ইসলামের ভুষণ উত্তম চরিত্র : উবায়দুল হক খান

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদিসে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামকে পাঁচটি স্তম্ভসম্পন্ন একটি গৃহের সাথে তুলনা করেছেন। এ পাঁচটি স্তম্ভ হলো: আল্লাহ ও তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমানের স্যা, নামায, যাকাত, রোযা ও হজ।
বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল্লাহর হারামকৃত বিষয়সমূহকে এ গৃহের সংরণপ্রাচীর বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে তিরমিযীতে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি জিহাদকে এ গৃহের চূড়া তথা ছাদ বলে উল্লেখ করেছেন।
এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে ‘ইসলাম’ নামক গৃহটির সরঞ্জাম কি? জ্ঞানীরা চিন্তা করলে ‘উত্তম চরিত্র’ ছাড়া আর কিছুকে এ গৃহের সরঞ্জাম হিসেবে খুঁজে পাবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এ সরঞ্জাম না থাকার কারণেই আজ মুসলিম সমাজে এত বিবাদ ও হানাহানি। এ সরঞ্জামের অনুপস্থিতির কারণেই আজ কাফিররা ‘ইসলাম’ নামক গৃহে প্রবেশ করতে উৎসাহিত হচ্ছে না।
মুসলিম সমাজে যতদিন এ সরঞ্জাম যথেষ্ট পারিমাণে বিদ্যমান ছিল, ততদিন তাদের মাঝে বিরাজ করেছিল ঐক্য ও শান্তি এবং কাফিররা উৎসাহিত হয়েছিল এ গৃহে প্রবেশ করতে। মুসলমানদের যেখানেই এ সরঞ্জাম তথা ‘উত্তম চরিত্র’ যথেষ্ট পারিমাণে বিদ্যমান থাকবে, সেখানে নিশ্চয় শান্তি এবং একতা বিরাজ করবে।
উত্তম চরিত্র ‘ইসলাম’ নামক গৃহের কত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, তা নীচের কয়েকটি হাদিস থেকে সুস্পষ্ট হয়
হযরত নাওয়াস বিন সামআন রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাপ ও পুণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, পুণ্য হচ্ছে উত্তম চরিত্র। আর পাপ হচ্ছে, যা করা নিয়ে তোমার অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক হয় এবং তোমার মন চায় না, তোমার সে বিষয়টি অন্যরা জানুক। [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরদ : হাদিস নম্বর : ২৯৫, মুসলিম : হাদিস নম্বর : ২৫৫৩]
. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃতিগতভাবে অশ্লীলভাষা পছন্দকারী ছিলেন না এবং নিজেও অশ্লীল ভাষী ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম লোক তারাই, যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। [বুখারী : হাদিস : ৫৬৮৮, মুসলিম : হাদিস : ২৩২১]
হযরত উসামা ইবনে শরীক আলআমিরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সুন্দর চরিত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু মানুষকে (আল্লাহর প থেকে) দান করা হয়নি। [ইবনু মাজাহ : হাদিস : ৪৯, মুসনাদে আহমদ : হাদিস : ১৮৪২৭, ইবনু হাব্বান : হাদিস : ৬০৬১]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, কোন বিষয়ের কারণে মানুষ বেশি জান্নাতে প্রবেশ করে?  বললেন, আল্লাহর ভয় ও উত্তম চরিত্র। অতঃপর তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, কোন বিষয়ের কারণে মানুষ বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করে? বললেন, মুখ ও লজ্জাস্থানের অপব্যবহার। [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরদ : হাদিস : ২৯৪, তিরমিযী : হাদিস : ২০০৪, ইবনু মাজাহ : হাদিস : ৪২৪৬]
হযরত আবুদ দরদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে (আল্লাহর প থেকে) কোমলতা দান করা হয়েছে, সেই তার কল্যাণের অংশ পেয়েছে। আর যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেই তার কল্যাণের অংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কেয়ামতের দিন মুমিনের মিজানে (আমলনামায়) সবেচয়ে ওজনওয়ালা বস্তু হবে উত্তম চরিত্র। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন। [তিরমিযী : হাদিস : ২০০২, ইবনু হাব্বান : হাদিস : ৪৮১]
মুসলিম ও কাফির সবার েেত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবেচেয়ে বড় গুণ ছিল ‘উত্তম চরিত্র’। ইসলামের দাওয়াতের েেত্র তিনি ‘উত্তম চরিত্র’ দিয়েই সব অঞ্চল ও সব গোত্রের মানুষের মন জয় করেছেন। কুরআন মজীদের সুরা আল-কলমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী বলে ঘোষণা করেছেন।
অতএব, মুসলমান ও সৎ মানুষ বলতে সকলের ‘উত্তম চরিত্র’ এর অধিকারী তথা অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ও কল্যাণকামী হওয়ার বিকল্প নেই। কোনক্রমেই ধনী-দরিদ্র কারো প্রতি নির্দয় ও হিংসাপ্রবণ হওয়া যাবে না। নিজের ভাগ্য নিয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতিই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সম্পাদক, প্রতিভা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight