উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান : ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

মূল : জুর্জি যীদান :

প্রতিশোধ অভিযান :
একদিন লিময়া নিজেই ‘উম্মুল উমারার’ কাছে আব্দার পেশ করল, তিনি যেন হুসাইনকে ডেকে পাঠান..। উম্মুল উমারা তার এ আব্দারে ভারী খুশি হলেন। ভাবলেন হয়তো লিময়ার পিতৃশোক ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। এর বড় প্রমাণ হলো, এই সে এখন তার বাগদত্ত্বকে দেখতে চাচ্ছে। তিনি তখনই হুসাইনকে দ্রুত আসতে বললেন। হুসাইনও তড়িঘড়ি করে হাযির হল। এবং কামরায় প্রবেশ করে সালাম বিনিময়পূর্বক বসে পড়ল।
হুসাইন এলে উম্মুল উমারা উঠে পড়লেন। কামরার বাইরে যেতে যেতে বললেন, কী হলো তোমরা কোন কথা বলছ না যে? নাকি হৃদয়ের ভাষায় পরস্পরে নিজেদের আলাপ সেরে নিচ্ছ?
লিময়া লজ্জায় মৃদু হাসল। হুসাইনও মাথা অবনত করল। এরপর উম্মুল উমারা দরজার কাছে পৌঁছে বললেন, নাহ! আমি তোমাদের ওপর নযরদারী করাকে পসন্দ করি না।’ এবলে তিনি বড় বড় পা ফেলে বেড়িয়ে গেলেন..।
এবার হুসাইন লিময়ার কাছাকাছি গিয়ে তাকে সমবেদনা ও সান্ত্বনা দিতে লাগল। এক পর্যায়ে লিময়ার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। সে হুসাইনের দিকে সলজ্জ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কৃতজ্ঞতা আদায় করল এবং তার চারিত্রিক মাধুর্য ও বীর-বাহাদুরির ভূয়সী প্রশংসা করল। আচানক সে বলে উঠল, জানেন আমিই উম্মুল উমারাকে বলেছি, আপনাকে ডেকে আনতে!
হুসাইনও বিস্মিত হয়ে বলল, আচ্ছা! তাহলে তো ভালই। এই তো আমি তোমার সামনে উপস্থিত। লিময়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। এদিকে লিময়া তাকে কী উদ্দেশ্যে ডেকে আনতে পারে, এ নিয়ে হুসাইন অনেক কিছু কল্পনা করতে লাগল।
– আমার বাবার মৃত্যুশোকে আমি এখনো পীড়িত ও ব্যথিত। আপনার কথাবার্তা আমার হৃদয়ের ঠাণ্ডক ও প্রশান্তিদায়ক। কিন্তু কিছুদিন ধরে কয়েকটি বিষয় আমার ধ্যান, মন ও ফিকিরকে অস্থির করে রেখেছে। আমি তা আপনার কাছে খুলে বলতে চাই। আপনি কি আমাকে এ বিষয়ে কোন সহযোগিতা করতে পারবেন?
– অবশ্যই! সবসময়েই আমি তোমার যেকোনো আব্দার-অনুরোধ পূরা করতে এক পায়ে খাড়া। তুমি যা ইচ্ছা তাই বলতে পারো।
– দু‘টি বিষয়, এক. আমি সংকল্প করেছি যে, আমি আমার পিতা ও খলীফার বিরুদ্ধে পরিচালিত ঐ ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাই- এ ব্যাপারে আপনি আমাকে সহযোগিতা করবেন! হুসাইন দীপ্তকণ্ঠে বলল, লিময়া! তুমি এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। আমি তো দুর্ঘটনার রাত থেকেই এদের থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছি..। অতএব তুমি এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। আস্থা রাখো, এই দায়িত্ব আমারই, তোমার নয়। এখানে আরেকটি কথা শুনে রাখ, আমি যদি ঐ বিশ্বাসঘাতকদের থেকে প্রতিশোধ নিতে না পারি, তাহলে আমি তোমার স্বামী হওয়ারই যোগ্য নই।’
এ কথা শুনে লিময়ার চোখেমুখে আনন্দের উদ্ভাস দেখা গেল। এবং ঠোঁটের কোণে হৃদয়ছোঁয়া এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
-আপনাকে অনেক অনেক শোকরিয়া। আপনার এই অনুগ্রহ আমার আজীবন মনে থাকবে। তবে আপনার এ মিশনে আমিও অংশীদার হতে চাই।’
– তাতো অবশ্যই। তুমি তো সবকাজেই আমার অংশীদার ও সহযোগী। আচ্ছা, তুমি যে বলেছিলে যে, দু’টি বিষয় তোমাকে পেরেশান করে রেখেছে। একটি তো বললে, অপরটি কী?
লিময়া মাথা অবনত করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এরপর সে মাথা উঠিয়ে বলল, ‘দ্বিতীয়টি হল, আপনার নিকট অনুরোধ প্রতিশোধ অভিযান পূর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিয়ের আক্দ অনুষ্ঠান মুলতবী রাখবেন।’
– ঠিক আছে লিময়া। তোমার কথামতই সব হবে। আর আমিও তোমার পিতার প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্বে বিয়ের ব্যাপারে সম্মত নই। কারণ, তোমার পিতা মানে আমারও পিতা। কিন্তু তুমি কি প্রতিশোধ নেওয়ার কৌশল সম্পর্কে কোন কিছু ভেবেছ?
– হ্যাঁ, আমার কাছে একটি কৌশল আছে। তবে এর বিস্তারিত বিবরণ এখনই জানতে চাইবেন না।’
– কেন জানতে চাইব না। আমরা না এ মিশনে পরস্পরের সহযোগী?
লিময়া মুচকি হেসে বলল, তা ঠিক, এ অভিযানে আমরা উভয়েই হিসসা নিতে চাচ্ছি। কিন্তু আমি আমার কৌশলটি প্রথমে আমীরুল মুমিনীনের কাছে উপস্থাপন করে তাঁর সম্মতি লাভের পূর্বে আমি তা প্রকাশ করতে চাচ্ছি না।’

ইত্যবসরে তারা তাদের কামরার দিকে কারো আসার পদধ্বনি শুনতে পেল। উভয়েই আগন্তুকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। একটুপরই ‘উম্মুল উমারা’ হাসতে হাসতে কামরায় প্রবেশ করলেন। বসতে বসতে বললেন, তোমাদের আলোচনায় আমার ব্যঘাত ঘটানোর ইচ্ছা ছিল না..। কিন্তু আমীরুল মুমিনীন ও সেনাপতি জাওহার হুসাইনকে জরুরী পরামর্শের জন্য তলব করায় আমি বাধ্য হলাম..। তাঁরা একঘণ্টা যাবত আমীরুল মুমিনীনের বিশ্রামকক্ষে অবস্থান করছেন। মনে হচ্ছে তাঁরা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছেন।’
হুসাইন ও লিময়া উভয়েই দাঁড়িয়ে গেল..। এরপর লিময়া উম্মুল উমারার কাছে গিয়ে বলল, আমরাও কিছু বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। আমীরুল মুমিনীনের সাথে আমার সাক্ষাতের জন্য কি অনুমতি নেয়া যাবে?
উম্মুল উমারা সাথে সাথে বললেন, আমীরুল মুমিনীনের কাছে যেতে তোমার অনুমতি লাগবে নাকি! তুমি যেকোনো সময় তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে পারবে। তবে এ মুহূর্তে তো কোন বাঁধা-ই নেই।’ এবলে তিনি কক্ষ থেকে বেড়িয়ে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলেন।
এবার উম্মুল উমারা আমীরুল মুমিনীনের কামরার দিকে যাওয়ার পথে লিময়ার ডান হাত এবং হুসাইনের বামহাত ধরলেন। বললেন, চলো হে নবদম্পতি! তোমাদের উভয়কেই আমীরুল  মুমিনীন ডাকছেন।..
উম্মুল উমারা লিময়া ও হুসাইনসহ খলীফার কামরায় প্রবেশ করলেন। খলীফা তাদের দু’জনকে নিজের পাশে বসালেন। এবং জাওহারকে লক্ষ্য করে বললেন, আমরা যে বিষয়ে আলাপ করছিলাম, তা এদের কাছে কোন গোপন নয়।’
এরপর খলীফা ‘উম্মুল উমারা’ লিময়া ও হুসাইনের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, জাওহার! আপনি তো জানেন, উম্মুল উমারা কেমন বুদ্ধিমতি ও গুণবতি। আর বেটি লিময়া, আমাদের দেশ ও জনগণের জন্য তার নিষ্ঠা এবং ইখলাসের কোন জুড়ি নেয়।’ অপরদিকে হুসাইন, সে তো অচিরেই তোমারমত একজন বীর সেনাপতি হিসেবে নিজেকে বিকশিত করবে বলে আমি আশাবাদী।
এবার তিনি বিশেষভাবে লিময়াকে লক্ষ্য করে বললেন, প্রিয় বেটি! আমরা জীবিত থাকতে তোমার ভয় নেই। তোমার বিষয়টি আমাদের জাতীয় সমস্যার মতই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আস্থা রাখ! আমরা অবশ্যই তোমার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেব।’
লিময়া খলীফার দিকে শোকর ও কৃতজ্ঞতা ভরে তাকাল। এবং কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, অনেক শুকরিয়া জনাব। তবে ঐসব প্রতারকদের থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে আমীরুল মুমিনীনকে হত্যার   ষড়যন্ত্রের বদলা হিসেবে।
খলীফা মুচকি হেসে বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমার মঙ্গল করুন, বেটি!
লিময়া বলল, আমীরুল মুমিনীনের অনুমতি হলে ‘প্রতিশোধ অভিযানে’ আমিও শরীক হতে চাই।
খলীফা তার কাঁধ চাপড়ে বললেন, বেটি! তুমি তো পিতৃশোক ও অন্যান্য দিক থেকে মর্মাহত ও ভারাক্রান্ত..।
লিময়া বলল, জাহাপনা! তবে আমি ঐ সকল চক্রান্তকারী সম্পর্কে যা জানি তা হয়তো আপনাদের মিশনে অনেক সাহায্য করবে।
এবার জাওহার চকিতে ফিরে বললেন, লিময়া! এদের সম্পর্কে তুমি কী কী জান?
লিময়া বলল, আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আপনি এদের ব্যাপারে যা যা জানতে চান সবই বলে দেব।
খলীফা বললেন, বেটি! তুমি   যেকোনো মন্তব্য, ফিকির, পরামর্শ ও মতামত খোলাখুলি বলতে পার। তোমার প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্ত্বার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।
লিময়া লজ্জায় মাথা অবনত করল। তার গণ্ডদ্বয় গোলাপীরঙ ধারণ করল। সে মাথা উঠিয়ে বলল, আমার মনে হয় আমীরে মিসর কাফূরকেই এই ষড়যন্ত্রের পূর্ণভার বহন করতে হবে। তিনিই এর নাটের গুরু। তাই সাজা প্রথমে তারই পাওয়া উচিত।’
খলীফা জাওহারের দিকে তাকালেন। দু’জনের দৃষ্টিবিনিময় হল এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ মুচকি হাসলেন। এরপর খলীফা বললেন, লিময়া! আশ্চর্য তুমি কি আমাদের পরামর্শসভায় উপস্থিত ছিলে! অন্যথায় আমাদের মতের সাথে তোমার মত এমন মিলে গেল কীভাবে? নাকি তুমি মানুষের মুখ দেখেই তার অভ্যন্তর পড়ে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করেছ!!
উম্মুল উমারা বললেন, আমীরুল মুমিনীন কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
এবার জাওহার হাসতে হাসতে বললেন, ‘আসলে আপনারা আসার পূর্বে আমীরুল মুমিনীন আমাকে মিসর আক্রমণের কথা বলছিলেন।’
খলীফা বললেন, সিপাহসালার জাওহারের সাথে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। মনে হচ্ছে, মিসরের শাসক ‘কাফূর আলইখশীদিকে শিক্ষা দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ এসেছে।..
এবার হুসাইন অনুমতি নিয়ে বলল, জাহাপনা! আপনার সিদ্ধান্তই যুক্তিযুক্ত। তবে আমার মনে হয় এ মিশনে পা বাড়াবার পূর্বে আমাদের অর্থ সঞ্চয় করার দরকার। কারণ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে বিপুল অর্থের প্রয়োজন পড়ে। পাশাপাশি মিসর আক্রমণের পূর্বে তার অভ্যন্তরীণ অবস্থাও ভালভাবে জানা জরুরী। ’
ক্রমশ

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান : ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

  1. সাজিদুল ইসলাম সাজিদ says:

    ভালো লাগলো পড়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight