ঈদের আনন্দ নিভে গেল আবদুল মালেক মুজাহিদ

কতিপয় লোক বড়ই দুর্ভাগা হয়ে থাকে। তারা পিতামাতার অধিকার সমূহের প্রতি আদৌ পরোয়া করে না। স্ত্রী প্রেমে তারা এতই উন্মত্ত হয়ে পড়ে যে, মাতাপিতাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে বসে। মাতাপিতার আকাঙ্খার প্রতি মোটেই সম্মান প্রদর্শন করে না। এটা এরূপই এক হতভাগ্য ব্যক্তির কাহিনী। এর বর্ণনাকারী হচ্ছেন শায়খ আলী বিন আবদুল মালেক আলকারনী। তিনি সৌদি আরবের একজন সুপরিচিত ইসলাম প্রচারক। তিনি বলেন, এ কাহিনীটি একজন জহুরী (স্বর্ণ ব্যবসায়ী) বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনাটি তাঁর দোকানেই সংঘটিত হয়েছিল।
তিনি বর্ণনা করেছেন, রমযান মাসের শেষ দশকে আমার দোকানে একটি লোক স্বীয় স্ত্রী, শিশু এবং মাতাসহ স্বর্ণলংকার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে আগমন করে। তার শিশু ছেলেটি তার বৃদ্ধা মাতার কোলে ছিল। মাতা তাঁর নাতিকে কোলে উঠিয়ে দোকানের একদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখে অনুমিত হচ্ছিল যে, বাস্তবিকই তিনি কোন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন ভদ্র মহিলা। এদিকে স্বামী-স্ত্রী বিভিন্ন প্রকারের স্বর্ণলংকার পছন্দ করে। তাদের পছন্দকৃত স্বর্ণালংকারের মূল্য ছিল বিশ হাজার রিয়াল।
মাতার দৃষ্টি বিভিন্ন প্রকার স্বর্ণালংকারের প্রতি পড়ছিল। তিনি স্বীয় জায়গা হতে এগিয়ে গিয়ে দোকানের ঐ অংশে গমন করেন যেখানে স্বর্ণের আংটি রক্ষিত ছিল। আংটিগুলির মধ্য হতে মাতার একটি আংটি পছন্দ হয়। তিনি ঐ পছন্দনীয় আংটিটি স্বীয় আংগুলে পরে নেন। ঐ আংটির মূল্য ছিল একশ রিয়াল।
জহুরী বর্ণনা করেন, পুত্র যখন হিসাব চুকিয়ে নেয়ার জন্যে কাউন্টারে আসলো এবং হিসাব দেখলো তখন সে পকেট হতে বিশ হাজার রিয়াল বের করে আমাকে দিয়ে দিল। আমি বললাম আরও একশত রিয়াল দিতে হবে। সে বলল, একই তো হিসাব করা হল এবং হিসাবে হল বিশ হাজার রিয়াল। সুতরাং এই একশত রিয়াল কেন? আমি বললাম, একশত রিয়াল হচ্ছে ঐ আংটিটির মূল্য যেটা আপনার মাতা গ্রহণ করেছেন। সে তখন উহ বলে মুখ ভ্যাংচালো এবং বলল, বুড়ি মহিলার আংটি কি প্রয়োজন? একথা বলে সে তার মায়ের আঙ্গুল থেকে আংটিটি খুলে নিল। ওটা সে কাউন্টারে রেখে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এ দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতে মাতার মনের অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তিনি চেষ্টা করলেন যে, তাঁর মনে এ ব্যথা যেন প্রকাশিত না হয়। তিনি স্বীয় নাতিকে কোলে নিয়ে দোকান হতে বেরিয়ে গেলেন। শিশুকে নিয়ে তিনি গাড়িতে উঠলে স্ত্রী তার স্বামীকে তিক্ততার সুরে বলল, তোমার মাতাকে তুমি আংটি কিনে দিলে না কেন? অযথা তুমি তোমার মায়ের মনে কষ্ট দিলে? এই যদি তিনি রাগের বশবর্তী হয়ে বাড়ি হতে বিদায় হয়ে যায় তবে আমাদের শিশু সন্তানকে কে সামলাবে? তার ফিডার কে পরিস্কার করবে? এ কথা বলে সে বিড় বিড় করতে লাগল।
জহুরী বর্ণনা করেছেন, স্ত্রীর কথা শুনে স্বামী আবার দোকানে আসল এবং আমার নিকট ঐ আংটিটি চাইল যেটা সে তার মাতার আংগুল হতে ছিনিয়ে নিয়ে কাউন্টারে ফেলে দিয়েছিল। আমি তাকে আংটিটি দিলাম। সেও মূল্য পরিশোধ করল। যখন সে আংটিটি নিয়ে মাতার নিকট গেল তখন তার ঐ বৃদ্ধা মাতা তাকে বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম! জীবনে আমি সোনা পরব না। আমি এই আংটিটি ছাড়া আর কিছ্ইু চাচ্ছিলাম না। আকাঙ্খা ছিল যে, আমি এটা ঈদের দিন পরব। অন্যান্য লোকদের সাথে আমিও ঈদের আনন্দ উপভোগ করব। এখন আমি ঈদের আনন্দ মনের মধ্যে গেড়ে দিলাম। হে আমার পুত্র! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।

মাতার আদেশ পালন করার কারণে প্রাণ বেঁচে গেল
“সাআদাতুদ্দারাইনে ফী বিররিল ওয়ালেদাইনে” এর বরাত দিয়ে এ ঘটনাটি বর্ণনা করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে যে, এক নব যুবকের প্রাণ মাতার আদেশ পালন করার কারণে রক্ষা পেয়েছিল। এ ঘটনাটি দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, একজন লোকের পিতামাতার আনুগত্য করার কারণে যেমন অসংখ্য উপকার লাভ হয়ে থাকে, অনুরূপভাবে তাদের খেদমত ও আদেশ পালনের ফলে অসংখ্য বিপদ আপদও কেটে যায়। এই কিতাবের রচয়িতা লিখেছেন, এক নব যুবক তার এক বন্ধুর ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে যে, তার বন্ধুটি প্রত্যহ তার মাতাকে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্যে নিয়ে যেত। তার মাতা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করার অভ্যাস করে ফেলেছিলেন। একবার ঐ যুবক তার এক সাথীর সাথে কোন এক যায়গায় যাওয়ার ওয়াদা করল। উভয় বন্ধুর মধ্যে এই সিদ্ধান্ত হল যে, অমুক তারিখে অমুক জায়গায় তারা গমন করবে। অতঃপর ঐ তারিখ এসে পড়ল। আমার বন্ধুর ঐ সাথী তার বাড়িতে আসল এবং ওয়াদা অনুযায়ী তার সাথে গমন করার কথা তাকে বলল।
আমার বন্ধু তার মাতার খেদমতে হাজির হয়ে বলল, আম্মাজান! আপনি কোন জায়গায় যেতে চান কি?
মাতা উত্তর দিলেন না, আজ কোথাও যাওয়ার আমার ইচ্ছা নেই। তোমাকে যেখানে যেতে হবে সেখানে তুমি যেতে পার। আল্লাহ তোমাকে হিফাযত করুন।
দরজার বাইরে আমার বন্ধুর সাথী অপেক্ষা করছিল। আমার বন্ধুর মাতার অনুমতি নিয়ে বাড়ির বাইরে আসল এবং স্বীয় সাথীর সাথে গাড়িতে উঠল। এমতাবস্থায় তার বাড়ির কোন এক জিনিরেস কথা স্মরণ হলো যে সে ভুলে রেখে গিয়েছিল। সুতরাং সে বাড়ির মধ্যে জিনিসটি আনতে গেল। ঐ সময় তার মাতা তাকে বলল, আমি চাচ্ছি যে, তুমি আমাকে মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে।
পুত্র বলল, কয়েক মুহূর্ত পূর্বে তো আপনি বললেন যে, আপনি কোথাও যাবেন না। মাতা বলল, হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম বটে; কিন্তু এখন যেতে চাই।
পুত্র বলল, আম্মাজান! আপনার হুকুম শিরোধার্য। আপনার খেদমত আমার জন্য গর্বের কারণ। একথা বলে পুত্র বাড়ি হতে বের হয়ে বাইরে স্বীয় সাথীর নিকট আসল এবং তাকে বলল, দোস্ত আমাকে ক্ষমা কর! আমি এখন বাড়ি হতে বের হতে পারবো না। কেননা আমার মাতা মসজিদে যেতে চান। সুতরাং তুমি আজ চলে যাও পরে কখনও দেখা যাবে।
যুবক একথা বলে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল এবং তার সাথী গাড়ি স্টার্ট করে সেখান থেকে চলে গেল। অতঃপর কিছু সময় অতিবাহিত হল, ইতিমধ্যে জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি ও দুঃখ ছড়িয়ে পড়ল। জনগণ একটা বড় দুর্ঘটনার ব্যপারে বলাবলি করছিল। ঐ সময় মাতার বিশ্বস্ত ও অনুগত যুবক পুত্র জানতে পারল যে, তার সাথীর এক্সিডেন্ট হয়েছে এবং ঘটনাস্থলেই মারা গেছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন!
শ্রদ্ধেয় পাঠকম-লী! আপনারা এই ঘটনাটি একটু চিন্তা করে দেখুন যে, মাতাপিতার খেদমতের মধ্যে কত উপকার রয়েছে! মাতাপিতার বাধ্য ও অনুগত পুত্র কেমন বিপদ সমূহ হতে নিরাপদ থাকে! যদি আমাদের সমস্ত মুসলমান ভাই নিজ নিজ মাতাপিতার অধিকার সমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন এবং নিজেদের ব্যস্ততার উপর পিতামাতার প্রয়োজনগুলিকে প্রাধান্য দিতেন।

দাদীমার সাথে সদ্ব্যবহারের প্রতিদান
ইসলামী শরীয়তে যেখানে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে সেখানে দাদা দাদীর সাথেও সদ্ব্যবহারের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত রাখার ধারা এত ব্যাপক যে, এর মাধ্যমে ইসলামী সমাজের ময়দান অত্যন্ত সুন্দর হয়ে যায়। ইসলাম মুসলমানদের প্রতি আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত রাখার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছে।
দাদা-দাদী ও নানা-নানীও প্রকৃতপক্ষে পিতামাতারই স্থলাভিষিক্ত। প্রত্যেক মানুষের উপরই এটা অবশ্য কর্তব্য যে, সে যেমনভাবে স্বীয় পিতামাতার প্রতি চিত্তাকর্ষণ রাখে, অনুরূপভাবে স্বীয় পিতামাতার প্রতিও গভীর মুহাব্বত রাখবে। দাদা-দাদী ও নানা-নানীও তো আমাদের জন্য এতটাই গুরুত্ব রাখে যতটা গুরুত্ব আমাদের জন্য আমাদের পিতামাতার রয়েছে। যে ঘটনাটি আমরা নি¤েœ বর্ণনা করতে যাচ্ছি ওর সম্পর্কও আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত রাখার সাথেই রয়েছে। এই ঘটনার একটি ছেলে তার দাদীর সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কুক্ত রাখে, ফলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে দেন। আসুন, এঘটনাটি আমরা বর্ণনা করছি।
দাদীমা আমাদের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। তাঁকে আমি যখন দেখলাম তখন আমার আনন্দের কোন সীমা থাকল না। দাদীমার আগমন আমার নিকট এরূপ অনুভূত হলো যে, জান্নাত আমার বাড়িতে পদধূলী দিয়েছে! আমি সংকল্প করে ফেলি যে, দাদীজানের খেদমতের কোন সুযোগ আমি হাত ছাড়া করবো না। দাদীর খেদমত করে আমি জান্নাতি হওয়ার আকাঙ্খা করেছিলাম। আমাদের বাড়িতে তাঁর আগমন করা মাত্রই আমি এবং আমার আম্মা এই ইচ্ছা পোষণ করে ফেলি যে, এখন দিন রাত আমরা তাঁর খেদমত করতে থাকব। দাদীর বর্তমান অবস্থার প্রতি বড়ই চিত্তাকর্ষণ রাখছিলাম। এ কারণে আম্মা বিভিন্ন পুস্তক ও সংবাদপত্র আমার দাদীকে পাঠ করে শুনাতেন। আমি দাদীজানকে খাওয়াতাম এবং সময়মত ঔষধ পান করাতাম। দাদী আমাদের বাড়িতে আগমনের পর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছিল। তিনি ভয়ানক মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর এ রোগ বৃদ্ধি পেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। আমি দেখেছি যে, যখন আমার দাদীমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়ার পর ইনজেকশন দেয়া শুরু হয় তখন তিনি শাহাদাত আঙ্গুলী আকাশের দিকে উঁচু করে তাসবীহ ও তাহলীল পাঠ করতে থাকেন। আমি কোন রোগীকেই এরূপ অবস্থার আল্লাহ তাআলার তাকবীর ও তাহলীল করতে দেখিনি। আমার দাদীর এরূপ ভয়াবহ অবস্থাতেও আল্লাহ তাআলার যিকির করছিলেন। দাদীজানকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছিল। ডাক্তারগণ তাঁর প্রতি বিশেষভাবে মনযোগ দেন। আল্লাহ তাআলার ফযল ও করমে তিনি সুস্থ হয়ে যায় এবং হাসপাতাল হতে বাড়িতে চলে আসেন।
আমার ভালভাবে স্মরণ আছে যে, আমার দাদীমা প্রায় গত তিন বছর হতে আইয়্যামে বীয অর্থাৎ প্রতি চন্দ্র মাসে ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন।
ওমযানুল মোবারক ছাড়াও তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি শা’বান ও শাওয়াল মাসেও রোযা রাখতেন। প্রকাশ থাকে যে, ডাক্তারগণ চিকিৎসার সময় তাঁকে খুব গুরুত্বের সাথে বলেছিলেন যে, তিনি যেন এত বেশি রোযা না রাখেন। কেননা অধিক রোযা রাখার কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। সময়মত ঔষধ পান না করলে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর রোগ বৃদ্ধি পেলে অন্তরের উপর অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে। আমি দাদীজানের খেদমতে হাযির হতাম এবং সালাম করে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম।
একবার আমি এশার নামাজের পর তাঁর নিকট হাযির হলাম এবং তাঁকে কিছু টাকা দিলাম। তাঁকে বললাম, আমি কলেজের ডিগ্রি লাভ করেছি। কাজেই এখন আমার কলেজের ধাপ শেষ হয়েছে। এই আনন্দেই আমি আপনাকে কিছু টাকা দিলাম। দাদীমা এই অর্থ দেখে আমার দিকে ¯েœহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন এবং বহু দুআ করলেন। এই সময় আমি দাদীমাকে বললাম, ডাক্তারগণ আপনাকে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন এবং সময়মত ঔষধ পানের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সুতরাং আপনি স্বাস্থের প্রতি খেয়াল রেখে ডাক্তারগণের উপদেশ অনুযায়ী রোযা রাখা বন্ধ রাখুন।
দাদীমা আমার কথাগুলি মনযোগের সাথে শ্রবণ করলেন এবং ওয়াদা করলেন, তুমি যা বলছো তাই করবো। এরূপ কথাবার্তার পর আমি আমার কক্ষে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। ফজরের নামাজের পর হঠাৎ আমার দরজায় জোরে জোরে করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। আমি চিন্তাম্বিত হয়ে দরজা খুললাম। দেখলাম যে, চাকরানী হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, যে দাদীমা মাটিতে পড়ে রয়েছেন। আমি এ কথা শোনামাত্রই দাদীজানের কক্ষে প্রবেশ করলাম। দেখি যে, দাদীমা মাটিতে পড়ে আছেন! ডান হাতখানা বাম হাতের উপর রেখে তিনি কিবলামুখী হয়ে রয়েছেন। মনে হচ্ছে তিনি যেন নামাযে রয়েছেন। তখ নপর্যন্ত তিনি ঔষধ পান করেননি। আমি আমার হাতখানা তার শরীরে রেখে দেখলাম যে, তার দেহ ঠান্ডা হয়ে রয়েছে। তিনি এই ধ্বংসশীল পৃথিবী হতে বিদায় নিয়ে পরকালের দিকে চলে গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজেউন।
দাদীমার ইন্তেকালের পর তিন মাস অতিবাহিত হয়েছিল। আমার আকাঙ্খা ছিল যে, আমি বাড়ির পাশ্ববর্তী স্কুওে শিক্ষকতা করব। এজন্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমার সার্টিফিকেট জমা দেয়া জরুরী ছিল। কারণ এই যে, যদি এ স্কুল কোন পদ শূণ্য থাকে তবে আমি ওটা পেয়ে যাব। সুতরাং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসে আমি আমার সার্টিফিকেট নিয়ে হাযির হলাম। জেনারেল ম্যানেজার সেক্রেটারীকে ঐ ফাইল আনতে বললেন যার মধ্যে স্কুলসমূহের তালিকা ছিল। এই তালিকার মাধ্যমে জানা যেত যে, কোন স্কুলে পদ শূণ্য রয়েছে। সেক্রেটারী তালিকায় দৃষ্টি ফিরানোর পর জেনারেল ম্যানেজারকে বললেন, দরখাস্তকারীর আকাঙ্খা হচ্ছে যে, তিনি অমুক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করবেন। অথচ তাঁর আকাঙ্খিত স্কুল ছাড়া প্রায় সব স্কুলেই দুজন করে শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকাশ থাকে যে, ঐ যুগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন চাকুরীই সুপারিশের ভিত্তিতে নয়; বরং মেধা এবং পরীক্ষার ভিত্তিতে লাভ করা যেত। জেনারেল ম্যানেজার আমাকে বললেন, নিরাশ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, এক সপ্তাহ পরে আসুন, হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কোন জায়গা বের করে দিবেন।
আমি ইনশাআল্লাহ বলে সেখান হতে বের হয়ে বাড়িতে ফিরে এলাম। রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে আমার দাদীকে দেখলাম। তিনি আমার খবরাখবর জানতে চাইলেন এবং কৈফিয়ত তলব করে বললেন, তোমার সাথে কয়েক দিন হতে সাক্ষাত হয়নি। ব্যাপার কি?
আমি স্বপ্নের মধ্যেই তাঁকে উত্তর দিলাম, দুনিয়ার কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকার কারণে সাক্ষাতে বিলম্ব হল। অতঃপর তিনি আমার জন্য দুআ করতে গিয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা যেন তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করেন। আমি স্বপ্ন হতে জাগ্রত হয়ে এরূপ অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি চাকুরী পেয়ে গেছি।  আমি প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলাম। জেনারেল ম্যানেজার আমাকে দেখে সেক্রেটারীর মাধ্যমে ফাইল আনিয়ে নিলেন এবং তাতে স্কুলসমূহের তালিকার উপর চক্ষু বুলাতে লাগলেন। তিনি এ জেনে বড়ই বিস্মিত হলেন যেন, যে স্কুলগুলিতে দুজন করে শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল না অর্থাৎ ঐ স্কুলটি যেটা আমার বাড়ির নিকটবর্তী ছিল এবং আমি ঔ স্কুলেই চাকুরী করতে আকাঙ্খী ছিলাম, তাতে একজন শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল! জেনারেল ম্যানেজার এ দেখে সেক্্েরটারীকে কড়া ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি অন কোন ফাইল তো নিয়ে আসনি? উত্তরে তিনি বললেন, এ সম্পর্কীয় ফাইল এটাই। আলহামদুলিল্লাহ! আমার আকাঙ্খা অনুযায়ী আমার বাড়ীর নিকটবর্তী স্কুলেই আমি নির্বাচিত হয়ে গেলাম! অতঃপর সেখানেই শিক্ষাদান করতে লাগলাম। আমি মনে করছি যে, আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহরে পর আমার দাদীমার সাথে সদ্ব্যবহারের ফলেই আমি এই চাকুরী লাভ করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight