কায়রাওয়ান রাজপ্রাসাদে : ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

কায়রাওয়ান রাজপ্রাসাদে
উম্মুল উমারা ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়া, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় এক বিদূষী নারী। স্বয়ং খলীফা মুঈযও অধিকাংশ সময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। উম্মুল উমারা গুরূত্বপূর্ণ পরামর্শ সভাগুলোতে হাজির হতেন বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরী করা পর্দার আড়াল করা থেকে। মুঈয সেনাপতি জাওহারের সাথে হুসাইন ও লিময়ার বিয়ের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন- উম্মুল উমারাকে তা অবহিত করলেন। লিময়া রাজপ্রাসাদে এলে যেন তাকে পরম আদর-যতœ ও মমতা দিয়ে আগলে রাখার জন্য বললেন।
লিময়া যখন প্রাসাদে পা রাখলো। এখানের অনাড়ম্বরতা দেখে সে অবাক হল। দেখল যে এ জায়গার সবকিছুই অত্যন্ত সাদাসিধে। মূলত এটিই খলীফা মুঈযের চিরাচরিত রীতি ও মতাদর্শ। বিলাসিতা ও চাকচিক্যে দেশের পতন ও ধ্বংসের মূল কারণ মনে করছেন।
উম্মুল উমারা তখন তাঁর কামরার মেঝেতে একটি চাদরে বসা ছিলেন। ঐ চাদরের উপরে রাখা ছিল রেশমি সূতা দিয়ে নকশা করা সাধারণ বালিশ। লিময়াকে আসতে দেখে তিনি তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ওঠে গেলেন। তা দেখে লিময়া দৌঁড়ে গেল। উম্মুল উমারা দাঁড়ানোর পূর্বেই সে তাঁর হাতের উপর ঝুঁকে চুম্বন করল। এবং অত্যন্ত ভক্তি, শ্রদ্ধা ও জড়োসড় হয়ে তাঁর পাশে বসে গেল।
এরপর উম্মুল উমারা তাকে লক্ষ্য করে বললেন, স্বাগতম হে প্রিয়তমা! বেটি! আমি আশা করবো তুমি এ ঘরকে তোমার নিজের ঘরই মনে করবে। লিময়া বলল, অনেক শুকরিয়া আম্মাজি! আমি তো আপনার রাজপ্রাসাদে একজন নগণ্য দাসী!!
উম্মুল উমারা বললেন, না, না, তা কখনো না। তুমি তো আমাদের সকলের সম্মানিত মেহমান। পূর্বে আমি তোমার শৌর্য-বীর্য, সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্ত্বার কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু এখন তো দেখছি যে, তারা তোমার প্রতি অনেক অবিচার করেছে।
লিময়া এ কথা শুনে চমকিত হয়ে উম্মুল উমারার দিকে জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকিয়ে রইল। উম্মুল উমারা বলতে লাগলেন,‘হ্যাঁ, বাস্তবেই তারা তোমার প্রতি জুলুম করেছে। কারণ, ওরা তোমার এই সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়নি। অথবা তারা তা দিতে সক্ষম হয়নি। আমি তো দেখছি তুমি এক অপরুপ সুন্দরী।’
এ কথায় লিময়া লজ্জায় বিগলিত হয়ে মাথা অবনত করল। এবার উম্মুল উমারা বললেন, বেটি! তুমি তো দেখছ যে, আমরা কেমন অনাড়ম্বর  রাজপ্রাসাদে সাদাসিধা জীবন-যাপন করি। তাই তোমার জন্য চাই তোমার সাথে মানানসই সুরম্য প্রাসাদ। কারণ, তোমার মত অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতীদের সাথে তো অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর যুবকদেরই মানায়।
লিময়া বুঝতে পারল যে, তিনি হুসাইনের সাথে তার বিয়ের ব্যাপারে ইঙ্গিত করছেন। এসময় তার সালিমের কথা মনে পড়ে গেল। আর তখনই চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্র“ গড়িয়ে পড়ল।    উম্মুল উমারা অনুভব করলেন যে, লিময়া তার থেকে কোনো বিষয় লুকাচ্ছে। তিনি বললেন, মনে হচ্ছে তোমার মন অন্য কারো কাছে পড়ে আছে!’
এবার লিময়া আর নিজেকে সম্বরণ করতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠল। তখন উম্মুল উমারা তার একেবারে কাছে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে বললেন, লিময়া! তুমি কাঁদছো কেন? আমি তো তোমার সাথে রসিকতা করছিলাম। পিতাকে ছেড়ে আসার দ্বারা তোমার মনে যে দুঃখ-কষ্ট ছিলো, তা কিছুটা লাঘব করতে চেয়েছিলাম। তোমার মাঝে আমি যে অসাধারণ রূপ-লাবণ্য ও কমনিয়তা দেখেছিলাম, তার জন্য মনে করেছিলাম যে, তোমার সাথে কেবল আমাদের সম্ভ্রান্ত ও উঁচুঘরের ছেলেরাই মানায়।
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে, অন্য কোনো ভাগ্যবান যুবকের সাথে হয়তো তোমার মন দেয়া নেয়া চলছে। বেটি! আমাকে তোমার মা হিসেবে গ্রহণ করতে পারো। আমাকে তোমার মনের কথা খুলে বলো। আর আশ্বস্ত থাকো যে, আমি তোমার মনের আশা পূরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’
এ কথায় লিময়া লজ্জায় আরো আড়ষ্ট হয়ে গেল। সলজ কণ্ঠে সে বলল, ক্ষমা করবেন আম্মাজান! আমি ঐ সম্মানের যোগ্য নই।
উম্মুল উমারা বললেন, না বরং তুমি এরচেয়েও  উত্তম মর্যাদার যোগ্য। আচ্ছা, যাকগে আমাদের আলোচনা আজ এ পর্যন্তই মুলতবি থাক। আগামী কোনো এক অবসরে আমরা আবারো গল্প করবো।
এরপর তিনি হাততালি দিলে প্রধান পরিচারিকা এল। উম্মুল উমারা তাকে নতুন মেহমানের জন্য বিশেষ একটি কামরা প্রস্তুত করার জন্য নির্দেশ দিলেন। পরিচারিকা তাকে সাথে নিয়ে কামরায় চলে গেল।
লিময়া তার জন্য নির্ধারিত কামরায় এল। কামরার নির্জনতায় সে বিভিন্ন চিন্তায় ডুবে গেল। তার কানে ভেসে আসতে লাগল উম্মুল উমারার কথাগুলো। তবে উম্মুল উমারাকে তার অত্যন্ত ভাল লেগেছে। খলীফা মুঈয লিদীনিল্লাহর রাজপ্রাসাদে তাঁর মত একজন মহীয়ষী নারীর সংশ্রব পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছে। পাশাপাশি লিময়া নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এতো নৈকট্য পেয়ে গৌরববোধ করছে।
এই ভাবনার মাঝেই লিময়া আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। এ কামরার বেলকনিটি ‘শাহী ফুলবাগানের’ ঠিক ওপরে। লিময়া বেলকনিতে এসে বসতেই সালিমের কথা মনে পড়ে গেল। মনে মনে সে আকাঙক্ষা করছিলো যে, সালিমের ব্যাপারে যদি সে কোনো সন্তেুাষজনক সংবাদ পেতো।’ একটু নিচের বাগানে কয়েকটি পদধবনি ও কারো অস্পষ্ট কথাবার্তায় তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। লিময়া বেলকনি থেকে সামান্য উঁকি দিয়ে দেখল যে, সেনাপতি জাওহার যাচ্ছেন। তাঁকে সে ইতোপূর্বে একাধিক দেখেছে। জাওহারের পাশে টগবগে, সুদর্শন ও সুঠামদেহের অধিকারী এক যুবক হেঁটে যাচ্ছে।
লিময়া বেলকনির একপাশে সরে গেল, তাঁরা যেন তাকে দেখতে না পায়। পরক্ষণেই সে শুনতে পেল যে, জাওহার যুবককে লক্ষ্য করে বলছেন, নিংসন্দেহে তুমি যদি তাকে (মেয়েটিকে) দেখতে অভিভূত না হয়ে পারতে না..। যুবকটি বলল, ভাল কথা, আব্বাজান! কিন্তু, এতে তার বাবার মতামত কী?
তখন লিময়া বুঝতে পারল যে, এই যুবকটিই ‘হুসাইন’। তারা পিতা-পুত্র তার সাথে বিয়ের প্রস্তাবের ব্যাপারে আলোচনা করছে।
এরপর লিময়া উঠে তার কামরায় প্রবেশ করল। ইত্যবসরে উম্মুল উমারাও আগমন করলেন। লিময়া তাঁর দিকে এগিয়ে গেলে তিনি লিময়াকে হাত ধরে তাঁর পাশে বসালেন। এরপর পরম স্নেহ ও মমতাভরে বললেন, আশা করি এখন তোমার ভাল লাগছে। আচ্ছা লিময়া! তোমাকে আমি আজ থেকে মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিতে চাই, তুমি কি আমাকে মা হিসেবে গ্রহণ করবে?!
এ প্রস্তাবে লিময়ার দু’চোখ অশ্র“সজল হয়ে উঠল। সে উম্মুল উমারার হাতে গভীর চুমু খেয়ে বলল, মা! আমি তো এতো বড় সম্মানের উপযুক্ত নই। এমন সম্মানের তো আমি কল্পনাও করিনি।
উম্মুল উমারা বললেন, কিন্তু লিময়া, আমি এর দ্বারা নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করবো। যেদিন তোমাকে আমি প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকেই আমি তোমার জন্য আমার হৃদয়ের দুয়ার খুলে দিয়েছি। আর তোমার আরেকটি আনন্দের বিষয় হলো যে, এই রাজপ্রাসাদের সকলেই তোমাকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এমনকি আমাদের প্রধান সেনাপতি জাওহারও তোমার শ্রদ্ধেয় পিতাকে আমীরুল মুমিনীনের আরো ঘনিষ্ট করে তোলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর জন্য তদবিরও করছেন। এই তো কিছুক্ষণ পরেই জাওহার তোমার পিতাকেসহ খলীফার সাথে সাক্ষাতের জন্য আগমন করবেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে উম্মুল উমারা মুচকি হেসে বললেন, দেখো না, তোমাকে সেনাপ র সাথে বিয়ে দিতে চায়। আচ্ছা, লিময়া! আগে কী কখনো তুমি হুসাইনকে দেখেছো? 
লিময়া এবার হকচকিয়ে গেল। লজ্জায় তার গণ্ডদ্বয় রক্তিমবর্ণ ধারণ করল। সে নিচুস্বরে বলল, মা! এইতো কিছুক্ষণ পূর্বে সে তার পিতার সাথে বাগানের পথ ধরে অতিক্রমকালে যতটুকু দেখেছি। এর আগে কখনো তাকে দেখেনি..। এ বলে লিময়া মাথা নিচু করে ফেলল। এরপর সে বুকে সাহস জমাতে চেষ্টা করলে। বলল, মা! আপনি যেহেতু আমাকে নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আপনি আমাকে এতো মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছেন, তার জন্য আমি সারাজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।  আমি আপনার মেয়ে হিসেবে বলতে চাই যে, আমি আরেকজনের ‘বাগদত্ত্বা’। এতটুকু বলার পরই তার নিঢোল চেহারা লাল হয়ে গেল।
লিময়ার এ কথা শুনে উম্মুল উমারা চমকিত হননি। কারণ, পূর্বেই তিনি তা লক্ষ্য করেছেন। তাই মুচকি হেসে তার আরো ঘনিষ্ট হয়ে বললেন, আচ্ছা মা! কে সেই ভাগ্যবান যুবকটি!?

লিময়া এবার আমতা আমতা করে বলল, সে আমার পিতার এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর ভাতিজা। তার নাম সালিম। তার চাচা আমাদেরকে অনেক মুহাব্বত করেন। তিনিই আমার পিতার নিকটে তার ব্যাপারে (সালিমের) প্রস্তাব দিয়েছেন।
উম্মুল উমারা লিময়ার গালে আলতোভাবে চাপড় দিয়ে বললেন, আচ্ছা, এখন তাহলে সে কোথায়?
তা আমি জানি না মা! মানুষ গুজব রটাচ্ছে যে, সে নাকি ‘সিজিলমাসা’ যুদ্ধে মারা গেছে। কিন্তু আমার তা বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার মন বলছে যে, সে এখনো জীবিত। শীঘ্রই ফিরে আসবে।
বেটি! এটি তো ওফাদারীর এক বিরল দৃষ্টান্ত। তবে আমি তোমাকে মা হিসেবে বলছি যে, ‘হুসাইন’ সে এক অতুলনীয় যুবক। বর্তমান যামানায় তার সমকক্ষ দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারপরও তোমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে তোমাকে কোনো চাপাচাপি করবো না।
লিময়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দু’চোখ ওঠাল। তার দু’চোখ তখন অশ্র“জলে চকচক করছিলো। কাঁদোকাঁদো স্বরে লিময়া বলল, মা! আমি তো আমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। মা! আপনার সামনে অমন স্পষ্টভাষায় কথা বলার জন্য আমাকে মাফ করবেন।!
তাদের এ কথাবার্তার মাঝেই আমীরুল মুমিনীনের কামরার দিকে ধাবমান কয়েকটি পায়ের আওয়াজ শুনা গেল। উম্মুল উমারা পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেন যে, খলীফা মুঈয তাঁর সভাকক্ষের দিকে যাচ্ছেন। তাঁর পিছুপিছু সেনাপতি জাওহার ও আরেকজন লোক যাচ্ছে। উম্মুল উমারা লিময়াকে ইশারা করে কাছে ডেকে বললেন, মনে হচ্ছে আমীরুল মুমিনীন কোনো জরুরি বিষয়ে সেনাপতি জাওহারের সাথে আলোচনা করবেন। কারণ উভয়েই বড় সভাকক্ষে যাচ্ছেন। লিময়া! তুমি কি পর্দার আড়াল থেকে এই সভাকক্ষ ও তাঁদের আলোচনা শুনতে চাও?
লিময়া: অবশ্যই! এটি তো আমার জন্য বড় খুশির সংবাদ। কিন্তু..। এ বলে সে নীরব হয়ে গেল।
উম্মুল উমারা: না, তুমি ভেবো না যে, আমরা তাঁদের গুপ্তচরবৃত্তি করছি। বরং আমীরুল মুমিনীন নিজেই আমাকে পর্দার আড়াল থেকে তাঁর সকল মিটিং ও আলোচনায় অংশ নিতে অনুমতি প্রদান করেছেন। তাই চলো যাই।
উম্মুল উমারা উঠে আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। লিময়াও তাঁর পিছপিছু চলল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় তারা একটি কামরায় গিয়ে পৌঁছলো। কামরার এক কোণে উঁচু একটি তাকিয়া রাখা। আর ঐ তাকিয়ার সামনে বড় পর্দা ঝুলানো। তবে এর মধ্যে অনেক ছিদ্র। ফলে তাকিয়ায় যে বসবে, সে সভাকক্ষের সকলকে দিব্যি দেখতে পাবে। এবং তাদের কথাও স্পষ্ট শুনবে। কিন্তু সভাকক্ষের লোকেরা তাকে দেখতে পাবে না।
উম্মুল উমারা তাকিয়ায় বসে নিজের পাশে লিময়াকে বসার জন্য জায়গা করে দিলেন। লিময়া তাঁর পাশে বসে পড়ল। এরপর উভয়েই পর্দার ছিদ্র দিয়ে তাকালো। সভাকক্ষের ভিতরে চোখ পড়তেই লিময়া চমকে উঠে উম্মুল উমারাকে বলল- আচ্ছা, আম্মাজান! আমীরুল মুমিনীনের পাশে উপবিষ্ট ঐ বয়ষ্ক লোকটিকে চেনেন?
না তো! তবে যেহেতু খলীফা তাঁর একেবারে পাশে বসিয়েছেন, তাহলে তিনি অবশ্যই উচ্চপদস্থ কোন ব্যক্তি!
তিনিই আমার শ্রদ্ধেয় পিতা।
ও! তাহলে খলিফা তাঁকে যথাযথ মর্যাদায়-ই দিয়েছেন। সর্বোপরি তাঁর তো অনেক বড় গর্বের বিষয় যে, তিনি আমাদের জন্য এত মুল্যবান ফুটন্ত গোলাপ তাঁর ঘরে জন্মেছে।
এ কথা শুনে লিময়া মৃদু হেসে লজ্জাবনত হল।
এরপর কিছু বিষয়ে সভাকক্ষে দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা হলো। এক পর্যায়ে মুঈয লিময়ার পিতা হামদুনকে লক্ষ্য করে বললেন,
আপনি তো জানেন সিপাহসালার জাওহার আমাদের কাছে কত মর্যাদা ও গৌরবের পাত্র। আর আপনিও তো আমাদের কাছে কম মর্যাদার পাত্র নন। তা-ও আপনি হয়তো আঁচ করতে পেরেছেন। এখন আমি চাই সিপাহসালার জাওহার ও আপনার মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি আরো দৃঢ় ও মজবুত হোক। মূলত এটি আমাদের জন্যও অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়।
এবার হামদুন তাঁর কথার মর্ম অনুধাবন করতে পারলেন। কিন্তু তিনি না বুঝার ভান করে বললেন, আমার কামনাও তো তাই!
মুঈয বললেন, আমরা আপনার মেয়ে লিময়ার সাথে জাওহারের ছেলে হুসাইনের বিয়ে দিতে চাই..।  এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।
হামদুনও তড়িঘড়ি করে অত্যন্ত আনন্দের সাথে উত্তর দিল, জনাব! এটি তো আমার জন্য অনেক বড় গৌরবের বিষয়। আর আমার মেয়েতো আপনারই একজন দাসী। মনীব তাঁর দাসীকে যেখানে ইচ্ছা এবং যার সাথে ইচ্ছা বিয়ে দেবেন-এতে আপত্তি করার কী আছে!
ওদিকে লিময়া তা শুনামাত্র ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার অস্থিরতা চরমে পৌঁছল। সে উঠতে উদ্যত হলে উম্মুল উমারা তার হাত ধরে বসিয়ে দিলেন। বললেন, আচ্ছা, এখন কি আর না বলার উপায় আছে? সে কিছুই বললো না। চুপ রইলো। এরপর উভয়েই শুনলো যে, খলীফা সভাকক্ষ থেকে বলছেন, অনুষ্ঠানের তারিখ ধার্য করার বিষয়টি আপনাদের উপরই ছেড়ে গেলাম। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানটি আমাদের তত্ত্বাবধানে করার অনুরোধে করবো। এতে বর-কনে উভয়েরই সম্মান ও গৌরব রয়েছে।
এ কথার পরপরই উম্মুল উমারা উঠে তাঁর কামরায় চলে গেলেন। লিময়াও তার পিছুপিছু গেল। কামরায় ঢুকেই চেয়ারের উপর দপ করে বসে পড়ল এবং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। উম্মুল উমারা তা দেখে এগিয়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এবং বললেন, কান্না থামাও বেটি আমার! নিশ্চিন্ত থাক তোমার অমর্জিতে কোনো কিছুই হবে না। আর আমি তোমাকে এও নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমি যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন আমি তোমার পাশে থাকবো। আচ্ছা,মা! তুমি এখন কী করতে চাও?
লিময়া এবার সোজা হয়ে বসে বলল, আমি কখনো আপনার এই স্নেহ-মমতা ভুলতে পারবো না আম্মাজান! আপনি সত্যিই মহৎ ও মমতাময়ী মা। আমি এ মুহূর্তে  আব্বার সাথে তাঁর সেনাশিবিরে গিয়ে এ বিষয়ে মতবিনিময় করতে চাই।
উম্মুল উমারা বললেন, কিন্তু তুমি এই রাতে কীভাবে রাস্তায় বের হবে? তাছাড়া রাজপ্রাসাদের সকল ফটক এখন বন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু তোমার মত উঠতি বয়সি তরুণীর জন্য এ মুহূর্তে রাজপ্রাসাদ থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া যায় না।
লিময়া অকপটে উত্তর দিল, না মা! আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। আমি অন্ধকার ভয় পাই না। আমি রাজপ্রাসাদ থেকে নওকরদের বেশে বের হয়ে যেতে পারবো। উম্মুল উমারা এবার রাজি হলেন। তিনি বাদীদেরকে নির্দেশ দিলেন, লিময়াকে যেন রাজপ্রাসাদের নওকরদের পোষাক এনে দেওয়া হয়। লিময়া নওকরদের পোষাক পরলে মনে হল যেন সে তাদেরই একজন।
উম্মুল উমারা দরজা পর্যন্ত লিময়া বিদায় জানিয়ে ফিরে গেলেন। আর লিময়া পিতার সেনাশিবিরের যাওয়ার উদ্দেশ্যে কামরা থেকে বের হয়ে প্রধান ফটকের দিকে রওয়ানা দিল।

ভাষান্তর: প্রবন্ধিক, শিক্ষাসচীব, আল-মানহাল মডেল কওমী মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ কায়রাওয়ান রাজপ্রাসাদে : ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

  1. মোঃ ফজলুর রহমান says:

    উপন্যাসটি অনেক ভাল লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight