কালালা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা / মাওলানা মুজিবুর রহমান

সাহাবায়ে কেরামগণের অপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা ছিল কালালা বা নিঃসন্তান ব্যক্তির পরিত্যাক্ত সম্পদ বণ্টন এবং তার ওয়ারিস-সংক্রান্ত ব্যপারে। এরশাদ হচ্ছে, ‘লোকেরা তোমার নিকট ফতোয়া চায়, বল, আল্লাহ তোমাদেরকে কালালা সম্পর্কে ফতোয়া দিচ্ছেন। [সূরা নিসা : আয়াত ১৭৬]
জিজ্ঞাসাকারী সাহাবী ছিলেন হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ রা.। যেমন শুবা, মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির, জাবির বিন আবদুল্লাহর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন, তাঁর সঙ্গে হযরত উমর রা.। যখন তাঁরা আমার ঘরে প্রবেশ করেন, আমি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করলেন। ওযুর অবশিষ্ট পানি আমার মুখে ছিটিয়ে দিলেন, আমার হুঁশ ফিরে এল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মিরাস কিরূপ হবে? আমার ওয়ারিশ তো কালালা। তখন ফরায়েজ-সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়। তবে ওয়াহিদী উপর্যুক্ত আয়াতের সঙ্গে আরো যুক্ত করেন যে, তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ রাসূল! আমার সাত বোন, তাদের জন্য দুই তৃতীয়াংশের নির্দেশ দিন। তিনি বললেন, অপেক্ষা কর। রাবী বললেন, তারপর তিনি অর্ধেকের কথা বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অপেক্ষা কর। এই বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। খানিক পর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করলেন। এবং বললেন, হে জাবির! তুমি এমন ব্যথ্যা নিয়ে মৃত্যুবরণ কর আমি তা চাই না। আল্লাহ বিধান নাযিল করেছেন, এবং তোমার বোনদের জন্য দুই তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন।
কালালা-সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার জবাবে আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও, কালালা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই তোমাদেরকে ফতোয়া দিচ্ছেন। যদি এমন কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, যার কোন সন্তানাদি নাই, আর তার শুধু এক বোন থাকে, তবে পরিত্যক্ত সম্পদের অধিকাংশ তার জন্য নির্ধারিত। আর সে যদি নিঃসন্তান হয়, তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। আর তার দুই বোন থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ। পক্ষান্তরে যদি তার ভাই-বোন উভয়ই থাকে তবে একজন পুরুষ দুইজন নারীর সমান অংশ পাবে। তোমরা বিভ্রান্ত হবে বলে আল্লাহ তোমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। আর আল্লাহ তাআলা সব কিছুই জানেন।’ [সুরা নিসা : আয়াত ১৭৬]
কালালার পরিচয় : জাহেলিয়াত যুগে কালালা ব্যাপকভাবে পরিচিত ও ব্যবহৃত একটি শব্দ। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও বিশেষ করে ফারায়েজ-সংক্রান্ত বিধান নাযিলের পূর্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আরবী ভাষা পারদর্শীগণ কালালা বিষয়ে অনেক কথাই বলেছেন। শব্দটি ‘মান্ তাকাল্লালাহুন্ নাসাবু’ অর্থাৎ ‘যার পর্যন্ত এসে বংশধারা থেমে গেছে বা বেঁকে গেছে থেকে’ উদ্ভুত। আবু বকর আল-জাস্সাস বলেছেন, ‘আল-কালালাতু’ শব্দটি ‘আত্-তাকলিল’ থেকে নির্গত, এর অর্থ ‘ইহাতা’ বা ‘পরিবেষ্টন’। এ থেকে হয় ‘আল-কালিল’ শব্দ। কেননা, ‘আল-কালিল’ বা টুপি মাথাকে পরিবেষ্টিত রাখে। অতএব এ অর্থে বংশের দিক দিয়ে কালালা হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে সন্তান, পিতা-মাতা ভাই-বোন দ্বারা পরিবেষ্টিত। ইমাম রাগেব ইস্পাহানি বলেছেন, কালালা শব্দের অর্থ দুর্বলতা ও পরোক্ষ আত্মীয়তা। আর তা সরাসরি আত্মীয়তার তুলনায় দুর্বল হয়। এ কারণেই কালালা শব্দটি মৃত ব্যক্তি এবং তার ওয়ারিশ উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেন, হাদিস এবং অভিধানের মধ্যে এ শব্দের ব্যাখ্যায় বাহ্যত পার্থক্য মনে হয়, যদিও উভয়ের কথাই সঠিক।
কেননা, যে মৃতের সরাসরি কোনও ওয়ারিশ না থাকে অর্থাৎ পিতা বা সন্তান কেউ না থাকে, অন্য লোকেরা তার ওয়ারিশ হয়, তাহলে সেই অন্যদের সাথে মৃতের আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হবে। কেননা, তারা কেউ প্রত্যক্ষ আত্মীয় নয়, পরোক্ষ আত্মীয়। অনুরূপ মৃতের সাথে এ ওয়ারিশানদের আত্মীয়তাও দুর্বল হবে। তা এ জন্য যে, তারা কেউ মৃতের সন্তানদের থেকে কেউ নয়। আর তার পিতাও নয়।
সাহাবী, তাবেয়ী, পূর্ববর্তীযুগের মনীষীগণ এবং ফিকহবিদগণ কালালা সম্পর্কে বিভিন্ন রকম মতামত ব্যক্ত করেছেন। এগুলো থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, কখনো মৃত ব্যক্তিকে কালালা, কখনো তার ওয়ারিশগণকে কালালা বলা হয়। আল্লাহর কথা, যদি কোন ব্যক্তি কালালার ওয়ারিশ হয়। এখানে মৃত ব্যাক্তিকেই কালালা বলা হয়েছে। কালালা তার অবস্থার পরিচিতি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে কালালা শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, কালালা সেই মৃত ব্যক্তি, যার কোন সন্তান নেই, পিতাও নেই। সুফিয়ান ইবনে উয়ানাহ, আমর ইবনে দীনার, হাসান ইবনে মুহাম্মদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যে মৃত ব্যক্তির সন্তান নেই, পিতা-মাতাও নেই।
আস-সমীম ইবনে উমায়র বলেছেন, উমর রা. বলেছেন, আমার এমন একটা সময় গেছে যখন কালালা কী তা জানতাম না। কালালা হচ্ছে সন্তান ও পিতা ছাড়া অন্যান্য ওয়ারিশ। আসেমুল আহওয়ালী শা’বী থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আবু বকর রা. বলেছেন, সন্তান ও পিতাহীন ছাড়া অন্যান্য উত্তরাধিকারী। উমর বলেছেন, আমি মনে করি কালালা সে, যে ব্যক্তি পিতা ও সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেছে। অবশ্য পরে তিনি নিজের মত ত্যাগ করে হযরত আবু বকর রা.-এর মত গ্রহণ করেন। আর হযরত আবু বকর রা. থেকে ভিন্ন মত পোষণের জন্য আল্লাহর নিকট লজ্জিত বোধ করেন।
ব্যাপক ব্যবহারে প্রচলিত কথা অনুসারে কালালা বলে সেই লোকদেরকে বোঝানো হয় যারা উপরদিক দিয়ে আত্মীয়হীন। না তাদের পিতা-মাতা জীবিত আছে আর না তাদের নিজ ঔরসজাত সন্তান আছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এবং সাহাবীদের বর্ণনা থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মৃত ব্যক্তি নিজেই কালালা নামে অভিহিত। তাদের মূল কথা হল, কালালা সে ব্যক্তি যার সন্তানও নেই, পিতাও নেই। আবার অন্যান্য কিছু লোক বলেছেন, কালালা সে ব্যক্তি যার সন্তান নাই। কালালা নামটি কখনও যেমন মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়, তেমনি কখনও কোন কোন ওয়ারিশ সম্পর্কেও ব্যবহৃত হয়। তাই কোন কোন অভিধানবিদ লিখেছেন, কালালা সেই ওয়ারিশকে বলা হয়, যে মৃতের পিতাও নয়, সন্তানও নয়। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, সন্তান ছাড়া আর যারা মৃতের সম্পত্তিতে অংশ পায় তাদেরকে কালালা বলা হয়। আবু বকর সিদ্দীক, আলী ইবনে আব্বাস থেকে পাওয়া বর্ণনানুযায়ী কালালা হচ্ছে পিতা ও সন্তান ব্যতীত অন্যান্য ওয়ারিশ। মুহাম্মদ ইবনে সালিম শা’বী ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, পিতা ও সন্তান ছাড়া অন্যান্য ওয়ারিশ  হচ্ছে কালালা। জায়েদ বিন সাবিত রা. থেকেও অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। অবশ্য হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে পাওয়া অপর একটি বর্ণনা এসেছে। পিতা ছাড়া অন্যান্য ওয়ারিশান হচ্ছে কালালা।
কাতাদা সালিস ইবনে আবু যায়দ মিদান ইবনে আবু তালহার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কালালা সম্পর্কে যত প্রশ্ন করেছি, এত অধিক প্রশ্ন আর অন্যকোন বিষয়ে করিনি। এমনকি এত অধিক প্রশ্ন করায় তিনি তার আঙ্গুল দিয়ে আমার বুকে খোঁচাও মেরেছেন। পরে বলেছেন এ ব্যাপারে তোমার জন্য গ্রীষ্মকালে অবতীর্ণ আয়াতই যথেষ্ট। জারীর, আবু ইসহাক আশ-শায়বানী, আমর ইবনে মুররা, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কালালার ওয়ারিশ কী করে হয়? জবাবে তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কি বলে দেননি? এরপর তিনি সুরা নিসার ১২ নং আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। বললেন, তবু হযরত উমর কালালা বুঝলেন না। পরে তিনি স্বীয় কন্যা হাফসা রা. কে বললেন, তুমি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাসি-খুশি অবস্থায় দেখবে তখন তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবে। তাই তিনি তাঁকে হাসি-খুশি অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে তিনি বললে, তোমার পিতা বুঝি তোমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে বলেছেন? আমি দেখছি তোমার পিতা এ বিষয়ে যেন বুঝতেই পারছেন না। এর পর থেকে হযরত উমর রা. প্রায়ই বলতেন, মনে করি আমি এ বিষয়ে কখনই জানি না। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে যা বলার তা তো বলেই গেছেন।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেন, হযরত উমর রা. কালালা সম্পর্কে একখানা দলীল লিপিবদ্ধ করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে সেই লিখিত জিনিস মুছে ফেলেছেন এবং বলেছেন, তোমরা এ বিষয়ে তোমাদের নিজেদের মতই পোষণ কর। জেনে রেখো, আমি কালালা সম্পর্কে কোন কথাই বলিনি। হযরত উমর রা.-এর এতদ-সংক্রান্ত বারংবার জিজ্ঞাসার জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে আয়াতের উপর নির্ভর করতে বলেছেন। বরং তা আয়াত থেকে অনুধাবন, ইস্তিমবাত এবং দলিল প্রয়োগ করতে বলেছেন। অথচ, হযরত উমর রা. একজন আরবিভাষী বিশেষজ্ঞ প-িত ব্যক্তি ছিলেন।
তার তাৎপর্য জানার পন্থাও তার নিকট অস্পষ্ট ছিল না। এ থেকে বোঝা গেল, কেবল ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান দ্বারাই কালালার তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়। মূলত এটি মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের একটি। তার তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদেরকে মুহকাম আয়াতের উপর সাহায্য নিতে হবে। এছাড়া প্রশ্ন করলেই অকাট্য দলিল নাযিল করে তাওকিফি (সময়সাপেক্ষ) পদ্ধতিতে তার তাৎপর্য বলে দেয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাধ্যতামূলক হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার বর্ণনা দেয়া এড়িয়ে যেতেন না। আর তা এ জন্য নয় যে, কালালার ব্যাপারটি সম্পর্কে যে অবস্থার প্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন এ বিষয়ে কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে তার হুকুম কার্যকর করার কোন প্রশ্ন ছিল না। অন্যথায় তিনি নিজে এ নিয়ে বলতে বাকি রাখতেন না। সে জন্যই তিনি হযরত উমর রা.-কে ইজতিহাদ করার দিকেই আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছেন। পূর্বোদ্ধৃত বিস্তারিত আলোচনা থেকে কালালার তাৎপর্য জানার জন্য সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদি চেষ্টা-প্রচেষ্টা অকাট্য ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন তারা পরস্পরের কথাকে অগ্রাহ্য করেননি। কেননা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইজতিহাদ অনুযায়ী কথা বলেছেন। আবু বকর আল জাসসাস বলেছেন, সাহাবাগণ এ বিষয়ে একমত যে, সন্তান কালালার মধ্যে গণ্য নয়। পিতা অন্তর্ভুক্ত কিনা সে বিষয়ে তাদের মতামত ভিন্ন ভিন্ন। জমহুর ফিকহবিদগণ বলেছেন পিতা কালালার বাইরে। ইবনে আব্বাস রা. তাঁর দুটি বর্ণনার একটিতে অনুরূপ কথাই বলেছেন। অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, সন্তান ছাড়া অন্যরা কালালা। দাদার ব্যাপারেও বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেকে বলেছেন দাদা কালালাকে ওয়ারিশ বানায় না। অন্যরা বলেছেন সে নিজেই একজন কালালা। তবে উত্তম কথা হল, দাদা পিতার মতই কালালার বাইরে। এ ব্যাপারে ফরায়েজ সংক্রান্ত কিতাবাদিতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
কালালার বিধান : আল-কুরআনের দুটি আয়াতে কালালার বিধান উল্লেখিত হয়েছে। দুটি আয়াতই সূরা নিসায় বর্ণিত হয়েছে। একটি সূরার প্রথম দিকে অপরটি সূরার শেষের দিকে। এরশাদ হচ্ছে, ‘বলে দিন আল্লাহ তাআলা কালালা সম্পর্কে তোমাদেরকে ফতোয়া দিচ্ছেন, যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে এবং তার কোন সন্তানাদি না থাকে এবং তার এক বোন থাকে, তবে সে পরিত্যাক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ পাবে। আর তার ভাই তার উত্তরাধিকার হবে, যদি সে নিঃসন্তান হয়। আর যদি কোন দুইজন থাকে, তবে পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ পাবে। পক্ষান্তরে যদি ভাই-বোন উভয়ই থাকে – নর এবং নারী, তাহলে একজন পুরুষ দুজন নারীর সমান অংশ পাবে। আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বিধি-বিধান বর্ণনা করেন যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। বস্তুত আল্লাহ তাআলা সবকিছুই জানেন।’ [সূরা নিসা : আয়াত ১৭৬]
এই আয়াতে সন্তান না থাকা অবস্থায় ভাই-বোন জীবিত থাকলে তাদের মীরাসের অংশের কথা বলা হয়েছে। এদেরকেই কালালা নামে অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্য তাতে পিতা জীবিত না থাকা জরুরি। যদিও তা আয়াতে বলা হয়নি। পিতা জীবিত থাকলে ভাইরা মিরাস পাবে না। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, পিতা ও সন্তানগণই মৃতের আসল ওয়ারিশ। তাদের অবর্তমানে ভাই-বোন মীরাসের অধিকারী হয়। কালালা বা নিঃসন্তান ব্যক্তির আসল ওয়ারিশ নাই। তাই তার আপন ভাই- বোনকে সন্তানসন্তুতির পর্যায়ে গণ্য করা হয়েছে। আর আপন ভাই-বোন না থাকলে বৈমাত্রিয় ভাই-বোন এ মর্যাদা পাবে। উল্লেখ থাকে যে, ভাই-বোন তিন প্রকার :
১. আপন বা সহোদর ভাই-বোন, যাদের পিতা-মাতা উভয়ই অভিন্ন ব্যক্তি।
২. বৈমাত্রিয় ভাই-বোন যাদের পিতা একজন কিন্তু মা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি।
৩. বৈপিত্রিয় ভাই-বোন। যাদের মা একজন কিন্তু পিতা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি।
উপরিউক্ত তিন প্রকার ভাই-বোনের মাঝে সহোদর ভাই-বোন এবং বৈমাত্রেয় ভাই-বোন উভয়ের হুকুম সন্তান-সন্তুতির মত। যদি মৃতের পিতা ও সন্তান কেউ-ই না থাকে, তবে উভয়ের মাঝে সহোদর ভাই-বোনই অগ্রাধিকার পায়। তার অবর্তমানে বৈমাত্রিয় ভাই-বোন এবং সর্বশেষ বৈপিত্রিয় ভাই-বোনগণ মিরাস পাবে।
উপর্যুক্ত আয়াতে ভাই-বোন বলতে বৈমাত্রিয় ভাই-বোনের অবস্থার কথা বলা হয়েছে। আপন ভাই-বোনের অনুপস্থিতিতে বৈমাত্রিয় ভাই-বোন ওয়ারিশ হয়। অন্যথায় আপন ভাই-বোনই মিরাসে অগ্রাধিকারী হয়। যদি কোন ব্যক্তি এক বোন রেখে মারা যায়, তার পিতা ও সন্তান কেউ-ই না থাকে, তবে সে বোন তার পরিত্যক্ত সম্পদের অর্ধাংশ পাবে। আর বোন দুই জন হলে পরিত্যক্ত সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ পাবে। আর যদি ভাই-বোন উভয়ই রেখে যায়, তাহলে ভাই-বোনের দ্বিগুণ হারে অংশ পাবে। এদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ ঘোষণা করা হয়নি। তবে আমার হিসাবে মিরাস পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য পুরুষ দুইজন নারীর সমান অংশ পাবে এই ভিত্তিতে। এখানে বাকি থাকল যে, ভাই-বোন বলতে যদি বৈপিত্রিয় ভাই-বোন বোঝায় তাহলে তাদের মীরাস কি হবে তা সূরার প্রথম দিকের আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে, ‘যদি কোন মৃত ব্যক্তির কেউ ওয়ারিশ হয়, সে মৃত ব্যক্তি নারী-পুরুষ যাই হোক (তার অবস্থা এরূপ যে) তার না আছে মূল আর না আছে শাখা, এবং তার এক ভাই এবং এক বোন থাকে তবে প্রত্যেকেই ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। আর যদি ভাই-বোন বেশি থাকে তাহলে সকলেই এক তৃতীয়াংশের অংশীদার হবে। তবে অবশ্যই তা তার ঋণ এবং অসিয়ত পূর্ণ করার পর, যেন কারো কোন ক্ষতি না হয়। এটি আল্লাহর আদেশ। আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞ অতিশয় ধৈর্যশীল।’ [সূরা নিসা : আয়াত ১২]
এখানে ভাই-বোন বলতে বৈপিত্রিয় ভাই-বোন বুঝানো হয়েছে। সেজন্যই ইবনে মাসউদ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং উবাই বিন কাব প্রমুখ ‘ওয়া লাহু আখুন ওয়া উখ্তুন’-এর পরে ‘লাম’ শব্দ যোগ করে পাঠ করেছেন। সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ দাঁড়াল এই যে, মৃত ব্যক্তি পুরুষ কিংবা নারী যাই হোক তার যদি পিতা-মাতা বা ছেলে কেউ-ই না থাকে এবং তার বৈপিত্রিয় ভাই-বোন থাকে তবে সে ভাই-বোন ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। এক্ষেত্রে ভাই-বোন সমান অংশ পাবে। কম বা বেশি করা হবে না। এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নাই। বৈপিত্রিয় ভাই-বোন যদি একাধিক হয় তবে তারা সকলেই পরিত্যক্ত সম্পদের এক তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে। তবে অবশ্যই তা মৃত ব্যক্তির ঋণ এবং অসিয়ত পূর্ণ করার পর। অসিয়ত দ্বারা কোনক্রমেই ওয়ারিশগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। সেই জন্যই ইসলামী শরীয়তে প-িত ব্যক্তিবর্গের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল এক তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদে অসিয়ত বৈধ নয়। আর করলেও তা এক তৃতীয়াংশ সম্পদেই কার্যকর হবে।
উল্লেখ থাকে যে, ওয়ারিশগণ যেন মৃতের পরিত্যাক্ত সম্পদ মৃতের ঋণ আদায় এবং অসিয়ত পূর্ণ না করেই ভাগাভাগি করে না নিতে পারে সেজন্যই মিরাসের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ এবং অসিয়ত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আয়াতের শেষাংশে ‘গায়রা মুর্দার’ বলে উদ্দেশ্য করা হয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য ঋণ কিংবা অসিয়তের মাধ্যমে ওয়ারিশগণকে ক্ষতিগ্রস্থ করাও অবৈধ। সেজন্য অসিয়ত কিংবা নিজের জিম্মায় ভিত্তিহীন ঋণের কথা স্বীকার করে ওয়ারিশগণকে বঞ্চিত করার গোপন ইচ্ছা এবং সে ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ কালালা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা / মাওলানা মুজিবুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight