কুরবানীর ফাজায়েল ও মাসায়েল : মুফতী মুস্তাকিম আমীর

Upnnas

‘জিলহজ’ আরবি বছরের শেষ মাস। এ মাসেই ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ হজের মূল অনুষ্ঠানাদি পালিত হয়ে  থাকে। এ সময়ে বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান ভৌগলিক সীমারেখা ও সাদা কালোর ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মক্কা মোয়াজ্জামায় হাজির হয়ে “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাশ মুখরিত করে তোলে। এ সময় মদীনা মুনাওয়ারায় লক্ষ লক্ষ প্রকৃত নবী প্রেমিক নবীপ্রেমে দিওয়ানা নবীর রওজা মুবারকের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণ খুলে সালাম জানায়। এই পবিত্র সময়ই অর্থাৎ ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ উৎসব। এ সময়ে যে ব্যক্তির মালিকে নেসাব পরিমাণ মাল থাকে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
কুরবানীর  ফাজায়েল
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হাদীস শরিফে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন, কুরবানীর দিন আল্লাহর নামে পশু জবাই করার চেয়ে উত্তম আর কোন আমল নেই। [শুআবুল ঈমান ৭০৮২]
অন্য হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, কুরবানীর জন্য জবাইকৃত পশুর গায়ের পশম পরিমাণ সওয়াব আল্লাহ তাআলা কুরবানী দাতাকে দান করবেন। [ইবনে মাযা ৩১১৮]
অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূল সা. হযরত ফাতেমা রা. কে তাঁর কুরবানীর নিকট উপস্থিত থাকতে বলেন এবং ইরশাদ করেন, এই কুরবানীর প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কি শুধু রাসূল পরিবারের জন্য, নাকি সকল মুসলিমের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন, এই ফযীলত সকল মুসলিমের জন্য। [মুস্তাদরাকে হাকিম ৭৬৩৩]
অপরদিকে যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই ইবাদত পালন করে না তাদের সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেন, যার কুরবানী করার সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। [ইবনে মাযা ৩১১৪]

কুরবানীর  মাসায়েল
যে কোন ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরী। এক. ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং দুই. শরীয়তের নির্দেশনা মুতাবেক মাসায়িল অনুযায়ী সম্পাদন করা। তাই নিম্নে কুরবানীর কিছু জরুরী মাসায়িল আলোচনা করা হল।

কুরবানী কার উপর ওয়াজিব?
১০ই  জিলহজ ফজর থেকে ১২ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নর-নারী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা (ভরি) রূপার সমমূল্যের সম্পদের মালিক হবে, তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা পয়সা, সোনা-রূপার অলঙ্কার, ব্যবসায়ী পণ্য, অপ্রয়োজনীয় আসবাব পত্র এসব কিছুর মূল্য কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাব-যোগ্য।
নেসাবের মেয়াদ
কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরী নয়; বরং কুরবানীর তিন দিন (১০, ১১ ও ১২ই জিলহজ) এর মধ্যে যে কোন দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।

গরীবের কুরবানীর হুকুম
গরীব ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোন পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

কুরবানীর পূর্ণ সময়
মোট তিন দিন কুরবানী করা যায়। জিলহজের ১০ ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে প্রথম দিন অর্থাৎ জিলহজের ১০ তারিখে কুরবানী করা উত্তম।
কুরবানী করতে না পারলে
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করেছিল কিন্তু কোন কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে কিংবা তার ন্যায্য মূল্য সদকা করবে।

প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
যে সব এলাকার লোকদের জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টি-বাদল বা অন্য কোন কারণে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয়, তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।

রাতে কুরবানী করা
১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয, তবে দিনে কুরবানী করাই ভাল।
কুরবানীর পশুর বয়স-সীমা
উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হƒষ্টপুষ্ট যে, দেখতে এক বছরের মত মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস বয়সের হতে হবে। উল্লেখ্য যে, ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কোন অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয হবে না।

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
একটি ছাগল, ভেড়া  বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি প্রাণী একাধিক ব্যক্তি মিলে কুরবানী করলে কারো কুরবানী ঠিক হবে না। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারবে। সাতের কমে যে কোন সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। সাতের অধিক হলে কারো কুরবানীই হবে না।

সাত শরীকের কুরবানী
সাতজন মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন, কারো আধা ভাগ কারো দেড় ভাগ। এ ক্ষেত্রে কোন শরীকের কুরবানীই হবে না।

কোন অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না।

পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা ও তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয।

নিজের কুরবানীর পশু নিজেই জবাই করা
কুরবানী দাতা নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কুরবানী দাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভাল।
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে। যদি কোন একজন না বলে তবে ঐ কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশু হালাল হবে না।

কুরবানীর গোশত বণ্টন
শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।

কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করা
কুরবানীর গোশত এক তৃতীয়াংশ গরীব মিসকিনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনকে ও পাড়া প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোন অসুবিধা নেই।

গোশত ও চর্বি বিক্রি করা
কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে।

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া
জবাইকারী, কসাই ও কাজে সহযোগিতা কারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোন কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্ব চুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোন অঙ্গ কাটা মাকরূহ।

কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া
কুরবানীর গোশত হিন্দু বা অন্যান্য বিধর্মীকে দেওয়া যাবে। নিজের কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া
কুরবানী দাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব।

রাসূল সা. এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা
সামর্থ্যবান ব্যক্তি রাসূল সা. এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সা. হযরত আলী রা কে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়ত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূল সা. এর পক্ষ থেকে কুরবানী দিতেন।

জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী
মৃত ব্যক্তির মতো জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে নফল কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবার খেতে পারবে।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্র করা
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।

কুরবানী দাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন কুরবানী করবে
কুরবানী দাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানী দাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ঐ এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে।

কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সদকা করা
কুরবানীর চামড়া কুরবানী দাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরী।

কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া
এক কুরবানীর পশুতে আকিকা ও মান্নতের নিয়তে অংশ দেওয়া যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় করা যাবে।

কুরবানীর গোশত দিয়ে ঈদের দিনের খাবার শুরু করা
ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খাবার শুরু করা সুন্নাত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নাত শুধু ১০ই জিলহজের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খাবার শুরু করা সুন্নাত নয়।

কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি
কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এ ক্রয় বিক্রয় জায়েয। এতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু কোন কুরবানী-দাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোন কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে।

রাতে কুরবানী করা
১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলো স্বল্পতার দরুন জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতেও জবাই করা যাবে।

কুরবানী দাতার জন্য করণীয় আমল
কুরবানী দাতার জন্য ১ জিলহজ থেকে ১০ তারিখ পশু কুরবানী করার পূর্ব পর্যন্ত নখ-চুল এবং শরীরের কোন কিছু না কাটা মুস্তাহাব।
কিবলা-মুখী হওয়া
জবাই এর পূর্বে পশুকে কেবলামুখী করা এবং জবাইকারী কেবলামুখী হয়ে জবাই করা সুন্নাত।

নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়
শুধু অন্তরে কুরবানীর নিয়ত করাই যথেষ্ট। মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়। তবে জবাই করার সময় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা জরুরী।

জবাইয়ের সময় শরীকদের নাম নেওয়া
অনেক জায়গায় কুরবানীর পশু শুইয়ে রেখে জবাই করার পূর্বে শরীকদের নাম ও পিতার নাম পাঠ করা হয়। এসব জরুরী নয়; বরং পশুকে অনর্থক কষ্ট দেওয়া মাকরূহ।

চামড়া সদকা করাই উত্তম
কুরবানীর পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করা বা তা বিক্রয় করে তার মূল্য সদকা করা জায়েয। তবে মূল চামড়া সদকা করাই উত্তম। এ ক্ষেত্রে মাদরাসার এতিম ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে সদকা করলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যাবে। একটি সদকার সওয়াব অপরটি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে সহযোগিতার সওয়াব।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight