কায়রাওয়ানী দুলহানমূল : জুর্জি যীদান, ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

বিষমিশ্রিত মধু: খলিফা খাবার খাওয়া শেষ করলেন। ঐ বাবুর্চি শরাব নিয়ে তাঁর সামনে পরিবেশন করে বলল, জাহাপনা! এই শরাবটি খাবার হজমে সহায়ক। এটি পান করলে সাথে সাথেই বদহজম দূর হয়।’
খলিফা মুঈয শরাবের পেয়ালাটি নেওয়ার পূর্বেই হামদুন উঠে পেয়ালাটি নিয়ে বললেন, জনাব! মাফ করবেন। ইতোপূর্বে এই শরাবটি আমি দেখিনি এবং চাখিওনি। তাই আপনার আগে আমারই তা চেখে দেখা উচিত। বার্বারী গোষ্ঠীর রীতি হল, মেহমানদের অত্যাধিক আপ্যায়নস্বরূপ মেহমানের পূর্বেই মেযবান খাবার চেখে দেখে।’ এ বলে তিনি পেয়ালার সবটুকু শরাব পান করে ফেললেন। তিনি দেখলেন যে, শরাবটি সত্যিই অত্যন্ত সুপেয় ও মজাদার।’
এরপর হামদুন বাবুর্চিকে নির্দেশ দিলেন, যেন সে খলিফাকেও পেয়ালা ভরে দেয়। সেনাপতি জাওহার এবং তাঁর ছেলে হুসাইনকেও এক পেয়ালা করে পরিবেশন করে। ..
খলিফা মুঈয শরাবের পেয়ালায় এখনও চুমুক দেননি।..ইতোমধ্যে শুনতে পেলেন দ্রুতধাবমান অশ্বের ক্ষুরধ্বনি। অশ্বের উপর মুখোশপরা এক আরোহী। সে সরাসরি খলিফার দিকেই এগুলো। ঘোড়া থেকে নেমে দৌড়ে সে খলিফার কাছে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, জনাব! দয়া করে এখনই আপনি এই পত্রটি পড়–ন..।’
খলিফা বিস্মিত হয়ে পত্রটি নিলেন এবং হাতে ধরা শরাবের পেয়ালাটি দস্তরখানে রেখে দিলেন..। তাঁকে রাখতে দেখে সবাই নিজ নিজ পেয়ালা রেখে দিল।..
আরোহীটিকে উপস্থিত আর কেউ চিনতে না পারলেও হামদুন ঠিকই চিনে ফেললেন..। তিনি আরোহীর কুশল জিজ্ঞাসা করতে যাবেন, কিন্তু তা পারলেন না..। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় যমীনে লুটিয়ে পড়লেন..। নওকররা তাঁকে বহন করে পার্শ্ববর্তী তাবুতে নিয়ে গেল..।
জাওহার দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মুখোশধারীকে লক্ষ্য করে কড়াসুরে নির্দেশ দিলেন, আমরা তোমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছি। এবার বলো, তুমি কে, কোত্থেকে এসেছো এবং পত্রই বা কিসের?!
আরোহী তার মুখোশ সরাল। তার ঘাড়ে ও তার কাপড়ে ছোপ ছোপ রক্ত। ভীষণ ক্লান্তিতে তার চেহারার অবয়ব পাল্টে গেছে। আর তখনই হুসাইন দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, আরে লিময়া! তোমার কী হল? এরপর হুসাইন দৌড়ে গিয়ে লিময়া মাটিতে পড়ে যাওয়ার পূর্বেই বাহুতে ঠেস দিয়ে ধরে খলিফার পাশে নিজ আসনে তাকে নিয়ে বসাল..।
এবার খলিফা সীমাহীন বিস্ময় নিয়ে বললেন, বেটি! এসব কী হলো! ঘটনার বিবরণ দাও তো! না থাক, এখন তুমি কিছু বিশ্রাম নাও।’
খলিফা তারপর পত্রটি জাওহারকে দিয়ে পড়ে শুনাতে বললেন। লিময়া কিছুটা শক্তিসঞ্চয়ের পর ঘোড়া তাকে নিয়ে মরুভূমিতে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া থেকে নিয়ে খলিফার কাছে ফেরা পর্যন্ত যা যা ঘটলো- সবগুলো সে বিস্তারিত বর্ণনা করলো।  উপস্থিত সবাই পরস্পরে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। লিময়ার কথায় তাঁরা সীমাহীন বিস্মিত হচ্ছিল। তার কথা এদের বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। যদি লিময়ার প্রতি খলিফার আস্থা না থাকত, তাহলে তাঁরা অনেকেই তার ব্যাপারে বিভিন্ন ধারণা পোষণ করতো।..
লিময়ার কাছ থেকে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনার পর খলিফা মুঈয সেনাপতি জাওহারের দিকে তাকালেন। দেখলেন তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। বিস্ময়ে তাঁর চোখ কপালে উঠে গেছে। তাঁর অবস্থা দেখে খলিফা বললেন, জাওহার! কী হলো..! চিঠিতে কী পেলে?
জাওহার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললেন, জাহাপনা! আলহামদুলিল্লাহ চিঠিতে আশ্চর্য জিনিস পেয়েছি এবং অনেক মূল্যবান তথ্য উদ্ধার হয়েছে। এ পর্যায়ে আমার ধারণাই ঠিক হয়েছে এবং আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে..।’
খলিফা জাওহারের কথা কিছুই বুঝতে পারলেন না।  জাওহার বললেন, জাহাপনা! চিঠিতে তুমি কী পেলে, তা খুলে বলো জাওহার..!
জাওহার বললেন, জনাব! আমি তো পড়ে বুঝেছি, এবার আপনি শুনুন। ঘটনার ভয়াবহতা আপনি নিজেই অনুধাবন করতে পারবেন..।’ এ বলে জাওহার পত্র পাঠ আরম্ভ করলেন,
‘প্রাপক, আমীরুল মুমিনীন মুঈয লিদীনিল্লাহ আলফাতিমী। আল্লাহ তাআলা আপনাকে আরো শক্তিশালী ও সুসংহত করুন এবং আপনাকে তাঁর আপন নুসরত দ্বারা বিজয় দান করুন।
জনাব,আমি আপনার গুণমুগ্ধ একনগণ্য গোলাম ‘ইয়াকূব বিন কালাস’। পরকথা,
আমীরুল মুমিনীন! আমি এখনও আপনার ঐসব দান-দক্ষিণা এবং অনুগ্রহগুলোর কথা স্মরণ করি। যেগুলো আপনি আমার ও আমার পূর্বপুরুষদের উপর করেছিলেন। আমি যদিও এখনো ইসলামে দীক্ষিত হবার সৌভাগ্য লাভ করিনি, তারপরও আমাদের প্রতি আপনাদের সীমাহীন অনুগ্রহ ও বদান্যতার কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতা আদায় করার চেষ্টা করবো।
জনাব, বিশ্বস্তসূত্রে আমি জানতে পেরেছি যে, আপনার আমীর-ওমারাদের মধ্যে কিছুলোক আপনি এবং আপনার সেনাপতি জাওহারের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা মিসরের শাসনকর্তা ‘কাফূর আলইখশীদি’ এর কাছে আপনাদের দেশ আক্রমণ করতে প্ররোচিত করছে এবং সেখানে তারা সবধরণের নাশকতা চালাচ্ছে; এসব আমি নিজ কানে শুনেছি। এই তো কিছুদিন পূর্বে ‘সালিম’ নামে এক যুবক আপনাদের দেশ থেকে মিসরে আসে। সে ছিল প্রচণ্ড নেশাগ্রস্ত। সে তার সহচরদেরকে বলছিল যে, সে ও আবু হামেদ নামে আরেকজন ‘আবু আব্দুল্লাহ আশশীয়ী’র হত্যার প্রতিশোধ নিতে আমীরুল মুমিনীন  এবং তাঁর সেনাপতিকে হত্যা করার সংকল্প করেছে। এ লক্ষ্যে সিজিলমাসা অধিপতি ও তাঁর মেয়েকে ধোকা দিয়ে ওদের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে অংশীদার করেছে।..’
সেনাপতি জাওহার পত্রপাঠ শেষ করার পূর্বেই লিময়ার মাথা ঘোরাতে লাগল। এ কী! ষড়যন্ত্রের জাল এতটুকু পর্যন্ত   বিস্তৃত হয়েছিলো..!! এটুকু ভাবতেই আতঙ্কে তার শরীর হিম হয়ে গেল..। ষড়যন্ত্রের সুদূরপ্রসার ও ঘৃণ্যতায় সে বিমূঢ় হয়ে গেল..। এমন সময় খলিফার আওয়াজে সে সম্বিত ফিরে পেল।
খলিফা বললেন, এই আবু হামেদ কোথায়? এ মুহূর্তে তাকে এখানে হাযির করো।’ এরপর তিনি জাওহারের দিকে ফিরে বললেন, এ কি ঐ লোক নয়, যাকে ‘হামদুন’ তার বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে ছিলো? এরপর নির্দেশ দিলেন, এই যাও! ‘আবু হামেদ’ ও ‘হামদুন’ উভয়কেই এ মুহূর্তেই উপস্থিত করো..!
এদিকে হামদুনের নওকররা আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে খলিফার কাছে এল। তাদের একজন কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, হুযুর! আমীর হামদুন মারা গেছেন।’
লিময়া এ মর্মান্তিক দু:সংবাদে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শোকে বিমূঢ় হয়ে সে শুধু এতটুকু চিৎকার করে বলতে পারল, ‘হায় আমার আব্বাজান!’ এরপরই সে যমীনে উপুড় হয়ে পড়ে সংজ্ঞা হারায়..।
হুসাইন দৌঁড়ে গিয়ে বাদীদের ডাকলেন। বাদীরা লিময়াকে তার (লিময়ার) তাবুুতে নিয়ে গেল।..
এরপর খলিফা, সেনাপতি জাওহার ও হুসাইন ‘হামদুনের’ বিছানার কাছে গেলেন। হামদুনের মৃত্যুর ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত হলেন। হামদুনের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁরা বিস্মিত হলেন। খলিফা তৎক্ষণাৎ ডাক্তার তলব করলেন। ডাক্তার এসে হামদুনকে একনজর দেখেই চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘আমীরে সিজিলমাসা বিষপানে মারা গেছেন।’..
জাওহার বললেন, এ কীভাবে সম্ভব! আমরা সকলেই তো একই খাবার খেয়েছি!’
খলিফা সাথে সাথেই উত্তর দিলেন, তা বটে। তবে সে যে শরাব পান করেছিল, আমরা তা পান করেনি।’ এরপর তিনি ঐ শরাবের পেয়ালাটি আনতে বললেন, যা তখনো দস্তরখানেই রাখা ছিল।..
ডাক্তার শরাবের পেয়ালাটি নিয়ে তার তরলতা পরখ করলেন। এরপর তিনি পকেট থেকে পাউডার বের করে শরাবের সাথে মেশালেন। পাউডারটি মেশানোর সাথে সাথেই শরাবের রং পাল্টে গেল..। তখনই তিনি বলতে লাগলেন, এই শরাব বিষমিশ্রিত। এই শরাবই আমীর হামদুনের প্রাণ সংহার করেছে..।’
খলিফা মুঈয তখনই শরাব পরিবেশনকারী ঐবাবুর্চিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কেউ তার হদিস পেল না।
এরপর খলিফা সেনাপতি জাওহারকে নিয়ে কামরার একপাশে সরে গেলেন। মর্মান্তিক ঘটনাকে নিয়ে তাঁরা পর্যালোচনা করতে লাগলেন। সবশেষে তাঁরা একমত হলেন যে, এই ষড়যন্ত্রে ‘আমীর হামদুনের’ কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এ ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। কারণ, তিনি যদি জানতেন, এই শরাব বিষাক্ত, তাহলে তিনি কখনো তা খলিফার পূর্বে পান করতেন না।’..
খলিফা মুঈয আমীর হামদুনের আকস্মিক মৃত্যুতে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হন। খলিফার আনুগত্যের প্রতি তাঁর ইখলাস ও নিষ্ঠা, ওফাদারী ও বিশ্বস্ততায় কোন কমতি ছিল না- এ ব্যাপারে সবাই বিনাবাক্যবয়ে স্বীকার করে..।
তাই খলিফা আমীরে সিজিলমাসা হামদুনকে অত্যন্ত সম্মান ও  ভাবগাম্ভীর্যের সাথে দাফন করার নির্দেশ দেন।’
আমীর হামদুনের দাফন সম্পন্ন করে খলিফা লিময়াকে ডাকলেন। সে বাদীদের কাঁধে ভর করে উপস্থিত হল। খলিফা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘লিময়া! তোমার পিতা এবং  তোমার ইখলাস (নিষ্ঠার) ব্যাপারে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। এবার আমি তোমাকে আমাদের সাথে ‘কায়রাওয়ান’ যাওয়ার দাওয়াত দিচ্ছি।.. আর শোনো, তোমার পিতার অবর্তমানে আমিই হবো তোমার পিতা..।’
এটুকু বলেই তিনি তাবুগুলো তুলে নিতে বললেন। সাথে সাথে ঘোষণা করা হল যে, বিবাহ অনুষ্ঠান অন্য কোন সময় হবে। তারপর খলিফা তাঁর সভাসদসহ রাজপ্রাসাদ অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। লিময়াও তাঁর সাথে চললো..। সবাই রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেল। ..
লিময়া রাজপ্রাসাদে পৌঁছে উম্মুল উমারার কামরার দিকে গেল। উম্মুল উমারাকে দেখামাত্র সে তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুকরে কাঁদতে লাগল। উম্মুল উমারা মমতা ও স্নেহমাখা সুরে তাকে সমবেদনা ও সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। তাঁর স্নেহসূলভ আচরণ এবং আদর-সোহাগে লিময়ার অস্থির হৃদয় শান্ত হল এবং অনেক নিশ্চিন্তমনে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল। ..
এরপর থেকে লিময়া স্বয়ং খলিফার তত্ত্বাবধানে দিন কাটাতে লাগল..। তিনি সর্বদা তার কুশল জিজ্ঞাসা করতেন.., খোঁজ-খবর নিতেন। আর উম্মুল উমারার মা সূলভ রক্ষণাবেক্ষণ তো বলাবাহুল্য..। ঘুমের সময় ছাড়া কখনো তাকে তিনি দূরে রাখতেন না। ফলে উম্মুল উমারার সাথে লিময়ার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে..।
তারপরও যে বিষয়টি লিময়াকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত ও অস্থির করে রাখে তা হলো, ঐ দুই কুখ্যাত গাদ্দার ‘আবু হামেদ’ ও সালেম’ থেকে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।’ সে নিশ্চিত যে, ঐগাদ্দার থেকে অতিশীঘ্র পিতৃহত্যার প্রতিশোধ  নেওয়ার দ্বারাই তার এই অস্থিরতা ও অশান্তি দূর হতে পারে।.. ফলে এ জন্য সে রাতদিন বিনিদ্র থেকে প্রচুর মেধা খরচ করে প্রতিশোধ অভিযানের একটি ছক তৈরী করে।..

ভাষান্তর: নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী
শিক্ষাসচীব, আল-মান্হাল মডেল কওমী মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight