ইসলাম ও নারীর কর্মসংস্থান : নাজমা সুলতানা

নারী ও পুরুষ অখণ্ড মানব সমাজের দু’টি অপরিহার্য অঙ্গ। এই দু’টি অঙ্গই একে অপরের পরিপূরক। এর কোনটিকে বাদ দিয়ে সমাজ গঠিত হয়না। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, নারী-পুরুষের সুষম উন্নয়ন তথা সমাজ প্রগতিতে নারীর ভূমিকা কোথায় এবং কতটুকু?
নারী অর্ধেক মানবতা। পুরুষ মানবতার মাত্র একাংশের প্রতিনিধি, অপর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। তাই নারী সমাজকে বাদ দিয়ে মানবজাতির জন্যে যে পরিকল্পনাই রচিত হবে, তা অনিবার্যভাবে হবে অসম্পূর্ণ ও ত্র“টিপূর্ণ।
ইসলাম মানব জাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তাই ইসলাম নারী সম্পর্কে কি ধারণা দিয়েছে, তা জানার জন্যে মানুষ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিকোণ সর্বপ্রথম বিবেচ্য। উত্তরে সংক্ষেপে বলা যায়- ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ অতীব সম্মানিত ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম অবয়বে।” [সূরা আত-তীন : ৪]
নারী হোক বা পুরুষ হোক, তার এই আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান ও মর্যাদাকে তার নিজের বাস্তব চরিত্র ও কাজ-কর্মের সাহায্যেই রক্ষা করতে হবে। ইসলামপূর্ব দুনিয়ার নারী জীবনে শুধু বেঁচে থাকার অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-“কখনো আমি তোমাদের কোন একজনেরও কাজকে বিনষ্ট হতে দেব না, তা সে নারীই হোক, আর পুরুষই হোক। তোমরাতো উদ্ভূত হয়েছো একে অপর হতে।” [সূরা আলে ইমরান : ১৯৫]
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেছেন- “যে ব্যক্তি নেক কাজ করবে, সে পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যদি সে ঈমানদার হয়, তবে আমি তাকে এক শান্তিময় জীবন দান করবো এবং তাদের ভাল কাজের বিনিময়ে তাদেরকে পুরস্কার প্রদান করবো।” [সূরা নাহল;৯৭]
নবী করীম সা. এই উপেক্ষিত, বঞ্চিত নারী সমাজের অবস্থার উন্নয়ন ও সঠিক মর্যাদায় তাদের প্রতিষ্ঠিত করা প্রসঙ্গে যে উন্নত মানের শিক্ষা পেশ করেছেন, নারী মুক্তির কোনো উচ্চকণ্ঠ সমর্থকই আজ পর্যন্ত সেই মানের শিক্ষা পেশ করতে পারে নি।
হযরত উকবা বিন আমির রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, ‘‘যে লোকের তিনটি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে (তাদের বোঝা স্বরূপ মনে না করে) এবং তাদের সাধ্যানুসারে ভাল খাওয়ায়, পরায়, তাদের সাথে দয়ার্দ্র ব্যবহার করে, তার জন্য বেহেশ্ত অবধারিত।” [বুখারী]
বস্তুত এরা হচ্ছে নারীর প্রতি অতি উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা।
ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার উৎকট মানসিকতা ব্যাপকভাবে বিরাজমান ছিল, ঠিক সেই সময় নবী সা. এর মাধ্যমে ইসলাম তাদের প্রতিপালনের বিরাট পূণ্যের কথা ঘোষণা করলো। শুধু তাই নয়, যুগপৎভাবে স্বামী ও পিতার সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার সত্ত্বের কথাও ইসলামই ঘোষণা করেছে। সেবিকা হতে তারা উন্নিত হলেন সহধর্মীনীতে। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “তারা তোমাদের পরিচ্ছদ স্বরূপ, আর তোমরা তাদের পরিচ্ছদ স্বরূপ।” [আল বাকারা :১৮৭]
“তাদের সাথে সদাচারণ ও সৎভাবে বসবাস করো।” [নিসা : ১৯]
নারী জাতির মানোন্নয়ন ও মর্যাদা বিধানের যে সুদূর প্রসারী কর্মসূচী ইসলামের দ্বারা বাস্তবায়িত হয়, তার প্রথম পর্যায় বলা যেতে পারে এই কন্যা সন্তান প্রতিপালনের উৎসাহ প্রদানকে। ইদানিং পণ প্রথা তথা যৌতুক প্রথার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব মুসলমান সমাজেও ঘটার কারণে কন্যা সন্তান জাহিলিয়াতের যুগের মতই অবাঞ্চিত ও অবহেলিত বিবেচিত হচ্ছে। ফলে নবী করীম সা. এর বর্ণিত কন্যা সন্তান প্রতিপালনের বিরাট পূণ্যও আজ আর আকর্ষণীয় বোধ হচ্ছে না। এই অবাঞ্চিত অবস্থার অবসান হওয়া উচিত।
কর্মে নারীর ভূমিকা কি এবং কতটুকু?
নারী সমাজের কর্মতৎপরতা কেবলমাত্র বিদ্যা শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্র পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে- ইসলাম এমন কথা বলেনি; বরং বাস্তব কাজে যথার্থ ভূমিকা পালনের জন্যে ইসলাম এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র তাদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী যেমন জ্ঞান বিজ্ঞানে শিক্ষা লাভে অগ্রসর হতে পারে, তেমনি কৃষি ও ব্যবসায়ের কাজে পরোক্ষ অংশ গ্রহণ করারও সম্পূর্ণ অধিকারী। জীবিকার জন্যে বিভিন্ন কাজ কারবার, শিল্প-কারখানা স্থাপন, পরিচালনা বা তাতে কাজ করারও অধিকার রয়েছে নারীদের। সেই সঙ্গে সমাজ ও জাতির কল্যাণমূলক বহুবিধ সামষ্টিক কাজ আঞ্জাম দেয়াও তাদের জন্যে কিছুমাত্র নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নারীদের এসব কাজে নেমে যেতে হবে এবং এসব করা তাদের জন্য একান্ত জরুরি। বস্তুত অনুমতি এক কথা, আর বাস্তবে তা চর্চা করা একান্তই জরুরি হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। নারীরা এসব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়–ক ইসলামে তা কাম্য নয়। নারীদের মধ্যে এ ধরণের কাজে অংশ গ্রহণের আগ্রহ-উৎসাহ থাকতে পারে বা অসহায়তার কারণে প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কাউকে নিরুৎসাহিত করাও রীতি নয়। তবে তাদের আলাদা কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করতে হবে- এটাই ইসলামের দাবি।
নারী-পুরুষের স্বাধীন ও অবাধ মেলামেশার ফলে সমাজে নৈতিক অধঃপতনের যে মারাত্মক রোগ দেখা দেয়, তা থেকে সমাজকে হেফাযত করার জন্যই ইসলাম পর্দা প্রথাকে ফরয করা হয়েছে। যাদের সাথে শরিয়ত মুতাবিক বিবাহ নিষিদ্ধ, শুধুমাত্র তাদেরকে বাদে অন্য সকলের জন্য পর্দা প্রথা মেনে চলা একান্ত আবশ্যক। বেপর্দা নারীরা পর্দাকে অবরোধ মনে করে, অথচ ইসলাম নারীকে শৃঙ্খলিত করেনি, পর্দার মাধ্যমে তার হেফাযতের ব্যবস্থা করেছে তাকে বলেছে সংযত হতে, নিজেকে খোলা-খুলিভাবে প্রকাশ না করতে।নারীরও জীবন লক্ষ্য সুস্পষ্ট-সুনির্ধারিত
নারী-পুরুষ উভয়েই জীবন উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হওয়ার স্রষ্টা। যিনি পুরুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই নারী সৃষ্টি করেছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “হে মানব জাতি! তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক আদম থেকে এবং সেই আদম থেকে তাঁর জীবন সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের উভয়ের মাধ্যমে অগণিত নর-নারীকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা সেই আল্লাহকেই ভয় কর- যার নাম স্মরণ করিয়ে দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাজে নিজের অধিকার দাবি করে থাকো। আর আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্কের ফাটল ধরানো থেকেও সদা সতর্ক থাকো। আল্লাহ কিন্তু তোমাদের কার্যকলাপের উপর অত্যন্ত কড়া দৃষ্টি রাখেন।”[সূরা নিসা :১]
রাসূলুল্লাহ সা. এর যুগে একজন মহিলা সাহাবী তালাকপ্রাপ্তা হয়ে ইদ্দত পালনকালে ঘরের বাইরে গিয়ে নিজের বাগানের খেজুর সংগ্রহ করে বিক্রি করার অনুমতি চাইলে রাসূলে করীম সা. জবাবে বললেন- “অবশ্যই তুমি যেতে পারো এবং তোমার বাগানের খেজুর সংগ্রহ করে বিক্রি করতে পারো। সম্ভব হলে বিক্রির অর্থ থেকে তুমি সদকা ও  সৎকাজ করতে পারবে।”
এখানে রাসূল সা. উক্ত মহিলাকে মানবতার কল্যাণকর কাজ করার জন্য উৎসাহ দিলেন। এর তাৎপর্য হলো, ইসলামী শরিয়তে নারী সমাজকেও মানবতার খিদমত ও কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত দেখতে চায়। কিন্তু তাতে যেন কখনোই সীমালংঘিত না হয়, সেদিকেই ইসলামের সতর্কতা।
আবু বকর রা. -এর কন্যা আসমা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-যুবাইর রা. যখন আমাকে বিবাহ করেন, তখন তার না ছিল সম্পত্তি, না ছিল চাকর-বাকর। একটা উট আর একটা ঘোড়াই ছিল তার সম্বল। ঘোড়াটাকে আমি ঘাস পানি খাওয়ানোর জন্যে বাইরে নিয়ে যেতাম। আর সেলাই ও গম ভাঙ্গার কাজও করতাম। আমি রুটি তৈরি করতে জানতাম না, আমার কয়েকজন ভাল আনসার প্রতিবেশী মহিলা আমাকে রুটি বানিয়ে দিতেন।
কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ সা. যুবাইরকে একখণ্ড জমি দেন। তা থেকে আমি শুকনো খেজুরের বীচি সংগ্রহ করে মাথায় বহন করে আনতাম। [বুখারী]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- “পুরুষ হোক বা নারী, যেই নেক কাজ করবে, (শর্ত হলো) যদি সে মুমিন হয়, তাহলে তারা অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও অবিচার করা হবে না।” [সূরা নিসা :১২৪]
আল-কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে-“তোমরা কোনোক্রমেই সেসব জিনিসের প্রতি লোভ কর না- যা আল্লাহ তাআলা তোমাদের কাউকে অপরের তুলনায় অধিক দরাজ হস্তে দান করেছেন। পুরুষ যা কিছু অর্জন করে, তা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট, আর নারীরা যা অর্জন করে, তা নারীদেরই জন্য। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য তার কাছেই প্রার্থনা জানাতে হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবহিত।” [সূরা নিসা : ৩২]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বেগম নিজে ঘরে বসে শিল্পকর্ম করতেন এবং তা বিক্রি করে ঘর সংসারের খরচাদি চালাতেন। একদিন তিনি নবী করীম সা. এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন- “আমি একজন কারিগর মেয়েলোক। আমি তৈরি করা দ্রব্য বিক্রি করি। এছাড়া আমার ও আমার স্বামীর এবং আমার সন্তানদের জীবিকার অন্য কোনো উপায় নেই। রাসূলে করীম সা. বললেন- “এভাবে উপার্জন করে তুমি তোমার ঘর-সংসারের প্রয়োজন পূরণ করছো, এতে তুমি বিরাট সওয়াবের অধিকারী হবে।” নবী করীম সা. এর বিভিন্ন ব্যাপারে মহিলাদের বিবেক-বুদ্ধি প্রসূত পরামর্শ গ্রহণ করে ইসলামী সমাজ বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে। ইসলামী সমাজ গঠনেও তাঁদের যোগ্যতা-প্রতিভাকে বাস্তব কাজে লাগানো হয়েছে। নারীদের উপর প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণের দায়িত্ব না থাকলেও তাঁরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েও স্বতঃস্ফুর্তভাবে যেসব বড় বড় খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, তা এই পর্যায়ে বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রয়োজনের সময় ইসলামী রাষ্ট্র সরকারও তাঁদের থেকে এ ধরণের কাজ নেবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতিহাসে সে সব কাজের উল্লেখ আছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রাসূলে করীম সা. এর মহিলা নীতির ব্যাখ্যা দান প্রসঙ্গে বলেছেন- “রাসূলে করীম সা. মহিলাদের যুদ্ধ-জিহাদে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তাঁরা সেখানে আহত ও রোগাক্রান্ত লোকদের চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্র“ষার কাজ আঞ্জাম দিতেন।”
শিশু সন্তানের লালন-পালনের ব্যাপারে নারীদের যোগ্যতা পুরুষদের তুলনায় বেশি এবং এ কারণে পুরুষদের ওপর নারীদের অগ্রাধিকার বেশি দেওয়া হয়েছে।
সমাজের যে সব ক্ষেত্রে তাদের সেবামূলক কর্মদক্ষতা অধিক অবদান রাখতে সক্ষম এবং যেসব ক্ষেত্রে এই নারীসুলভ সেবা-শুশ্র“ষামূলক কার্যাবলি অপরিহার্য বিবেচিত হবে, সেই সব ক্ষেত্রে তাঁদেরকেই অগ্রসর করা হবে, এটাইতো স্বাভাবিক। উপরোক্ত কুরআন ও হাদীসের আলোকে বুঝা  যায় যে, ইসলামী শরীয়ত নারী সমাজকে মানবতার খিদমত ও কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। উপার্জনের জন্য কাজ করা ও সেজন্য ঘরের বাইরে যাওয়া নারীদের জন্য নিষিদ্ধ নয়। তবে তাতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশায় ও বন্ধুত্ব সখ্যতা করার সুযোগ থাকা চলবে না। অর্থাৎ ইসলামী শরিয়তের সীমা লংঘন করা যাাবে না।
তাই আসুন বোনেরা! আমরা সকলে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি হাসিলের উদ্দেশ্যে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করি এবং অন্যায় অসত্যের অন্ধকার দূর করে এক শ্বাসত সুন্দর শান্তিময় সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হই। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight