উম্মাহর ঐক্য ও মৈত্রী পথ ও পদ্ধতি : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

উম্মাহ আজ নানা দল, উপদল ও ফেরকায় বিভক্ত। নানা মত ও মতাদর্শের শিকার হয়ে বহুধা বিভক্ত ঐক্যর ও মৈত্রীর প্রতীক ইসলামের অনুসারীগণ। এরপর আরও কতশত মত ও পথের উদ্ভব হবে আল্লাহই মালুম। এই বিভক্তি ও মতাদর্শের বিভিন্নতার সুযোগ নিয়ে তাগুতী শক্তি সর্ব শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে পৃথিবী থেকে বিদায় করতে। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির বহুমুখী চক্রান্তের শিকার হয়ে প্রায় হাজার বছর পুরো বিশে^র নেতৃত্ব দানকারী মুসলিম উম্মাহ আজ অন্যদের করুণার পাত্র। মুসলিম বিশে^র রাষ্ট্র প্রধানরা সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির দাবার গুটিতে পরিণত। ফলে পৃথিবীর দেশে দেশে আজ মুসলিম উম্মাহই সবচে বেশি দমন-পীড়নের শিকার। আরও কষ্টের কথা হচ্ছে ইসলামের আঁতুড় ঘর আরব ভূমি তথা মধ্যপ্রাচ্যই আজ সবচে বেশি অস্থির, অশান্ত। সা¤্রাজ্যবাদীদের কূটকচালে নিজেরা নিজেরাই যুদ্ধ করে কান্ত-পরিশ্রান্ত। অথচ ইসলামের অমোঘ বাণী হচ্ছে সকল মুমিন পরস্পরে ভাই ভাই। একে অপরের বিপদে ঝাপিয়ে পড়বে। নিজেদের মধ্যে কোন সমস্যা দেখা দিলে কুরআন-হাদীসে ঘোষিত নীতির আলোকে নিজেরাই তা সমাধান করে নিবে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে অনৈক্য বা কলহ-বিবাদ দেখা দিলে তোমরা নিজেরাই তা মিমাংসা করে দাও। আর আল্লাহকে ভয় কর। যাতে তোমাদের উপর রহমত করা হয়।’ [সূরা হুজুরাত : আয়াত ১০]
সাহাবী নুমান ইবনে বশীর রা. এর বর্ণনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সকল মুমিন-মুসলমান এক ব্যক্তির মতো। যদি সে ব্যক্তির চোখ আক্রান্ত হয়, তাহলে তার পুরো দেহই সে কষ্ট অনুভব করে। আর যদি মাথা আক্রান্ত হয়, তাহলে তার পুরো দেহই সে কষ্ট অনুভব করে।’ [মুসলিম : হাদীস নং ২৫৮৬, আহমাদ : হাদীস নং ১৮৩৯৩, আল মুজামুল কাবীর : হাদীস নং ১০৬]
কুরআন-হাদীসের এ সকল অমোঘ বাণী উম্মাহকে শিক্ষা দেয় পরস্পরে একতাবদ্ধ থাকার। কিন্তু উম্মাহর জীবনে কুরআন-হাদীসের এ সকল অমোঘ ও অমূল্য বাণীর সফল বাস্তবায়নের অভাবে উম্মাহ আজ দিকভ্রান্ত। রাখাল বিহীন ছাগল পালের মতো বিক্ষিপ্ত-ছত্রভঙ্গ। মুসলিম উম্মাহ আজ ঐক্যবদ্ধ থাকলে এ দুর্দশা তাদেরকে পেত না। এহেন অবস্থায় যে যার মতো করে চেষ্টা করে যাচ্ছে বহুধা বিভক্ত উম্মাহকে এক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে ঐক্যের সুফল ভোগ করতে। কিন্তু সকল চেষ্টা- তদবীরই পর্যবসিত হচ্ছে প-শ্রমে। এরপরও বসে নেই ঐক্যের প্রচেষ্টাকারীগণ। কারণ ঐক্যের উপকারীতাতো সকলেরই জানা। একটি জাতির ঐক্য সে জাতিকে পৌঁছে দিতে পারে সফলতার স্বর্ণশিখরে। এনে দিতে পারে সফলতার রাজমুকুট। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। উল্টো একের পর এক নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। নিত্যনতুন মতবাদ আর মতাদর্শের অক্টোপাসে আটকে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহ। ফলে নতুন নতুন মতবাদ ও মতাদর্শের ডাল-পালা গজাচ্ছে। আসল কথা হলো কুরআন-সুন্নায় ঐক্য, সৌহার্দ্য, সংহতি ও সম্প্রীতির যে উসূল ও মূলনীতির কথা বলা হয়েছে সেই উসূল ও মূলনীতি মেনে যদি ঐক্য, সৌহার্দ্য, সংহতি ও সম্প্রীতির প্রচেষ্টা চালানো যায়, তাহলে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য না হয়ে পারে না। কেননা সেই মূলনীতিগুলোর প্রবর্তক হলেন সব দ্রষ্টা, সব জান্তা আল্লাহ তাআলা আর উম্মাহকে সেগুলো শিখিয়ে গিয়েছেন পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকল জ্ঞানের আধার মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তাই ঐক্য প্রচেষ্টায় কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত উসূল ও মূলনীতির কোন বিকল্প নেই। এ কথাতো সকলেরই জানা, এক সময় জগতের সকল মানুষই একতাবদ্ধ ছিল। সকলে এক আল্লাহরই ইবাদত করতো। পরস্পরে ছিল না কোন বিভেদ-ভেদাভেদ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মরদুদ শয়তানের প্ররোচনায় কিছু অসাধু ব্যক্তিবর্গ ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর মাঝে ফাটলের সূত্রপাত ঘটায়। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তোমাদের এই উম্মাহতো একই উম্মাহ (একই ধর্ম ও আদর্শের অনুসারী)। আর আমি আল্লাহ তোমাদের রব। কাজেই তোমরা কেবল আমরই ইবাদত কর। কিন্তু তারা নিজেদের দীনকে নিজেদের মাঝে টুকরো টুকরো করেছে। (ফলে তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়লো) তবে এক সময় সকলেই আমার কাছে ফিরে আসবে। [সূরা আম্বীয়া : আয়াত ৯২-৯৩]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তোমাদের এই উম্মাহতো একই উম্মাহ (একই ধর্ম ও আদর্শের অনুসারী)। আর আমি আল্লাহ তোমাদের রব। কাজেই তোমরা কেবল আমাকেই ভয় কর। কিন্তু তারা নিজেদের দীনকে নিজেদের মাঝে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়লো। আর প্রতিটি দল-উপদল নিজেদের আবিষ্কৃত মতাদর্শ নিয়েই তৃপ্তিবোধ করল। অতএব হে নবী! তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতায় নিমজ্জিত থাকতে দিন। [সূরা মুমিনূন : ৫২-৫৩]
পবিত্র এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে উম্মাহর ঐক্য ও মৈত্রীর ভিত্তি হচ্ছে, ১. তাওহীদ বা একত্ববাদ। ২. এক আল্লাহর ইবাদত। ৩. তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর; পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না। তোমরা স্মরণ কর সে সকল নেআমতের কথা যেগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরাতো পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তর সমূহে ভালবাসা ও সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পরে ভাই ভাই হয়েছে। [সূরা আল ইমরান: ১০২-১০৩]
পবিত্র এই আয়াতে মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ঐক্যের বিষয়টি অত্যন্ত সাবলীল ও বিজ্ঞজনোচিত ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে। এতে সর্ব প্রথম উম্মাহকে পরস্পরে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করার অমোঘ ব্যবস্থাপত্র বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর পরস্পরে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে এ বিভাদ মিটানো ও ঐক্যর ব্যবস্থা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর; পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না’। এখানে আল্লাহর রজ্জু বলে আল কুরআনকেই বোঝানো হয়েছে। কুরআন বা দীনকে আল্লাহর রজ্জু বলার কারণ এই যে, রজ্জু যেভাবে এক বস্তুকে আরেক বস্তুর সাথে মিলন ঘটায় এবং অনেকগুলো বস্তুকে একত্রে রাখতে পারে, ঠিক সেভাবে আল কুরআন একদিকে আল্লাহ তাআলার সাথে দুনিয়াবাসীর সম্পর্ক স্থাপন করে আর অপর দিকে মুসলিম উম্মাহকে পরস্পরে ঐক্যবদ্ধ করে একদলে পরিণত করে। কাজেই ঐক্য ও মৈত্রীর জন্য আল কুরআন ও তার ব্যবস্থাকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরার কোন বিকল্প নেই। মূলত ঐক্য ও মৈত্রী যে প্রশংসনীয় ও কাম্য তাতে জগতের জাতি-ধর্ম, বর্ণ ও দেশ-কাল নির্বিশেষে সকল মানুষই একমত। এভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে ঐক্য অপরিহার্য তাতেও জগতের সকল মানুষই একমত। এতে কারো দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। বোধ করি দুনিয়ার কোথাও এমন কোন ব্যক্তি নেই যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কলহ-বিবাদকে উপকারী ও কল্যাণকর মনে করে। আর ঐক্য ও মৈত্রীকে অপকারী ও ক্ষতিকর মনে করে। এ কারণেই বিশে^র সকল দল-উপদল, সংগঠন-উপসংগঠন ও জাতি-গোত্রই জনগণকে ঐক্যের ডাক দেয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা সাক্ষি দেয়, ঐক্য অত্যন্ত উপকারী ও অপরিহার্য হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত হওয়া সত্তেও মানব জাতি বিভিন্ন দল-উপদল ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। এরপর দলের ভিতর উপদল এবং সংগঠনের ভিতরে উপসংগঠন সৃষ্টি করার এমন এক কার্যধারা অব্যাহত রয়েছে, যাতে সঠিক অর্থে দুই ব্যক্তির ঐক্যই কল্প কাহিনীতে পর্যবসিত হয়েছে। কখনও-সখনও সাময়িক স্বার্থের লিপ্সায় কয়েক ব্যক্তি কোন বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয় বটে। কিন্তু স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে কিংবা স্বার্থোদ্ধারে অকৃতকার্য হলে কেবল যে তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয় এমন নয়; বরং পরস্পরের মাঝে বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভয়ংকরভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এর কারণ হলো প্রত্যেকেই জনগণকে নিজ নিজ পরিকল্পনা মুতাবিক একতাবদ্ধ করতে চায়। যদি অন্যদের কাছেও কোন পরিকল্পনা থাকে, তাহলে তারা তার সাথে একমত হওয়ার পরিবর্তে নিজের তৈরী পরিকল্পনার সাথে মৈত্রী গড়ার আহবান জানায়। ফলে ঐক্য ও মৈত্রীর প্রতিটি আহবানের ফল দাড়ায় অনৈক্য ও ভাঙ্গনের মাঝে আরও ভাঙ্গন এবং মতবিরোধের চোরা বালিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত উম্মাহর অবস্থা দাঁড়ায় এই প্রবাদ বাক্যের মতো-‘যতই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, ব্যাধি ততই বেড়ে যায়’। এ কারণে মহাগ্রন্থ আল কুরআন কেবল মৈত্রী, ঐক্য, শৃঙ্খলা, ও দলবদ্ধ হওয়ার উপদেশ দান করেই ক্ষান্ত করেনি; বরং তা অর্জন করা ও অর্জনের পর অটুট রাখার জন্য কয়েকটি মূলনীতিও নির্দেশ করেছে। যেগুলো স্বীকার করে নিতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। একটি কথা ভালভাবে মনে রাখা দরকার। তাহলো কোন মানুষের মস্তিষ্কনিসৃত বা কতিপয় লোকের রচিত ব্যবস্থা ও পরিকল্পনাকে জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে এই আশা করা যে, তারা একতাবদ্ধ হয়ে যাবে, তা বিবেক ও ন্যয়বিচার পরিপন্থী ও আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয়। [মাআরিফুল কুরআন : ২/১১০-১১২] অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, দীনী বা দুনিয়াবী ক্ষেত্রে মতভেদ দেখা দিলে তা বিভেদে রূপ নেয়। ফলে একে কেন্দ্র করে একে অপরকে উপহাস ও তাচ্ছিল্য করা, গীবত করা, মিথ্যা অপবাদ দেয়া, কুধারণা পোষণ করা, কটুক্তি করা, খারাপ নাম বা মন্দ উপাধীতে ডাকে ইত্যাদির চর্চা হতে থাকে দেদারসে। সাধরণ মানুষতো পরের কথা, আলেম-উলামা পর্যন্ত বেমালুম ভুলে যায় যে, ইসলামে এ বিষয়গুলো নিষিদ্ধ ও হারাম। [সূরা হুজুরাত : আয়াত ১১-১৩]
প্রত্যেকের আচরণ দেখে মনে হয় যে, প্রতিপক্ষের ইজ্জত-আব্রু নষ্ট করা মুস্তাহাব! প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে এ জাতীয় আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার তার কোনো অধিকার নেই। অথচ এতটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারতো একজন সাধারণ মানুষও রাখে, যদিও সে অমুসলিম হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! (জেনে রাখ) যে কেউ কোন যিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস বা অবস্থানকারী কোন কাফেরের) প্রতি অবিচার করবে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার কমিয়ে দিবে বা সামর্থ্যরে বাইরে কোন কাজ চাপিয়ে দিবে কিংবা তার আত্মিক তুষ্টি ব্যতীত তার কোন সম্পদ ভোগ করবে, কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হয়ে তার অন্যায় অপরাধ প্রমাণ করব।’ [আবু দাউদ : হাদীস নং ৩০৫২]
এমনকি ইসলামে জীব-জন্তুর হক ও অধিকারের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যা বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনায় পাওয়া যায়। তো প্রতিপক্ষের সাথে যদি দীনদার শ্রেণীরই এই আচরণ হয়, তাহলে ঐক্য-মৈত্রীর চেষ্টা হবে অরণ্যে রোদনের মতোই। বর্তমানে ঐক্যের পথে বড় আরেকটি বাধা হলো, আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতি। কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের প্রিয়ভাজন ও আস্থাভাজনদের প্রাধান্য দেওয়ার নামই আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতি। এটি একটি মারত্মক ব্যাধি, যা মানুষকে ইনসাফ ও ন্যায়ের পথ হতে বিচ্যুত করে জালিম ও স্বৈরাচারের কাঠগঢ়ায় দাড় করায়। তাই ঐক্য ও মৈত্রীর অন্যতম শর্ত হলো সকল প্রকার আসাবিয়াত থেকে মুক্ত হয়ে কেবল ইসলাম ও ইসলামের আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। যার প্রকৃষ্ট উদাহারণ হলো মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্র। যারা যুগ যুগের গোত্রীয় পরিচয় ছাপিয়ে আনসার নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গেলেন এবং ‘চির প্রতিদন্ধী ও জানের শত্রু’র তকমা দূরে ঠেলে দিয়ে পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে গেলেন। আর এ সকল কিছুই সম্ভব হয়েছিল আসাবিয়াত বর্জন করার কারণে। উম্মাহর ঐক্য ও মৈত্রীর পথে আরেকটি অন্তরায় হলো স্বীয় মতকে প্রধান্য দেয়ার প্রবণতা। গলার জোরে; নয়তো যুক্তির কারিশমায় স্বীয় মতকে বাস্তবায়িত করার জন্য আদা-জল খেয়ে লাগে ঐক্যের বার্তাবাহকগণ। ফলে ঐক্য ও মৈত্রীর পরিবর্তে অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতাই প্রবলভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তবে বিশ^ জাহানের ¯্রষ্টা ও পালনকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত ব্যবস্থা ও পরিকল্পনায় সকল মানুষের ঐক্য যে অবশ্যই স্বাভাবিক এ কথা জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই নীতিগতভাবে অস্বীকার করতে পারে না। তাই বলা যায় মুসলমানদের বিভিন্ন দল-উপদল পবিত্র কুরআনের ব্যবস্থায় একমত হয়ে গেলে হাজারো দলগত, বর্ণগত ও অঞ্চলগত বিরোধ এক নিমিষেই শেষ হয়ে যেতে পারে, যা মানব ও মানবতার উন্নতি এবং উম্মাহর ঐক্য ও মৈত্রীর পথে প্রতিবন্ধক। এরপর যদি উম্মাহর মাঝে কোন মতানৈক্য ও মতভেদ থাকে তাহলে তা হবে কেবল কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা নিয়ে। আর এ ধরনের মতবিরোধ সীমার মধ্যে থাকলে তা নিন্দনীয় নয় এবং মানব ও মানবতার উন্নতি এবং উম্মাহর ঐক্য ও মৈত্রীর পথে প্রতিবন্ধক ও ক্ষতিকারকও নয়; বরং তা প্রশংসনীয় ও উম্মার জন্য কল্যাণকরই বটে। এ বিষয়টি জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই অজানা থাকার কথা নয়। কিন্ত ঐক্য ও মৈত্রীর বার্তাবহকগণ যদি উপরে বর্ণিত কুরআনী ব্যবস্থা ও নীতিমালা থেকে সরে গিয়ে নিজেদের উদ্ভাবিত পরিকল্পনা ও নীতিমালা মুতাবিক ঐক্য ও মৈত্রীর জন্য কসরত করতে থাকেন, তাহলে মতবিরোধ ও কলহ-বিবাদ নিরসনের কোন প্রতিকার থাকবে না এবং কিয়ামত অবধি ঐক্যের কোন সম্ভবনাও দেখা দিবে না। ফলে উম্মাহ উল্টো পরস্পরে কলহ-বিবাদ ও লড়াই-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়বে। যার অপরিহার্য ফল হিসাবে উম্মাহ অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে। বর্তমানে এ সকল কুরআনী মূলনীতিকে পরিত্যাগ করার কারণেই সমগ্র মুসলিম সমাজ শতধাবিভক্ত হয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলছে। তাই অনৈক্য আর বিভেদের অনল থেকে বাচাঁর পথ একটাই। সেটা হলো কুরআনী নীতিমালার আলোকে উম্মাহকে ঐক্য ও মৈত্রীর পথে আহবান করা। তাহলে এই একবিংশ শতাব্দীতেও বহুধা বিভক্ত উম্মাহর ঐক্য সম্ভব।
লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা, গবেষক, প্রবন্ধকার ও সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিয়া মিফতাহুল উলূম, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight