ঈদুল ফিতর উদযাপন : তাৎপর্য ও শিক্ষা / মাওলানা আহমদ মায়মূন

দুনিয়ার সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকে উৎসব দিবস পালনের রেওয়াজ চলে আসছে। লোকেরা উৎসবের দিন সাজগোজ করে বের হয় এবং আনন্দ-ফুর্তি করে। জীবনের কান্তি-অবসাদ দূর করে মন-মেজাজকে প্রফুল্ল করে তোলার জন্য আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
ইরানের অগ্নিপূজকেরা বছরে দুটি উৎসব পালন করত। একটি নওরোজ (২১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ এর মধ্যবর্তী কোনো একদিন)। দ্বিতীয়টি মেহেরগান, যার আরবী উচ্চারণ মেহেরজান। (এটি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত এক মাস দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের অধিবাসীদের পালিত শরৎকালীন ফসলী নববর্ষের প্রাচীন উৎসব)। এ দুটি উৎসব ইরানের প্রভাবে আরব দেশগুলোতেও চালু ছিল।
ইসলামে ঈদের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে হিজরতের পরে। এর কারণ, রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় গমন করেন তখন তিনি দেখতে পান যে, সেখানে লোকেরা বছরে দুটি দিন উৎসব দিবসরূপে পালন করে থাকে। এ দিনগুলিতে তারা আনন্দ-ফুর্তি করে, খেলা-ধূলা করে এবং আসর ও মেলা জমানোর আয়োজন করে। তখন রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এ দিবসগুলো কি? তারা বলল, আমরা এ দিনগুলোতে জাহেলিয়াতের যুগ থেকে আনন্দ-ফুর্তি করি (অর্থাৎ, প্রাচীন কাল থেকে উৎসবদিবস পালন করি)। রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুসলিম জাতির উৎসব করার জন্য অন্য দুটি দিন ধার্য করে দেন। এরপর বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের পূর্ববর্তী উৎসব দিবস দুটির পরিবর্তে আরও উত্তম দুুটি দিবস দান করেছেন। আর সে দুটি দিবস হল, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১২০০৬, ১৩৬২০/১৩৬২২; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস: ১১৩৪; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৩৪৩৬] এভাবেই মুসলিম সম্প্রদায়ের এ দুটি উৎসবের বিধান প্রবর্তিত হয়।
জাহেলিয়াতের যুগ থেকে চলে আসা উৎসব দিবস দুটির পরিবর্তে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য ভিন্ন দুটি উৎসবের দিন ধার্য করার রহস্য হল, যে কোন উৎসবের পেছনে কিছু কারণ থাকে। যেমন: ধর্মীয় কোন রীতি বা প্রতীককে প্রসার দান করা অথবা ধর্মীয় নেতাদের শ্লোগানের একাত্বতা প্রকাশ করা অথবা কোনো কিছুকে স্মরণীয় করে রাখা ইত্যাদি।
জাহেলী যুগের উৎসব দিবসের কথা শোনার পর হযরত রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা করলেন যে, যদি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা উৎসবের দিন ধার্য করে না দেওয়া হয়, তবে উৎসবের প্রতি মানুষের স্বভাবগত আকর্ষণের ফলে তারা অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোকে নিজেদের উৎসবরূপে গ্রহণ করে ফেলতে পারে। আর এতে জাহেলী যুগের রীতি-আদর্শের প্রসার ঘটবে এবং জাহেলিয়াতের নেতৃস্থানীয়দের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই শরীয়ত এখানে বিকল্প ব্যবস্থা দান করেছে এবং মুসলিম জাতির আনন্দ-উৎসবের জন্য দুটি দিন ধার্য করেছেন। এ দুটি আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে মিল্লাহে ইবরাহীম আ.-এর রীতি-আদর্শের প্রসার ঘটে। মুসলমানদের এ দুটি উৎসব কেবল উৎসবই নয়, বরং এগুলোকে ইবাদতের দিবসে পরিণত করা হয়েছে। এ দিনগুলোতে আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি দুই রাকাত নামাযের হুকুম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও নানা রকমের ইবাদত এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাতে মুসলমানদের এ জমায়েত কেবল আমোদ-ফুর্তির জমায়েতে পরিণত না হয়; বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কালামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটে। [হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা]।
ঈদুল ফিতর আসে রমযান মাস সমাপ্ত হওয়ার পরের দিন। এজন্য এ দিনটিকে পুরস্কারের দিন বলা হয়। রমযান মাসে আল্লাহর বান্দাগণ এক মাসব্যাপী পানাহার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। ঈদের দিন তাদেরকে বৈধ পানাহার ইত্যাদির পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। রমযান মাস ছিল তাদের জন্য আমলের মাস। আর ঈদের দিন তাদের আমলের পুরস্কার লাভ করার দিন।
ঈদের শুভ সূচনা হয় ঈদের নতুন চাঁদ দেখার পর। রমযান মাসের শেষ দিন সন্ধ্যায় প্রায় সকল মুসলিম ঈদের নতুন চাঁদ দেখার চেষ্টা করে। যখনই শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দৃষ্টিগোচর হয় তখন যারা সচেতন মুসলিম তারা বলে উঠে, হে আল্লাহ! আকাশে উদিত নতুন চাঁদকে আমাদের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও আপনার আনুগত্যের চাঁদে পরিণত করুন। এ মাসকে আপনি আপনার বিশেষ রহমত বর্ষণের মাসে পরিণত করুন।
সুতরাং ঈদের চাঁদ মুসলিম জাতির জন্য কেবল আনন্দ উৎসবের চাঁদ নয়, বরং এ নতুন চাঁদের আগমন তাদেরকে জগৎ ¯্রষ্টা আল্লাহ তাআলার প্রতি অভিমুখী করে দেয়, তাদেরকে আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন তারা নিজেদের জন্য এবং সকল মানুষের জন্য দোয়া করতে থাকে, হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদের মাধ্যমে যে মাসের সূচনা হচ্ছে, তাকে আপনি আমাদের সকলের জন্য রহমত ও বরকতের মাসে পরিণত করুন।
ঈদের চাঁদ উদিত হওয়ার পর ঈদের দিনের আগে যে রাত আসে, সে রাতে ধর্মভীরু মুসলমান বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, কুরআন তেলাওয়াত করে, নফল নামায পড়ে, এবং নিজের দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্যের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করে। ফলে ঈদের নতুন চাঁদের উদয় তাদের জন্য ধর্মীয় সচেতনতা সৃষ্টির বার্তাবহ হয়ে আসে।
ঈদের দিন সকালবেলা মুসলিম জনগোষ্ঠী গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন কাপড় বা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করে এবং ছোট বড় সবাই নিজেদের ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে বা মসজিদে গমন করে। যাওয়ার সময় রাস্তায় নিয়ম মোতাবেক তারা আল্লাহর যিকির করে, যার অর্থ এরকম; আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আর আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য সকল প্রশংসা।
এরপর তারা ঈদগাহে বা মসজিদে একত্র হয়ে দু’রাকাআত নামাজ আদায় করে। নামায পড়ার মাধ্যমে কার্যত তারা এ কথা স্বীকার করে যে, এক আল্লাহই সকলের মালিক ও উপাস্য। সকল মানুষ তাঁরই বান্দা এবং তাঁরই সৃষ্টি। নামাযের পর ইমাম খুতবা পেশ করেন। খুতবায় আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব বর্ণনা করা হয়। তাতে এও বলা হয় যে, সকল মানুষ একই আল্লাহর সৃষ্টি। সকলের কর্তব্য তাঁরই ইবাদত করা এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বান্দারূপে জীবন যাপন করা।
নামায শেষ হওয়ার পর লোকেরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে, একে অপরকে ঈদের মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানায়। একে অপরের আনন্দে শরিক হয়। একে ঈদ মিলন বলা হয়। ঈদ মিলন সমাজে পারস্পরিক আন্তরিকতা বিস্তারের একটি উপায়। ঈদ মিলনের উদ্দেশ্য হল, মানুষ কেবল একা একা আনন্দ-উৎসব করবে না, বরং অন্যের আনন্দ-খুশিতে শরিক হয়ে পুরো পরিবেশটাকে আনন্দময় করে তুলবে। এরপর লোকেরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে যায়; একে অপরের সাথে সালাম বিনিময় করে। অর্থাৎ একে অপরের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও করুণা বর্ষণের দোয়া করে। একে অপরের সাথে মিলে মিশে আন্তরিকতা প্রকাশ করে। এরূপ মেলামেশা এবং একে অপরের পানাহারে শরিক হওয়ার দ্বারা সমাজে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি পায়। ঈদের দিন বিশেষভাবে এসব সামাজিক মূল্যবোধের বিস্তার ঘটানো হয়।
ঈদের দিনের আনন্দকে ব্যাপকতা দানের উদ্দেশে যেসব পন্থা অবলম্বন করা হয়, তন্মধ্যে অন্যতম হল সদকায়ে ফিতর। শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য বা অর্থ গরিব ও অসহায়কে প্রদান করবে। যাতে তারাও তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারে এবং তারাও ঈদের দিন নতুন খাবারের আয়োজন করতে পারে। তারাও অন্য সকলের মত ঈদের আনন্দে শরীক হতে পারে।
এসব পন্থা এজন্য অবলম্বন করা হয়, যাতে ঈদের দিনটি সমাজের সর্বস্তরের সকলের জন্য আনন্দের দিনে পরিণত হয় এবং ঈদের দিনটি সকলের জন্য একটি নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে।
ঈদের দিন খেলা-ধূলার দিন নয়। ঈদ একটি ধর্মীয় শালীন উৎসব। ঈদকে শালীনতা, ভদ্রতা ও নৈতিকতার দাবি অনুযায়ী উদযাপন করতে হয়। ঈদের দিন আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই ঈদের দিনটি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অনুযায়ী অতিবাহিত করা উচিত। ঈদের দিন মানুষ একে অপরকে ঈদের মোবারকবাদ দিয়ে থাকে। কাজেই ঈদের দিন কেবল এমন কাজগুলোই করা চাই, যেগুলোর মধ্যে সাধারণ মানুষের সাথে ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার দিকটি থাকে। ঈদের দিনের সকল কর্মতৎপরতার একটি দিক হতে হবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও রেজামন্দির দিক। আর অপর দিকটি হতে হবে মানবতা ও উদারতার দিক।
আমাদের দেশে ঈদুল ফিতরের দিন সেমাই খাওয়ার প্রচলন আছে। লোকেরা একে অপরকে মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় আহার্য দ্বারা আপ্যায়িত করে এবং মিষ্টি দ্রব্য বিতরণ করে। তাই ঈদকে মিষ্টান্নের উৎসব বলা যায়। মিশরের ঈদুল ফিতরকে ঈদুল কিসওয়া অর্থাৎ, পোশাকের ঈদ বলা হয়। মিশরের ফাতেমী খলিফাদের আমলে ঈদুল ফিতরের দিন গরিব মানুষদের মধ্যে কাপড় বিতরণের রেওয়াজ চালু হয়। এ কারণে তখন থেকে ঈদুল ফিতরকে ঈদুল কিসওয়া ( পোশাকের ঈদ) বলা হয়ে থাকে।
সকল মুসলিম দেশেই ঈদুল ফিতর বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উদযাপিত হয়। জিরার দি তেরওয়াল নামক এক ফরাসি পর্যটক ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় তুরস্কে এসেছিলেন। তখন ছিল সুলতান আবদুল মজীদের শাসনকাল। তিনি ঈদের দিন ইস্তাম্বুলে ছিলেন। তাই তিনি নিজের দেখা ইস্তাম্বুলের ঈদ উদযাপনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লেখেন, আমি দেখলাম, ইস্তাম্বুলের প্রতিটি ঘরে নানা রকম উপাদেয় খাদ্য ও মিষ্টিদ্রব্যের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। যে কোনো ব্যক্তি যে কোন ঘরে প্রবেশ করে আয়োজিত খাবারে শরীক হতে পারে। আমির-গরীব সকলের অবস্থা ছিল এ ক্ষেত্রে সমান। বাহ্যিক বেশভূষার প্রতি লক্ষ্য না করে প্রত্যেকে তার ঘরে আগত ব্যক্তিকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আদর আপ্যায়ন করছিল।
ঈদুল ফিতরের উৎসব এভাবে উদযাপন করা উচিত, যাতে তা অপরের কষ্টের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। আর এদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত, যাতে অন্যদেরও আনন্দ উৎসবের সুযোগ হয়। এর মাধ্যমে পারস্পরিক আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। সত্যিকার ঈদ সেটিই, যা সকল মানুষের জন্য আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। [নাশরী তাকরীরে, মাওলানা ওয়াহীদুদ্দীন কৃত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight