ইসলামে এতিম, নিঃস্ব ও বিধবাদের অধিকার : উমর মুহাম্মদ মাসরুর

ইসলামি শরীয়ার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে তা এতিম, নিঃস্ব, মিসকিন ও বিধবাদের অধিকারসমূহ সুরক্ষিত করেছে এবং বস্তুগত ও আদর্শিক সুরক্ষাদানের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজে তাদের নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তাআলা এতিমদের প্রতি ¯েœহ ও মমতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : “সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।” একইভাবে মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত প্রাপ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন : “আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দেবে এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসকিন, নিঃস্ব ও বিধবাদের অধিকার অধিকতর সংহতকরণে তাঁর উম্মাহর সকল সদস্যকে তাদের প্রয়োজন পূরণে প্রচেষ্টা ব্যয় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং যাঁরা বিধবা ও অভাবগ্রস্তদের খোঁজ-খবর রাখে ও দেখাশোনা করে তাঁদের উচ্চতর মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : “বিধবা ও নিঃস্বদের জন্য উপার্জনকারী আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো, অথবা (তিনি বলেছেন,) রাত জেগে ইবাদতকারী ও দিবসে রোযা পালনকারীর মতো।” সুতরাং এর চেয়ে বড় প্রতিদান, এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের প্রতি অনুগ্রহ করা, মমতা দেখানো ও ¯েœহপরায়ণ হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এর জন্য মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে এতিমদের অধিকারের শেকড় প্রোথিত করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন : “আমি ও এতিমের লালনপালনকারী জান্নাতে এরূপ থাকবো।” এ কথা বলে তিনি তর্জনি ও মধ্যমা আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। দুটি আঙ্গুলের মাঝে সামান্য ব্যবধান ছিলো।
এতিমদের প্রতি সর্বোচ্চ পর্যায়ের দয়া, মমতা ও ¯েœহ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাহর সদস্যদের এতিমদেরকে তাদের সন্তানদের সঙ্গে যুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন : “যে কেউ কোনো মুসলিম এতিমকে তার পানাহারের সঙ্গে যুক্ত করবে, যাতে তার সব প্রয়োজন পূরণ হয়, তাহলে তার জন্য চিরকালের মতো জান্নাত আবশ্যক হয়ে যাবে।”
আপনি দেখতে পাচ্ছেন, ইসলামি ব্যবস্থা এতিম, মিসকিন ও বিধবাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে না যে তাদের কেবল বস্তুগত চাহিদাগুলো পূরণ করা প্রয়োজন; বরং তাদের এভাবে মূল্যায়ন করে যে, তারা মানবম-লীর সদস্য কিন্তু ভালোবাসা ও মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুসারীদেরকে মিসকিন ও এতিমদের প্রতি কোমলহৃদয় ও মমতাময় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের কষ্ট ও দুঃখভার লাঘব করার আদেশ দিয়েছেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে তার হৃদয়ের কঠিন ও নিষ্ঠুরতার অভিযোগ করেছিলো। তখন তিনি তাকে বলেছিলেন : “তুমি কি চাও তোমার অন্তর কোমল হোক এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হোক? তাহলে এতিমের প্রতি ¯েœহশীল হও, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও এবং তোমার খাবার থেকে তাকে খাওয়াও। তাহলে তোমার অন্তর কোমল হবে এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হবে।”
অন্যদিকে ইসলামি শরীয়ত এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ ও তাদের প্রতি জুলুম করার ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : সাতটি ধ্বংসাত্মক ব্যাপার থেকে দূরে থাকো। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন সেগুলো কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ১. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা; ২. জাদু করা; ৩. আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করা; ৪. সুদ খাওয়া; ৫. এতিমের মাল আত্মসাৎ করা; ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা; ৭. ঈমানদার সতীসাধ্বী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।”
শুধু তাই নয়, ইসলাম মিসকিন ও এতিমদের জন্য সম্পদ ব্যয় করতে উৎসাহিত করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “এই সম্পদ হলো চিত্তমোহিনী ও সুস্বাদু । সুতরাং সে-ই ভাগ্যবান মুসলিম যে এই সম্পদ থেকে মিসকিন, এতিম ও মুসাফিরকে দান করে।”
নৈতিক দিক থেকে ইসলাম এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছে। দেখা যাচ্ছে যে, যে ওলিমার ভোজে কেবল ধনীরা উপস্থিত হয়, গরিব ও এতিম-মিসকিনদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয় না তার নিন্দা করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । তিনি বলেছেন : “যে ওলিমার ভোজে ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং গরিবদের দাওয়াত দেওয়া হয় না তা কত নিকৃষ্ট ভোজ! আর কেউ যদি দাওয়াত গ্রহণ না করে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করলো।”
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে এতিম, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের ভরণপোষণের দায়িত্বভার নিজ কাঁধের ওপর তুলে নিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন : “মহান মহীয়ান আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমি অন্যসব লোক অপেক্ষা মুমিনদের অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি ঋণ অথবা নিঃসম্বল পরিজন রেখে গেলে তোমরা আমাকে ডাকবে, আমি তার অভিভাবক। আর তোমাদের মধ্যে যে লোক সম্পদ রেখে মারা যাবে তার সম্পদের অধিকারী হবে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সে যে-ই হোক।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলতেন তা দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করতেন। আবদুল্লাহ বিন আবু আওফা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা ও মিসকিনদের সঙ্গে হাঁটতে তুচ্ছতা বোধ / ঘৃণা বোধ করতেন না এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিতেন।”
এইভাবে ইসলাম এতিম, বিধবা ও মিসকিনদের যাবতীয় নৈতিক ও বস্তুগত অধিকারের সুরক্ষা প্রদান করেছে। ইসলামি মানবসভ্যতায় তাদের অবস্থায় সংহত করেছে।
লেখক : বহুগ্রন্থ প্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight