একটি তাওবা ও আমাদের শিক্ষা : মাওলানা আমীরুল ইসলাম

Tawba

১৯৬৫ সনের কথা। হজ্জের সফরে এক বৃদ্ধের সাথে আমার পরিচয়। খুবই সাদা মনের মানুষ। কথাবার্তায় অসাধারণ মাধুর্যতা। মদীনা মুনাওরায় তার একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁ। জীবিকা হিসেবে এটাই তার একমাত্র সম্বল। খুব একটা জাঁকজমক না হলেও অনেক সাজানো গুছানো। খাবারের মানও খুব একটা খারাপ না। প্রথম পরিচয়েই তার সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠলো। কথায় কথায় অনেক বন্ধুত্ব জমে গেল। জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় শেয়ার করলেন। জানলাম তার আসল বাড়ি মিসরে; সেখানেই তার বাপ দাদার বসবাস। আমার কৌতুহল জাগলো, তাহলে মদীনায় এলেন কিভাবে? তিনি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শুধু বললেন, থাক তা আর জেনে দরকার নেই; এর পিছনে এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। আমি তো নাছোড় বান্দা; অনেক পিড়াপিড়ি করলে অবশেষে বললেন, “আসলে মানুষের জীবনে নানান ঘাত প্রতিঘাত থাকে; থাকে আনন্দ বেদনার; কান্না-হাসির অনেক ঘটনা। ঠিক তেমনি আমিও একটি স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও বেঁচে আছি।
১৯০৯ সনের কথা: ‘কায়রো’-এর ছোট্ট একটি গ্রামে আমি জন্মেছিলাম। পরিবারে দারিদ্রতা থাকায় ছোট বয়সেই কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। এক সময় দয়াময়ের করুণায় একটি ছোট্ট চাকুরী ‘দোকান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার’ পেলাম। মালিকের কাপড় ব্যবসা; খুবই দক্ষ মানুষ তিনি। ব্যবসা সম্পর্কে যথেষ্ঠ ধারণা রাখেন। খুবই অল্প সময়ে দোকানটিকে তিনি অভিজাত বিপণীতে রূপান্তর করে ফেলেন। যতদূর মনে পড়ে আমার বয়স তখন বিশ বছর। খুব ধীরে ধীরে কষ্টের সিঁড়িগুলো পাড়ি দিচ্ছিলাম। প্রথম চান্সেই মালিকের মন জয় করেতে সক্ষম হই। তিনি সাধারণ কর্মচারী থেকে আমাকে সেল্সম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। এর তিন বছর পর পদবী আরো বাড়লো। মালিক বিশ্বাস করে আমাকে ক্যাশিয়ার হিসেবে নিয়োগ দিলেন। আমি বরাবরই উচ্চাভিলাসি ছিলাম। কাজেই কাজগুলো খুবই সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে চেষ্টা করতাম। তবে চাকরিটা ছিলো খুবই কষ্টের। সেই সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাকা বারো ঘন্টা ডিউটি। তাই রাতের বেলা দোকান থেকে বের হতেই সারা দিনের ক্লান্তি একত্র হয়ে আমাকে জাপটে ধরতো। মনে হতো পুরো দুনিয়া আমার চোখের সামনে চরকিরমত করে ঘুরছে। আর এ অবস্থা নিয়েই সোজা আমার বড় ভাইয়ের দোকানে গিয়ে তার সাথে রাতের খাবার সারতে হতো। আবার বাসায় ফিরলে, মায়ের একটাই কাজ ছিলো আমাকে বিয়ের প্রতি তাগিদ দেওয়া। আর আমিও বরাবরই বিলম্বে করবো বলে জানাতাম এবং মনে মনে বলতাম, বিয়ে? একশ পাউ- হলে আমার একটা ছোট্ট কাপড় দোকান হয়ে যায়। তারপর থেকেই শুরু হলো অসৎ পন্থায় টাকা উপার্জন। আমি বিপণী থেকে সবার অগোচরে এক পাই দু’পাই করে জমাতে থাকলাম। এক সময় চুরির পরিমাণ বেড়ে গেল। তবে সবই চলছিলো খুবই সঙ্গোপনে। অন্যদিকে মালিকের খুবই আস্থাভাজন হওয়ায় ধরা পড়া তো দূরে থাক এক‘শ পাউ- জমাতে আমার খুব বেগ পেতে হলোনা। কিল্লাফতেহ! এই ভেবে ছোট্ট একটি দোকান খোঁজ করতে আরম্ভ করলাম।
কিন্তু, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! হঠাৎ আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাকে নিয়ে হসপিটালে ছুটলাম। ডাক্তার জানালেন অপারেশন করাতে হবে। আমি ডাক্তারের কথায় রাজি হলাম। এরপর মাকে একে একে দুটো অস্ত্রপচার করা হলো; কিন্তু মা আর বাঁচলেন না! ওদিকে আমার সব জমানো টাকা মায়ের চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেলো। হিসাব করে দেখলাম মায়ের দাফন কার্য সম্পাদনের পর মাত্র চার পাউ- অবশিষ্ট আছে। আমি যেন চোখের সামনে অন্ধকার দেখছিলাম! গোটা দুনিয়া আমার কাছে বদ্ধভূমি মনে হচ্ছিলো!! মাত্র তিনমাসে চৌরাশি পাউ- খরচ করে ফেললাম? আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন টাকাগুলো আমি কীভাবে উপার্জন করেছি। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। মায়ের মৃত্যুর পর বিপণীতে কাজের চাপ বেড়ে দিগুণ হলো। মালিক পাশাপাশি আরো একটি দোকান কিনলেন। সে সুবাদে আমি বনে গেলাম প্রধান হিসাব রক্ষক। আমার জন্য মালিকের অফিসের পাশে হিসাব নিকাশের সুবিধার্থে ছোট্ট একটি কামড়াও বরাদ্ধ দেওয়া হলো। দিনান্তে সেখানে নিজ হাতে শত শত পাউ- লকারবদ্ধ করতাম। অর্থগুলোর প্রতি তাকাতেই আমার মনের মধ্যে এক অজানা শিহরণ জেগে উঠতো। আর মনে মনে কল্পনা করতাম, ইস! টাকাগুলো যদি আমার হতো তাহলে আমিও উস্তাদ সালামার মতো একটি দোকান খুলতে পারতাম। এরই মধ্যে আমার জীবনের অন্য একটি অধ্যায় শুরু হল।
দোকানে একটি মেয়ের সাথে পরিচয়। মেয়েটি ভারী সুন্দরী। প্রথম দেখাতেই যে ভালবেসে ফেলেছিলাম তা আর গোপন করতে পারছি না। আবার সেও যে আমাকে ভালোবাসতো এতেও কোন সন্দেহ ছিল না। যাহোক, মাঝে মধ্যেই সে আমার দোকানে আসতো এবং গল্প করত। কোন একদিন কথার ফাঁকে জানতে পারলাম তার বাবা অনেক বড় সরকারী কর্মকর্তা। মনের  অজান্তেই তাকে নিয়ে ঘর বাধাঁর স্বপ্ন দেখলাম। মূলত সেই আমাকে এ স্বপ্নœ দেখতে বাধ্য করেছিল। মনে মনে প্লান করলাম, তার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দিব। যেই কল্পনা সেই কাজ। আমার এক পরিচিত ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সোজা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। তার বাবা-মায়ের সাথে কথা হলো। কিন্তু, যখন তারা জানতে পারলেন আমি দোকান মালিকের পুত্র নই তখন আর রক্ষা হলনা। সোজা আমাদেরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে নীল হয়ে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম- না আমি সামিরাকে ভুলে যাব। কিন্তু সম্ভব হলো না। ওদিকে একের পর এক হুমকি আসছিলো-আমাকে আবার দেখলে দোকান মালিককে সবঘটনা খুলে বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেই শেষ নয়। শেষে উস্তাদ সালামাকে বিষয়টি জানিয়েও দিল। অভিযোগের বিষয়টি যেভাবে জানতে পারলাম- হঠাৎ এক সকালে উস্তাদ সালামা দোকানে উপস্থিত। চোখে মুখে স্পষ্ট ক্রোধের চিহ্ন। দোকানে ঢুকেই আমাকে ধমকাতে আরম্ভ করলেন, তোমার এত বড় স্পর্ধা। তোমাকে ফের মেয়েটির বাড়ির আঙ্গিনায় পাওয়া গেলে তখন বুঝো।
আমার সে দিন যে কী পরিমাণ কষ্ট লেগেছিল তা বলে বুঝাতে পারবনা। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে সারাদিন কেঁদে ছিলাম। কূল কিনারা না পেয়ে বিষয়টি আমার এক ঘনিষ্ট কাস্টমার-এর সাথে শেয়ার করলাম। সে সৌদিতে ব্যবসা করতো। তবে, মাঝে মাঝে বিভিন্ন পণ্যের প্রয়োজনে আমাদের দোকানে আসতো। অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। অল্পদিনেই তার সাথে আমার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। আমার বলতে দিধা নেই যে, সেই কঠিন মুহূর্তে সেই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল। বলা যায়, বন্ধুকে আমি দুঃখের সময় শতভাগ কাছে পেয়েছিলাম। একদিন কায়রো-এর কোন এক সড়ক ধরে দু বন্ধু হাটছিলাম। আমি কথায় কথায় তাকে ঘটনাটা বলে দিলাম। কিছুক্ষণ ভেবে সে আমাকে প্রশ্ন করলো- আচ্ছা, মেয়েটি কি তোমাকে সত্যই ভালবাসে? আমি বললাম, অবশ্যই। সে পাল্টা প্রশ্ন করল- তবে তাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছনা কেন? আমি তার কথা শুনে হতচকিত হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তাকে নিয়ে পালিয়ে যাব! সে বলল, বিয়ে করে নিশ্চয়। আমি বললাম, আমাকে এ কাজে সাহায্য করবে এমন লোক এ শহরে কে আছে! সে বলল, দেখো তার পক্ষ থেকে কাউকে উকিল বানাতে পারোকিনা। তাহলে আমরা উপস্থিত থেকে বিয়ের কাজ সমাধা করে ফেলতে পারব। আমি বললাম, আচ্ছা তা না হয় হবে; এরপর কোথায় যাব? কেন তুমি আমার সাথে সৌদি চলে যাবে। আর আমি তো তোমার সহযোগিতায় আছিই। সেদিন রাতে ঘুম হলনা। শুধু একটি প্রশ্নই আমাকে কুঁড়ে খাচ্ছিল- কে আমাকে এ বিয়েতে সাহায্য করবে? অনেক্ষণ পর নিজেই একটা সমাধান বের করলাম। আচ্ছা, বিষয়টি আব্বাসকে জানালে কেমন হয়? কারণ সে ছিল সম্পর্কে আমার খালাত ভাই। দুজন সমবয়সি আবার ভাল বন্ধুও। আমরা একই সাথে স্কুলে পড়া-লেখা করেছি। তবে ভাগ্যের গুণে আজ দুজন দু’পথে। সে অর্থমন্ত্রণালয়ে চাকরি করে। আর আমি সাধারণ কর্মচারী। মজার ব্যপার হল, সামিরার বাবাকে সেও মনে মনে ঘৃণা করতো। কারণ তিনি  ভিষণ অহংকারী একজন।
পরদিন আমি তার সাথে যোগাযোগ করলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার। আমি সাক্ষাতে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। সে শুনে ক্রোধে ফেঁটে পড়লো ‘বেটার এতবড় সাহস? যা, আমি কথা দিলাম এ বিয়ে হবেই হবে। দেখি সে কী করতে পারে। আমি বাড়ি ফিরে এলাম। ক’দিন পর খালাত ভাই এসেই বলল, তুই বিয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি নে অমুক দিন বিয়ে হবে। অতঃপর নির্ধারিত দিন দুপুর বেলা বিয়ের কাজ সম্পন্ন হল। সামিরা নিজের মতো বাড়ি ফিরে গেল। সবকিছু এত সুচারুরূপে করা হল যে, তার বাবা-মা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। আফসোস! শয়তান কত সরলভাবেই না মানুষকে ঠকায়। আমিও আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলছিলাম। তবে যখনই দোকানের লকার খোলতাম আর দেখতাম নিজের সামনে অজ¯্র পউ-। তখনই শয়তান এসে উপস্থিত হতো। আরে, এইতো তোর সামনে টাকা। আরে দূর্ভাগা তুই কিসের ভয় করিস? খালি হাতে বৌ নিয়ে দূর দেশে পাড়ি জমাতে চাও খাবার জুটবে কোত্থেকে? দোকান মালিক সালামা এত অর্থ কার উসিলায় জমাতে পারল। ভীরু! এতে তোর মাথার ঘাম পায়ে ঝড়েনি? ভাল করে ভেবে দেখ, সফরে যাবার পূর্বেই যা পারিস হাতিয়ে নে। যত পারিস ততো নিয়ে নে। কে জানবে তুই সুয়েস থেকে জাহাজে চড়ে সৌদি পাড়ি জমিয়েছিস। কে পাবে তোর খোঁজ…… ইত্যাদি ইত্যাদি। অপর দিকে সৌদি বন্ধু এসে উপস্থিত, সে বলল- মাহমুদ! আর মাত্র তিন দিন বাঁকি। রবিবার সকালে জাহাজ ছেড়ে যাবে। আজ হল বুধবার। তাই কমকরে হলেও শুক্রবার রাতেই ট্রেনে সুয়েস পৌঁঁছতে হবে। সুতরাং যা ভাবার জলদি ভাবো। হাতে সময় কিন্তু একদমই কম’। সৌদি বন্ধু এ কথা বলেই দ্রুত প্রস্থান করল। আফসোস! এদিন রাতেই উস্তাদ সালামা আমাকে তার অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে বললেন, মাহমুদ! আমি আগামিকাল ভোরে আলেকজান্দ্রিয়া যাচ্ছি। আশা রাখি রোববার দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসব। তাই সবকিছু তোমার দায়িত্বেই রেখে গেলাম। আমি তোমার থেকে হিসাব নিব। এ সময় টুকুও আমার হাতে নেই। আমার ব্যাংক একাউন্ট নাম্বার তো তোমার জানাই আছে। সুতরাং টাকাগুলো আগামিকাল একাউন্টে জমা করে দিও। এভাবে বৃহস্পতি ও শনিবারেও টাকা জমা রাখবে। তবে একটি ছোট্ট কথা- চোখ, কান খোলা রেখে চলবে।’ এই বলে তিনি দোকান থেকে বের হয়ে গেলেন। আশ্চর্য! এটা তো সর্ব প্রথম নয় যে, তিনি টাকা-পয়সা আমার দায়িত্বে রেখে যাচ্ছেন। তবে, হ্যাঁ পার্থক্য আছে। আজকের মাহমুদ আর সেই মাহমুদ নেই। তাই উস্তাদ সালামা যেন তার দোকান ও সমুদয় অর্থ এক মানবরূপী শয়তানের কাছে ছেড়ে গেলেন। ওই দিনই আমি সামিরার সাথে দেখা করে পালানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করলাম। পরদিন দোকানে এসেই সবটাকা একত্র করে দেখলাম সাত’শ পাউ-। দ্রুত টাকাগুলো ব্যাগে ভরে লকার বন্ধ করে দিলাম। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা সৌদি বন্ধুর কাছে হাজির হলাম। সে আমার অন্যান্য আসবাব সহ আগ থেকেই অপেক্ষা করছিল। প্লান মতো ভাড়া গাড়িতে করে সামিরার অপেক্ষা স্থলে পৌঁঁছলাম। দেখি, বেচারী চাতক পাখির মতো পথ পানে তাকিয়ে আছে। কোন কথা না বলেই গাড়িতে উঠল। আমরা সোজা পোর্টে (বন্দরে) গেলাম। জাহাযে উঠার আগে সবকিছু আবার ভাল করে চেক করে নিলাম। দেখলাম, মাশাআল্লাহ! কোথায়ও কোন ত্রুটি হয় নি। তারপর সবাই জাহাযে চড়ে বসলাম। জাহায জেদ্দা বন্দরে গিয়ে ভিড়ল।
এতটুক বলে তিনি থেমে গেলেন।
একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন, একটু পানি হবে-গলাটা বড্ড শুকিয়ে এসেছে। আমি তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিতেই সবটুকু পানি এক ঢোকে শেষ করেই জিজ্ঞেস করলেন, কোন পর্যন্ত যেন এসে ছিলাম? আমি স্মরণ করিয়ে দিলাম। উফ! মনে পরেছে। তারপর জিদ্দা বন্দর থেকে সোজা মদীনা মুনাওয়ারায় গেলাম। তখনকার মদীনা এতো জাঁকালো ছিল না। ছোট্ট একটি গ্রাম মাত্র। পৌঁছতে রাত হয়ে গেল। বন্ধুটি আমার খুবই বুদ্ধিমান আগ থেকেই আমাদের জন্য ছোট্ট একটি পুরাতন বাসা ভাড়া করে রেখেছিল। আর দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই বাসাকে কেন্দ্র করেই সামিরার সাথে আমার অশান্তির সূত্রপাত হয়। পুরাতন বাসা দেখে সামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, এই সাধারণ মানের বাসায় আপনি আমাকে নিয়ে এসেছেন? আমি তার কথার জবাব না দিয়ে কূপি জ¦ালালাম এবং বললাম, হ্যাঁ এটাই আমাদের নতুন বাসা। সে মনক্ষুণœ হল। সকাল পর্যন্ত তার সাথে আমার একটি বাক্যও বিনিময় হয়নি। এমনকি বেচারী কিছু আহারও করেনি। বিষয়টি আমার অনুভূতিতে ভিষণ ভাবে নাড়া দিল। উপলব্ধি করলাম শয়তান আমাদেরকে নিয়ে কী নোংরা খেলাই না খেলেছে। আমি সবকিছুকে ছাপিয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নিলাম। শুরু হল কাপড় ব্যবসা। কিন্তু সামিরা দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছিল। বেচারী রাতে একটুও ঘুমাত না। দু’ হাতের উপর মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস মনে কী যেন ভাবত। সারাদিন একা একা দুশ্চিন্তা করত। আমি নিজেকে বুঝ দিতে পারছিলাম না। এই কি সেই সামিরা না যে আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করে আমার সাথে প্রবাসে পালিয়ে এসেছে? কিন্তু মনের কাছ থেকে জবাব পেলাম, কক্ষণই না। সে তো তোমাকে নয় বরং বিপণীর এক সংগ্রামী যুবককে বিয়ে করেছে, যার পরিচয় হলো সে একজন চোর। এটা শুধু আমার কথা নয়। বাস্তবেও সামিরা আমাকে এসব বলত। আমি তার মন পাবার জন্য যা কিছুই করছিলাম সবই তার কাছে অপ্রতুল মনে হচ্ছিল। তার কাছে টাকা, উন্নত খাবার, সুখ সাচ্ছন্দ এবং আনন্দ ফূর্তিই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াল। যেন আমি তার কেউ নই। এমন দুঃসময়ে আমার একমাত্র শান্ত¦না ছিলো রাসুলের সা. রওজা মোবারকের পাশে নামায আদায় করা। আর আছর নামাযান্তে নীরবে বসে দুআ করা। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমার সামিরার মনে সামান্য হলেও প্রশান্তি দান করুন। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন সামিরা আমাকে বলল, আমিও আপনার সাথে মসজিদে নববীতে নামায আদায় করতে যেতে চাই। আমি খুশী মনে তাকে নিয়ে মসজিদে গেলাম। সে নামায আদায় করে দুআ করল, হে প্রভু! আমাকে ক্ষমা করুন। দয়া করে আমাকে আপনি আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিন। হে আল্লাহ! আমি ক্ষমা প্রার্থী।’ কথাগুলো বলার সময় তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝড়ছিল। আমিও তার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। সেদিনই মাঝরাতের কথা, হঠাৎ সামিরা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। আমি তো হতবাক! দেখি সে মুচকি হাসছে। আমি ভাবলাম আমার দু‘আ বুঝি আল্লাহ মঞ্জুর করলেন। কিন্তু সে আমাকে যা বলল, জানেন! আল্লাহ তাআলা না আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন। আল্লাহ অবশ্যই আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিবেন।’ তার কথা শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। মনে হল, কে যেন আমার আত্মাটাকে ভিতর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাচ্ছে! আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আমি অচিরেই সামিরাকে হারাতে বসেছি। আমি কিছুতেই মনকে বুঝ দিতে পারছিলাম না। শুধু তার সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে নিরবে কাঁদলাম। বিশ্বাস করো! সেদিন আমার চোখে অশ্রুর ঢল নেমে ছিল। তারপর, কয়েক মাস পরের কথা-
আমি প্রতিদিনের মতো আছরের নামায আদায়ের জন্য মসজিদে নববীতে গেলাম। সে সময় রজব মাস চলছিল। চারিদিক থেকে মদীনাতে উমরা পালনকারীদের আগমণ ঘটছে। আমি নামাযান্তে দুআ করছি- হে প্রভু! আমাকে ক্ষমা করুন… কিন্তু! পিছন দিক থেকে কে যেন বলে উঠল- মহান আল্লাহ একজন প্রতারক পাপীকে কি ভাবে ক্ষমা করবেন? কণ্ঠটা খুবই পরিচিত মনে হল। ভাবলাম উস্তাদ সালামা না?! সাহস নিয়ে খুব কষ্টে পিছনে তাকাতেই দেখি তিনি ঠিক আমার পিছনে বসা। আমার শিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আসছিল। পুরো শরীর অবস হয়ে এলো। আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। উপায়ন্তর না পেয়ে তৎক্ষণাৎ সামান্য একটু অগ্রসর হয়েই বললাম, উস্তাদ! ওই দিনের পর থেকে আমি নিজের মাঝে কোন দিনই সুখ অনুভব করিনি। উস্তাদ সালামা বললেন, তার মানে তুমি স্বীকার করছো? আমি বললাম রাসুলের মসজিদে বসে আমি কি ভাবে মিথ্যা বলি? তিনি বললেন তুমি এমন কাজ কেন করতে গেলে?! আমি কি কোন দিন তোমার পাওনা বুঝিয়ে দিতে ত্রুটি করেছি? তোমাকে কোন দিন কষ্ট দিয়েছি? জবাব দাও। আমি বললাম- আপনি আমাকে আর ভর্ৎসনা করবেন না। আল্লাহর শপথ! যখনই আপনার কথা মনে হয়েছে তখনই নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধী বলে মনে হয়েছে। তিন বললেন, তাহলে এমন কাজ কেন করলে মাহমুদ? বললাম, উস্তাদ! অভিশপ্ত শয়তানই আমাকে দিয়ে এসব কিছু করিয়েছে। তিনি বললেন, তবে আমার টাকার কি হবে? বললাম, আপনার টাকা পুরোটায় রয়েগেছে। আমি ভুলেও স্পর্শ করিনি। আপনি চাইলে এখনই তা গ্রহণ করতে পারেন। তবে আপনার কাছে আমার একটাই অনুরোধ আমাকে আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সামনে লাঞ্ছিত করবেন না। তিনি বললেন, আচ্ছা তুমি আগে আমাকে তোমার বাসায় নিয়ে চল। আমি তাকে নিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে বাসার পথ ধরলাম। আমি চলতে চলতে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, আপনি আমার অবস্থান জানলেন কী করে? তিনি বললেন, আমার জানা ছিল না, এমনকি আমি কল্পনাও করিনি যে, তুমি এখানে আছ। তবে টাকা গুলো তুমি নিয়ে আসার পর আমি অনেক অর্থ সংকটে পড়ে যাই। তাহলে, আপনি কি বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন? বললেন, শুধু পুলিশ? আমি পুরো দুনিয়া উল্টিয়ে ফেলেছি। তার মানে আপনি খোঁজ জেনেই এসেছেন। তিনি রেগে গেলেন। প্রথমেই তো বললাম আমি তোমার খোঁজ জানতাম না। আমি ভয় পেয়ে আর কোন প্রশ্ন করিনি। এরপর তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, তবে আল্লাহর রহমত তিনি আমার অর্থ সংকট দূর করলেন। নিয়ত করলাম, উমরা পালনের উদ্দেশ্যে নবীর দেশে যাব। এবং এসেই তোমাকে পেয়ে গেলাম। পথে এক যুবক আমাদের সাথী হল। আমি ভালো করে লক্ষ্য করলাম, দেখি উস্তাদ সালামার ছেলে মামদুহ। সে আমার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকল। কেমন যেন সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারপর আমরা তিন জন একই সাথে ঘরে প্রবেশ করলাম। তারা ডাইনিং রুমে বসল। আর আমি সোজা আমার রুমে গেলাম। এবং টাকার থলে নিয়ে এসে উস্তাদ সালামার সামনে রাখতে রাখতে বললাম, পঞ্চাশ পাউ- কম আছে। তিনি থলে খুলে টাকাগুলো গুণতে লাগলেন। আর বাকি পঞ্চাশ পাউ-ও আমি আপনাকে এনে দিচ্ছি। এমন সময় সামিরা কফির ট্রে হাতে ডাইনিংয়ে প্রবেশ করল। সে বলল,
আমি ভিতর থেকে আপনাদের সব কথা শুনেছি। এই বলে সে কেঁদে দিল। আপনি দয়া করে আমার স্বামীকে ভুল বুঝবেন না। আসলে সে নিরাপরাধ। মূলত শয়তানই আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। উস্তাদ সালামা সামিরাকে দেখে নড়ে চড়ে বসলেন। তিনি সামিরাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, মা! তোমার বাড়ী মিশরে না? সামিরা উত্তরে বলল, হ্যাঁ আমি তো আপনার প্রতিবেশি মুস্তফা আন-নাদুরী সাহেবের কন্যা। উস্তাদ সালামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ও! তাহলে তুমিই তাকে অপহরণ করেছ? তোমার ধ্বংস হোক, অথচ ওদিকে ওর বাবা মা মরাণাপন্ন অবস্থা। সামিরা অধীর হয়ে জানতে চাইল, চাচা! আমার বাবা মায়ের অবস্থা এখন কেমন? তিনি বললেন, তুমি অপহরণ হবার পর থেকে তারা খাওয়া দাওয়া একদমই ছেড়ে দিয়েছেন। সামিরা প্রতিবাদ করে বলল, চাচা! আপনি ভুল বুঝেছেন। মাহমুদ কখনই আমাকে অপহরণ করেনি। বরং আমি স্বেচ্ছায় বিয়ে করে তার সাথে পালিয়ে এসেছি। আমরা শয়তানের প্রবঞ্চনার শিকার। আপনি কিছু মনে না করলে আমি আপনার সাথে আমার বাবা-মায়ের নিকট ফিরে যেতে চাই। উস্তাদ সালামা আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেন, ওকে ছেড়ে দাও! ও আমাদের সাথে স্বদেশে ফিরে যাবে। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও জবাব দিলাম, আমি তো তার পথ আগলে রাখিনি। সে স্বাধীনা। হ্যাঁ, এতটুকু অবশ্যই যে, আমি তাকে নিজের সাথে রেখে তার উপর অবিচার করেছি। তবে, এ কথাও সত্য যে, আমি তাকে ছাড়া নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও কল্পনা করতে পারি না। কারণ, সে আমার জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অতএব, আমি নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে ছেড়ে দিলাম। আমি তাকে মন থেকে ভালোবাসি। সুতরাং তার সুখই আমার সুখ। এরচেয়ে বেশী কিছু বলার মতো ভাষা আমার জানা নেই। উস্তাদ সালামা বললেন, তবে তাকে তালাক দিয়ে দাও। আমি তার কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মনে হল একটি তাজা বুলেট ক্ষীপ্র গতিতে আমার বুকে এসে বিঁধল। আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বললাম, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তাকে ছেড়ে দিলাম। সামিরাও কেঁদে উঠল। এরপর দিন সকালে উস্তাদ সালামা ও তার ছেলে আসল। আমি সামিরাকে বিদায় জানালাম। যাওয়ার সময় উস্তাদ সালামা বললেন, আমি তোমার কথা কাউকে জানাব না। তবে শর্ত হল, তোমাকে অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে যে, বাঁকি জীবন তুমি এখানেই কাটাবে। আমি নিজেকে তিরস্কার করে বললাম, আমি মিশর কেন যাবো যেখানে পুলিশ আমাকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে! এরপর তারা রওয়ানা হল। আর আমি অথর্বের মতো তাদের চলে যাবার দৃশ্য অবলোকন করছিলাম।
ঘটনা এ পর্যন্ত পৌঁঁছলে মসজিদ থেকে মাগরিবের আযানের ধ্বনি ভেসে এল। আমি লক্ষ্য করলাম, তার গ-দেশ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে; তিনি নিরবে কাঁদছেন। আমি তার অবস্থা স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। অবশেষে ঘটনার বাকি অংশ জানতে চাইলে তিনি কাঁদো কাঁদো স্বরেই বললেন, আমি তাদের চলার পথে তাকিয়েই ছিলাম। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম সামিরা তাদের সঙ্গে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলছে। এক সময় তারা আমার দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যায়। ঠিক এ মুহূর্তে আমার মনে হল তারা সবাই থামল! সত্যই তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে সামিরা ধীর পদে আমার দিকে এগিয়ে এল। তারপর সোজা আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, মাহমুদ! তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার তো স্বপ্ন ছিল পুরো জীবনটাই তোমার সাথে কাটিয়ে দিব। কিন্তু পরিবারের দূরত্বের কাছে আমি হেরে গেলাম। তখন আমি তাকে শুধু এতটুকই বললাম, সামিরা! আমি সব বুঝি। তোমাকে সত্যই ভালোবাসি। তাই তোমাকে বাঁধন মুক্ত করে দিতে দ্বিধা করিনি। তোমার পথ আগলে দাঁড়াইনি। সামিরা! আমি আর সহ্য করতে পারছি না তুমি চলে যাও। অতঃপর সে নীরবে নিঃশব্দে প্রস্থান করল।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত শুধু দেহটায় বেঁচে আছে। তার মাঝে প্রাণের উপস্থিতি নেই। অনেক কষ্টে এই ছোট্ট রেস্তরাঁটা খুললাম। কারণ, কাপড় ব্যবসাকে আমি মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। কিছু দিন পর সংবাদ এল উস্তাদ সালামার ছেলের সাথে সামিরার বিয়ে হয়েছে। অনেক বিলম্বে আমিও বিয়ে করলাম। এর মাঝেও অনেক ঘাতপ্রতিঘাত গিয়েছে। তবে খুশীর সংবাদ হল, আল্লাহ তাআলা আমার একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান দান করেছেন! তার নাম রেখেছি সামিরা। এখনো আগের মতো প্রতিদিন আছর নামাযান্তে মসজিদে নববীতে যায় এবং সেখানে মাগরীবের সালাত আদায় করি। আর নিজের অতীত ভুলের জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
হজ্জ কার্য সম্পাদন শেষে বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্বদেশে ফিরে এলাম। এরপর তার সাথে আর কোন যোগাযোগ নেই। এর ঠিক তিন বছর পর আবার (স্বপ্নের পুণ্যভূমি) হিজায সফর হল। এরমধ্যে পৃথিবীর কত কিছুইনা বদলেছে। বদলেছি আমি নিজেও। মদীনা মুনাওয়ারাতে প্রবেশ করতেই যা বুঝলাম। এখন আর সেই আগের শহর নেই। চেহারায় অনেক জৌলুস এসেছে। ভাবলাম রেস্তরাঁটা খোঁজে পেতে বেগ পেতে হবে। কিন্তু, না সহজেই পেয়ে গেলাম। তবে সেটা যথেষ্ট পরিমাণ উন্নত হয়েছে। খাবারের মাণটাও খুব একটা খারাপ না। রেস্তরাঁয় প্রবেশ করতেই দেখলাম ক্যাশে এক যুবক বসা। ছেলেটা অমায়িক, দেখে মায়া লাগে। তার সাথে আলাপ-পরিচয়ে জানলাম সে বৃদ্ধের বড় মেয়ের জামাই। এখন, সেই এটা পরিচালনা করে। অনেক হাসিখুশি। আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। সে ঠিক সেই চেয়ারটাতেই বসতে দিল যেখানে বসে আমি তার শ্বশুরের সাথে কথাবার্তা বলে ছিলাম। বসার পরক্ষণেই বিভিন্ন আইটেমের নাস্তা আরও কত কী! আমি কত বারণ করলাম অথচ সে আমার কোন কথাই শুনল না। বাধ্য হয়েই তার মনরক্ষার্থে একটু আধটু খাচ্ছি। এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা! তোমার শ্বশুর? ছেলাটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মুখটা মলিন করে ফেলল। তার চোখে আশ্রু ছলছল করছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আমার পছন্দের মানুষটি আর নেই। মুহূর্তে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কেমন যেন আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনের অজান্তেই কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলাম। চোখের সামনে তার হাস্যজ্জল চেহারাটা ভেসে উঠল। স্মৃতির পর্দায় তার মায়াবী চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি যেন আমার দিকে বিস্ময়ভরে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। তার নূরাণী চেহারা থেকে স্বর্গীয়ও দ্যুতি যেন চারি দিকে ছড়িয়ে পরছিল। একে একে তার সেই পরিবর্তীত জীবন কাহিনীর কথাগুলো কানে বাজ ছিল। তিনি যেন আজও আমার পাশেই বসা। ছেলেটা আমাকে সান্তনা দেবার জন্যে পিঠে হাত রাখতেই আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। স্মৃস্তির পাতা আর উল্টাতে পারলাম না। নিজের অজান্তে চোখের পাতা ভিজে এল।
প্রিয় পাঠক! মহান আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে নানান বৈচিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ভাল আর মন্দের সংমিশ্রণেই মানুষ। মানব হয়ে যার জন্ম তার মাঝে ভুল থাকবে এটা বিচিত্র কিছু নয়। বান্দা ভুল করবে, নিজের ভুলের কথা জেনে ক্ষমা চাবে এটাই কাম্য। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। যার কোন বিকল্প নেই। যে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করাতে পেরেছে, সুখী সেই; শান্তি তারই প্রাপ্য। অন্যথায় মরিচিকাকে পানি ভেবে প্রবঞ্চিত হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। আর পদস্খলন, বিপর্যয় তো আছেই। তাই ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে ক্ষমা চাওয়াই বান্দার একমাত্র কাজ। ঠিক এ কাজটায় আমি তাঁর মাঝে গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলাম। আমার বিশ্বাস আমার প্রভু আমার ভালোবাসার মানুষটির তাওবা ফেলে দেননি। তার প্রমাণ, তিনি নিজের হাবীবের দেশে তাকে শায়িত করেছেন। দয়ার নবী সা. বললেন, অপরাধের কথা স্বীকার পূর্বক তাওবাকারী এমন যে, তার কোন গোনাহই নেই। [ফাতহুল বারী:১০/২৮০] আর আমার পরওয়ারদিগারের ঘোষণা তো আরো মধুর: “হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয় তিনি অতিব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [যুমারঃ ৫৩]

লেখক: তরুণ আলেম, আল মান্হাল মডেল কওমি মাদ্রাসা, উত্তরা, ঢাকা।
[সূত্র: একটি আরবী গল্প অবলম্বনে।]

4 মন্তব্য রয়েছেঃ একটি তাওবা ও আমাদের শিক্ষা : মাওলানা আমীরুল ইসলাম

  1. মাবরুর হাসান says:

    হৃদয় নিংড়ানো তাওবা। এমন একটি তাওবা-ই সারা জীবনে কাম্য। আল্লাহ তুমি দুনিয়ার সকলকেই এমন তাওবা নসীব কর।

    • আমীরুল ইসলাম says:

      ভাই মাবরুর হাসান – কে জাযাকাল্লাহ আল্লাহ আপনাকে কবূল করুন । আমীন

  2. জয়নুল আবেদীন says:

    এই লেখাটি পড়ে অন্তরে কেমন যানি আনচান করছে। বার বার মুর্ছা যাচ্ছি ভিতর থেকে। অনেক কষ্টও হচ্ছে। আল্লাহ আমাকেও এমন তাওবা করে জীবনের সকল পাপ হতে মুক্তি দান কর। আমি এই জন্যই মাসিক আল জান্নাত পত্রিকাটিকে ভালবাসি এবং নিয়মিত পড়িও। আল্লাহ তাআলা যেন এই পত্রিকার আয়োজক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করেন। এই পত্রিকা যেন তাদের নাজাতের অসিলা হয় এই দোয়া করি মহান প্রভুর কাছে কায়মনোবাক্যে। সাথে আমাকেও।

    • আমীরুল ইসলাম says:

      ভাই জায়নুল আবেদীন ও আল জান্নাত পরিবার– কে জাযাকাল্লাহ আল্লাহ আপনাদের সবাইকে কবূল করুন । আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight