কিশোরের হাতরে রক্তরে চিঠি

Rokter Chiti

পূর্ব প্রকাশিতের পর……
খাদ্য সমগ্রী বা জাহাজ মেরামতের প্রয়োজন না হলে কোনো রাজ্যেই ভিড়ছে না তারা। অবিরাম চলছে কাফেলাটি। যেন দ্রুত পৌঁছতে পারে তাদের গন্তব্যস্থানে। এভাবে চলছে নাহিদা খালেদ ও যোবায়েরদের লঙ্কা দ্বীপের নতুন এ কাফেলাটি। জাহাজের ভিতরে কেউ কুরআন শরীফ পড়ছে, কেউ নামায পড়ছে আবার কেউ চুপ করে গালে হাত দিয়ে বসে দেখছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। মাঝে মাঝে কেউ শব্দ করে দোআ পড়ছে। তার আওয়াজ শুনে অন্যমনষ্করা আবার ফিরে আসছে প্রভুর পানে। নাহিদার পাশে বসা ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে। নাম সুমাইয়া নাহিদার প্রতিবেশি। বাড়ি থাকতে নাহিদার কাছে কুরআন পড়তো মেয়েটি। বয়স আট বা নয়। সে নাহিদার কোল ঘেঁসে বসা ছিল জাহাজে। নাহিদা লক্ষ্য করলো সুমাইয়ার দৃষ্টি কোথায় যেন আটকে গেল। মেয়েটি অপলক নেত্রে নিবীড়ভাবে জাহাজের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের পারের দিকে। নাহিদা সুমাইয়ার দৃষ্টি স্থল অনুসরণ করতেই তার আত্মা কেঁপে উঠল। ঝাপসা ভাবে দেখা গেল ছোট্ট একটি স্পীটবোড। নাহিদা এক নজরে তাকিয়ে আছে বোডটির দিকে। ভালো করে পরখ করছে জিনিসটা কি? ঝাপসার আভা ভেদ করে স্পষ্ট হতে লাগলো বোডটি। ভালো করে খেয়াল করলো নাহিদা। দিক বুঝা না গেলেও মনে হয় যেন তাদের দিকেই আসছে বোডটি। বোরকা আবৃত নাহিদা ইশারায় তার ভাই খালেদ কে ডাকল। খালেদ তার কাছে এসে নাহিদার ডাকে সাড়া দিল। নাহিদা তখন তার হাত তুলে ইশারা করলো সেই বোডটির দিকে। খালেদ তার আঙ্গুলের ইশারার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল বোডটি। এখন আগের চেয়ে অনেকটা স্পষ্ট। বোডে কয়েকজন মানুষ দেখা যাচ্ছে। লোকগুলোর গায়ে কালো পোষাক, একটি কালো কাপড় দিয়ে পুরো চেহারা মোরানো শুধু চোখ দুটি দেখা যায়। এরিমধ্যে যুবায়েরও এখানে এসে হাজির হলো। যুবায়েরের হাতটি ছিল খালেদের গাঢ়ে। অবস্থা দেখে যুবায়েরের হাতটি শক্ত করে চাপ দিল খালেদের গাঢ়ে। তাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, তারা দস্যুদের হাতে পড়েছে। হঠাৎ করে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে তারা হতচকিয়ে গেল।  কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। দস্যুরা এবার খুব কাছেই চলে এসেছে। তাদের বোডে আরো দুজন লোক দেখা যাচ্ছে অতিরিক্ত, মনে হচ্ছে তারা ডাকাত দলের লোক না। নিশ্চই দস্যুরা ধরে এনেছে কোথাও থেকে। এমন সময় দস্যুদলটি আরো কাছে চলে এলো জাহাজটির। প্রথমেই তারা  একটি  পতাকা বের করে দুহাতে ডানে বামে উড়াতে লাগলো। পতাকাটি তাতে সাদা কালিতে কিছু একটা লিখা ছিল তবে সেটা কেউ বুঝতে পারলো না। এর মধ্যে বাকি কয়েকজন দস্যু তাদের অশ্র বের করে তাক করলো জাহাজের দিকে। দুজনের অশ্র অবশ্য আগ থেকেই তাক করা ছিল। এদিকে জাহাজের ভিতর পাগলা ঘন্টা বজানো হলো। খালেদ সবাইকে সতর্ক করল যে, আমাদের জাহাজেটি দস্যুদের কবলে পড়ে গেছে। তোমরা কেউ ভয় পেওনা। আল্লাহর উপর ভরসা। আমরা তাদের সাথে লড়াই করে করে যাবো। যদি মারা যাই সরাসরি জান্নাতে। আর বেঁচে থাকলে দ্বীনের উপর অটল থাকবো। মুসলিম জাতি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পায়না। শত্রুর সামনে কভু মাথা নত করেনা। কারণ মুমিনের জান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতের বদলে কিনে নিয়েছেন। এবার সুযোগ এসেছে বিক্রিত পণ্য আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে জান্নাত বুঝে নেয়ার। খালেদ যখন কথা গুলো বলছিলো তখন জাহাজের নিচ তলা থেকে নারায়ে তাকবীর ধ্বনি ভেসে এলো। ডাকাত দল তাদের স্পীড বোডটি জাহাজে ভিড়াতে চাচ্ছে। কিন্তু নাবিকের দক্ষতার দাপটে তারা তাদের বোডটি সহজে ভিরাতে পারছে না জাহাজের গায়ে। এরিমধ্যে খালেদদের কাফেলাটি কিছুটা মানষিকভাবে নিয়ত করে নিল হয়ত মরবো নয়ত মারবো। কারণ এরা মুসলমানদের শত্রু তাও আবার গায়ে পরে লড়ায়ে এসেছে। সুতরাং এদের বিরুদ্ধে লড়তে কোন বাধা নেই। হঠাৎ এবার ডাকাতদল তাদের বোডটি জাহাজের গায়ে ভিরিয়ে নিল। চট করে তাদের বোডটি বেঁধেও ফেলল জাহাজের গায়ে। এবার তারা ছয়জন লাফিয়ে উঠল জাহাজে। ঝাপিয়ে পড়ল নিরীহ আল্লাহর বান্দাদের উপর। উঠেই তারা প্রথমে একটি শিশু বাচ্চাকে আটক করল। বাচ্চাটিকে অস্র ঠেকিয়ে অন্যদের ভয় দেখাচ্ছে। তাকে ঠেকাতে যেই যুবায়ের ঝাপিয়ে পড়ল ঠিক তখনি পিছনে থাকা আরেক ডাকাতের আঘাতে ছিটকে পড়লো সে। তখন এটা দেখে মনের অজান্তে নারায়ে তাকবীর বলে চিৎকার দিল নাহিদা। ওমনি খালেদ যুবায়েরসহ সকল পরুষদের গায়ে যেন পাহাড়সম শক্তি সঞ্চার হয়ে গেল। একটি মেয়ের চিৎকার পরিবেশটাকেই পরিবর্তন করে দিল। সাথে সাথে লাফিয়ে গিয়ে আক্রমণ করল যুবায়ের। ধরাশায়ি হয়ে গেল দুজন। নাহিদাও যেন তখন সর্পের মত ফুপে উঠছে। এবার নাহিদা তার ভাই খালেদকে সাবধান করলো, তোমার পিছে শত্রু! সাথে সাথে সে সরে গিয়ে আক্রমন করলো আরেক ডাকাতকে। এক আঘাতেই সে লুঠে পড়ল। খালেদ লাফ দিয়ে তার বুকের উপর বসল। অবস্থা দেখে বাকি সবাই ভয় পেয়ে গেল। কারণ এই ডাকাতটিই ছিল তাদের সর্দার। তারপর আর তাদের পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে ছয়জন ডাকাত ধরাশায়ি হলো। একেই বলে বিরঙ্গনা নারী। যার এক চিৎকারে পরিবর্তন হয়ে গেল যুদ্ধ প্রেক্ষাপট। নবী যুগেও এমন ছিল। পুরুষরা যুদ্ধ করতো আর নারী সাহাবীরা ভিবিন্ন তারানা গেয়ে সাহস যুগাতো পুরুষ যুদ্ধাদের। এভাবে ছয়জন ডাকাত পরাজিত হলো। তাদের সাথে আরো দুজন, একজন ছেলে একজন মেয়ে। তারা শুরু থেকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে শান্ত ছিল। তারা জাহাজে উঠার পর এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই তখনও তাদের দিকে ফিরে তাকায় নি নাহিদা ও খালেদ বাহিনী। এদের ছয়জনকে বন্ধি করে খালেদ ও যুবায়ের গেল তাদের কাছে। পরিচয় নিয়ে জানতে পারলো ছেলেটি জয়রাম মেয়েটি তার বোন মায়াদেবি। জয়রাম হলো রাজা দাহিরের রাষ্ট্রদূত। তারা ভাই বোন হয়তো কোন কাজে বেরিয়েছিলো। পথে এই ডাকাতরা তাদেরকে জিম্মি করে ফেলে। তারপর ভাইবোনকে ডাকাতরা তাদের কাছে বন্ধি করে রাখে। এখন মুসলমানদের সাথে এই যুদ্ধে ডাকাতরা হারার কারণে তারা বেঁচে গেল। ভায়ের জীবন রক্ষা পেল আর বোনের রক্ষা হলো ইজ্জত। তাই তারা চির কৃতজ্ঞ মুসলমানদের এই জামাতের কাছে। ফলে এখন লঙ্কা দ্বীপের মুসলমানদের এই কাফেলার সাথে যুক্ত হলো আরো অতিরিক্ত আটজন। ছয় জন ডাকাত মায়াদেবী ও জয়রাম। সাময়িক একটি দূর্ঘটনার পর আবার তাদের কাফেলাটি চলতে লাগলো তাদের গন্তব্য পানে। চলবে……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight