এক মায়ের বীরত্বের গল্প : এনামুল করীম ইমাম

হযরত আসমা রা. এর জীবনে সর্বাপেক্ষা দুঃখ ও বিষাদময় ঘটনা। যদ্বারা তাঁর অসাধারণ বীরত্ব, ঈমানী শক্তি, ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা হলো তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. এর শাহাদাৎ। তাঁর এই দৃঢ়তা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। তাই আমরা এবার প্রবেশ করব তাঁর ছেলের শাহাদাৎ বরণের সেই হৃদয়বিদারক গল্পে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. কে খতম করার জন্য হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ৭২ হিজরিতে বিরাট এক সেনাবাহিনী নিয়ে পবিত্র মক্কা আক্রমণ করল। সে পবিত্র মক্কা শরীফ অবরোধ করে বসে রইল।
এতে মক্কা নগরের অভ্যন্তরে এমন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল যে, প্রায় প্রতিটি ঘর থেকেই ক্ষুধাতুর জনতার কান্নার রোল শোনা যেতে লাগল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. এর সৈন্যরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ল। তাই তারা পালিয়ে হাজ্জাজের সেনাবাহিনীতে গিয়ে যোগ দিতে লাগল।
অল্পদিনের মধ্যেই প্রায় ১০০০ (এক হাজার) সৈন্য গিয়ে শত্রু সৈন্যের সাথে মিলিত হলো। স্বয়ং ইবনুয যুবায়েরের দুই পুত্র হামযা ও হাবীব পর্যন্ত হাজ্জাজের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে হাজ্জাজের শক্তি বৃদ্ধি করল। আর তৃতীয় পুত্র বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করলেন।
এই সঙ্কটময় মুহূর্তে হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. তাঁল মা হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর সাথে পরামর্শ করতে এলেন।
এই সময় হযরত আসমার বয়স ছিল একশ বছরেরও বেশি। তাঁর শরীরের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর অন্তরটা ছিল খুবই শক্ত, আস্থা ছিল অবিচল এবং মনোবল ছিল সুদৃঢ়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. তাঁর মমতাময়ী মাকে সম্বোধন করে বললেন,
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
ওয়াআলাইকুম সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
আম্মাজান! আমার সাথী সঙ্গী এমনকি নিজের সন্তানরাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র সামান্য কয়েকজন নিষ্ঠাবান সাথী আমার সাথে টিকে আছেন। অন্যদিকে শত্রুরা আমার কোনো দাবিই মানছে না।
এহেন মুহূর্তে তোমার আগমনের উদ্দেশ্য কী ?
আমার আগমনের উদ্দেশ্য, আপনার সাথে পরামর্শ করা।
পরামর্শ! কোন বিষয়ে ?
হাজ্জাজের ভয়ে বা প্রলোভনে পড়ে লোকেরা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এমনকি, আমার সন্তান এবং আমার পরিবারের লোকেরা পর্যন্ত আমাকে পরিত্যাগ করেছে। এখন আমার সাথে অল্প কিছু লোক আছে।
এদিকে উমাইয়ারা প্রস্তাব পাঠাচ্ছে যে, আমি আত্মসমর্পণ করি তাহলে পার্থিব সুখ-শান্তির জন্য আমি যা চাব, তারা আমাকে তাই দিবে।
এমতাবস্থায় আপনি আমাকে কী পরামর্শ দেন ?
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের অন্যতম এই সহযোগিনী হিজরতের সামান্য কিছুদিন পরেই মদীনার পথে পা বাড়ান। মদীনায় আসার পথে তিনি কিছুদিন কুবায় অবস্থান করেন। এখানেই হিজরতের ২য় (মতান্তরে ১ম) বর্ষে তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর আগে মুহাজির পরিবারে কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় নাই। এ জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়ের রা. কে ইসলামের প্রথম ভূমিষ্ঠ সন্তান বলা হত।
স্বামী হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. এর অবর্তমানে তিনি পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয়েরের কাছে চলে আসেন। হযরত আবদুল্লাহ রা. আপন মায়ের অতিশয় খেদমত করতেন। আবদুল্লাহ ছাড়াও তাঁর আরো কয়েকজন পুত্র ও কন্যা সন্তান ছিল। কিন্তু তিনি বড় ছেলে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়েরকেই সব থেকে বেশি ভালোবাসতেন।
শাহাদাতের আগ মুহূর্তে মায়ের সাথে পরামর্শ করতে এসেছেন মায়ের আদরের দুলাল হযরত আবুদুল্লাহ ইবনুয যুবায়েরর রা.। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি মাকে উপরিউক্ত কথাগুলি বললেন।
কিন্তু হযরত আসমা রা. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলেন-
বৎস! ব্যাপারটি একান্তই তোমার নিজস্ব। আর নিজের সম্পর্কে তুমিই সবচেয়ে ভালো জান। যদি তোমার দৃঢ় প্রত্যয় থাকে যে-
তুমি যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, তবে সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তোমার অন্যান্য সঙ্গী-সাথীরা যেভাবে প্রাণ দিয়েছে সেভাবেই প্রাণ দিয়ে দাও। আর যদি তুমি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না থেকে থাক। তুমি দুনিয়ার সুখ-শান্তির প্রত্যাশী হও। তাহলে তুমি একজন নিকৃষ্ট মানুষ। তাহলে তোমার ভেবে দেখা উচিত ছিল যে, তোমার নিজের ও অন্যান্য সঙ্গী-সাথীদের জীবন ধ্বংস করার জন্য তুমি দায়ী হয়ে যাচ্ছ।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. বললেন, এখন আমার সব সঙ্গীই আমাকে শেষ জবাব দিয়ে চলে গেছে।
হযরত আসমা রা. সান্ত¦নার সুরে বললেন,
সঙ্গী-সাথীদের অসহযোগীতা আল্লাহ প্রেমিক সভ্য ভদ্র মানুষের কাছে কোনোই গুরুত্ব রাখে না। ভেবে দেখ, এই পৃথিবীতে তুমি কতদিন থাকতে পারবে? হক্ক ও হক্কানিয়্যাত তথা সত্য ও সততার জন্য জীবন দেওয়া হক্ক ও হক্কানিয়্যাতকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকার চেয়ে বহু গুণে উত্তম।
তাহলে আজ আমি নিশ্চিত নিহত হব ।
তুমি হাজ্জাজের কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং বনূ উমাইয়ার ছোকরারা তোমার মু-ু নিয়ে খেলা করবে, এর থেকে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাওয়াই উত্তম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. বললেন, এখন আমার এই ভয় হয় যে, বনূ উমাইয়ার নিষ্ঠুর লোকেরা আমাকে হত্যা করার পর আমার মৃতদেহ শূলে বিদ্ধ করবে অথবা অন্য কোনো উপায়ে লাঞ্চিত করতে পারে।
হযরত আসমা রা. বললেন,
বাবা! ছাগল জবাই করার পর তার চামড়া উঠাবার সময় তার কোনো প্রকার কষ্ট হয় না। সুতরাং তোমার মৃত্যুর পরে তোমার সাথে কে কী আচরণ করবে সেটা তোমার ভাবনার বিষয় নয়। যুদ্ধের ময়দানে গমন কর। মহান আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করে নিজের কর্তব্য পালন করতে থাক।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. এর মুখম-লের দীপ্তি আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আনন্দাতিশয্যে তিনি মায়ের মস্তক চুম্বন করলেন এবং বলতে লাগলেন-
মা! আল্লাহর রাস্তায় কখনো দুর্বল প্রতিপন্ন হব না। আমার উদ্দেশ্য কেবল আপনাকে শুধু এতটুকু নিশ্চয়তা দেওয়া যে, আপনার পুত্র কোন অসৎ পথে জীবন দান করে নাই। আমি শহীদ হয়ে গেলে আপনি কোনো দুঃখ করবেন না।
যদি তুমি অসত্য ও অন্যায়ের পথে নিহত হও তাহলে আমি ব্যথিত হব।
আম্মাজান! আপনি বিশ্বাস রাখুন আপনার সন্তান কোনো অন্যায় করেনি। কোনো অশ্লীল কাজের সাথে যুক্ত হয়নি। আল্লাহ তাআলার বিধান লঙ্ঘন করেনি। কারো সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি। কারো উপর জুলুম করেনি।
একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অপেক্ষা পছন্দনীয় বস্তু আমার কাছে আর কিছু নেই। একথা বলার দ্বারা নিজেকে নিষ্পাপ বলা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, আমার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। আপনার অন্তরে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা সৃষ্টি হোক কথাগুলো শুধু এজন্যই বলেছি।
হযরত আসমা রা. বললেন, বৎস! সর্বাবস্থায়ই আমি মহান আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করব এবং সবর করে যাব। যদি তুমি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসতে পার, তাহলে আমি তোমার বিজয় দেখে খুশি হব। আর যদি আমার থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে যাও, তথাপি আমি ধৈর্য ধারণ করব। যাও, জীবন কুরবান করে দাও! ফলাফল আল্লাহর হাতে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. বললেন, মা! আমার জন্য দুআ করুন।
হযরত আসমা রা. দু’হাত আকাশের দিকে তুলে দুআ করলেন, হে আল্লাহ! রাতের আঁধারে মানুষ যখন গভীর ঘুমে অচেতন থাকে তখন তাঁর জেগে জেগে দীর্ঘ ইবাদত করার জন্য আপনি তাঁর উপর রহম করুন।
হে আল্লাহ! অধিক রোযা রাখা অবস্থায় ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট নীরবে সহ্য করে যাওয়ার কারণে আপনি তাঁকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন।
হে রাহমানুর রাহীম! পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের কারণে আপনি তাঁর প্রতি করুণা বর্ষণ করুন।
হে আল্লাহ! আমি আমার পুত্রকে আপনার হাতে সমর্পণ করছি। আপনি তাঁকে দৃঢ়তা ও সাহস দান করুন এবং আমাকে ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা দান করুন।
দুআ করার পর শতবর্ষী বৃদ্ধা মাতা তাঁর কম্পিত দুই হাত প্রসারিত করে বলতে লাগলেন,
বাবারে! তুমি একবার আমার কোলে এস, শেষ বারের মত আমি তোমাকে বুকে ধারণ করি। প্রাণ ভরে তোমার গন্ধ শুকি!
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. তখন বলতে লাগলেন, আজকের সাক্ষাতই হয়তো আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। আজই হয়তো আমার জীবনের প্রদীপ নিভে যাবে।
অতঃপর তিনি অবনত মস্তকে মমতাময়ী মায়ের বুকে আশ্রয় নিলেন। ¯েœহময়ী মাতাও এই সাহসী বীর পুত্রকে কোলে তুলে নিলেন। কপালে চুমু দিয়ে বলতে লাগলেন, বাবা! নিজের কর্তব্য পালন কর।
এই সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. লৌহ বর্ম পরিধান করে রেখেছিলেন, বীর মাতা ছেলের সর্বশরীরে লোহার পোশাক দেখতে পেয়ে একটু বিমর্ষভাবে বললেন,
বৎস! আল্লাহর রাস্তায় জীবন কুরবানকারীদের শরীরে এমন লোহার পোশাক ব্যবহার করা উচিত নয়।
মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনতে পেয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. শরীর থেকে লৌহ বর্ম খুলে ফেললেন এবং স্বাভাবিক বেশে বীরত্ব গাঁথা গাইতে গাইতে সিরীয় সৈন্যদের দিকে ময়দানে চলে গেলেন।
শত্রু বাহিনীকে তিনি এমন ভীষণ বিক্রমে আক্রমণ করলেন যে, ক্ষণিকের মধ্যেই ময়দান কেঁপে উঠল। কিন্তু সিরীয় সেনারা ছিল গণনাতীত। এই অগণিত সৈন্যের সামনে তাঁর সামান্য কয়েকজন সৈন্য বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারল না। তাদের বাধ্য হয়ে পিছু হটে আসতে হলো।
এ সময় এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলতে লাগল, হে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের! পিছনে রক্ষিত স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করুন।
তিনি আহ্বানকারীর প্রতি উপেক্ষার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ এই বলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন, ‘ইবনুয যুবায়ের এত ভীরু কাপুরুষ নয় যে, বীর সঙ্গিদের মৃত্যু দেখে ভয় পাবে।’
মুষ্টিমেয় কয়েকজন সঙ্গি নিয়ে তিনি সিংহ বিক্রমে ময়দানে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন; কিন্তু তাঁর শরীর ছিল উন্মুক্ত ও অরক্ষিত। এ জন্য উল্কার বেগে যখন তিনি শত্রু সৈন্যকে ধাওয়া করছিলেন তখন শত্রুপক্ষের আক্রমণে ক্ষত বিক্ষত দেহ হতে রক্ত ছিটে পড়ছিল।
এমন সময় কাবার মিনার হতে আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এল। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি কানে পৌঁছার সাথে সাথেই আল্লাহর বান্দা হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়েরের তরবারী কোষবদ্ধ করে মসজিদে চলে গেলেন।
নামায শেষ করে এসে দেখলেন সবই শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি একাকীই অগণিত শত্রু সৈন্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে বিদ্যুতগতিতে তরবারী চালনা শুরু করলেন।
এমন সময় সামনের দিক থেকে একটি তীর এসে তাঁর মস্তক ভেদ করে গেল। শিরস্ত্রাণ, মুখম-ল ও দাড়ি রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠল। এ সময় তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন-
‘আমরা এমন নই যে, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করার পর আমাদের পা দিয়ে রক্ত ঝরবে।
আমরা বুক পেতে দিয়ে বীরবিক্রমে দ-ায়মান হই,
আর আমাদের বাহুতে রক্তের ফোয়ারা ছুটে।’
হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. এই বীরত্বগাঁথা গাইতে গাইতে তরবারী চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ তরবারী চালিয়ে এই অবস্থায়ই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে তার রুহ দুনিয়ার বাঁধন ছিড়ে চিরদিনের মত বিদায় হয়ে গেল।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হাজ্জাজ প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাঁর শির আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের কাছে পাঠিয়ে দিল। আর দেহটাকে শহরের বাইরে উঁচু স্থানে ঝুলিয়ে রাখল। এই হৃদয় বিদারক সংবাদ হযরত আসমা রা. এর কানে গেল। তিনি হাজ্জাজকে বলে পাঠালেন, যেন ইবনুয যুবায়েরের পবিত্র দেহ শূল হতে নামিয়ে রাখা হয়।
হাজ্জাজ উত্তর দিল-
কিছুতেই না; আমি এই দৃশ্য স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চাই।
হযরত আসমা রা. পুনরায় পবিত্র লাশের দাফন কাফনের অনুমতি চাইলেন; কিন্তু হাজ্জাজ এই আবেদনেও কর্ণপাত করল না।
কুরাইশরা এই পথে চলতেন আর তাদের এই বীর সন্তানের শূলবিদ্ধ লাশ দেখে নীরবে অশ্রু ঝরিয়ে পাশ কেটে চলে যেতেন।
ঘটনাক্রমে হযরত আসমা রা. একদিন এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আদরের সন্তানের লাশ এভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেলেন।
¯েœহময়ী মাতা দীর্ঘক্ষণ লাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে লাগলেন,
‘এখনও কি এই বীর যোদ্ধার ঘোড়া হতে নামার সময় আসে নাই ?
দীর্ঘক্ষণ যাবৎ জাতির এই খতীব মিম্বারে আরোহণ করেছেন।
নামেন নাই,
তিনি নামেন নাই।
এই বীর এখনো যোদ্ধাবেশ ত্যাগ করেন নাই।
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. ছিলেন অত্যধিক সাহসী এবং আত্মসম্ভ্রমবোধসম্পন্না। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ যখন তাঁকে তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পয়গাম পাঠাল, তখন তিনি তার ভয়ানক হুমকি ধমকি সত্ত্বেও সাক্ষাৎ করতে অস্বীকার করলেন।
হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ পুনরায় তাঁকে তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পয়গাম পাঠাল।
এবারও তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। এমনি করে তিন তিন বার তিনি হাজ্জাজের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।
শেষ পর্যন্ত হাজ্জাজ নিজেই তাঁর কাছে এসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. এর ব্যাপারে অশালীন কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করে দিল।
তখন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. হাজ্জাজকে যথোপযুক্ত জবাব দিয়ে দিলেন। হাজ্জাজ বলল,
বলুন তো আমি আল্লাহর দুশমন ইবনুয যুবায়েরের সাথে কেমন আচরণ করেছি?
‘তুমি তাঁর দুনিয়া শেষ করেছ। আর সে তোমার আখেরাতে শেষ করে দিয়েছে।
তুমি তাঁকে ‘যাতুন নিকাতাইন’ আমিই। আমিই আমার নিতাক দ্বারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর হিজরতের পাথেয় বেঁধে দিয়েছিলাম।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই আমাকে এই ‘যাতুন নিকাতাইন’ উপাধী দিয়েছিলেন।
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. হাজ্জাজের রক্তচক্ষুর মোটেও ভয় করেননি।
যেমনটি তিনি ভয় করেছিলেন না হিজরতের সময় মক্কার কুরাইশ কাফেরদের হিং¯্র দানবীয়তাকে।
লেখক : সাহাবীদের গল্প সিরিজ প্রণেতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight