁরই দয়া-অনুগ্রহে মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আজকের বস্তুবাদী জীবন তাকে দুনিয়ার সকল ভোগ-সামগ্রী দান করতে পারলেও তার অন্তরের এ আকুতি পূরণ করতে পারে না।
মানুষের এই স্বভাবগত চাহিদা অনেক সময় তার রিপুর তাড়নার নীচে চাপা পড়ে যায়, কিন্তু একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। আর এটাই হলো মানুষের সে সুপ্ত চাহিদা, যা ভোগ-বিলাসের সকল উপকরণ করায়ত্ত হওয়ার পরও তাকে শান্তি দেয় না; বরং কখনো কখনো তার জীবনকে বিরান ভূমি বানিয়ে দেয়। কবির ভাষায়Ñ
তোমাকে ছাড়া জীবন এভাবেই অতিবাহিত হয়
যেন কোন পঙ্কিলতায় আমি প্রবাহিত হই।
ইসলামের শিা ও আদর্শে ইবাদত অংশটি এ জন্যই আছে, এর উপর সঠিকভাবে আমল করা হলে তা মানবাত্মার সত্যিকারের খোরাক সরবরাহ করবে এবং আল্লাহ তাআলার সাথে তার সম্পর্ককে মজবুত করবে। আর মানুষের দেহ ও আত্মার চাহিদাগুলোর মাঝে ভারসাম্য সৃষ্টি করে মানুষকে এমন এক সমতা বিন্দুতে (ঊয়ঁরষরনৎরঁস) উপনীত করবে, যা প্রকৃতপে স্বস্তি ও প্রশান্তির অপর নাম।
এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে “স্মরণ রেখো, আল্লাহর যিকিরের (স্মরণ) মাধ্যমেই অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। [সুরা রাদ : আয়াত ২৮]
পবিত্র রমযান মাস প্রতিবছর এ জন্যই সমাগত হয়, বছরের বাকী এগারোটি মাসে জাগতিক কর্মব্যস্ততাই থাকে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। যার ফলে তার অন্তরের উপর রূহানী আমল বা আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকর্মের ব্যাপারে উদাসীনতার আবরণ পড়তে থাকে। বছরের অন্য সাধারণ দিনগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা এরূপ হয়, চব্বিশ ঘণ্টার কর্মব্যস্ততায় নিখাদ ইবাদতের সময় সাধারণত খুবই কম হয়। এভাবে মানুষ তার আত্মার ভ্রমণে দেহের ভ্রমণের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে।
রমযান মাস এ জন্যই রাখা হয়েছে, এ বরকতের মাসে মানুষ দেহের খোরাকের পরিমাণ কমিয়ে আত্মার খোরাক বাড়িয়ে দিবে এবং দৈহিক পরিভ্রমণের গতি কিছুটা শ্লথ করে আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণের গতি বাড়িয়ে দিবে। এভাবে পুনরায় উভয়ের মাঝে ভারসাম্য সৃষ্টি করে সে ‘সমতা বিন্দু’তে ফিরে আসবে, যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত। যদি কিছুটা গভীর দৃষ্টি নিপে করা হয় তাহলে এ ‘সমতা বিন্দু’-তে উপনীত হওয়ার আনন্দ উৎসবই ‘ঈদুল ফিতর’ এর শিরোনামে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
অতএব, রমযান শুধু রোযা ও তারাবীরই নাম নয়; বরং এ মাসের পূর্ণ সুফল লাভ করার জন্য প্রয়োজন, মানুষ যেন এ মাসে নফল ইবাদতের দিকেও বিশেষ মনোযোগ নিবদ্ধ করে। আর কারো হক নষ্ট না করে যদি নিজের সময়কে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করতে পারে, তাহলে নিজেকে যেন মুক্ত করে অধিক থেকে অধিক নফল ইবাদত এবং যিকির ও তাসবীহের মধ্যে অতিবাহিত করে।
‘কারো হক নষ্ট না করে’ কথাটি আমি এ জন্য বলেছি, যাদের চাকরি-বাকরি আছে তাদের ডিউটির সময় দায়িত্ব পালন ছেড়ে নফল ইবাদতে মগ্ন হওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়, তবে অবসর সময়ের কথা ভিন্ন।
কারো হক নষ্ট না করেও প্রত্যেকে রমযান মাসে নিজের দুনিয়াবী কর্মব্যস্ততা কিছু না কিছু কমাতে পারে। প্রত্যেকেই নিজেকে ঐসব কাজ থেকে অবসর রাখতে পারে যেগুলো হয় তো প্রয়োজনীয় নয়, বা সেগুলো পেছানো যায়। এভাবে যে সময় পাওয়া যাবে তা নফল ইবাদত, যিকর ও দোয়াতে ব্যয় করা উচিত।
তাছাড়া যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, রমযানে দিনের বেলায় মানুষ যখন রোযার হালতে থাকে, তখন সে খানা-পিনা ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার বন্দেগীর জন্য এমন সব বিষয় ত্যাগ করে, যা সাধারণ অবস্থায় তার জন্য হালাল ছিল। তাহলে এটা কেমন অন্যায়, মানুষ রোযার কারণে সাধারণ অবস্থায় যা হালাল ছিল তা ত্যাগ করছে, কিন্তু এমন সব কাজে পুরোদস্তুর লিপ্ত রয়েছে, যা সাধারণ অবস্থায়ও হারাম ছিল।
অতএব, কোন ব্যক্তি যদি রমযান মাসে এ সব হারাম কাজ (মিথ্যা, পরনিন্দা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি) পরিহার না করে, তাহলে সহজেই অনুমান করা যায়, এমন রোযা তার আধ্যাত্মিক উন্নতির েেত্র কতটুকু সাহায্যকারী হবে?
তাই রমযান মাসে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই হওয়া উচিত, চোখ, কান, মুখ এবং শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন সব ধরনের গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে এবং আল্লাহর নাফরমানির পথে একটি কদমও যেন না পড়ে।
রমযানকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘পারস্পরিক সহমর্মিতার মাস’। এ মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দান-খায়রাতও অত্যধিক পরিমাণে করতেন। তাই রমযান মাসে আমাদের দান-খায়রাত, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলাদা গুরুত্ব দেয়া কর্তব্য।
এটি পরস্পর আপোসÑমীমাংসার মাস। তাই এ মাসে ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকার বিশেষ হুকুম আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কেউ যদি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাহলে তুমি তাকে বল, আমি রোযাদার।
সারকথা, রমযান শুধু সাহরী ও ইফতারীর নাম নয়; বরং এটি একটি প্রশিণ কোর্স, যা দ্বারা প্রতিবছর মুসলমানদের প্রশিণ দেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য , নিজের ও প্রভুর সাথে যেন মানুষের দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সকল বিষয়ে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়। সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের অসৎ প্রবণতা মিটিয়ে দেয় এবং উৎকৃষ্ট গুণাবলীর অধিকারী হয়। তার অন্তরে যেন ভাল কাজের প্রেরণা এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেতনা জাগ্রত হয়। আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়। যা তাকে রাতের আঁধারে এবং অরণ্যের নির্জনতার মাঝেও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে, এরই নাম ‘তাকওয়া’। কুরআন কারীমে একেই রোযার মূল উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিলো, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া বা খোদাভীরুতা সৃষ্টি হয়। [সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩]
যে ব্যক্তি ‘তাকওয়ার’ এ প্রশিণ কোর্সে সঠিকভাবে উত্তীর্ণ হবে, তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সুসংবাদ দিয়েছেন, যার রমযান শান্তিতে অতিবাহিত হয়, তার গোটা বৎসর শান্তিতে অতিবাহিত হবে।
সুতরাং রমযান এসেছে আমাদের জন্য গোটা বছরের শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তা নিয়ে, যদি আমরা শান্তি ও নিরাপত্তা চাই এবং এর জন্য এ পবিত্র মাসকে স্বাগত জানাতে পারি এবং তার মর্যাদা ও পবিত্রতা রা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন।
অনুবাদ : মুফতী উবায়দুল হক খান, মুঈনে মুফতী, জামিআ সাবিলুর রাশাদ গাজীপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight