কা’বাগৃহ নির্মাণ: সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

কা’বা গৃহ নির্মাণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, এবং স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই ঘরের স্থান তখন বলেছিলাম, আমার সাথে কোন শরীক স্থির করোনা। আমার ঘর কে পবিত্র রাখিও তাদের জন্য, যারা তাওয়াফ করে যারা (নামাযে দাঁড়ায়) রুকু করে ও সেজদা করে। এবং মানুষের নিকট হজ এর ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উঠ সমূহের পিঠে, এরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে [সুরা:হজ:২৬-২৭] এ ছাড়াও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন- স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বা গৃহের প্রাচির তুলছিল, তখন তারা বলছিলো, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ গ্রহন কর, নিশ্চই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনোজনকে তোমার অনুগত করো এবং আমাদের বংশধর  হতে তোমার এক অনুগত উম্মত করো। আমাদের ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের এক রাসূল প্রেরণ করে দাও, যে তোমার আয়াত সমূহ আবৃত্তি করবে, তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবে এবং তাদের কে পবিত্র করবে, তুমি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। [সুরা বকারাঃ১২৪-১২৯] এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় রাসূল এবং বহু সংখ্যক নবীর পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম আ. সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বায়তুল আতিক বা কা’বাগৃহ নর্মাণ করেন। এটাই সর্বপ্রথম মসজিদ, যা সর্বসাধারনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এ ঘরের ভিত্তি স্থান নির্দিষ্ট করে দেন। হযরত আলী রা. সহ অনেক সাহাবি বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ ওহি যোগে ইবরাহীম আ. কে ঐ স্থানের নির্দেশ দিয়েছেন যেখানে কা’বা ঘর, যা বায়তুল মা’মুরের সোজা নিচে যমীনে অবস্থিত। এমন কি যদি বায়তুল মা’মুর নিচে পতিত হতো, তাহলে কা’বা গৃহের উপরে পতিত হতো। শুধু তাই নয়, কোন কোন পুর্বসূরি আলেমের মতে, সাত আসমানের প্রতিটি ইবাদত গৃহ এর উপর একই বরাবর অবস্থিত। তারা বলেছেন প্রতিটি আসমানে একটি করে ঘর আছে যা পৃথিবীর অধিবাসির কা’বারই অনুরুপ। তাই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর অধিবাসীদের জন্য কা’বা ঘর নির্মাণের আদেশ দেন। যেমনি আসমানের ফেরেশতাদের ইবাদাতের জন্য ঘর আছে। আল্লাহ তাকে সে স্থান দেখিয়ে দেন।  আসমান ও যমীন সৃষ্টির পর এ যমীনটি উক্ত ঘরের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। বুখারী ও মুসলীমে এ কথাই বর্ণিত হয়েছে। এ শহরকে আল্লাহ সে দিনই হারাম” বলে মর্যাদাবান করেছেন, যে দিন তিনি আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করে ছিলেন। সুতরাং আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদায় এটা কিয়ামত পর্যন্তই হারাম-ই থাকবে। কোন সহীহ বর্ণনায় পাওয়া যায়নি যে, ইবরাহীম খলিলের নির্মাণের পূর্বে এ ঘরের কোন নির্মিত রুপ ছিল।  এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন- নিশ্চই সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের ইবাদতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত তা অতি বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়েতের মাধ্যম।  অর্থাৎ প্রথম ঘর যা সর্বসাধারনের কল্যাণার্থে নির্মাণ করা হয়েছে, তা ছিল বরকতের ও হেদায়েতের জন্য। আয়াতে ‘বাক্কা’ শব্দ দ্বারা ২টি অর্থ বোঝায়। (১) মক্কা (২) কা’বা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, কেননা এটি নির্মাণ করেছে ইবরাহীম আ. যিনি তার পরবর্তী সকল নবীর পিতা। নিজ বংশধরদের মধ্যে থেকে যারা তাকে অনুসরণ করেছে ও তার রীতি-নীতি গ্রহন করেছে, তাদের তিনি ইমাম। এ কারনেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন- মাকামে ইবরাহীম, অর্থাৎ যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে তিনি কা’বা ঘরের নির্মাণ কাজ করেছিলেন। যখন কা’বা ঘরের দেয়াল তার চাইতে উচুঁ হয়ে যায়, তখন তার পুত্র ইসমাঈল আ. এই পাথরুুুুুখানা এনে পিতার পায়ের নিচেঁ স্থাপন করেন, যাতে দেওয়াল উচুঁ করতে পারেন। ইবনে আব্বাস রা. এর দীর্ঘ হাদীসেও এ কথা উল্লেখ হয়েছে। এ পাথরটি সেই প্রাচিনকাল থেকে হযরত ওমর রা. এর খেলাফত কাল পর্যন্ত কা’বার দেয়ালে সংলগ্ন ছিল। তিনি এটাকে কা’বা ঘর থেকে কিছু পিছিয়ে দেন। যাতে নামায আদায়কারী ও তাওয়াফ আদায়কারীর কষ্ট না হয়। এ ব্য্পারে হযরত ওমর রা. এর সিদ্বান্তকে সবাই মেনে নেয়। কেননা, যে সব বিষয়ে হযরত ওমর রা. এর মতামত আল্লাহর আনুকূল্য লাভ করে, তার মধ্যে এটি একটি। কারণ তিনি একবার রাসূল সা. এর নিকট বলেছিলেন- কতই না ভালো হতো যদি মাকামে ইবরাহীম কে নামাযের স্থান রুপে গ্রহন করতাম! তখন আল্লাহ আাাত নাযিল করেন- তোমরা মাকামে ইবরাহীম কে নামাযের স্থান রুপে গ্রহন কর। ইসলামের প্রাথমিক যুগ পর্যন্ত ইবরাহীম আ. এর পায়ের দাগ পাথরের  উপর অবশিষ্ট ছিল। মোট কথা, হযরত ইবরাহীম আ. বিশ্বের সবচেয়ে অধিক সম্মানিত মসজিদ কে সবচেয়ে অধিক সম্মানিত স্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। সে স্থানটি এমন একটি উপত্যকা, সেখানে কোন ফসল উৎপাদিত হতো না। তিনি সেখানকার আদিবাসিদের বরকতের জন্য দোআ করেন, ফলের দ্বারা তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করতে দোআ করেন; যদিও সেখানে পানির স্বল্পতা এবং বৃক্ষ, ফল ও ফসলের শূন্যতা ছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোআ করেন, এ স্থানকে সম্মানিত এবং নিরাপদ স্থানে পরিনত করতে। আল্লাহ তার প্রার্থনা শুনেন, দোআ কবুল করেন, আহবানে সাড়া দেন ও পার্থিব বস্তু দান করেন। আল্লাহ ইরশাদ ফরমান- ওরা কি দেখে না, আমি হারাম কে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ এর চতুষ্পার্শ্বে যে সব লোক আছে, তাদের উপর হামলা করা হয়। হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর কাছে, তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করার জন্য দোআ করেন। অর্থাৎ তাদের স্বজাতীর মধ্য থেকে, তাদেরই উন্নত ভাষা শৈলীতে পারদর্শী কোন ব্যক্তিকে। যাতে করে দিন ও দুনিয়ার উভয় নিয়ামতের অধিকারী হতে পারে। আল্লাহ তার এ দোআ কে কবুল করেন। তিনি তাদের মধ্যে থেকে রাসূল প্রেরন করেন। যিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী, তার পরে আর কোন নবী-রাসূল আসবে না। তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেন, যা ইতিপূর্বে কাহারো ক্ষেত্রে করেনি। তাঁর দাওয়াত কে সর্বকালের সর্বদেশে পৃথিবীর সকল ভাষাভাষীর জন্য ব্যাপক ও বিস্তৃত করে দিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর এ দীনিই বলবৎ থাকবে। সকল নবীর মধ্যে থেকে এটা ছিল তার একক বৈশিষ্ট্য, তার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা, তাঁর আনিত দ্বীনের পূর্ণতা, জন্মভূমির  গৌরব, ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব। উম্মতের উপর অশেষ দয়া ও মমতা, বংশ মর্যাদা ও তাঁর আচার আচরণ। এই জন্যই যখন ইবরাহীম আ. দুনিয়াবাসীদের জন্য কা’বা ঘর নির্মাণ করেন তখন তাঁর সম্মান ও মর্যাদায় সপ্তম আকাশের অধিবাসি, ফেরেশতাগণের কা’বা বায়তুল মা’মুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা এসে নামায আদায় করে। যারা একবার এসেছে, কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনদিন তাদের সুযোগ মিলবে না। আল্লাহ যখন ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.কে কা’বা নির্মাণের আদেশ করেন, তখন তারা কা’বার স্থানটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না, আল্লাহ তখন খাজুজ নামক একটি বায়ু প্রেরণ করেন। তার ছিল দু’টি পাখা ও সাপ আকৃতির মস্তক। সে বায়ুটি প্রাচিনকালের কা’বার স্থানটি আবর্জনা মুক্ত করে দেয়। তখন ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. তা অনুসরণ করে কোঁদাল দ্বারা মাটি খুঁজে সেখানে ভিত্তি স্থাপন করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- যখন আমি ইবরাহীম কে ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিলাম, ভিত্তির উপর দেয়াল উঠানোর সময় ঘরের স্তম্ভ নির্মাণ করেন। ইবরাহীম আ. ইসমাঈল আ.কে বললেন, হে প্রিয় বৎস! এখন আমার জন্য হাজরে আসওয়াদ’ পাথর নিয়ে আসো। মূলত এটা ছিল, শুভ্র ইয়াকৃত পাথর, দেখতে উঠ পাখির ন্যায়। হযরত আদম আ. এ পাথর সহ জান্নাত থেকে অবতরণ করেন। মানুষের পাপের স্পর্শে এই পাথরটি কালো হয়ে যায়। ইসমাঈল আ. একটি পাথর নিয়ে পিতার নিকট এসে উক্ত হাজরে আসওয়াদ কে রুকনে কা’বার নিকট দেখতে পান। পিতাকে জিজ্ঞেস করেন, আব্বুজান এ পাথরটি কে নিয়ে এসেছে? উত্তরে তিনি বললেন, এই পাথরটি যিনি নিয়ে এসেছেন তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যে তোমার চেয়ে অধিক গতিসম্পন্ন। এরপর পুনরায় নির্মাণ কাজে মনোনিবেশ করেন। শেষে এই দোআ করেন- হে আমার রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ। [সূরা বাকারা : ১২৭]ইবনে আবু হাতিম রহ. বলেছেন, ইবরাহীম আ. পাচঁটি পাহাড়ের পাথর দ্বারা পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণ কাজ করতেছিলেন, তখন গোটা পৃথিবীর বাদশা যুলকারনাইন ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের এ কাজ করতে কে নির্দেশ দিয়েছে? ইবরাহীম আ. বললেন- আল্লাহই আমাদের হুকুম দিয়েছেন। যুলকারনাইন বললো- আপনার কথার প্রমান কি? তখন পাঁচটি ভেড়া সাক্ষ্য দিল যে, আল্লাহর নির্দেশ দিয়েছেন। তখন যুলকারনাইন সাথে সাথে ঈমান আনলেন এবং তার সত্যতা স্বীকার করলেন। আযরাকী রহ. লিখেছেন- তিনি ইবরাহীম আ. এর সাথে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন। হযরত ইবরাহীম আ. এর তৈরী কা’বা ঘর দীর্ঘকাল পর্যন্ত অক্ষত থাকে। পরবর্তিকালে কুরায়শগন ঘরটির পুণঃনির্মাণ করেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সা. একবার তাঁকে বলেছিলেন, আয়েশা! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের ব্যাপারটি ভেবে দেখেছো কি? তারা যখন কা’বা ঘর পূর্নঃনির্মাণ করে, তখন ইবরাহীম আ. এর ভিত্তি থেকে ছোট করে ফেলে। আমি বললাম ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আপনি কেন তা ইবরাহীম আ. এর ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনেন না? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের লোকজন যদি নও-মুসলিম না হতো, তাহলে আমি কা’বার মধ্যে রক্ষিত সম্পদ, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে দিতাম। ঘরের দরজা নিচু করে যমীনের সমতলে নিয়ে আসতাম এবং [বাদ-পড়া] ‘হাতীম কা’বা’ অংশটুকু বায়তুল্লাহর অর্ন্তভূক্ত করে দিতাম। পরবর্তিকালে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. তার শাসন আমলে সে ভাবেই তৈরী করেন। হিজরি ৭৩ সালে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ, ইবনে যুবায়ের রা. কে হত্যা করে তদানীন্তন খলীফা আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের নিকট পত্র লিখে। আব্দুল মালেকের সভাসদগনের ধারণা ছিল যে, আব্দুল্লা ইবনে যুবায়ের তার ইচ্ছা অনুযায়ী কা’বার সংস্কার করেছে। তাই খলিফা তা ভেঙ্গে ফেলার আদেশ করে। হাতিম অংশ কে ভিতর থেকে বের করে দেয়। এবং অন্যান্য পাথর কা’বা ঘরের ভিতর রেখে দেয়াল উঠিয়ে দেয়। ফলে পূর্ব দিগের দরজা উচুঁ হয়ে যায়। এবং পশ্চিম দিকের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আব্দুল মালেক রহ. এর লোকজন জানতে পারলো যে, ইবনে যুবায়ের রা. আয়েশার বর্ণনা অনুসারে কা’বা সংস্কার করেছিলেন, তখন তারা দুঃখ প্রকাশ করে এবং অনুসূচনা করে যে, এরুপ করা না হলে ভালো হতো।  এরপর খলিফা মাহদী ইবনে মানছুর, খিলাফতে অধিষ্ঠিত হয়ে ইমাম মালেক ইবনে আনাসের নিকট পরামর্শ চান যে, আব্দুল্লা ইবনে যুবাইর রা. এর ভিত্তির উপর কা’বা পুনঃপ্রষ্ঠিতা করলে কেমন হয়? ইমাম মালেক র. বলেন, এতে আমার আশংকা হয় যে, রাজা-বাদশাহরা কা’বা ঘর কে খেলার বস্তু মনে করবে। অর্থাৎ প্রত্যেক বাদশা কাবা’ঘর সংস্কার করতে চাইবে। সুতরাং কা’বা ঘর কে সেই অবস্থায় বহাল রাখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight