ইসলামে ইবাদত-বন্দেগীর স্বরূপ : ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

ইবাদত সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি : ইসলামের শিা অনুযায়ী মহান আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন সমগ্র বিশ্ব জগতের মহান শ্রষ্টা এবং প্রভু। তিনিই সমস্ত বিশ্ব জাহানের নিয়ন্ত্রতা ও সার্বভৌম মতার মালিক। তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং তাঁর জাতের সমক কোনো সত্ত্বাও নেই। একটি সুনির্দিষ্ট ল্য এবং উদ্দেশ্য তিনি নিয়ে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। আর এ বিশ্বজগতের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জ্বিন ও মানব সম্প্রদায়। এ দু‘টি সম্প্রদায়ের সৃষ্টি উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন : “আমি জ্বিন এবং মানুষকে একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি”। [সূরা আয যারিয়াত : আয়াত ৫৬]
এ উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁরা জাতিকে আল্লাহর ইবাদত করার কথা শিা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি প্রত্যেকজাতির নিকট একজন পয়গাম্বর পাঠিয়েছি। তাঁরা মানুষের নিকট এ পয়গাম পৌঁছিয়েছে যে, হে মানুষেরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাগুতকে (আল্লাহ বিরোধী শক্তি) পরিহার করো”। [সূরা আন নাহল : আয়াত ৩৬]
যুগে যুগে আগত নবী-রাসুলগণও তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য স্মরণ রেখে স্বজাতির প্রতি এ আহবান করেছেন : “হে আমার জাতি আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ৫৯]
সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ব শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও সে বার্তার কথা স্মরণ করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “হে নবী! আপনার আগে আমি যেসব নবী-রাসুলগণকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি তাদের প্রতি আমি এ ওহী-ই নাযিল করেছিলাম যে, “আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদাত করো।” [সূরা আম্বিয়া : আয়াত ২৫]
উল্লেখিত বর্ণনা হতে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর ইবাদত করাই মানব জাতির কর্তব্য। কেননা হেদায়ত ও মুক্তির পথ দেখানোর জন্য আল্লাহর প্রেরিত যে সব নবী-রাসূলগণ দুনিয়াতে এসেছিলেন তাঁদের প্রত্যেকেই মানুষকে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আহবান করেছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এর ব্যতিক্রম করেননি বরং তিনি এ আহবানের পূর্ণতা দিয়েছেন। যেহেতু আল্লাহর দাসত্ব করাই মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য, তাই এ উদ্দেশ্য পূরণ করাই আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করার উপায়। একজন মানুষ মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছার অর্থই হলো, তিনি তার কাজকর্ম দ্বারা ইবাদাতের উচ্চ স্তরে পৌঁছেছেন। তাই কুরআনুল কারীমে দেখতে পাওয়া যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা যখন তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ স্নেহ-মমতা ও মর্যাদার সাথে স্মরণ করতে চান, তখন তিনি ‘আবদুন’ (ইবাদতকারী) শব্দের দ্বারা বিশেষায়িত করে তাদের স্মরণ করে থাকেন।
যেমন আল্লাহর বাণী, “তিনি কত মহান! যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে করে তিনি (বান্দা) বিশ্বজগতের জন্য সর্তককারী হতে পারে।” [সূরা ফুরকান : আয়াত ০১] এখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা স্নেহ ও মর্যাদার সাথে ‘আব্দ’ তথা বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এতেই বুঝা যায় যে, উবুদিয়াত তথা দাসত্বের গুণ অর্জনের মাধ্যমে মানুষ সম্মানিত হয়।
মানুষ আল্লাহর প্রয়োজনে নয়, বরং নিজের প্রয়োজনে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। কারণ মহামহিম আল্লাহ কারো ইবাদতের মুখাপেী নয়। ইবাদত করলে আল্লাহর প্রভুত্ব অুণœ থাকবে অন্যথায় থাকবে না তা নয়। বরং জন্মগত স্বভাবে আল্লাহর সকল সৃষ্টি তাঁর ইবাদতে মশগুল থাকে। আল্লাহর বাণী, “তারা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আনুগত্যের বিধান অন্বেষণ করে? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবাই ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক তাঁরই (আল্লাহর) নির্দেশের অধীনে অনুগত হয়ে আছে। [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ৮৩]
অন্যত্রে এরশাদ হচ্ছে, “এমন কোনো বস্তু নেই, যা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছে না। কিন্তু তোমরা সেই প্রশংসা বুঝতে পারো না।” [সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ৪৪]
আরো এরশাদ হচ্ছে, “আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। যে সব (ফেরেস্তা) তাঁর দরবারে আছে তারা কখনো ইবাদত হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। আর তাতে তারা অবহেলাও প্রদর্শন করে না।” [সূরা আল আম্বিয়া : আয়াত ১৯-২০]
উল্লেখিত বিবরণ হতে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় তা হচ্ছে, মানুষ আল্লাহর বান্দা হিসেবে তাঁর ইবাদত থেকে বিরত থাকা কিংবা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিরলসভাবে সাধনা চালিয়ে যাওয়াই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ইবাদত সহীহ বা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য ইখলাস তথা নিষ্ঠা অপরিহার্য শর্ত। ইখলাস ব্যতীত কোনো আমল সহীহ-শুদ্ধ হয় না। এটা ইবাদাতের সৌন্দর্য্যও বটে। এর প্রভাবে ইবাদতের মধ্যে প্রদর্শনেচ্ছা ও পার্থিব কোনো প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে না। এটা এমন একটি স্তর বা পর্যায়, যেখানে পৌঁছে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত থাকার চেতনা জাগ্রত হয় এবং মন ও চিন্তা-চেতনা অন্যসব দিক থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ধ্যানমগ্ন হয়। আর মহান আল্লাহ তায়ালাকে নিজের সামনে উপস্থিত জেনে তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদার কথা স্মরণ করে তাঁর ভয় এবং প্রেম অন্তরে জাগ্রত রেখে বিনয় ও ন¤্রতা সহকারে প্রশান্ত মনে তাঁর ইবাদত করাই হচ্ছে ইহসান। হাদীস শরীফে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহসান সম্পর্কে বলেন, “এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তাঁকে তুমি দেখতে পাচ্ছো। আর যদি তা মনে করতে না পার, তাহলে মনে কর তিনি তোমাকে দেখছেন।” [সহীহ বুখারী]
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর ইবাদত হচ্ছে উত্তম আদর্শ :
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসূল। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবুয়াতের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর প্রচারিত দ্বীনের অনুসরণ করা দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য আবশ্যক। তাই মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদতই হচ্ছে ইবাদতের উত্তম আদর্শ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ইবাদতের নির্দেশ দিয়ে এরশাদ হচ্ছে, “হে নবী! আপনার রবের ইবাদত করুন, যতণ না নিশ্চিত ব্যাপারটির (মৃত্যুর) সময় এসে যায়।” [সূরা আল হিজর : আয়াত ৯৯]
অপর স্থানে এরশাদ হচ্ছে, “হে নবী! যখনি আপনার অবসর হয় তখনই ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে যান এবং আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হোন।” [সূরা আলাম নাশরাহ : আয়াত ৭-৮]
ঈমান আনার পরে একজন মুমিন ব্যাক্তির উপর যে সব দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তায় বিশেষ করে নামাজ রোজা হজ্ব যাকাতসহ যাবতীয় ইবাদাত বন্দেগীর দায়িত্ব আরোপিত হয়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর েেত্রও তা সমভাবে প্রযোজ্য। তিনি অতীব উত্তমভাবে সে দায়িত্ব পালন করতেন। উম্মতের হাদী তথা পথ প্রর্দশক হিসেবেও তিনি সঠিকভাবে এসব দায়িত্ব পালনে যতœশীল ছিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ছাড়াও তিনি দিনে অন্তত আরো উনত্রিশ রাকাত নামায আদায় করতেন। এর মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আগে পরের সুন্নাত, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, চাশতের নামায, সালাতুল আওয়াবীন ইত্যাদি বিষেশভাবে উল্লেখ্য। আল্লাহর বাণী, “আর রাতের কিছু অংশে আপনি তাহাজ্জুদ পড়তে থাকুন। এটা আপনার জন্য আল্লাহর অতিরিক্ত দায়িত্ব, আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” [সূরা বনী ইসরাইল : আয়াত ৭৯]
শুধু তা নয়, এগুলো ছাড়াও তাঁর প্রতি এমন সব গুরু ইবাদতের দায়িত্বও আরোপিত ছিল যা সর্ব সাধারণের চিন্তা ও ধারণারও বাইরে। এ দিকে ল্য রেখে তিনি উম্মুল মু‘মেনিন হযরত আয়েশা রা. কে বলেছিলেন, হে আয়েশা আমার চু শুধু ঘুমায়, আমার হৃদয় ঘুমায় না। [সহীহ বুখারী]
আল্লাহর প্রিয় ও অনুগত বান্দা হওয়ার জন্য ইবাদত-বন্দেগীতে তাঁর যে নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা ফুটে উঠে, তাতে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ধ্যানে মশগুল এক ব্যতিব্যস্ত খোদাপ্রেমিক বান্দার প্রকৃত চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতদীর্ঘ সময় যাবত দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফুলে উঠত, লোকে জিজ্ঞেস করত ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি এত কষ্ট করে ইবাদত বন্দেগী করেন কেন? অথচ আল্লাহ তায়ালা আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ মা করে দিয়েছেন। উত্তরে তিনি বলতেন, আমি কী আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? অপর হাদীসে হযরত আবু যর গিফারী রা. বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আয়াত পড়তে পড়তে রাত কাটিয়ে দেন। আয়াতটি হল, “ যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তাহলে তারা তো আপনার বান্দা, আর যদি ক্ষমা করে দেন তাহলে আপনি পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানময়। [সূরা আল মায়েদা : আয়াত ১১৭]
একবার তিনি হযরত আলী রা. কে সাথে নিয়ে কোন পাহাড়ের আড়ালে নামায পড়ছিলেন, এমন সময় আবু তালিব এসে সে দৃশ্য দেখতে পেলেন এবং জিজ্ঞেস করেন তোমরা এ কি করছ? নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সব খুলে বল্লেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। [সীরাতুন্নবী, শিবলী নোমানী]
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি একদা ল্য করলাম নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ রাতে জাগ্রত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেন আর তারকাগুলোর প্রতি তিনি ল্য করলেন, এর পর সূরা আলে ইমরানের অত্র আয়াত তিলাওয়াত শুরু করলেন, “পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে যে সমস্ত বুদ্ধিমান লোক উঠতে-বসতে ও শয়নে, সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন। হে আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যেবিহীনভাবে সৃষ্টি করোনি৷ বাজে ও নিরর্থক কাজ করা থেকে তুমি পাক-পবিত্র ও মুক্ত৷ কাজেই হে প্রভু! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের রা করো৷ [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯০-৯১]
ইবনে আব্বাস রা. আরো বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতের বেলায় তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়াতেন তখন বলতেন, “হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। তুমিই আসমান-যমীন ও এ দুয়ের মধ্যস্থিত সবকিছুর ব্যাবস্থাপক, তোমার জন্যই সকল প্রশংসা, তুমি আসমান-যমীন ও এ দুয়ের মধ্যস্থিত সকল কিছুর নূর বা আলো। সকল প্রশংসা তোমারই। একমাত্র তুমিই আসমান, যমীন ও এ দুয়ের মধ্যস্থিত সকল জিনিসের মালিক, সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই, তুমিই বাস্তব ও সত্য, তোমার প্রতিশ্রুতি সত্য, তোমার সাথে সাাৎ সত্য, তোমার বাণী সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, সকল নবীই সত্য, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য এবং কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ আমি তোমার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি, তোমার প্রতি বিশ্বাসস্থাপন করেছি, তোমার উপরই তাওয়াক্কুল করেছি, তোমাকে স্মরণে রেখেই আমার সকল কাজের ব্যাবস্থাপনা করেছি, তোমার কারণে বিবাদে লিপ্ত হয়েছি এবং তোমার কাছেই সব বিষয়ে মীমাংসার জন্য পেশ করেছি। অতএব, আমার অতীত ও ভবিষ্যতের প্রকাশ্য ও গোপন সব অপরাধ মা করে দাও। তুমিই অগ্রবর্তী ও পরবর্তী। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ বা রব নেই।”
রমজান মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো অধিক ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে দানশীল ব্যাক্তি। আর রমজান মাস আসলে প্রবাহিত বায়ুর ন্যায় তার দানশীলতা আরো বৃদ্ধি পেত। রমজান মাসের শেষ দশ দিন তিনি সারারাত জাগ্রত থাকতেন ঐ সময় তিনি স্ত্রীদের নিকট হতেও পৃথক হয়ে যেতেন। আহলে বাইতকে তিনি নামাযের জন্য জাগিয়ে দিতেন। তিনি এতেকাফে থাকতেন। আর যে বৎসর তিনি ইন্তেকাল করবেন সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফে ছিলেন। [সহীহ বুখারী]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে তাঁর যাবতীয় চাওয়া-পাওয়া, অভাব-অভিযোগসহ জাগতিক ও পরকালীন সব বিষয়ে বিনয় সহকারে কাতর হৃদয়ে প্রার্থনা করতেন। কুরআনে বর্ণিত দোয়া ও মুনাজাত সমূহ পাঠের পাশাপাশি নিজ থেকেও তিনি অনেক দোয়া ও ফরিয়াদ আল্লাহর কাছে পেশ করতেন। কিছু দোয়া তিনি সর্বদা করতেন আর কিছু দোয়া তিনি অবস্থার প্রেেিত স্থান-কাল অনুসারে করতেন। তবে প্রায় সব দোয়ার মধ্যেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা ঘোষণা করতেন এবং এরপরেই তাঁর আবেদনের বিষয় ব¯ু‘ তুলে ধরতেন। এসব দোয়া কখনো নামাযে কখনো নামাযের বাইরে আবার কখনো দু‘হাত তুলে আবার কখনো বা হাত না তুলে তিনি তা নিবেদন করতেন।
নবী করীম সা. এর কিছু দোয়া ও মুনাজাত : “হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের সাহায্যে তোমার কাছে কল্যাণ কামনা করছি, আমি তোমার শক্তির সাহায্যে তোমার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি, কেননা তুমি মতাবান ও আমি অম, তুমি জ্ঞানবান আর আমি জ্ঞানহীন আর অদৃশ্য বিষয়ে তুমি পূর্ণরূপে পরিজ্ঞাত। হে আল্লাহ! তোমার জ্ঞানে, আমার এ কাজ (সংশ্লিষ্ট কাজের বর্ণনা) আমার দ্বীন, জীবন ও জীবিকা, কর্মের পরিণাম বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যে যদি কল্যাণকর হয় তাহলে তুমি তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও। আর যদি তোমার জ্ঞানে এ কাজ আমার জন্য মঙ্গল না হয় তাহলে তা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে রাখ। আমার জন্য সর্বেেত্র কল্যাণ নির্ধারণ কর।”

“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট চারটি বিষয়ে আশ্রয় প্রাথর্না করি। এমন জ্ঞান হতে যা কোন উপকারে আসে না, এমন অন্তর থেকে যা ভয় করে না, এমন আত্মা থেকে, যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দোয়া থেকে, যা কবুল হয় না।”
“হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তুমি অপবিত্রতা হতে পবিত্র রাখ, আমার আমলকে তুমি প্রদর্শনী হতে মুক্ত রাখ, আমার চুকে তুমি খেয়ানত হতে মুক্ত রাখ। কেননা তুমি চুর খেয়ানত সর্ম্পকে এবং অন্তরের গোপনীয়তা সম্পর্কে অবগত।
“আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক ও তাঁর কোন শরীক নেই। সব সা¤্রাজ্য তাঁর এবং সকল প্রশংসাও তাঁর। তিনি সব কিছুর উপর মতাবান।”
“হে প্রভু! তোমার কাছে দোয়া কামনায় আমাকে ব্যর্থকাম করো না এবং আমার অনূকুলে তুমি বড়ই মেহেরবান ও দয়ালু হিসাবে ধরা দাও। হে সর্বোত্তম প্রার্থনা পূরণকারী ও সর্বদাতা প্রভূ!”
“হে আল্লাহ! তুমি আমার অন্তরে নূর (আলো) দাও, আমার কবরে নূর দাও, আমার সম্মুখে ও আমার পেছনে নূর দাও। আমার ডানে ও আমার বামে নূর দাও। আমার উপরে এবং আমার নিচে নূর দাও। আমার কানে আমার চোখে আমার পশমে আমার চামড়ায় আমার গোসতে আমার রক্তে আমার হাড়ে নূর দাও। হে আল্লাহ! আমার নূর কে বর্ধিত করে দাও এবং আমার জন্য নূরের স্থায়ী ব্যবস্থা কর। তিনি পবিত্র (আল্লাহ), যিনি ইজ্জত ও মহত্তের চাদরে আবৃত এবং নিজের জন্য তাকে বিশিষ্ট করে নিয়েছেন। তিনি পবিত্র যিনি সম্মানের জামা পরিহিত এবং মর্যাদা দ্বারা সম্মানিত। তিনিই সুমহান যিনি ছাড়া আর কারো জন্য তাসবীহ পড়া বাঞ্চনীয় নয়। তিনিই পবিত্র যিনি সমস্ত দানের ও নিয়ামতের অধিকারী, যিনি সুমহান ও মর্যাদাবান। পবিত্র তিনি যিনি মহিমাময় ও মহানুভব।”
সাইয়্যেদুল ইসতিগফার হিসাবে যে দোয়াটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন তা হচ্ছে, হে আল্লাহ! তুমি আমার রব, তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তোমার গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সাথেকৃত ওয়াদা ও অঙ্গিকারের উপর অটল আছি। আমার কর্মের মন্দ পরিণাম থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তুমি আমাকে যত নিয়ামত দান করেছ, আমি সবই স্বীকার করছি এবং স্বীকার করছি আমার গোনাহের কথাও। হে প্রভু! তুমি আমাকে মা কর। তুমি ছাড়া আর কেউ মা করতে পারে না। [সহীহ বোখারী]
প্রাবন্ধিক : লেখক ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight