কুরআন মানব জাতির পথ প্রদর্শক : মমিনুল ইসলাম মোল্লা

কুরআন পাঠ উত্তম ইবাদত। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে সে উহার বদলে একটি নেকি লাভ করে আর একটি নেকি দশটি নেকির সমান [তিরমিযী শরীফ : হাদীস নং ২৯১০]
তবে তা সুন্দর করে পড়তে হবে। কেউ ইচ্ছে করে অবহেলা করলে সে গুনাহগার হবে। কুরআন পাঠের কতগুলো আদব রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বিতাড়িত শয়তানের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া। আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন বলেন, “অতএব, যখন আপনি কুরআন পাঠ করবেন তখন বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন [সূরা নাহল : আয়াত ৯৮]”
এছাড়া কুরআন পাঠে অবহেলা করা যাবে না। মাদ- মাখরাজ- ওয়াক্ফ ঠিক রেখে ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে সহীহ- শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। কুরআন মুসলমানদের জন্য পথ প্রদর্শক। তাই মুসলমান কখনও কুরআনের জ্ঞান থেকে দূরে থাকতে পারে না। সুরা বাকারার প্রথমেই আল্লাহ বলেছেন, “আলিফ লাম মীম। এটি এমন একটি কিতাব, যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই।” এটি হচ্ছে আল্লাহভীরুদের জন্যে পথ প্রদর্শক । কুরআনের প্রথম নাযিলকৃত আয়াত হচ্ছে, “পাঠ কর, তোমার প্রভূর নামে।” তাই কুরআন পাঠ, মুখস্ত করা ও বার বার পড়া প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। আমরা কুরআন পড়তে ভালবাসি, কেউ নীরবে পড়ি, আবার কেউ সরবে পড়ি। আবার কোন কোন যায়গায় দেখা যায় হাফেজ সাহেব টাকার বিনিময়ে মাইকযোগে সারারাত কুরআন পড়েন এবং সকালে সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে সম্মিলিতভাবে দোয়া- মুনাজাত করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এ ব্যবস্থা ছিল না। তখন মসজিদে নববীতে কুরআন পাঠ করা হতো । কুরআন পাঠের আওয়াজ বেশি হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চৈঃস্বরে কুরআন পাঠ করতে নিষেধ করেন। কুরআন মুখস্ত করা এবং মনে রাখা আল্লাহর একটি নেয়ামত। পৃথিবীর এমন কোন বই নেই যা কোন ব্যক্তি এমনকি লেখকও দাড়ি কমাসহ সম্পূর্ণ মুখস্ত বলতে পারবেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পৃথিবীব্যাপী মুসলিম শিশুরা তা এমনভাবে মুখস্ত করে নেয় যে, যের- যবর, পেশে’র কোন ত্রুটি হয় না। অথচ যে ছেলেটি যে বয়সে কুরআন হেফয হয় সে বয়সে সে তার মাতৃভাষায়ও ততটা দক্ষতা লাভ করে না।
প্রত্যেক মুসলমানকে সাধ্য অনুযায়ী কুরআন শেখার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ পাক বলেছেন “কুরআনের যতটুকু সহজ লাগে তা পাঠ কর [সূরা মুযযাামিল : আয়াত ২০] ফযরে কুরান পাঠের ফজিলত বেশি। কেননা এ কুরআন পাঠ কেয়ামতের দিন সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে [সূরা বনি ঈসরাইল : আয়াত ৭৮]
মদীনায় হিজরত করার পর হযরত মুহহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন মসজিদে নববী। এ মসজিদের পাশে “সুফ্ফা” নামক একটি কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেন। আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। এ ঈমান এর হ্রাস- বৃদ্ধি ঘটে। কুরআন শেখার পর নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। আমরা অনেকেই বাল্যকালে কুরআন শিখি, কিছু দোয়া- দরুদ শিখি। চর্চার অভাবে তা ভুলে যাই। কুরআন ওয়ালা ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বেঁধে রাখা উটের মতো। তার দেখাশোনা করলে তাকে আটকে রাখা যায় আর তাকে ছেড়ে দিলে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তাই নিয়মিত কুরআন চর্চা করতে হবে। কুরআন শিক্ষাকারী এবং শিক্ষাদানকারীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, কুরআন হতে যে অংশটুকু তোমার কাছে নাযিল হয় তা তিলাওয়াত কর এবং এর কথা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই [সূরা কাহাফ : আয়াত ২৭]
রাসুলের উপর আরো অন্যান্য আয়াতে কুরআন পাঠের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূরা নামল ৯১-৯২ এ রসুলকে আত্মসমর্পণকারীদের আওতাভুক্ত থাকতে এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কুরআন পাঠের পাশাপাশি কুরআনের অমিয় বাণী মানুষের মধ্যে পেঁৗঁছে দিতে হবে। এজন্য আমাদেরকে জান ও মাল নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচয় দেয়া উচিত নয়। কুরআনের প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী হেদায়েত ও আল্লাহভীতি জাগরুক করে তুলতে হবে। যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য কুরআনে বহু উপদেশ বাণী রয়েছে। সহজ কথায় মুসলমানদের মুক্তির পথ একমাত্র কুরআন।
কুরআনের আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর সাহাবাগণ কুরআন মুখস্তের পাশাপাশি তা লিখে রাখতেন। যায়েদ ইবনে সাবেত ছিলেন নির্দিষ্ট অহির লিখক। এছাড়া একাজে চার খলিফাসহ আরো অনেকেই নিয়োজিত ছিলেন। তারা রাসুলের নির্দেশ অনুসারে কোন আয়াতটি কোন সূরার পর যাবে সে অনুযায়ী তারা পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, গাছের পাতা, ইত্যাদির উপর লিখতেন। তবে এগুলো কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল। হযরত ওমর রা. এর ইসলাম গ্রহণের সময় সূরা ত্বহা এর কিছু আয়াত পাঠ করেছিলেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত কুরআনের ১৭টির অধিক মাসহাফের সন্ধান পাওয়া যায়। ইয়ামামার যুদ্ধে যখন হাফেযদের একটি বড় দল শহিদ হয়ে যায় তখন সর্বপ্রথম ওমর ফারুক রা. সর্বপ্রথম কুরআন মাজিদ লিখিতভাবে একত্রিত করার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। হযরত ওসমান রা. এর সময় চারজন সাহাবার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বর্তমানে কুরআনের রূপ নেয়। তখনই এতে ৭টি মঞ্জিল, পরে ৩০ পাড়া এবং প্রত্যেক পাড়াকে আবার চারভাগে ভাগ করা হয়েছিল। কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে। এতে আরবিয়দের অনেক সুবিধা হয়েছে। অনারবীয়দের জন্য কুরআন পড়ায় সমস্যা সৃষ্টি হলে সর্ব প্রথম বসরার গভর্নর যিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান একজন আলেম আবুল আসওয়াদ আদদয়ালীকে এ বিষয়ে একটি সমাধান খোঁজার নির্দেশ দেন। তিনি অক্ষরগুলোর উপর নোক্তা দেয়ার পরামর্শ দেন। ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ যের- যবর, পেশ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

আল কুরআন মানব জাতির পথপ্রদর্শক। এটি শুধু বিশেষ কোন ধর্মের লোকদের জন্য পাঠানো হয়নি। এটি সমগ্র মানব জাতির মুক্তির সনদ। এটি এমন একটি গ্রন্থ যাতে রয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, গোত্র , সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবজাতির জন্য আদর্শ নির্দেশনা। এতে অমুসলিমদের জন্যও বহু নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু মূল কুরআন শরিফ আরবীতে লিখিত হওয়ায় আরবি না জানা লোকেরা তা সহজে অনুধাবন করতে পারেন না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয় আমি এ কুরআনকে আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার [সূরা ইউসুফ : আয়াত ২]
বর্তমানে ইংরেজিসহ বহু ভাষায় পবিত্র কুরআন শরিফের উচ্চারণসহ অনুবাদ ও ব্যাখা গ্রন্থ রয়েছে। সেগুলো যে কোন মানুষ পড়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে “এটা মানুষের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা। এবং আল্লাহভীরুদের জন্য পথ প্রদর্শক ও উপদেশ” [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৩৮]
আল কুরআনে বিজ্ঞান, আইন, ও দর্শন সম্পর্কে বহু আয়াত আছে। এগুলো পড়ে যে কোন মানুষ সঠিক পথের দিশা পেতে পারেন। মোট কথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের কার্যকর বিধান আল কুরআনে মওজুদ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আল কুরান সমগ্র মানব জাতির জন্য এক নেয়ামত। কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “আল কুরআন মানব জগতের সংস্কারক । আধ্যাত্মিক নির্দেশনা এবং তথ্যে সমৃদ্ধ এ মহাগ্রন্থ মানব সভ্যতার এক বিস্ময়কর সংস্কার সাধন করেছে।” আল্লাহ ৬দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আমাদের বসবাসের জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুই তিনি আমাদের দিয়েছেন। সূরা আর রহমানে বলা হয়েছে, আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, সূর্য ও চন্দ্র হিসেব মত চলে, তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন । তিনি মানুষের আহারের ব্যবস্থা করেছেন । অতএব তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? দ্বীনি আলোচনা বাদেও পবিত্র কুরআন শরিফে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ও সামাজিক জীবনকে কিভাবে সুন্দর করে সাজানো যায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাতিগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কেন তারা ধ্বংস হলো তাদের বসতি কোথায় ছিল এগুলো কুরআন শরিফে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
মানুষের দেখা অদেখা, চিন্তা ও চেতনার বাইরে যা আছে তাও কুরআনের আলোচ্য বিষয়বস্তু। এ থেকে অমুসলিমগণ সাহায্য পেতে পারেন। বড় বড় বিজ্ঞানী ও মনিষীগণ দিন দিন গবেষণা করে একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন আল কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বকে। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ গ্ল্যাডষ্টোন আল কুরআন পড়ে এবং তা নিয়ে গবেষণা করে এটাই বুঝতে পারেন কুরআন ভিত্তিক জীবন ধারণকারী মুসলমানদেরকে কেউ কখনও পরাজিত করতে পারেনি। কিংবা তাদের মধ্যে বিভেদ ঘটেনি। অধ্যাপক পিকে হিট্টি বলেন, ইসলামের জয় অনেকাংশে একটি ভাষার জয়, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হয় যে একটি কিতাবের জয়। ড. মরিস বুকাইলী ফ্রান্সের বিজ্ঞানী। তিনি তার লিখিত “দি বাইবেল, দি কুরান এন্ড সাইন্স ” গ্রন্থে আল কুরানের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ গ্রন্থটি বিশ্বের ৫০টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তিনি ফ্রান্স সরকার কর্তৃক মিশর থেকে আনিত ফেরাউনের লাশ পরীক্ষা করতে গিয়ে পরীক্ষালব্দ ফল পবিত্র কুরআন শরীফের সাথে মিলে যাওয়ায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শিখ ধর্মের নেতা গুরু নানক বলেন, বেদ ও পুরানের যুগ চলে গেছে। এখন দুনিয়াকে পরিচালিত করার জন্য আল কুরআন একমাত্র গ্রন্থ। এজে আরবেরী বলেন, আমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ যে কুরআন হলো একটি অলৌকিক সৃষ্টি।” পবিত্র কুরানের বাংলা অনুবাদ ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন করেছেন। তিনি ১৮৮১ সালে তা প্রকাশ করেন। এছাড়া কুরান অনুবাদের ব্যাপারে রাজেন্দ্রনাত মিত্র, তারাচরণ বন্দোপাধ্যায়, ব্যাবারেজ এইচজি রাউস এর নাম বিশেষভাবে জড়িত। কুরআন আমাদেরকে ভাল কাজের নির্দেশনা দেয়। কোন কোন অপছন্দনীয় ও ক্ষতিকর কাজ থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে এ নির্দেশনা কুরআন থেকে পাওয়া যায়। বিশেষ করে পারিবারিক জীবনকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। পারিবারিক জীবনে শিথিলতা আনয়নের কারণেই আজ এইডসের মতো ভয়াবহ রোগ পাশ্চত্য দেশগুলোতে ভয়াবহভাবে দেখা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে ভ্রাতৃত্ববোধ, সমতা, প্রতিবেশীর প্রতি অধিকার, এসব ব্যাপারে বহু আলোচনা রয়েছে। ড. রাধাকৃষ্ণ বলেন, আমরা এটা অস্বীকার করতে পারি না যে, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ সব রকমের সম্প্রদায়গত ও জাতিগত গন্ডি অতিক্রম করে গেছে। এরকম একটা বৈশিষ্ট্য যা অন্য কোন ধর্মে পাওয়া যায় না। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য কুরআন অধ্যয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কুরআনের শিক্ষাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে না পারলে কুরআন অধ্যয়ন স্বার্থক হবে না।
লেখক : গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের ক্যাম্পেনার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight