ঈমানের দৃঢ়তা / উম্মে হাবিবা নুসরাত

ছোট্ট বালক ইউসুফ। বয়স দশ। রূপে, গুণে ইউসুফি সৌন্দর্যেরই দ্যোতি ছড়াচ্ছে যেনো। পিতা ইসলামি সালতানাতের সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব। এমন একটি ছেলে পেয়ে বড্ডো খুশি তিনি। ছেলের ইমানদীপ্ত কথা, আচরণে মাঝেমধ্যে মুগ্ধ হয়ে যান। ও একসময় ইসলামি সালতানাতকে ক্রুসেডমুক্ত করবে, এটাই তার বিশ্বাস। ১১৪৮-১১৪৯ সালের মাঝামাঝি সময়। ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত করতে ইউসুফকে একটা কাফেলার সঙ্গে তিকরিতে রওনা করেন। দেখাশোনার জন্য সঙ্গে দিলেন একজন ভৃত্য। অনেকটা পথ পেরিয়ে বিশাল এক প্রান্তর। গাছপালাহীন প্রান্তরটা মরুভূমির মতো। দুর্গম পথ। উঁচু উঁচু টিলা আশপাশে। এখানে এসে কাফেলার সবার মুখ ভয়ে কেমন রক্তশূন্য হয়ে পড়েছে। ডাকাতের কবলে পড়ে অনেকে নাকি প্রাণ হরিয়েছে এখানে। সকলের কথার আওয়াজ মিইয়ে গেলো হঠাৎ। শঙ্কা, উৎকণ্ঠা নিয়ে পথ চলতে লাগলো নীরবে। কিন্তু ইউসুফের মনে কোনো ভয় নেই। নির্ভয়ে এগোতে থাকলো। একটু এগোনোর পর সত্যিই বিপদটা এসে পড়লো। টিলার আড়াল থেকে ধুলো উড়িয়ে ছুটে এলো একদল ডাকাত। মুহূর্তেই ঘিরে ফেললো কাফেলাটিকে। চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক ডাকাত সর্দারের। হুংকার ছেড়ে বললো, ‘জান নিয়ে যেতে চাইলে সব সম্পদ রেখে যাও।’
কাফেলার লোকগুলো ভয়ে চুপসে গেলো। অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সবাই। ইউসুফ ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করলো, ‘চাচা, এখান থেকে আমাদের রাজ্য কতটুকু দূরে হবে?’
ভৃত্য জবাব দিলো, ‘মাইল দশেক হবে।’ গভীরভাবে কী যেনো ভাবলো ইউসুফ। এরপর ছুটে গেলো মহিলা ও শিশুদের কাফেলায় রাখা নিজ পালিত কবুতরের কাছে। একটু পর ভৃত্যের পাশে এসে দাঁড়ালো। ডাকাত সর্দার দুটি বর্শা জমিনে গেঁথে গেটের একটা আকৃতি বানালো। আদেশ দিলো, ‘এ বর্শার নিচ দিয়ে মাথা ঝুঁকে ওপাশে নিজ নিজ সম্পদ রেখে আসবে। তবেই মুক্তি পাবে। এমনটি না করলে জানও যাবে, মালও যাবে।’
ভয়ে কাতর লোকগুলো তাই করতে লাগলো। ইউসুফ বারবার উত্তুরে বাড়ির পথের দিকে তাকাতে লাগলো। মনে হলো কারো জন্য অপেক্ষা করছে সে। একটু পর এলো ওর পালা। ডাকাত সর্দার আদেশ দিলো, ‘এই ছোকরা, এটার নিচ দিয়ে ঝুঁকে ওপাশে তোর মাল রেখে আয়।’ ইউসুফ অনড়। ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে আছে। ভৃত্য ওকে বোঝাতে লাগলেন, ‘বাবা, যা আছে রেখে এসো। না হয় ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।’ ইউসুফ ডাকাতের আদেশ না মেনে বাড়ির পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। সর্দার আবার হুংকার ছাড়লো, ‘এই ছোকরা, দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? মরার শখ হয়েছে বুঝি?’
ইউসুফ এবার দৃঢ় গলায় বললো, ‘আল্লাহকে ছাড়া আর কারো সামনে মাথা ঝোঁকাবো না। আপনার যা মন চায়, তাই করুন।’ সর্দার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, ‘পিচ্চি হলে কী হবে, তেজ আছে ছোকরার!’ জোড় গলায় ফের বললো, ‘দেখো, ছোট বলে তোমাকে এখনো কিছু বলি নি। শেষবারের মতো বলছি, এর নিচ দিয়ে যাও। না হলে দেখো তোমার অবস্থা কী করি!’ বর্শার নিচ দিয়ে যাওয়ার জন্য ভৃত্যও বারবার অনুরোধ করতে লাগলো। ইউসুফ আগের মতোই অনড় দাঁড়িয়ে রইলো। এমন সময় দেখা গেলো, উত্তুরের ধুলোবালি উড়িয়ে ছুটে আসছে সুলতানের অশ্বারোহী বাহিনী। সবার সামনে ইউসুফের পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব। চোখের পলকে ডাকাতদের ধরে বেঁধে ফেললো সৈন্যরা। সুলতান ডাক দিয়ে বললেন, ‘কোথায় আমার ইউসুফ?’
আড়াল থেকে ছুটে এসে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো ইউসুফ। হাসিহাসি মুখে বললেন, ‘ইউসুফের উসিলায় আজ তোমরা বেঁচে গেলে। তোমাদের বিপদের কথা লিখে কবুতর দিয়ে আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলো। তখনই সৈন্য নিয়ে রওনা করি।’ সবাই অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। ভৃত্য এসে ইসুফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। ইউসুফের ইমানের দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ হলো সবাই।
তার আসল নাম ইউসুফ হলেও উপাধি ছিলো সালাহ উদ্দিন আইয়ুবি। পরবর্তীকালে তাঁর হাতেই খ্রিস্টানদের থেকে মুক্ত হয় জেরুজালেমের মসজিদে আকসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight