ইসলামে কর্মজীবী ও শ্রমিকদের অধিকার : উমর মুহাম্মদ মাসরুর

ইসলাম গৃহকর্মী ও শ্রমিকদের মর্যাদা প্রদান করেছেন, তাদের অবস্থান বিবেচনা করেছে, তাদের সম্মানিত করেছে এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। পূর্ববর্তী কোনো কোনো সমাজব্যবস্থায় কাজ ও শ্রমের অর্থ ছিলো দাসত্ব ও গোলামি। কোনো কোনো সমাজব্যবস্থায় কাজের অর্থ ছিলো হীনতা ও অপদস্থতা। কিন্তু ইসলাম সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাদের সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইসলামি সভ্যতা কর্মজীবী ও শ্রমিক শ্রেণিকে যে মহৎ দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছে সে ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন। তাঁর জীবনচরিতই ছিলো শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিকদের প্রতি মানবিক সৌজন্যমূলক আচরণ করতে, তাদের প্রতি দয়া ও সদাচার করতে এবং তাদের সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপিয়ে না দিতে। তিনি ঘোষণা করেছেন : “জেনে রাখো, চাকর-বাকরেরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। এ কারণে যার ভাই তার অধীন থাকবে, সে নিজে যা খায় তাকে যেনো তাই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরিধান করে তাকে যেনো তাই পরিধান করায়। তোমরা তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি তাদের কষ্টকর কাজ করতে দাও, তবে তোমরা নিজেরাও তাদের কাজে সাহায্য করবে।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন যে, ‘ইখওয়ানুকুম খাওয়ালুকুম’, অর্থাৎ, চাকর-বাকরেরাও তোমাদের ভাই। এ কথা বলে তিনি শ্রমিক, গৃহকর্মী, চাপরাশি সকলকে আপন ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছেন। পূর্ববর্তী কোনো সভ্যতা এ ধরনের মহানুভবতা প্রত্যক্ষ করেনি।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিকের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন যে তিনি শ্রমিক ও কাজের লোকদেরকে তাদের ঘাম শোকাবার আগেই যথার্থ পারিশ্রমিক প্রদান করবেন। তাদের প্রতি কোনো জুলুম করবেন না, কোনো ধরনের টালবাহানার আশ্রয় নেবেন না। তিনি ঘোষণা করেছেন : “তোমরা শ্রমিকদের শরীরের ঘাম শোকাবার আগেই তাদের পারিশ্রমিক প্রদান করো।”
ইসলাম শ্রমিকদের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে কুদসিতে বলেছেন : “আল্লাহ তাআলা বলেন, কিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ধরনের লোকের প্রতিপক্ষ হবো, এবং যে লোক কোনো শ্রমিককে কাজে খাটিয়েছে এবং তার থেকে পূর্ণ শ্রম ও কাজ নিয়েছে; কিন্তু তাকে যথার্থ পারিশ্রমিক প্রদান করেনি।” যে লোক চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের প্রতি জুলুম করে তারা জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কিয়ামতের দিন তিনি তার প্রতিপক্ষ হবেন।
মালিকের উচিত নয় শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া, যা তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এবং কাজের ক্ষেত্রে তাকে অসমর্থ বানিয়ে দিতে পারে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “তুমি তোমার গৃহপরিচারক থেকে যতটুকু কাজের ভার লাঘব করে দেবে তা কিয়ামতের দিন তোমার আমলের পাল্লায় প্রতিদান হিসেবে যুক্ত হবে।”
যে সকল অধিকারকে ইসলামি শরীয়ায় উজ্জ্বল নিদর্শন মনে করা হয় তার অন্যতম হলো খেদমতগার ও চাপরাশিদের ন¤্রতা প্রাপ্তির অধিকার। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাহকে উদ্বুদ্ধ করে বলেছেন : “যার সঙ্গে তার গৃহকর্মী আহার গ্রহণ করে, যে-লোক গাধার পিঠে চড়ে বাজারে যায় এবং যে লোক ছাগী ধরে নিয়ে এসে দুধ দোহন করে তারা অহঙ্কারী হতে পারে না।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন ছিলো তাঁর কথার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি যা বলতেন তা করতেন। সাইয়িদা আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তম চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন এবং বলেছেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে নিজ হাতে কখনো কোনো প্রাণিকে মারেননি, কোনো স্ত্রীলোকের গায়ে হাত তোলেননি এবং কোনো চাকরকেও প্রহার করেননি।”
আবু মাসঊদ আনসারি রা. তাঁর এক গোলামকে প্রহার করছিলেন। এই কা- দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যা বলেছিলেন তা এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন : “হে আবু মাসঊদ, জেনে রাখো, তুমি তার ওপর যতটুকু ক্ষমতাবান, আল্লাহ তোমার ওপর তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান।” আবু মাসঊদ রা. বলেন, এ কথা শুনে তাকিয়ে দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি তাকে আজাদ করে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : “তুমি যদি তা না করতে তবে জাহান্নামের আগুন তোমাকে গ্রাস করতো।”
প্রহার করা বা চড় দেওয়া বা কিল-ঘুষি দেওয়া বা লাথি মারা এসব দুর্ব্যবহার কাজের লোকদের জন্য চরম অপমানজনক। এ কারণে কঠিন-হৃদয় মনিব ও মালিকের উত্তম শাস্তি হলো তাকে তৎক্ষণাৎ তার মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা। এটাই ইসলামের মহত্ত্ব এবং ইসলামি সভ্যতার মাহাত্ম্য।
এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাদেম ও গৃহকর্মী আনাস বিন মালিক রা. সত্য ও যথার্থ সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের মানুষ। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজের জন্য পাঠাতে চাইলেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি কিছুতেই যাবো না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে ছিলো যে আল্লাহর নবী আমাকে যে কাজের জন্য যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আমি অবশ্যই সে কাজে যাবো। আমি বেরিয়ে পড়লাম এবং কয়েকটি বালকের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম। তারা বাজারে খেলাধূলা করছিলো। হঠাৎ টের পেলাম কেউ একজন পেছন থেকে এসে আমার দুই কাঁধের ওপর হাত রেখেছেন। তাকিয়ে দেখি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । তিনি মুচকি হাসছেন। আমাকে ¯েœহময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন : ‘হে প্রিয় আনাস! আমি তোমাকে যে কাজে যেতে বলেছি সেখানে গিয়েছিলে?’ আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি এখনই যাচ্ছি, হে আল্লাহর রাসূল!” আনাস রা. বলেছেন : “আল্লাহর কসম, আমি ৭ বছর (অথবা বলেছেন, ৯ বছর) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করেছি। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কখনো তিনি আমার কোনো কাজের ফলে বলেননি ওই কাজটি তুমি কেনো করলে এবং আমার কোনো কাজ না করার কারণে বলেননি যে ওই কাজটি তুমি কেনো করলে না।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহকর্মী ও পরিচারকদের ভালোমন্দ এতটা খেয়াল করতেন যে তারা নিজেদের বিয়ের চেয়েও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য ও খেদমতে প্রাধান্য দিতো। রবিয়া বিন কা‘ব আল-আসলামি রা. থেকে এ-ব্যাপারে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, ‘হে রবিয়া, তুমি বিয়ে করবে না?’ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আমি বিয়ে করতে চাই না। স্ত্রীকে ভরণপোষণের সামর্থ্যও আমার নেই। তা ছাড়া আমি চাই না কোনোকিছু আমাকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে দিক। তিনি আমাকে আর কিছু বললেন না। আমি তাঁর খেদমত করে যেতে থাকলাম। পরে আবারো একদিন তিনি আমাকে বললেন, ‘হে রবিয়া! তুমি বিয়ে করবে না?’ আমি বললাম, আমি বিয়ে করতে চাই না। স্ত্রীকে লালন-পালনের সামর্থ্যও আমার নেই। তা ছাড়া আমি চাই না কোনোকিছু আমাকে আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিক। তিনি আমাকে আর কিছু বললেন না। এবার আমি মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করলাম এবং বললাম, হে আল্লাহ রাসূল! দুনিয়া ও আখেরাতে যা কিছু আমার জন্য কল্যাণকর সে ব্যাপারে আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। মনে মনে বললাম, যদি তিনি তৃতীয়বার আমাকে বিয়ে করতে বলেন, আমি অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ বলবো। তখন তৃতীয়বারের মতো তিনি আমাকে বললেন, হে রবিয়া! তুমি কি বিয়ে করবে না? আমি বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে যা চান বা যা পছন্দ করেন তার আদেশ দিন। তিনি বললেন, ‘তুমি অমুক গোত্রে চলে যাও।’ অর্থাৎ, তিনি আনসারদের একটি গোত্রে চলে যেতে বললেন।”
শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের প্রতি সদাচারের ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার মহত্ত্ব ও উদারতা সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল মুসলিম গৃহকর্মীদের প্রতিই নয়, বরং অমুসলিম গৃহকর্মীদের প্রতিও ছিলেন একইরকম ¯েœহপরায়ণ ও মমতাবান। যে ইহুদি বালকটি তাঁর খেদমত করতো তার সঙ্গে তিনি যে মমতাময় ও ¯েœহপূর্ণ আচরণ করেছেন তা আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বালকটি একবার প্রচ- অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন, তার শুশ্রƒষা করতেন। ধীরে ধীরে সে মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলো এবং মৃত্যুর উপক্রম করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন এবং তার শিয়রে বসলেন। তারপর তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। ছেলেটি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার বাবার দিকে তাকালো। তার বাবা বললো, আবুল কাসেম যা বলছেন তা শোনো। বাবার সম্মতিতে ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করলো। কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যু হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন।”
সত্যদ্বীন ইসলাম শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের এসব অধিকারের শেকড় প্রোথিত করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথায় ও কাজের মাধ্যমে এসব অধিকার বাস্তবায়িত করেছেন। তা ছিলো এমন এক যুগে যখন মানুষ শ্রমিক, গৃহকর্মী ও ভৃত্যদের প্রতি দুর্ব্যবহার, জুলুম ও অত্যাচার করা ছাড়া আর কিছু জানতো না। ইসলাম ও মুসলমানদের সভ্যতা কতটা মানবিক, কতটা মহৎ ও উৎকর্ষম-িত তা এ আলোচনা থেকে যথার্থ উপলব্ধি হয়।
লেখক : গ্রন্থপ্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight