কায়রাওয়ানী দুলহান মূল : জুর্জি যীদান ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

পূর্ব প্রকাশিতের পর…

জাওহার বললেন, তোমরা মহলের ওপরে সবুজ পতাকা উড়াবে। তাহলে আমাদের সৈনিকদের কেউ তার কাছেও ঘেষবে না।
-তাহলে কী এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিবেন?
-না, আজ রাতটি তুমি এখানে থেকে যাও। আগামীকাল দেখবো কি করা যায়।
আজ নয় কাল, এভাবে লিময়া জাওহারের শিবিরে কয়েকদিন কাটাল। ওদিকে বিনতে ইখশীদ সংবাদ শুনার জন্য ছটফট করছিলেন। তাঁর কাছে মনে হতে লাগল যে, পরিশেষে ফাতেমীরাই বিজয়ী হবে। এর ফলে নিজেকে নিয়ে তার অনেক আশংকা হতো। কিন্তু যখনই হুসাইনের কথা মনে হতো, তখনই তার মনে আশার আলো মিটমিট করে জ্বলে উঠতো।
একদিন তার আশঙ্কা ও অস্থিরতা তীব্রতর হলে, হুসাইনকে তার কাছে নিয়ে আসতে বললেন। সে এলে শাহজাদী চলমান যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।
হুসাইন নি:সংকোচে উত্তর দিল, মোহতারামা! নি:সন্দেহে আমীরুল মুমিনীন মুঈযের বাহিনীর বিজয় হবে।
শাহজাদী বললেন, আশ্চর্য! তুমি এত দৃঢ়তার সাথে তা কীভাবে বলতে পারলে? অথচ তুমি তো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো নি কিংবা কারো কাছ থেকে যুদ্ধের সংবাদও পাওনি।
হুসাইন বলল, আমি আপনার মহলে বন্দি থাকা সত্ত্বেও এ যুদ্ধের ফলাফল বলে দিতে পারি। কারণ, আমাদের বাহিনীর প্রতিটি অফিসার ও সৈনিক এবং এলাকার সকল নাগরিক সবদিক দিয়েই একতাবদ্ধ। তাদের প্রত্যেকেই খলীফার জন্য জান দিতে প্রস্তুত। আপনাদের সৈনিক ও নাগরিকরাও কী অনুরূপ?
শাহজাদী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, না বৎস! দুর্ভাগ্যবশত আমরা এরকম হতে পারিনি।
হুসাইন বলল, আমি আপনাকে এর একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি, কায়রাওয়ান থাকাবস্থায় আমি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এরপরই মিসর আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে সে বলল, না এই বিয়ে ফুসত্বাত্বেই হবে, তা বিজিত হওয়ার পর। এরপর সেও এ যুদ্ধে অংশ্রগ্রহণ করার জন্য কায়রাওয়ান ত্যাগ করেছিল। এখন পর্যন্ত আমরা তার বর্তমান অবস্থান জানতে পারিনি। বিদায়কালে আমাকে যে কথাটি বলেছিল, তা আজীবন আমার স্মরণ থাকবে। সে বলেছিল, ইনশাআল্লাহ ফুসত্বাত্বেই নীলনদের পারে মুঈয লিদীনিল্লাহর বাসভবনে আমাদের দেখা হবে।
বিনতে ইখশীদ তার এ কথায় খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, সত্যিই সে অসাধারণ মেয়ে। এখন আমার মনে হচ্ছে, তোমাদের নারীরাই অন্যসব নারীদের তুলনায় অধিক সাহসী। এই তো কিছুদিন আগে ইয়াকুব তোমাদের দেশের একটি বাদী আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলো। সেও বুদ্ধি, জ্ঞান ও সাহসিকতায় অনন্যা যুবতী। সে আমাকে এও বলেছে যে, সে তোমাকে ও তোমার পিতাকে ভাল করেই চেনে এবং তোমাকে যারা নিয়ে এসেছিল ওদেরকেও জানে।
হুসাইন এবার ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করল, জনাবা, তার নামটা কী?
বিনতে ইখশীদ বললেন, সালামাহ।
হুসাইন কিছুক্ষণ চুপ করে মাথা চুলকাতে লাগল। এরপর জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা ওই মেয়েটি কি সেই যে, আমার কাছে সৈনিকবেশে নিরাপত্তাপত্র আনতে গিয়েছিলো?
-হ্যাঁ, আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলতে পারি যে, সালামা আনুগত্য, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় একজন অদ্বিতীয়া যুবতী। আমাকে বলে যে, সে বাদী। কিন্তু তার আচার-উচ্চারণে মনে হয়, সে কোন সম্ভ্রান্ত ও উঁচু বংশের মেয়ে।
হুসাইন এ কথা শুনে সন্দেহ পোষণ করলো যে, এই সালামাহ লিময়াই হবে।
এ কথোপকথনের মাঝেই বিনতে ইখশীদ বাইরে অনেক হৈচৈ ও হট্টগোল শুনতে পেলেন। তিনি ধীরে ধীরে বারান্দার কাছাকাছি গিয়ে কান পাতলেন। শুনতে পেলেন, বাইরে তরবারির ঝনঝনানি এবং ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি।
বাইশ
এরপর তিনি দৌড়ে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেন। দেখলেন রাওযাতে মুঈযযের সেনা গিজগিজ করছে। হাতে তাদের চকমকে তলোওয়ার, কাঁধে বড় বর্শা। তারা ধীরে ধীরে বীরদর্পে অগ্রসর হচ্ছে। পুল পার হয়ে ফুসত্বাত্বের দিকে কাছাকাছি চলে এসেছে। কেউ তাদের পথরোধ করার জন্য এগিয়ে আসছে না।
এ অবস্থা দেখে শাহজাদী হতবিহবল হয়ে চিৎকার জুড়ে দিলেন। হায়, শত্র“রা তো আমাদের শহরে ঢুকে পড়েছে। এবলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে যমীনে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন; ফলে হুসাইন দৌড়ে এসে তাকে রক্ষা করলো।
হুসাইন বলল, মোহতারামা! আপনি শান্ত হোন। আমি আপনার বাড়িতে যে ইযযত-সম্মান ও কদর পেয়েছি; এর কৃতজ্ঞতা আদায় স্বরূপ আপনাকে জানবাজি রেখে হেফাজত করবো। আমাকে এখন কেবল প্রধান ফটকে যাওয়ার রাস্তাটি দেখিয়ে দিন। এরপর যা যা করার আমিই করবো।
শাহজাদী তাকে প্রধান ফটকে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিল। সিঁড়ি ভেঙে দ্রুতপদে সে নিচে নেমে গেল। বাইরের প্রধান দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখল তা বন্ধ। আচমকা দেখতে পেল যে, মরক্কো সৈনিকদের পোষাক পরিহিত এক সৈনিক অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে ওই দরজার ওপর চড়তে লাগল।
হুসাইন তাকে হাঁক ছেড়ে বলল, এই! তুমি ওখানে কী করছ। নিচে নেমে এসো।
সৈনিকটি তার কথায় কোন কর্ণপাতই করল না। সে তার মত দরজা বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
এবার হুসাইন আরো কড়া স্বরে নির্দেশ দিল, এই আমি তোমাকে ওখান থেকে নামতে বলছি। আমি হুসাইন বিন জাওহার।
তারপরও সৈনিকটির মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তার কোন কথা সে এতটুকুও আমলে নিল না। সৈনিকটি একেবারে দরজার উপরে পৌঁছে কোমরের কাছ থেকে একটি সবুজ পতাকা বের করে দরজার উপরিভাগে গেড়ে দিল। এরপর সে দেয়ালের ওপর থেকে দ্রুতগতিতে নেমে সোজা বাসভবনের দিকে চলে গেল।
হুসাইনও তার পিছুপিছু দৌঁড়ে গেল। সে সৈনিকটিকে বলতে লাগল, কে তুমি আমার নির্দেশ তুমি পালন করনি কেন?
তখন সৈনিকটি শাহাদাত আঙুল দিয়ে চুপ করতে ইশারা করল। তারপর সে দ্রুতগতিতে প্রাসাদে ঢুকে গেল। হুসাইনও তার পিছনে দৌঁড় দিল। কিন্তু সে তার নাগাল পেল না। সৈনিকটি বাসভবনের অভ্যন্তরে হারিয়ে গেল।
হুসাইন বাসভবনের ভিতরে ঢুকে দাড়োয়ানকে বলল, যেন শাহজাদীকে খবর দেওয়ার জন্য।

শাহজাদী তৎক্ষণাৎ হাযির হয়ে বললেন, কী হয়েছে?
হুসাইন বলল, না মোহতারাম। উদ্বেগজনক কিছুই ঘটেনি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ওই যে দেখুন প্রধান ফটকের ওপর আব্বার সবুজ পতাকা উড়ছে। এটি হলো নিরাপত্তার নিদর্শন। এর ফলে কেউ এ বাড়িতে হানা দেয়ার দু:সাহস করতে পারবে না।
তার কথায় বিনতে ইখশীদ বেলকনি দিয়ে প্রধান ফটকের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলেন যে, সত্যিই তো তার ওপর সবুজ একটি পতাকা পতপত করে উড়ছে।
তিনি বললেন, কিন্তু এটি ওখানে উড়াল কে?
হুসাইন বলল, আমাদেরই এক সৈনিক। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সে ওই সৈনিকটিই যে আব্বার কাছে আমার চিঠিটি নিয়ে গিয়েছিল।
বিনতে ইখশীদ বললেন, তার মানে সালামাহ এসে গেছে? কোথায় সে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight