উপন্যাস : কিশোরীর হাতে রক্তের চিঠি

পূর্বপ্রকাশিতের পর…….
বেটা আমার নবীর সাথে বেয়াদবি! এবার দেখ কেমন লাগে। তারা আরো ভাবতে লাগলো যে, নবী কারীম সা. যেখানে সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন সেখানে আজ তারা হাজিরা হবে। দেখবে সেই রওজা যেখানে আল্লাহর নবী চিরনিদ্রায় শায়িত আছে। আমরা তার পবিত্র রওজা জিয়ারত করবো। এবং প্রিয়নবী কে বেদনাময়ী সালাম জানাবো। জানাবো হৃদয়ে জমাটবাঁধা সমস্ত দুঃখের কথা। আর চোখের জলে বুক ভাসাবো…। এমনি হাজারো এলোমেলো ভাবনা উদয় হতে লাগলো তাদের মনে। আর অতিক্রম হতে চললো দিন রাত। চলতে রইলো তাদের আত্মিক পথ চলা। আস্তে আস্তে হজ্জের সময় উপস্থিত হয়ে যেতে লাগলো। সাথে সাথে তারাও প্রস্তুতি নিতে লাগলো পরিপূর্ণ ভাবে। আগেকার লোকেরা তো একদেশ থেকে অন্য দেশে সফর করার জন্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করত জাহাজ। কেননা তখন পানিপথই ছিলো সফর পথ। এক সময় তো আকাশ পথের রচনা হলো। যাক ভালই হলো। খুব অল্প সময়েই যাওয়া যায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে। সময়ও বাচে আবার পানি পথের ধকলও পোহাতে হয় না। তখনকার জামানায় পানি পথে ডাকাতি হতো। এখন আর হয় না। তবে বেশ কিছু দিন আগে এমন ব্যতিক্রমধর্মী একটি ঘটনা ঘটেছিলো ঢাকা টু চাঁদপুরগামী একটি লঞ্চে। আমার এক সহপাঠী সরেজমিনে ছিল। ঘটনাটি সে যেভাবে ব্যক্ত করল আমাদের কাছে, সেদিন ঢাকা থেকে চাদপুর যাওয়ার জন্য হোস্টেল থেকে বের হয়ে সদরঘাট গেলাম। এবং চাঁদপুরের লঞ্চে উঠলাম। লঞ্চ ছিল রাত্রের, সবাই তাদের কাঁথা চাদর বিছিয়ে একটু আরামের জায়গা করে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর লঞ্চ ছাড়লো। তার আগে লঞ্চে কিছু লোক উঠতে দেখা গেল। যাদের সাথে একটি লাশের কফিন ছিল। লাশের কফিনটি কোথায় রাখবে এনিয়ে তাদের মাঝে ও লঞ্চ কর্তৃপক্ষের মাঝে মতভেদ দেখা দিল। অবশেষে তা রাখা হলো নামাজের স্থানে। সবার ভিতরে একটা অন্য রকম অনুভূতি দোলা দিল। কিছুক্ষণের জন্য সবাই কেমন যেন মৃত্যু কে ভয় পেল এবং চুপ থাকলো। কিন্তু কি আশ্চর্য যাদের লাশ তাদের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না। ভাব সাব এমন যেন তাদের সাথে কোন মৃত মানুষের যাত্রা নেই। যা দেখে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করল। এবং তাদের কে চোখে চোখে রাখল। এদিকে লঞ্চ এগুতে লাগল চাঁদপুরের পথে। কফিনের কাছে তাদের একজন যুবক কোরআন পাঠ করছিলো অস্পষ্ট স্বরে। বাকিরা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ঘুরা ফেরা করছে। একজন মাদরাসার ছাত্র তখন বসা ছিল নামাজের স্থানের কাছের বারান্দায়। হঠাৎ দেখল লাশের পাশে বসে কুরআন পাঠরত লোকটি নেই। কোথাও গেল বোধয়। সে ভাবল কোরআন পড়লে তো ছওয়াবই হয়। তাছাড়া আমরা কুরআন পড়া জানি আমরা যদি না পড়ি যারা জানেনা তারা কিভাবে পড়বে। যেই কথা সেই কাজ। সেই ছাত্রটি গিয়ে বসে পড়ল কোরআন তিলাওয়াতে। আস্তে আস্তে কোরআন পাড়ছে সে। হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনতে পেল সে। কিরে সময় কি হলো? আওয়াজটি তার কানে যেতেই সে তো পুরো ভয় পেয়ে গেল। কে করল আওয়াজটি? সে ছাড়া তো এখানে কেউ নেই। লাশ থাকাতে মানুষ এদিকে খুব একটা আসা যাওয়া করছে না। আর মরা মানুষ তো কথা বলতে পারেনা। সে খুব ভয় পেয়ে গেল। শরীর মোটা মোটি ঘেমে ভিঁজে গেছে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে লক্ষ্য  করতে চেষ্টা করল আওয়াজটা আসছে কোত্থেকে? কিছুক্ষণ পর যখন আবার আওয়াজ আবার শুনতে পেলো তখন ঠিকই বুঝতে পরল এটা কফিনের ভিতর থেকে আসছে। সে নিজেকে অনেকটা সাহসী করে বুদ্ধি খাটিয়ে উত্তর দিল। না এখনও হয়নি। হলে তো বলবই। তখন কফিন থেকে আবার আওয়াজ আসলো সবাই কি ঠিক ঠিক স্থান গুলিতে গেছে। ছাত্রটি বলল হ্যাঁ গেছে। তখন ছাত্রটি বুঝতে পারলো কি ঘটতে যাচ্ছে লঞ্চে। আর কেনই বা মৃত্যু যাত্রী নিয়েও লোকগুলোর চেহারায় তার কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। তখন সে আস্তে আস্তে সেখান থেকে উঠে এসে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টি খুলে বলল। তারা তো খুব চিন্তিত হয়ে গেল। এতগুলো যাত্রী লঞ্চে যদি কোন অঘটন ঘটে যায়। বুদ্ধি করে তারা তাড়াতাড়ি ফোন করল প্রশাসনের কাছে। তারা খুব দ্রুত গতিতে সেখানে স্পীট বোডে করে পুলিশ পাঠালো। পুলিশের অভিযান বুঝতে পেরে ডাকতরা কেউ কেউ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর কয়েকজন ডাকাত গ্রেফতার হলো পুলিশের হাতে। আর ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পেল লঞ্চের যাত্রীরা। তখনকার সময়ে এমন ঘটনা ঘটতো অহরহ। আবার পানি পথ দিয়ে চলতে গেলে অনেক সরাঞ্জামাদি নিয়ে রওয়ানা করতে হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রীও সাথে রাখতে হয়। যাতে করে আবার মাঝ পথে গিয়ে কোন সমস্যা না হয়। এদিকে লঙ্কাদ্বীপের লোকেরাও তাদের পানিপথের সফরের জন্য সবকিছু গোছগাছ করতে লাগল। কেউ যোগ দিল জাহাজ মেরামতের কাজে, কেউবা সমাধা করছে পাথেয় সরবরহের কাজ। তাদের সকল প্রস্তুতি নেয়া শেষ হলো। অবশ্য এবারের যাত্রায় শুধু বড়রা যাবে। সেই কোঠায় মা বাবা ও দাদা দাদির স্থানই বেশি। এতকিছু সব আবুল হাসানের দিকনির্দেশনায়  হচ্ছিলো। তবে এখন যেহেতু চূরান্তভাবে একটি জামাতবদ্ধ হচ্ছে তাই সর্বসম্মতি ক্রমে এক আমীর নিযুক্ত করা প্রয়োজন। অবশ্য নবী কারীম সা. এই আমিরত্বকে একদিকে যেমন আমীর বলে আখ্যা দিয়েছেন তেমনি অন্যদিকে বলেছেন আমীররাই হলো কওমের খাদেম। যাহোক এখন একজন আমীর নিযুক্তের পালা। কে হবেন সর্বসম্মতিক্রমে সেই আমীর নামক খাদেম। এই বিষয়ে আলোচনা হলে সবাই একবাক্যে আবুল হাসানের নাম বলে দিল। একেবারে সবাই আবুল হাসান কেই তাদের আমাীর হিসেবে দেখতে চায়। কারণও অবশ্য আছে, এরা তো সবাই নব মুসলিম তেমন কিছু জানেনা। যহোক আবুল হাসানই সবার সেবার দায়িত্ব মাথায় নিল। তারপর তার নেতৃত্বেই নির্দিষ্ট সময়েই সবাই জরো হলো জাহাজের কাছে এবং ছেলেসন্তানরা তাদের বৃদ্ধ মা বাবাকে বিদায় জানাতে জাহাজের কাছে আসল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight