কায়রাওয়ানী দুলহান : ফুসত্বাত্বে

পূর্বপ্রকাশিতের পর…
আবু হামেদের কথায় কাফুরের চেহারায় আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল..।  প্রশ্ন করলেন, তুমি কি নিশ্চিত যে, মিশনে তুমি এ পরিমাণ সফলতা অর্জন করতে পেরেছ?
আবু হামেদ বলল, জনাব! আমি শতভাগ নিশ্চিত। আপনি জানেন যে, আমি ও আমার এই ভাতিজা (সালিমের দিকে ইঙ্গিত করে) যুদ্ধসরঞ্জাম মজুদ করছি এবং পার্শ্ববর্তী কবীলাগুলোকে আমাদের কাক্সিক্ষত দিনটির সফলতার লক্ষ্যে অর্থ-সম্পদ জোগাড় করার জন্য অনুপ্রাণীত করছি। ইতোমধ্যে আমরা অনেক সম্পদ জমা করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের মিশনে সফলতার পথে বাঁধা ছিল দু’জন ব্যক্তি। তারা হলো, মুইয লিদীনিল্লাহ এবং তার সেনাপতি জাওহার আসসিকিল্লী..। কিন্তু এখন আর তাদের পক্ষ থেকে কোন কিছুর আশঙ্কা নেই। তাদেরকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে..।
লিময়া শেষোক্ত বাক্যটি শুনামাত্র তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। চিৎকার দিয়ে তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল যে, চুপ করো হে নরাধম! তুমি মিথ্যুক, তুমি মুনাফিক। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। বহুকষ্টে সে তার ক্রোধ সংবরণ করল।
ইয়াকুবও চাচ্ছিলেন আবু হামিদের পর সালিমও কথা বলুক। লিময়া যেন তার আওয়াজ শুনতে পায়। তাই ইয়াকুব সালিমকে লক্ষ্য করে বললেন, এই সুনিপুণ পরিকল্পনায় নিশ্চয় আপনারও অনেক অবদান রয়েছে?
সালিম উত্তরে বলল, না না, আমি তা দাবি করি না। এ মহান পরিকল্পনায় (??) আমার উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিলনা। আমার কাজ ছিল কেবল অবলা, সরলমনা এক যুবতীকে প্রেমের প্রলোভনে নিজেদের বাগে আনা। মেয়েটি ভাবত, আমি তাকে ভালোবাসি…। মূলত আমি তাকে ঘৃণা করতাম। আমি শুধু তার সাথে প্রেমের অভিনয় করতাম। এতে সে প্রবঞ্চিত হয়। আমাদের ওপর তার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের একপর্যায়ে তাকে আমরা মুঈযের রাজপ্রাসাদে গোয়েন্দাগিরির দায়িত্ব দিলাম।’
এবার লিময়া আর টিকতে পারল না। সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে সালিমের দিকে অগ্রসর হতে যাবে; কিন্তু ইয়াকূব তার এই উত্তেজনাকর অবস্থা দেখে তাকে ধৈর্য ধরার ইঙ্গিত করলেন। ফলে সে পিছু হটলো এবং ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসতে লাগল।
তাদের এই কথাবাতার মাঝেই হঠাৎ কাফূরের কাশি আরম্ভ হল। ডাক্তার তখন আবু হামেদ ও সালিমকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। অগত্যা তারা বের হয়ে গেল।
আবু হামেদ ও সালিম বেরিয়ে গেলে লিময়া দ্রুত ঔষধের ব্যাগ ডাক্তারের সামনে এনে ধরল। ডাক্তার কিছু ঔষধ নিয়ে কাফুরের নাকে শুকালেন। কিন্তু তার কাশি প্রচন্ড ছিল যে, দীর্ঘ একঘণ্টা যাবত অনেক কোশেশ ও প্রচেষ্টার পর তার কাশি থামল এরপর তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন ইয়াকুব লিময়াকে ইশারা করলেন। ফলে সে ঔষধের ব্যাগ ডাক্তারের কাছে রেখে ইয়াকুবের পিছনে পিছনে বড় বাগানের বাইরে এসে পৌঁছল। লিময়া ইয়াকুবের এই উপকারের শুকরিয়া জ্ঞাপন করল। তাঁর বদৌলতেই সে ওই দুই গাদ্দার আবু হামেদ ও সালিমের মুখোশ উম্মোচন এবং সকল চক্রান্তের বর্ণনা নিজ কানে শুনতে পেল। পাশাপাশি সে ডাক্তার শালূমের কাছেও তার শোকর ও কৃতজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করল।
এরপর লিময়া ইয়াকূবের নিকট সরায়খানায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইল। ইয়াকূব তাকে অনুমতি দিলে সে সরায়খানায় পৌঁছলে মালিক তাকে স্বাগত জানায়।
লিময়াও তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার গাইড ও নওকর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল।
সরায়খানার মালিক বলল, ওরা কিছুক্ষণ আগে বিনোদন করতে এবং ফুসত্বাতের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য বেরিয়েছে।
লিময়া সরায়খানায় কয়েকদিন অবস্থান করল। এসময় সে ইয়াকুব ও মুসলিম ইবনে আব্দুল্লাহর বাড়িতে আসা-যাওয়া করত। অনেক সময় সে ফুসত্বাতের পথ-ঘাটে হেঁটে মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বেড়াত। সেখানে শী‘য়া সম্প্রদায় এবং তাদের সাথে সম্পৃক্ত সকলের প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ণ ও নিগৃহতা তাকে ভীষণ উদ্বিগ্ন করল।
মুসলিম ইবনে আব্দুল্লাহর বাড়ি একবার যিয়ারতকালে লিময়াকে তিনি তার বাড়িতে থেকে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করলেন। লিময়ার কোন ওযর-আপত্তিই তিনি গ্রহণ করতে চাইলেন না। অগত্যা লিময়া তাঁর প্রস্তাবে রাজি হল।
মুসলিম তখন তার জন্য বাড়ির একটি কামরা বরাদ্দ করলেন এবং উন্নত আসবাব ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে কামরাটি ভরপুর করে দিলেন। লিময়া মুসলিমের বাড়িতে অত্যন্ত সমাদর ও সম্মানের সাথে থাকতে লাগল। বাড়ির সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে। ইয়াকুব ইবনে কালসও অধিকাংশ সময় লিময়ার সাথে এ বাড়িতে এসে দেখা করেন। এখানে বসে তারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। তারা আশঙ্কা করছিলেন যে, অচিরেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পতন ঘটবে। এরই মাঝে সংবাদ এলো যে, কাফূর মারা গিয়েছেন এবং আহমদ বিন আলী বিন আলইখশীদিকে মসনদে বসানো হয়েছে। নতুন শাসনকর্তা ‘আহমদ’ ছিলো ছোট বালক। বয়স এখনো এগার পার হয়নি। ফলে শীঘ্রই কর্তৃত্বের চাবিকাঠি খুবদ্রুতই কাফুরের উযীরে আযম ‘জা‘ফর ইবনুল ফুরাতের কাছে চলে গেল।
ইবনে কালসের কাছে এক সূত্রে খবর এল যে, ইবনুল ফুরাত শীঘ্রই কাফূরের ঘনিষ্ঠ লোকদেরকে বিতারিত করবেন এবং তাদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করবেন। আর সর্বপ্রথম তিনিই হবেন তার প্রথম লক্ষবস্তু। ফলে ইয়াকুব নিজসম্পদ ক্ষোয়া যাওয়ার ভয়ে তা লুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
এদিকে লিময়া ও আবু মুসলিম বালক ‘আহমদ’ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর এবং ইবনুল ফুরাতের কর্তৃত্বের ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার প্রতিক্ষা করছিল।
একদিন ইয়াকুব তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য এলেন। ইয়াকুব তখন আত্মগোপনে ছিলেন। লিময়া তাকে আবু হামেদ ও সালিম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, ওইদিন কাফুরের সাথে সাক্ষাতের পর আর তাকে দেখিনি। তবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, ওরা যায়নাব বিনতে ইখশীদের রাজপ্রাসাদে গিয়ে কোন চক্রান্ত করছে।
তখন লিময়া আকাঙক্ষা করতে লাগল, যদি সে বিনতে ইখশীদের সাথে সাক্ষাত করতে পারত; তাহলে হয়তো সে ওদের চক্রান্ত নস্যাৎ করতে সক্ষম হত।
এদিকে হঠাৎ তার মনে হল, গাইড, নওকর এবং নিজের জিনিসপত্র সবই সরায়খানায় রেখে এসেছে। তাই সে মুসলিমের কাছে সামানপত্র আনতে সরায়খানায় যাওয়ার অনুমতি চাইল।
মুসলিম বললেন, আরে! এর জন্য তোমাকে যেতে হবে কেন। তুমি থাক, আমি কাউকে পাঠিয়ে তোমার সব সামানা আনিয়ে দিচ্ছি। সাথেসাথে তোমার গাইড ও নওকরকে তোমার ব্যাপারেও নিশ্চিত করব।
লিময়া বলল, বরং আমি নিজে যাওয়াটাই অধিক মঙ্গলকর ও ফায়দাজনক হবে। আর ইনশাআল্লাহ আমি আজ রাত কিংবা আগামীকাল সকালে ফিরে আসব।
মুসলিম বললেন, না, তুমি আজ রাতে অবশ্যই ফিরে আসবে।
জাওহার আলেকজান্দ্রিয়ায় লিময়া মুসলিমের সম্মতি পেয়ে নিজ কামরায় গেল। পুরুষের পোষাক পরে কামরা থেকে বের হলো। সে যে রাস্তা দিয়ে এখানে এসে ছিল ওই রাস্তা ধরেই সরায়খানায় পৌঁছল। তাকে দেখেই সরায়খানার মালিক অত্যন্ত আনন্দের সাথে স্বাগত জানালো। লিময়া তাকে নওকর ও গাইড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বলল, ওরা অনেকদিন হলো ঘোড়া নিয়ে চলে গেছে।
-আর আসবাবপত্র?
– হ্যা, সেগুলো আমি আপনার কামরায় একটি তালাবন্ধ সিন্দুকে রেখে দিয়েছি। তবে আপনার ওই কামরাটি দু‘মুসাফির ভাড়া নেওয়ায় সিন্দুকটি আমি একপাশে সরিয়ে রেখেছি।
এরপর সরায়খানার মালিক কামরার দিকে হাঁটা দিল। লিময়াও তার পিছুপিছু গেল। কামরার কাছে গিয়ে জোরে তার দরজার কড়া নাড়ল। দেখল কামারাটি তালাবদ্ধ।
লিময়ার দিকে তাকিয়ে সে বলল, জনাব, তাদের অনুপস্থিতিতে জোরপূর্বক দরজা খুললে আমার আশঙ্কা হয় যে, তারা আমার ওপর চুরির অপবাদ আরোপ করতে পারে। তারচে’ আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। তারা বেশিক্ষণ বাইরে দেরি করবেন না। আর ফিরে আসার পূর্বপর্যন্ত আপনি আমার কামরায় অবস্থান করুন।
অনন্নোপায় হয়ে লিময়া তার পিছনে পিছনে পার্শবর্তী আরেকটি কামরায় প্রবেশ করল। সে অধিক হাঁটার কারণে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে সে দরজা বন্ধ করেই সোফায় গা এলিয়ে দিল। একটু পরেই সে বাইরে কারো পদধ্বনি শুনতে পেল। তড়িঘড়ি করে উঠে যখন সে দরজা মৃদু ফাঁক করল, বিস্ময়ে তার চোখ কপালে ওঠে গেল। ওমা একি! এ যে আবু হামেদ ও সালিম। ওরা সেই তার কামরা-ই প্রবেশ করছে। সে দ্রুত দরজা বন্ধ করে সোফার উপর ওঠে দেয়ালের একটি খিড়কি খুলল, যার দ্বারা সে পার্শ্ববর্তী কামরায় তাদের সব কথা শুনতে পাবে।
লিময়া সালিমকে বলতে শুনল, চাচা! আজ কি ‘বিনতে ইখশীদের সাথে সাক্ষাত হয়েছে।
আবু হামেদ বলল, হ্যাঁ, তবে তার সাথে সাক্ষাত না করাই ভাল ছিল।
সালিম বলল, কেন?
আবু হামেদ বলল, কারণ তাঁর সাথে সাক্ষাত করলে, তিনি আমাকে উদ্বেগজনক কিছু সংবাদ দেন।
সালিম সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, কী সংবাদ?
আবু হামেদ বলল, কাফূরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কায়রাওয়ানবাসী পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছে। সালিম ভয় ও আতঙ্ক জড়ানো কণ্ঠে বলল, তা কীভাবে? তারা কখন এলো? তাদের সাথে কে আছে? এখন তারা কোথায়?
আবু হামেদ বলল, মুঈয লিদীনিল্লাহ আসেন নি। তার সেনাপতি জাওহার বিশাল বাহিনী নিয়ে এখন আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করছেন।
লিময়া এ খবর শুনে খুশিতে ড়তে লাগল। এরপর সে আবু হামেদকে বলতে শুনল, কিন্তু ঘটনা যাই হোক আমি আমার সংকল্প থেকে একচুলও নড়ব না। কেননা জাওহার শীঘ্রই আমার কৌশলের সামনে নতিস্বীকার করে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হবে!! সালিম বলল, তার পিছপা হওয়ার সম্ভাবনা তো দেখছি না। কারণ, তার সাথে তো বিশাল বাহিনী আছে!
আবু হামেদ বলল, আমি তো বললাম অবশ্যই সে পিছু হটবে। ওই ছোট বালকটিকে নিয়ে আসার পর আমরা তাকে আমাদের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে আটকে রাখব।
সালিম বলল, আপনি কার কথা বলছেন?
আবু হামেদ বলল, হুসাইন!
হুসাইনের নাম শুনতেই লিময়ার হৃদয়ের ধুকধুকানি বেড়ে গেল। কিন্তু আবু হামেদের কথার রহস্য অনুধাবন করতে পারল না। ইতোমধ্যে সালিমকে প্রশ্ন করতে শুনল, কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?
আবু হামেদ বলল, ‘ফাজ্জুল খিয়ার’-এ আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য সফল হওয়ার জন্য সম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওই সম্পদ দখল করার জন্য হুসাইন অভিযান পরিচালনা করেছিল। কিন্তু আমাদের লোকেরা তাকে গ্রেফতার করেছে। মনে হচ্ছে ওই মেয়েটি (লিময়া) এই সম্পদের রহস্য ফাঁস করে দিয়েছে। হুসাইনকে এখানে নিয়ে আসা হলে আমরা তাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে রাখবো এবং তার মাধ্যমেই আমরা আমদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করব।
লিময়া আবু হামেদের মুখে এ ব্যাখ্যা শুনে ওর মাথা গুলিয়ে গেল। প্রচণ্ড মর্মপীড়ায় সে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। ভাগ্যিস সে, সোফার উপর দুই হাত বেধে হেলান দিয়ে বসল। সে সালিমকে বলতে শুনল, কিন্তু লিময়া এখন কোথায়?
আবু হামেদ বলল, আমার গুপ্তচররা সংবাদ দিয়েছে যে, সে কায়রাওয়ান থেকে বেরিয়ে গেছে। তবে সে তার যাত্রার দিক সম্পূর্ণ গোপন রাখায় কেউ তার বর্তমান অবস্থান জানে না।
সালিম বলল, তার ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়?
আবু হামেদ বলল, আমার প্রবল ধারণা যে, সে এখানে এসেছে। আমি বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছি, এখানকার ‘ইয়াকুব বিন কালসই’ খলীফা মুঈযকে আমাদের হত্যার ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছে। আর এজন্যই খলীফা আমদের হাত থেকে বেঁচে যায়। পাশাপাশি আমার দৃঢ়বিশ্বাস যে, এই ইহুদী এখানকার সেনাঅফিসারদেরকেও জাওহারের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সে যদি এটি করতে চাই, সে তাতে কখনও সফল হবে না। কারণ, তুমি তো জান এখানকার বাহিনী  পারস্পরিক দ্বন্দ্বে জড়িত। তবে আমি এখন পর্যন্ত যায়নাব বিনতে ইখশীদের মধ্যস্থতায় মিসরীয় বাহিনীর মাঝে ঐক্যপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করছি। কারণ সকলের কাছে এই যায়নাব শ্রদ্ধারপাত্র। তার কথা সকলেই মান্য করে।
এরপর নীরবতা ছেয়ে গেল। মনে হল লোক দু’জন ঘুমিয়ে পড়েছে।
লিময়া তখন ওঠে পড়ল। সরায়খানার মালিকের কাছে গিয়ে তার জিনিসপত্রগুলো এনে দেওয়ার জন্য বলল। মালিক দৌঁড়ে গিয়ে সবজিনিস নিয়ে এসে তার কাছে হস্তান্তর করল। লিময়া তার ভাড়া মিটিয়ে দিল। এরপর সে মুসলিম ইবনে আব্দুল্লাহর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল।
রাত তখন প্রায় গভীর হয়ে এসেছিল। সে তার বাড়িতে পৌঁছতেই দেখল যে, বাড়ির সামনে বহু ঘোড়া দাঁড়ানো এবং অনেক মানুষ দরজায় অপেক্ষা করছে।
লিময়া ভিতরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করল। জনাব মুসলিম কোথায়?
উত্তর এল, তিনি ওযীর জা‘ফর ইবনুল ফুরাতের সাথে একান্ত বৈঠক করছেন।
ফলে সে ওই জায়গায়-ই বসে পড়ল। সে অধীর আগ্রহে তাদের মাঝে কী কথা হচ্ছে, তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। একটু পরই হৈচৈ ও শোরগোল শুনতে পেল। মুসলিমকে দেখল ইবনুল ফুরাতকে বিদায় জানানোর জন্য বের হয়েছেন। সে শুনল যে, ইবনুল ফুরাত মুসলিমকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। আমি সেনাপতি জাওহারকে সন্ধির ব্যাপারে রাজি করাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
মুসলিম ফিরে এলেন। লিময়া তার মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে চাইল। কিন্তু তিনি বৈঠকঘরে চলে গেলেন। সেখানে অনেকলোক তার জন্য অপেক্ষা করছিল। ফলে লিময়া নিজ কামরায় চলে গেল। তার শরীর অনেক ক্লান্ত হয়ে ছিল। ফলে সে বিছানার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। শোয়ার সাথে সাথেই রাজ্যের ঘুম এসে তাকে কাবু করে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে সে গভীর ঘুমে হারিয়ে গেল।
পরদিন সকালে বাড়ির বাইরে শোরগোল ও অশ্বের হর্ষধ্বনিতে লিময়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে হন্তদন্ত হয়ে উঠে মুসলিম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বলল যে, তিনি ওযীর জা‘ফরের ‘সন্ধিপত্র’ নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া গেছেন। সাথে রয়েছে মিসরের নেতৃত্বাস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধি দল।
ইতোমধ্যে ও দেখল যে, ইয়াকূব বিন কালস বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করছেন..। লিময়া তাঁকে কাছে আসতে ইশারা করল। ইয়াকূব সহাস্যবদনে তার কাছে এলেন। সালাম দিয়ে একটি কুরসি টেনে বসলেন..। এরপর লিময়া গতকাল আবু হামেদ ও সালিমদের থেকে যা যা শুনলো, সবই বর্ণনা করল..।
ইয়াকূব ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে সীমাহীন বিস্মিত হলেন এবং কিছুক্ষণ নীরবে কপাল চুলকাতে লাগলেন। তারপর বললেন, এখনতো আর আবু হামেদ ও সালিমের চক্রান্ত নস্যাৎ করার কোন উপায় নেই; তবে..। এ বলে তিনি চুপ করে গেলেন।
-তবে কী?! মেহেরবানী করে খুলে বলুন..।
– আমি যদি বলি, তুমি কি মানবে?
-আমাকে কী মানতে হবে বলুন। আমীরুল মুমিনীনের নুসরত ও সহযোগিতার জন্য যা যা প্রয়োজন, সেজন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে আমি প্রস্তুত। এতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব।
ইয়াকূব বললেন, তুমি হয়তো আঁচ করতে পেরেছো, বর্তমান সময়ে সারাদেশে যায়নাব বিনতে ইখশীদির কেমন দাপট ও কর্তৃত্ব চলছে..। আমার মাথায় একটি চিন্তা এসেছে যে, তুমি যদি তার প্রাসাদে যেতে পারতে; তাহলে তুমি নিজেই ওদের সব ষড়যন্ত্র বাঞ্চাল করে দিতে পারবে।
লিময়া বলল, তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য আমি পূর্ণ প্র¯ত্তত। কিšত্ত তাঁর অন্দরমহলে আমি ঢুকবো কীভাবে..?
-তুমি তো জান, যায়নাব সুন্দরী-রূপসী দাসীদের প্রতি অতিশয় আসক্ত..। তুমি যদি রাজি থাক, তাহলে আমি তোমাকে মরক্কো দেশের দাসীর ছদ্মবেশে তাঁর জন্য হাদিয়াস্বরূপ পাঠাতে পারি..।’
-তাহলে এখনই আমি তাঁর কাছে যেতে রাজি।
লিময়ার সম্মতি পেয়ে ইয়াকূব তাকে নিজ এলাকার দাসীদের কাপড় পরে প্র¯ত্তত থাকার নির্দেশ দিলেন। এদিকে তিনি একজন দাস-দাসী বিক্রেতা আনতে চলে গেলেন। একঘণ্টা পর ইয়াকূব একজন খদ্দের নিয়ে ফিরে এলেন।
ইয়াকূব কামরায় ঢুকে লিময়াকে দেখিয়ে খদ্দেরকে বললেন, ওর কথা-ই তোমাকে বলছিলাম। তাকে আমি শ্রদ্ধেয়া বিনতে ইখশীদের কাছে হাদিয়াস্বরূপ পেশ করতে চাই। এ দাসীটি যেমন অপরূপ সুন্দরী, তেমনি অসাধারণ বুদ্ধিমতি ও ভদ্র। আমি আশা করব, তুমি নিজে জনাবার কাছে গিয়ে এ হাদিয়াটুকু ভালভাবে পেশ করবে..।
খদ্দের বলল, তা তো অবশ্যই জনাব। এটা আমার পেশা..।
এরপর ইয়াকূব লিময়াকে ইশারা করলে সে খদ্দেরের সাথে যায়নাব বিনতে ইখশীদের প্রাসাদের দিকে চলল..।
(ক্রমশ:)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight