কায়রাওয়ানী দুলহান

Upnnas

পূর্বপ্রকাশিতের পর…

মুসলিমের বাড়ি পৌঁছে দেখল, তার বাড়ির প্রধান ফটকে মানুষ গিজগিজ করছে। কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ যমীনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে অথবা তার সাহায্য চাচ্ছে।
লিময়া তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল যে, কাফুরী ও ইখশীদি সেনাঅফিসাররা জাওহারের সাথে আলেকজান্দ্রিয়ায় যে সন্ধিচুক্তি করেছিল, তা ওরা ভঙ্গ করেছে। এ খবর জনগণের কাছে পৌঁছলে, সকলেই ক্রোধ ও গোস্বায় ফেটে পড়ে।
লিময়া মানুষের ভীর ঠেলে অনেক কষ্টে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। দাড়োয়ানকে বলল, এ মুহূর্তে তার মুসলিমের সাথে দেখা করা দরকার।
দাড়োয়ান বলল, এখন সম্ভব নয়। তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে আছেন।
লিময়া বলল, আমার কাছেও অতীব জরুরী একটি বার্তা রয়েছে, যা এ মুহূর্তে তাঁর কাছে হস্তান্তর করা আবশ্যক।
ফলে দাড়োয়ান তাকে যাওয়ার জন্য সুযোগ করে দিল। লিময়া এক নওকরের কাছে তার ঘোড়াটি দিয়ে মুসলিমের কামরায় প্রবেশ করল। মুসলিম তখন কিছু গণ্যমান্য লোক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর সাথে বসে পরামর্শ করছিলেন। তারা সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হয়ে নানানজন বিভিন্ন কথা বলছিল।
মুসলিম লিময়াকে একনজর দেখেই চিনে ফেলেন। মজলিস থেকে উঠে তাকে নিয়ে অন্য কামরায় চলে গেলেন। লিময়া দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজের মুখোশ সরিয়ে ফেলল।
মুসলিম বললেন, কী ব্যাপার? কোন নতুন সংবাদ?
লিময়া তাকে বৃত্তান্ত জানাল। তাকে অবগত করল যে, হুসাইন ইবনে জাওহার এখন বিনতে ইখশীদের বাসভবনেই পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুস্থতার সাথে অবস্থান করছে। আর লিময়া হুসাইনের পক্ষ থেকে তার পিতার নিকট এ পত্রটি নিয়ে যাচ্ছে। তার এখন চিঠিটি হস্তান্তরের জন্য জাওহারের বর্তমান অবস্থান জানা জরুরী। তাই সে তার কাছে এসময়ে এসেছে।
এরপর লিময়া ইয়াকুব ইবনে কাল্লিসের খবরাখবর জিজ্ঞাসা করল।
মুসলিম বলেন, উজীর ইবনুল ফুরাত তার কাছে অঢেল সম্পদ রাখার দায়ে গ্রেফতারী পরোওয়ানা জারী করেছে। একপর্যায়ে তাকে হত্যার পাঁয়তারা করলে ইয়াকুব কৌশলে পালিয়ে যায় এবং গোপনে জাওহারের কাছে আশ্রয় নেয়। এখনও তাঁর কাছেই আছে।
এরপর মুসলিম তার কিছু ঘনিষ্ঠ সহচরকে লিময়ার সাথে দিয়ে দিলেন। তারা ঘোড়ায় চড়ে জাওহারের বাহিনীর পেছন দিক দিয়ে গিয়ে মিলিত হল।
জাওহার তখন তাঁর কামরাতে বসা ছিলেন। তাঁর পাশে অনেক সেনাঅফিসাররাও বসা ছিল। এমন সময় দাড়োয়ান এসে বলল, ফুসত্বাত্ব থেকে এক দূত এসেছে, সে আপনার সাথে একাকী সাক্ষাত করতে চায়।
জাওহার উপস্থিত সকলকে চলে যেতে ইশারা করলেন। সকলে তাবু ত্যাগ করলে তিনি দূতকে হাযির করার নির্দেশ দিলেন।
লিময়া সৈনিকের পোষাকেই এল এবং ভিতরে ঢুকেই মুখোশ খুলে ফেলল। সে জাওহারের হাতে ঝুঁকে চুমু খেল।
জাওহার তাকে দেখে আবেগ তাড়িত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, লিময়া, তুমি!!
লিময়া ঠোঁটে আঙুল রেখে এখানে তার আগমণের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য বলল।
জাওহার তাকে পিতৃস্নেহে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তাঁর চোখে তখন আনন্দাশ্র“ টলমল করছিলো।
লিময়া নিম্নস্বরে বলল, আমি দু’টি সুসংবাদ নিয়ে এসেছি।
জাওহার বলেন, আমার জন্য সবচে’ বড় সুসংবাদ তো হল যে, তোমার সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে।
লিময়া বলল, তবে আপনার জন্য এরচে’ আরো বড় খোশখবর আছে!
জাওহার বললেন, সেটি কী?
লিময়া বলল, প্রথম সুখবর হলো, হুসাইন এখানেই আছে এবং নিরাপদেই আছে।
জাওহার বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী! হুসাইন এখানে আছে?
লিময়া বলল, শুধু তাই নয়; আপনার কাছে পৌঁছানোর জন্য সে আমাকে এই চিঠিটিও দিয়েছে।
জাওহার চিঠিটি হাতে নিয়ে খুলে হুসাইনের হস্তলিপি শনাক্ত করলেন। এরপর চিঠিটি একপাশে রেখে বললেন, লিময়া! আল্লাহর শোকর। কী দিয়ে তোমার শোকর আদায় করবো, তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
লিময়া সাথে সাথেই উত্তর দিল, সকল প্রশংসা ও সকল শোকর কেবল আল্লাহ তা‘আলার। পাশাপাশি শীঘ্রই  আপনি শত্র“দের ওপর বিজয়লাভ করে তাঁরই শোকর আদায় করবেন। কারণ আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি যে, মূল নেতৃত্বের মাঝে চরম মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব। আপনি ওদের চেঁচামেচিতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়াবেন না। আর এটিই আমার দ্বিতীয় খোশখবর।
জাওহার বললেন, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন প্রিয় বেটি! তুমি কি কায়রাওয়ান ত্যাগ করার পর থেকে তোমার সকল ঘটনা আমাকে শুনাবে?
লিময়া এবার বসল। সে জাওহারকে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করল। একেবারে হুসাইনের চিঠি লেখার আগপর্যন্ত। এপর্যায়ে এসে জাওহার চিঠিটি খুলে পড়তে লাগলেন। চিঠি পড়া শেষ হলে লিময়াকে লক্ষ্য করে বললেন, হুসাইন যা যা চেয়েছে, সবই পুরা করা হবে। কিন্তু ওই দুই বিশ্বাসঘাতক সালিম ও তার চাচা আবু হামেদ কোথায়?
লিময়া বলল, এই তো কিছুক্ষণ আগেও দেখেছি যে, ওরা সৈনিকদেরকে  যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করছে। আচ্ছা, আমীরুল মুমিনীন মুঈয কেমন আছেন?
জাওহার বললেন, তিনি সহী সালামতেই আছেন। আমি যদি তাঁর দু’পায়ে রক্তও ঢেলে দেই, তারপরও আমি তাঁর ঋণ শোধ করতে পারবো না। তুমি তো জান যে, তাঁর কাছে আমার পদবী ও মর্যাদা কী। কায়রাওয়ান থেকে এ অভিযানে বের হওয়ার প্রাক্কালে তিনি  যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তুমি শুনলে সত্যিই বিস্ময়াভিভূত হবে। তিনি সেদিন নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমার সাথে যেন অনেক স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হয়।  তিনি তাঁর ছেলে, ভাই, আমীর-উমারা এবং সর্বস্তরের নাগরিকদেরকে পায়ে হেঁটে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য নির্দেশ দেন। ফলে আমি তখন ঘোড়ায় আরোহী ছিলাম। আর সকলে হাঁটছিলো। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর সকল গভর্ণরদেরকে নির্দেশ জারী করলেন যে, আমি তাদের এলাকা অতিক্রম করার সময় তারাও যেন আমাকে পায়ে হেঁটে অভ্যর্থনা জানায়।
এমন উষ্ণ সংবর্ধনার মাঝে আমি যখন বারকাহ পৌঁছলাম। ওই অঞ্চলের গভর্ণর আমাকে এমন অভ্যর্থনা জানাতে সংকোচ করল। এর পরিবর্তে সে আমাকে পঞ্চাশহাজার স্বর্ণমুদ্রা দিতে প্রস্তাব করল। কিন্তু আমি তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম যে, আমীরুল মুমিনীনের নির্দেশ মান্য করা ছাড়া অন্য কোন কিছু শুনতে চাই না। ফলে সে নিরুপায় হয়ে আমীরুল মুমিনীনের নির্দেশমত পায়ে হেঁটে বিদায় অভ্যর্থনা জানাল।
লিময়া তুমিই বলো, এমন মহান খলীফার জন্য আত্মোৎসর্গ করলে অতিরঞ্জন হবে?
লিময়া স্বগতোক্তি করে বলল, না, তা কখনো হবে না। আমিও তো কখনো তাঁর ওই মহানুভবতা ভুলতে পারবো না; যেদিন তিনি আমাকে তাঁর মেয়ে বলে বরণ করে নিয়েছিলেন।’ তো বিনতে ইখশীদ ও তার মহল রক্ষার ব্যাপারে স্থীর করেছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight