একটি সমৃদ্ধ সিলেবাসের ভাবনা : মুফতী আলী হুসাইন

Islamic_Books

চিন্তা ও নৈতিকভাবে গোটা দুনিয়ার তাবৎ মানুষ তিনভাবে বিভক্ত।
এক, যারা মনে করে এ দুনিয়ার জীবনটাই একমাত্র জীবন। এরপর আর কোন জীবন নেই। হাশর-নশর, বেহেশত দোযখ বলতে কিছুই নেই। সুতরাং এই দুনিয়াতে যা পার কামাও যা পার খাও, যতটা পার উন্নতি সাধন কর।
দুই. পক্ষান্তরে এমনও অনেক আছেন যারা মনে করেন দুনিয়া অচ্ছুত; এটা স্পর্শ করা যাবে না। এখানকার কোন কিছু ভোগ-বিলাস করা যাবেনা। অন্যথায় মহান প্রতিপালকের রোষানলে পড়তে হবে এবং পরকালে সবকিছু খোয়াতে হবে। এই উভয় প্রান্তিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে মানবতার ধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে তার ভারসাম্যপূর্ণ এক চিন্তাধারা। ইসলাম মনে করে দুনিয়ার এ জীবনই আমাদের শেষ নয়, এরপর আরেকটা জীবন আছে এবং সেটাই আসল জীবন, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। সেখানকার সুখই আসল সুখ। আর সেখানকার দুঃখই হল আসল দুখ। অপরদিকে ইসলামের দৃষ্টিতে এ দুনিয়াও অচ্ছুত বা অস্পৃশ্য কোন বিষয় নয়; বরং এটারও গুরুত্ব তার নিকট অপরিসীম। কারণ, পরকালের অনন্ত অসীম জীবনকে সাফল মন্ডিত করার একমাত্র কর্মক্ষেত্র এটাই। সুতরাং পরকাল বাদ দিয়ে শুধু দুনিয়ার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হওয়া যেমন বিজ্ঞজনোচিত কাজ হবে না, ঠিক তদরূপ শুধু পরকাল চিন্তায় বিভোর হয়ে দুনিয়ার জীবনকে উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করা সচেতন ও দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় বিষয়টাকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-  আল্লাহর দেয়া নেয়ামত সমূহ দ্বারা তুমি পরকাল অন্বেষণ কর তবে দুনিয়াতে তোমার অংশও তুমি ভুলে যেয়ো না। [সূরা কাসাস : ৭৭]
দুই. প্রসিদ্ধ আছে শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। তবে কথা হল- কোন শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড? আর জাতি বলতেই বা কী বুঝায়? আমরা বাঙ্গালী জাতি, তার চেয়ে বড় কথা হল আমরা মুসলিম জাতি। ধর্মীয় শিক্ষা না থাকলে তো আমরা মুসলিম জাতিই থাকব না। উন্নতির প্রশ্ন তো আরো পরের কথা প্রথমে জাতির অস্তিত্ব টেকাতে হবে। তারপর উন্নতির চিন্তা করতে হবে। এটাই হল যুক্তিগ্রাহ্য নিয়ম। কিন্তু আমরা অগভীর উদ্ধেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, প্রবাদটিকে কেন্দ্র করে একটা ধু¤্রজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে। একদিকে করা হচ্ছে শিক্ষাই জাতির মেরুদ-! অপরদিকে ধর্মীয় শিক্ষার টুটি চেপে ধরা হচ্ছে।  তাহলে কী বুঝানো হচ্ছে? শুধু জাগতিক শিক্ষাই কি জাতির মেরুদ-? এটাতো কখনোই হতে পারে না। এমনটি হলে তো মুসলিম জাতিসত্ত্বা নিশ্চিত অস্তিত্ব সংকটে পড়বে এবং মুসলিম ঘরে ইসলাম বিদ্ধেসী শক্তির উত্থান ঘটবে, এতে  কোন সন্দেহ নেই। যেমনটি আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। মনে রাখতে হবে ইসলাম কখনোই জাগতিক শিক্ষার বিরোধী নয়। অনুরুপ ইসলাম বৈশ্বয়িক উন্নতিরও বিরুধী নয়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হল পরিস্থিতির শিকার হয়ে ইসলাম আজ সমাজে এমনি চিত্রিত হতে চলেছে। এর জন্য যেমন শত্রুরা দায়ী তার চেয়ে বড় দায়ী আমরা নিজেরাই।

বর্তমান প্রেক্ষাপট
আমাদের দেশে বর্তমানে ত্রিমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালূ রয়েছে-
১.    জাগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা- যেখানে পরকাল বা ধর্ম-কর্মকে বাদ দিয়ে শুধু ইহলৌকিক জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে।
২.  ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা- যেখানে শুধু পরকালীন জীবনের উন্নতি আর সফলতার প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে।
৩. এ উভয় ব্যবস্থাকে সমন্বয়কারী আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য উভয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বয় সাধন করা হলেও গোড়া থেকেই এর তত্বাবধান করেছে প্রথম শ্রেণীর মন-মানসিকতা পোষণকারীরা। ফলে এ ব্যবস্থা এ পর্যন্ত কখনোই সর্বত্র স্বীয় লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে নি; বরং তা প্রথম শ্রেণীরই পর্যায়ভুক্ত রয়ে গেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক হারে প্রথম ব্যবস্থা থেকেও ভয়ানক ফলাফল বয়ে এনেছে।
এসব দৃষ্টে বলা যায় যে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত দুভাগেই বিভক্ত। জাগতিক ও পারলৌকিক। এ উভয়বিধ শিক্ষার অনিবার্য ফল হিসেবে আজ সমাজে দু’টি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। এবং এ দু শ্রেণীর মাঝে বিস্তর ফারাকও সৃষ্টি হয়েছে। যা এমন আরো ভয়ানক রূপ পরিগ্রহ করে চলছে। এর আশু সমাধান করতে না পারলে দেশ ও জাতি মারাত্মক হুমকির সুম্মখীন হতে হবে। এখন প্রশ্ন হল এর সামাধান কী ?
এর সবচেয় সুন্দর ও ফলপ্রসু সমাধান হত যদি সরকারীভাবে সমস্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হত এবং শতকরা ৯০/৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশ হিসেবে আমাদের এ আশাবাদ অযৌক্তিক হওয়ার কথা নয়। আজ যদি এমনটি হত তাহলে দ্বিমূখী শিক্ষার তেমন প্রয়োজন পড়ত না। আর সরকারের একমূখী শিক্ষানীতির যে দাবী তাও বাস্তবায়িত হত। সাথে সাথে মুসলমানদের জাতীয় স্ব^কীয়তাবোধও বলবত থাকত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের সরকারী সিলেবাসে ইসলাম ধর্ম শিক্ষাকে রাখা হয়েছে খন্ড করে। ফলে জাতীয় চিন্তা জাতিকেই করতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় সমাধান
এটা ছিল সরকারের কাজ যেহেতু সরকার এ ব্যাপারে যতœবান হচ্ছে না, তাই বাধ্য হয়েই জাতিকে আজ এ ধর্মীয় শিক্ষার গুরুভার নিজ স্কন্দে উঠাতে হচ্ছে। কেননা শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। শিক্ষা না থাকলে জাতি নিষ্প্রাণ ও বশংবদ জাতিতে পরিণত হতে বাধ্য। যে ডাবের ভিতর পানি নেই, যে ইক্ষুর ভিতর মিষ্টতা নেই, যে ফলের ভেতর যেগুণ থাকার কথা তাই যদি না থাকে তাহলে এগুলো মূলত ফল নয়; ফল নামের  কলঙ্ক। এ সব ফল বাজারে উঠালে মূল্য তো দুরের কথা জনগনের উত্তম মাধ্যমের শিকার হতে হয়। তাহলে   যে মুসলমানদের ভেতর ইসলামের কোন কার্যকলাপ নেই ইসলামের গুণাবলি নেই সে কি শুধু নাম আর বংশের জন্য মুসলমান আখ্যায়িত হবে? হলে হতেও পারে, কিন্তু তার মূল্যায়ন বিশ্ববাজারে ঠিক সেরকম হবে যেরকম অন্তসারশূন্য খোলসধারী ফলের হয়ে থাকে। এহেন নামধারী মুসলমানে জগত ভরে গেলেও ইসলামের কোন উপকার হবে না। আর দুশমনের কোন মাথা ব্যাথাও হবে না।
অতএব, আসুন আমরা শুধু নামকাওয়াস্তে নয়, বরং সত্যিকারার্থে মুসলমান হওয়ার প্রায়াসী হই। এবং এ জন্য যে লাগসই শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার তা আয়ত্ব করার প্রতি যতœবান হই।
ইসলামের শিক্ষা ব্যবস্থা
যে কোন জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন সর্বাগ্রে বিবেচ্য। তারপর উন্নতির প্রশ্ন। অস্তিত্ব না টিকিয়ে শুধু উন্নতির চিন্তা করা যেমন বেকুবী তেমনী শুধু অস্থিত্ব টিকিয়েই বসে থাকা উন্নতির কোন ব্যবস্থা না নেওয়াও সর্বনাশা। জাতির অস্তিত্ব টেকে কালচারাল শিক্ষার মাধ্যমে। আর উন্নতি সাধিত হয় বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠান লাভ করার মাধ্যমে। এ জন্য অপরিহার্য হল সংশ্লিষ্ট লাগসই শিক্ষা ব্যবস্থা। মুসলিম জাতি শুধু অস্তিত্ব নিয়েই সন্তুষ্ট হতে পারে না। বিশ্ব বাজারে প্রতিষ্ঠা লাভের উদগ্রবাসনা এবং এর জন্য যুৎসই পদক্ষেপ গ্রহণও দরকার। মনে রাখতে হবে ইসলাম শুধু আখেরাত নিয়েই বসে থাকতে আসেনি। ইরশাদ হচ্ছে-


তিনিই সেই সত্বা যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। যাতে করে তিনি এ দীনকে অপরাপর দীনেরউপর বিজয়ী করেন। যদিও মুশরিকা তা অপছন্দ করে। [সূরা তাওবা : ৩৩, সূরা সাফ : ৯।আর এটাও সতঃসিদ্ধ কথা যে.বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতো  না । পারলে পরিপূর্ণ আখেরাত টেকানোও অসম্ভব।
ইসলাম জীবন বিধান হিসেবে যেমন পরিপূর্ণ তেমনি তার শিক্ষা ব্যবস্থাও হবে পরিপূর্ণ। এর মাঝে জাগতিক ও পরলৌকিক কোন ভাবে ত্রুটি থাকার কথা নয়। ভারতের আযহার খ্যাত এতিহাসিক দারুল উলূমের প্রতিষ্ঠাতা মুহতামীম হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা কাশেম নানুতুবী রহ. বলেছিলেন, আমাদের ছেলেরা এখান থেকে দাওরা পাশ করার পর বসে থাকবে না; বরং জাগতিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত হবে। সুতরাং ইসলামের শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে পরকালনির্ভর শিক্ষা বুঝায় শুধু পরকালিন শিক্ষাকে নয়। আর এখানেই মূলত অন্যান্য শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবধান। যদি কেউ এমন ভাবে যে ইসলমী শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে শুধু কুরআন-হাদীসের শিক্ষা বা কওমী ধারার শিক্ষাকে বুঝায় তাহলে তা যথার্ত হবে বলে মনে হয় না। যতদূর বুঝে আসে এতে ইসলামী শিক্ষাকে খাটো করে দেখানো হয়। যা ইসলামের পরিপূর্ণতার উপর মারাত্মক এক বজ্রাঘাত।

একটি সংশয়
তবে এখানে অনেকের মনে একটি সংশয় উঁকি দিতে পারে যে যদি এমনটিই হবে তাহলে আমাদের আসলাফ কেন শুধু একমুখী শিক্ষা নিয়েই আমরণ ব্যস্ত থেকেছেন?
নিরসন : এর নিরসন কল্পে বলব যে, আমাদের আসলাফ বলতে কারা? নিকট অতীতের ভারতীয় আকাবির? না, শুধু এই সংকীর্ণ বৃত্তবদ্ধতা মানতে আমি নারাজ। আমাদের আসলাফ বরং পুণ্যাত্মা সাহাবা থেকে নিয়ে ভারতীয় অভারতীয় সব মুসলিম মনিষী ব্যপিই ব্যাপৃত। আর এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সমাজ জীবনের মানোন্বয়ন সংশ্লিষ্ট বহু কিছুর মধ্যে বিশ্বের প্রাগ্রসর মানবজাতি হিসেবে বিবেচিত ছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয়- পরবর্তীতে বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে মুসলমানরা ক্রমশ সিটকে পড়তে থাকে। তারি সাথেরই সাথে বিশ্ব সভ্যতার উন্নয়ন থেকেও দূরে সরতে থাকে।   আমি এখানে ‘চেপে রাখা ইতিহাস’ থেকে কিঞ্চিত আলোকপাত করতে চাই- এ থেকে বুঝতে কষ্ট হবে না যে অতীতে বিশ্ব সভ্যতার উন্নয়নে মুসলমানদের কতটা কৃতিত্ব রয়েছে। উক্ত গ্রন্থটিতে লিখক লেখেছেন- ‘মুসলিম সভ্যতা বিশ্বের উন্নতির সর্ববিভাগে এমন সৃজনশীল ও আবিষ্কারের জনক হয়ে আছে যা ঐতিহাসিক সত্য। বিজ্ঞান বিভাগে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় রসায়নের জন্মদাতা মুসলমান। রসায়নের ইতিহাসে জাবিরের নাম সর্বাপেক্ষা উল্লেখ্যযোগ্য। তাছাড়া ছোট খাট জিনিস ধরলে তো ফিরিস্তি অনেক লম্বা হয়ে যাবে।  বন্দুক, বারুদ, কামান, প্রস্তর নিক্ষেপণ যন্ত্রের সম্বন্ধে বিখ্যাত আরবী গ্রন্থ তারাই লিখেছেন বিশ্ববাসীর জন্য। সেটির নাম-‘আলফুরুসিয়া ওয়াল মানাসিব উল হারাবিয়্যা’। ভূগোলেও মুসলমানদের অবদান  এত বেশি যা জানলে অবাক হতে হয়। ৬৯জন মুসলিম ভূগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম যে মানচিত্র এঁকেছিলেন তা আজও বিশ্বের বিষ্ময়। তার আরবী নাম হচ্ছে- ‘সুরাতুল আরদ’ যার অর্থ হচ্ছে বিশ্বের আকৃতি। জনাব ইবনে ইউনুসের অক্ষ রেখা ও দ্রাঘিমা ম-ল নিয়ে গবেষণার ফল ইউরোপ মাথা পেতে মেনে নিয়েছিল। জনাব ফরগানী জনাব বাত্তানি ও আল খারজেমি প্রমুখের ভৌগলিক অবদান স্বর্ণম-িত বলা যায়। কম্পাস যন্ত্রের আবিষ্কারকও  মুসলমান। তাঁর নাম ইবনে আহমদ। জলের গভীরতা ও সমুদ্রের ¯্রােত মাপক যন্ত্রের আবিষ্কারক ইবনে আব্দুল মাজিদ। বিজ্ঞানের উপর যে সব মূল্যবান প্রাচীন গ্রন্থ পাওয়া যায় আজও তা বিজ্ঞান জগতের পুঁজির মত ব্যবহৃত হচ্ছে। ২৭৫টি গবেষণামূলক পুস্তক যিনি একাই লিখেছেন তিনি হচ্ছেন জনাব আলকিন্দি। প্রাচীন বিজ্ঞানী জনাব হাসান, জনাব আহমদ, জনাব মুহাম্মদ সম্মিলিতভাবে ৮৬০ সালে বিজ্ঞানের একশত রকমের যন্ত্র তৈরীর নিয়ম ও ব্যবহার  প্রণালী এবং তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করে গেছে।
চার্লস ডারউইন পশু-পক্ষি, লতা-পাতা নিয়ে গবেষণা করে পৃথিবীতে প্রচার করেছেন- ‘বিবর্তনবাদ’; কিন্তু তারও পূর্বে যিনি ঐ কাজ করার রাস্তা করে গেলেন এবং ইতিহাসে সাক্ষ্য রেখে গেলেন তিনি হচ্ছেন  জনাব আল আসমাঈ। তাঁর বইগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। ৭৪০ খৃষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয় এবং ৮২৮ খৃষ্টাব্দে হয় তার পরলোক গমন। মুসলমানরাই পৃথিবীতে প্রথম চিনি তৈরী করেন। ভূতত্ব সম্বন্ধে তুলো থেকে তুলট কাগজ প্রথম সৃষ্টি করেন ইউসুফ ইবনে ওমর। তার দুবছর পর বাগদাদে কাগজের কারখানা তৈরী হয়।
জাবীর ইবনে হাইয়ান- ইস্পাত তৈরী, ধাতুর শোধন, তরল বাস্পীকরণ, কাপড় ও চামড়া রং করা, ওয়াটার প্রুফ তৈরীলোহার মরিচা প্রতিরোধক বার্ণিশ, চুলের কলপ ও লেখার পাকা কালি সৃষ্টিতে অমর হয়ে রয়েছেন। ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড থেকে কাঁচ তৈরীর প্রথম চিন্তাবিদ মুসলিম বিজ্ঞানী। র্আরাজীও অমর হয়ে আছেন। ইংরেজদের ইংরেজি শব্দে ঐ বিজ্ঞানীর নাম ‘জধুবং’ লেখা আছে। একদিকে তিনি ধর্মীয় প-িত অপরদিকে গণিতত্ব ও চিকিৎসা বিশারদ ছিলেন। সোহাগা লবন, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিকও  সালমিয়াক নিয়ে তাঁর লেখা ও গবেষণা উল্লেখযোগ্য। আরও মজার কথা, পৃথিবীতে প্রথম জল জমিয়ে বরফ তৈরী করাও তাঁর অক্ষয় কীর্তি। ইউরোপ পরে নিজের দেশে বরফ প্রস্তুত কারখানা চালু করে।
পৃথিবী বিখ্যাত গণিত বিশারদদের ভিতর ওমর খৈয়ামের স্থান উজ্জল রতেœরমত। ঠিক তেমনি নাসিরুদ্দীন তুসি এবং আবু নিসার নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আকাশ জগৎ পর্যবেক্ষণ করার জন্য বর্তমান বিশ্বের মানমন্দির আছে বৃটেনে এবং আমেরিকায়। কিন্তু কে বা কারা এগুলোর প্রথম আবিষ্কারক প্রশ্ন উঠলে উত্তর আসবে জনাব হাজ্জাজ ইবনে মাসার এবং জনাব হুসাইন ইবনে ইসহাক। এঁরা পৃথিবীর প্রথম মানমন্দিরের আবিষ্কারক। সেটা ছিল ৭২৮ খৃষ্টাব্দে। ৮৩০ খৃষ্টাব্দে জন্দেশপুরে দ্বিতীয় মানমন্দির তৈরী হয়। বাগদাদে হয় তৃতীয় মানমন্দির। দামেষ্ক শহরে চতুর্থ মানমন্দির তৈরী করেন আল মামুন।
আর ঐতিহাসিকদের কথা বলতে গেলে মুসলিম অবদান বাদ দিয়ে তা কল্পনা করা মুশকিল। এমনকি মুসলমান ঐতিহাসিকরা কলম না ধরলে ভারতে ইতিহাস হয়ত নিখোঁজ হয়ে যেত। অবশ্য ইংরেজ ঐতিহাসিকদের সংখ্যাও কম নয়। তবে দারুনভাবে মনে রাখবার কথা- ইতিহাসের ¯্রষ্টা বিশেষত মুসলমান। তার অনুবাদক দল ইংরেজ ঐতিহাসিকরা। আর আমাদের ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ ইংরাজির অনুবাদ করেছেন। যে কোন প্রকৃত ঐতিহাসিক কিংবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অন্ততঃ জানিনা বলতে পারবেন না। নিশ্চয় স্বীকার করবেন  যে, মূল ঐতিহাসিক বেশীর ভাগই মুসলিম। যেমন- আল বিরুনী, ইবনে বতুতা, আলি বিন হামিদ, বাইহাকী, উৎবী, কাজী মিনহাজুদ্দিন সিরাজ, মহীউদ্দিন, মুহাম্মদ ঘোরী, জিয়াউদ্দিন বারণী, আমীর খসরু, শামসী সিরাজ, বাবর, ইয়াহইয়া, বিন আহমদ, জওহর, আব্বাস, শেরওয়ানি, আবুল ফজল, বাদাউনি, ফিরিস্তা, কাফি খাঁ, মীর গেলাম হুসাইন, হুসাইন সাঁলেমী ও সাইদ আলী প্রমূখ মনীষী। [সূত্র চেপে রাখাত ইতিহাস : পৃ. ২১-২৩]
উদ্বৃতাংশ থেকে কী প্রমাণিত হয়? এ থেকে কি এ কথা প্রমাণিত হয় না যে আমাদের মহান পূর্বসূরীগণ গনমূখী সর্ববিষয়েই অগ্রসরমান ছিলেন? বরং পথিকৃত ছিলেন। তাহলে আমরা তো  তাদেরই উত্তরসূরী। আমরা কেন পারি না তাদের পদাংক অনুসরণ করতে? এ জন্য কে দায়ী? যতটা দায়ী বাইরের ষড়যন্ত্র, তারচেয়ে বড় দায়ী আমাদের আত্মসচেতনতার অভাব। ‘আল ইসলামু ইয়ালু ওয়ালা য়ূলা’ এই যে মহান বানী তা আমরা ভুলেই বসেছি।। আফসোস! ….।
এবার আসি নিকট অতীতের আসলাফ সম্পর্কে। তাঁদের কেউ অভিবাকত্বহীনতার কারনে, আর কেউ উদাসিনতার কারনে, আর কেউ বা পরাধীনতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শুধু অস্তিত্ব টেকাতেই ব্যস থেকেছেন। ফলে সঙ্গত কারনেই তারা এগুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে পারেননি। কিন্তু এখন কী আমরা পরাধীন? এখন তো আমরা স্বাধীন। এখনো কেন আমরা বসে থাকব?
তখন তারা ইচ্ছে করলেই আমাদের দাবিয়ে রেখেছে। শিক্ষা-দীক্ষা চাকরী-বাকরীসহ সমস্ত গনমূখী পদ ও কার্যক্রমের শুধু হিন্দুদেরকেই বসিয়েছে। আর আমাদেরকে কোন পদ তো দেয়-ই নাই, পরুন্ত উপর্যপুরী জুলুম নির্যাতন চালিয়ে প্রচ- রকমের  একটাচাপের মধ্যে রেখেছে। এমনকি মুসলমানরা যেন  মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে; বরং সর্বদা রুটি রোজির চিন্তায় বিভোর থাকে সে জন্য বসত ভিটা পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। পক্ষান্তরে হিন্দুদের কে দিয়েছে স্থানে স্থানে বিস্তীর্ণ ভূমির জমিদারী। একদিকে চাকরী অপরদিকে জমিদারী প্রদান করে এদেরকে করেছে পরিপুষ্ট। আর সম্পূর্ণ উল্টো নীতি  অবলম্বন করে  আমাদেরকে করেছেন কোনঠাসা। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতির দিকে একটু লক্ষ করুন। কোন দিকে আছে? কোন বিভাগ আছে যেখানে আমরা যোগ্যতা নিয়ে গেলে তাতে চান্সপাব না? আর সব বিভাগেই কি আমাদের জনশক্তির দরকার নেই? এটাও কি দীনের অংশ নয়? সুতরাং পুরোপুরি না হোক অন্তত যতটা সম্ভব ততটার চেষ্টা তো অব্যাহত রাখা চাই। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখক: মুফতি, মুহাদ্দিস ও গবেষক:
জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া, গাজিপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight