ইসলামের বিশ্বজনীনতা / মাওলানা আহমদ মায়মূন

ইসলামের আবির্ভাব যুগে মদীনায় দুটি গোত্র বাস করত। একটির নাম ছিল আওস, আর অপরটির নাম ছিল খাযরাজ। এ দুটি গোত্র ছিল পরস্পরে প্রতিদ্বন্দ্বী। একটি অপরটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকত। যখন তারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত দীনে তাওহীদের প্রকৃত পরিচয় লাভ করল এবং ইসলাম গ্রহণ করল তখন তাদের মধ্যকার পারস্পরিক লড়াই বন্ধ হয়ে গেল। দুটি পারস্পরিক শত্রু গোত্র একটি অপরটির বন্ধু গোত্রে পরিণত হল। নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য যুধ্যমান লোকেরা একতাবদ্ধ হয়ে উচ্চতর মানবিক স্বার্থ রক্ষার সৈনিকে পরিণত হল।
এরূপ কেন হল? এর কারণ এ দুটি গোত্র এর আগে কেবল নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখত। আওস গোত্র খাযরাজ গোত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইত, আর খাযরাজ গোত্র চাইত আওস গোত্রের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে। এভাবে দুটি গোত্র একটি অপরটির উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরস্পরে লড়াইয়ে রত থাকত। তাদের সামনে একতা বা সমঝোতার দিগন্ত উন্মোচিত হত না। কিন্তু তারা যখন ইসলামের মাধ্যমে এক আল্লাহর পরিচয় লাভ করল, আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্য বুঝতে পারল তখন তাদের নিজেদের পৃথক পৃথক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার ভাবনা দূরীভূত হয়ে গেল। বাকী রইল শুধু এক আল্লাহর প্রভুত্ব। এত দিন উভয় গোত্র নিজেদের পৃথক পৃথক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ছিল। এখন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে এক আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতি মনোযোগী হল। ইসলাম তাদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ দূর করে একতাবদ্ধ হওয়ার নেয়ামত দান করেছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি কৃত-অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু। অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন; ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকু-ের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হও। [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১০৩]
অর্থাৎ, শত শত বছরের পুঞ্জীভূত শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ইসলাম ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলে তোমাদের দীন ও দুনিয়া সঠিক পথে পরিচালিত হয়েছে। তোমাদের মধ্যে এমন ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে, যা দেখে তোমাদের শত্রুরা তটস্থ হয়েছে। এ পারস্পরিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব আল্লাহ তাআলার এত বড় নেয়ামত, যা সারা দুনিয়ার সকল ধনভা-ার ব্যয় করেও অর্জন করা সম্ভব নয়।
কুরআন কারীমের উল্লিখিত বর্ণনা থেকে এ বিষয়টি প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, মানুষের অন্তরের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। অন্তরের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি করা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কাজ। কোন দল বা সম্প্রদায়ের অন্তরে পারস্পরিক হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করা আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ। বলা বাহুল্য যে, আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কেবল তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। গুনাহ ও অপরাধ করে এ অনুগ্রহ লাভ করা সম্ভব নয়। সুতরাং মুসলিম সম্প্রদায়কে সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমের আনুগত্যের মাধ্যমেই করতে হবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১০৩]
এখানে আল্লাহর রজ্জু দ্বারা কুরআন কারীম উদ্দেশ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলার কিতাবই আল্লাহ তাআলার রজ্জু, যা আসমান থেকে যমীনে সম্প্রসারিত করে দেওয়া হয়েছে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২ খ. পৃ. ৮৯; মাআরিফুল কুরআন, ২ খ. পৃ. ৩১]
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর রজ্জু, সে তো কুরআনই। [ইবনে কাসীর, প্রাগুক্ত]
আরবী ভাষায় হাব্ল তথা রজ্জু বা রশি দ্বারা প্রতিশ্রুতিও বোঝানো হয়েছে। সাধারণত এমন যে কোন বস্তুকে হাব্ল তথা রজ্জু বলা হয়, যার দ্বারা কোন কার্য সম্পাদন করা হয়। উক্ত আয়াতে কুরআনকে বা দীনকে এজন্য রজ্জু আখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, এর দ্বারা একদিকে আল্লাহ তাআলার সাথে ঈমানদারদের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, অপর দিকে ঈমানদারদেরকে পরস্পরে মিলিয়ে এক সূত্রে জামাতবদ্ধ করে দেওয়া হয়।
সার কথা এই যে, কুরআন পাকের এই একটি বাক্যে গভীর দার্শনিক নীতিমালা ব্যক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হল, প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য আল্লাহ তাআলা কর্তৃক অবতীর্ণ জীবনব্যবস্থা তথা কুরআন কারীমের বিধি-বিধান দৃঢ়তার সাথে অবলম্বন করবে। যার ফলে সকল মুসলমানের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি হবে। কুরআন কারীমের অন্য একটি আয়াতে এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে দয়াময় আল্লাহ অবশ্যই তাদের জন্য সৃষ্টি করেন ভালোবাসা। [সূরা মারইয়াম : আয়াত ৯৬]
এখানে আমাদের সর্বপ্রথম একথাটি জানতে হবে যে, মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি হতে হলে সেই ঐক্যের বিশেষ কোনো কেন্দ্রবিন্দু থাকতে হয়, যাকে ভিত্তি করে পরস্পরে ঐক্য সৃষ্টি হয়। ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু কী হতে পারে এ নিয়ে বিশ্বের নানা জাতির নানা মত রয়েছে। কোথাও বংশীয় ও গোত্রীয় সম্পর্ককে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হয়েছে। যেমন, আরবদের বংশীয় ও গোত্রীয় ঐক্য এরূপ ছিল। কুরায়শরা নিজেদেরকে এক গোত্র ভাবত, আর বনু তামীমরা অন্য গোত্র বিবেচিত হত। কোথাও গায়ের রঙকে ঐক্যের ভিত্তি ধরা হয়েছে। যেমন, কৃষ্ণাঙ্গরা এক সম্প্রদায়, আর শ্বেতাঙ্গরা ভিন্ন সম্প্রদায়। কোথাও ভৌগলিক সীমারেখা বা ভাষাগত অভিন্নতাকে ঐক্যের ভিত্তি সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, বাঙালি-অবাঙালি, ভারতীয়-অভারতীয় ইত্যাদি। কোথাও পূর্বপুরুষদের রসম-রেওয়াজ এবং কৃষ্টিকালচারকে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়েছে। যেমন, ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় ও আর্য সমাজ ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা সবকিছু ছেড়ে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু সাব্যস্ত করেছেন আল্লাহর রজ্জু তথা কুরআন কারীমকে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক অবতীর্ণ অমোঘ জীবনব্যবস্থাকে। আর স্পষ্টভাবে একথা ব্যক্ত করেছেন যে, যারা আল্লাহর রজ্জু ধারণ করেছে, সে সকল মুুমিন এক সম্প্রদায়। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর রজ্জু ধারণ করে না, তারা ভিন্ন সম্প্রদায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের কেউ হয় কাফের এবং তোমাদের মধ্যে কেউ হয় মুমিন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক দ্রষ্টা। [সূরা তাগাবুন : আয়াত ২]
ভৌগলিক সীমারেখা, ভাষার অভিন্নতা, বংশ-গোত্রের পরিচয়, গায়ের রঙ প্রভৃতি বিশ্বজনীন ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। কেননা, এগুলোর কোনটিই মানুষের এখতিয়ারের আওতায় পড়ে না। এ সকল বিষয় খ-িত পরিম-লে বা সীমিত আকারে ঐক্য সৃষ্টির অবলম্বন হতে পারে। ইসলাম বিশ্ব জনীন ঐক্য সৃষ্টি করতে চায়। তাই আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীম তথা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক অবতীর্ণ জীবনব্যবস্থাকে আল্লাহর রজ্জু আখ্যা দিয়ে তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে ঐক্য প্রচেষ্টার জন্য এখতিয়ার অবলম্বিত বহির্ভুত ইস্যুগুলোর সীমাবদ্ধতা থাকবে না। সুতরাং আল্লাহর রজ্জু ধারণকারী, সে প্রাচ্যের হোক বা পাশ্চাত্যের, শেতাঙ্গ হোক বা কৃষ্ণাঙ্গ, বাঙালি হোক বা অবাঙালি, ভারতীয় হোক বা ইউরোপীয়, কুরায়শ হোক বা অকুরায়শ, সকলে এক আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহ কর্তৃক জীবনব্যবস্থাকে অবলম্বন করে ইসলামের বিশ্বজনীন ঐক্যের শামিয়ানাতলে জমায়েত হতে পারে। দার্শনিক কবি ইকবাল বলেন, বুতানে রঙ ও খুঁ কো তুড় কর মিল্লাত মে গুম হোজা, না তুরানী রাহে বাকী, না ইরানী না আফগানী। গায়ের রঙ ও রক্ত-সম্পর্কের প্রতিমা ভেঙ্গে মিল্লাতকে সুসংহত করার জন্য আত্মনিবেদিত হও, ইরানি তুরানি তথা ভৌগলিক ভেদাভেদ দূরীভূত হয়ে যাবে।
এটাই সবচেয়ে বড় উৎকৃষ্ট বিশ্বজনীনতা, যা ইসলাম মানুষকে দান করেছে। ইসলাম মানুষকে কুরআন দান করেছে, কুরআন কারীমকে আল্লাহর রজ্জু আখ্যা দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কুরআন কারীমে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে। তিনিই সকলের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই সকলের মালিক। তিনিই সমগ্র জগৎ পরিচালনা করছেন। আল্লাহ তাআলার দান থেকেই মানুষের প্রাপ্তি। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ছাড়া মানুষ কিছুই লাভ করতে পারে না। এটাই ইসলামের একত্ববাদের বিশ্বাস, যা কুরআন কারীমের মূল বিশ্বাস। আর কুরআনকে দৃঢ় আস্থা সহকারে আঁকড়ে ধরার নির্দেশই ইসলামের বিশ্বজনীনতার বুনিয়াদ। যখন মানুষ কুরআনকে আঁকড়ে ধরবে, কুরআনের মূল শিক্ষা একত্ববাদকে গ্রহণ করবে তখন সে সকল বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিভূ এক আল্লাহকেই মনে করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল বস্তুকে সে সমান দৃষ্টিতে দেখবে। মানুষের মধ্যে যে নানা প্রকার শ্রেণিভেদ রয়েছে, সে সবই তার কাছে কৃত্রিম মনে হবে। এর ফলে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদের যে প্রাচীর খাড়া করে দেওয়া হয়েছে, তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। জাতিভেদ, বর্ণবৈষম্য, বংশীয় ও ভৌগলিক পার্থক্য ইত্যাদির ভিত্তিতে মানুষে মানুষে যে পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা দূরীভূত হয়ে যাবে। সকল মানুষ এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত হবে, আর এক আল্লাহ তাআলা হবেন সকলের মাবুদ তথা উপাস্য।
এক আল্লাহর আনুগত্য হয়ে কুরআনকে আঁকড়ে ধরার ফলে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির মধ্যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বজনীন ঐক্য সুদৃঢ় হয়। যেই এক আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রেজামন্দির জন্য একজন মানুষ দৌড়ায়, তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সকল মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এক আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ব্যতীত প্রত্যেক মানুষের অভীষ্ট লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু এক থাকে না। প্রত্যেকের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা সৃষ্টি হয়। এক আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করার ফলে সকলের লক্ষ্যবিন্দু এক ও অভিন্ন হয়ে যায়। এটাই ইসলামি শিক্ষার বিশ্বজনীনতা।  এর চেয়ে অধিক ব্যাপক বিশ্বজনীনতার ধারণা পৃথিবীর অন্যকোনো মতবাদ বা মতাদর্শের মধ্যে নেই।
আরব জাতি হাজার হাজার বছর যাবৎ আরব ভূখ-ে বসবাস করে আসছিল, কিন্তু ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হওয়ার মতো তাদের কোন কর্ম-অবদান ছিল না। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তারা কাব্য চর্চা করত, কবিতায় তারা একে অপরের নিন্দাবাদ ও কুৎসা রটনা করত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়াদি নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ, বিবাদ-বিসংবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ত। এমনও হত, কখনও তাদের মধ্যে লড়াই বেঁধে গেলে তা বংশানুক্রমে শত শত বছর যাবৎ চলতে থাকত।
অথচ এ আরব জাতি যখন ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল, ইসলামের শিক্ষা তথা কুরআন কারীমের জীবনব্যবস্থাকে অবলম্বন করল, আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করে আল্লাহর হুকুমকে মাথা পেতে নিল, তখন তাদের চিন্তা ও কর্মে এক বিপ্লব সূচিত হল, যার ফলে তারা নতুন এক বিশ্বসভ্যতার গোড়াপত্তন করল, তারা তাদের নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। যে সম্প্রদায়কে এক সময় অনুল্লেখযোগ্য মনে করা হত, তারা সমকালীন বিশ্বে উল্লেখযোগ্য সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করল। আরবী ভাষা, যা ইতিপূর্বে কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষার অবস্থানে ছিল, তা আন্তর্জাতিক ভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত হল।
এর পেছনে যে কারণ ছিল, তা হল ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার সার্বজনীনতা ও বৈশ্বিকতা। ইসলাম তাদের চিন্তা ও মনের অবরুদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে, ভাবনার কপট অর্গলমুক্ত করেছে। তারা প্রকৃতির পূজা করত। ইসলাম এসে তাদেরকে শিক্ষা দিল যে, প্রকৃতি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং অক্ষম। উপাসনা-আরাধনার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলা, যিনি তোমাদের এবং সমগ্র দুনিয়ার মালিক। তিনিই সৃষ্টিকর্তা। এর ফলে তাদের মধ্যে এ ভাবনা সৃষ্টি হল যে, প্রকৃতি এমন কোনো বস্তু নয় যে, তার সামনে মস্তক অবনমিত করা যায় বরং প্রকৃতি এমন জিনিস, যা নিয়ে গবেষণা করা যায় এবং তাকে নিয়ন্ত্রণাধীন করা যায়।
আরব জাতি মানুষকে আরব-অনারব, কালো-গোরা, মনিব-গোলাম, উচুবংশ-নিচু বংশ ইত্যাদি নানা বিভাজনে বিভক্ত করে রেখেছিল। ইসলাম তাদের সামনে ভাবনার এ দ্বারা উন্মোচিত করল যে, সকল মানুষ এক আদমের সন্তান। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। এর দ্বারা তাদের মধ্যে এমন উদার বৈশ্বিকতা ও বিশ্বজনীনতার ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে তারা সমগ্র দুনিয়াকে নিজেদের আবাসভূমি এবং সমগ্র মানবজাতিকে নিজেদের পরিবারের মতো ভাবতে শিখেছে। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তারা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মতো। ইসলামের ছায়াতলে আসার পর তারা বৈশ্বিক সভ্যতা বিনির্মানে একটি বড় অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
ইসলামের আগমণের পূর্বে আরবের লোকেরা গোত্রে গোত্রে বিভক্ত ছিল। ইসলামের শিক্ষার মাধ্যমে যখন তাদের চিন্তা চেতনায় বিপ্লব সূচিত হয় তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা একটি উৎকৃষ্ট সভ্যজাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে তাদের দৃষ্টি ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি নিবদ্ধ। ইসলামের আশ্রয়-গ্রহণের পর তাদের দৃষ্টিতে এত প্রশস্ততা সৃষ্টি হল যে, তারা স্থলপথ-জলপথ পাড়ি দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল এরপর কোনো পর্বতমালা বা অথৈ সমুদ্র তাদের গতিরোধ করতে পারেনি।
ইসলাম যখন আরব জাতির মধ্যে বিশ্বজনীনতার ভাবনা সৃষ্টি করল তখন তাদের অবস্থা এ পর্যায়ে দাঁড়াল যে, যারা গোত্রের  নেতৃত্ব নিয়ে গর্বিত বোধ করত তারা বিশ্বনেতা হয়ে গেল। তাদের মধ্যে ইবনে সীনা ও আল-রাজীর মতো বিজ্ঞ চিকিৎসা বিজ্ঞানীর জন্ম হল, যাদের চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থাবলির অনুবাদ হয়েছে ইউরোপীয় ভাষায় এবং সেগুলো ইউরোপের মেডিকেল কলেজসমূহে পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-ইদরীসীর মতো ভূগোলবিদ জন্ম নিয়েছেন, যিনি সিসিলীর স¤্রাট রোজার দ্বিতীয়র জন্য সর্বপ্রথম বিশ্বমানচিত্র তৈরি করেন। তাদের মধ্যে এরূপ দক্ষ শিল্পবিদের জন্ম হয়েছে যে, ইংল্যান্ডের স¤্রাট ওফারক্স তার দেশের সোনার মুদ্রা প্রস্তুত করার জন্য বাগদাদ থেকে মুদ্রার কারিগর ডেকে নেন।
সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার  দক্ষতায় তারা এতই উন্নতি করেছিল যে, তাদের মধ্যে আমেদ ইবনে মাজেদের মতো নাবিকের জন্ম হয়েছে, যিনি ভাস্কো দা গামাকে সামুদ্রিক অভিযানের পথ দেখিয়েছেন। যে খৃষ্টীয় পনের শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও ভারতের মধ্যকার সামুদ্রিক পথ অনুসন্ধানের জন্য বেরিয়েছিল। তাদের মধ্যে আবু উবায়দা মুসলিম আল-বালানসীর মতো ভূতত্ত্ববিদের জন্ম হয়েছে, যার গবেষণা অধ্যয়ন করে কলম্বাসের মধ্যে এ প্রতীতি জন্মেছে যে, এ বিশ্বের আরও অজানা দেশ আছে, যা আবিষ্কার করতে হবে। সুতরাং তিনি এ উপলব্ধি নিয়ে ইউরোপের সমুদ্র সৈকত থেকে অভিযান শুরু করেন, যার ফলে নতুন বিশ্ব আমেরিকা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।
ইসলামের এ বিশ্বজনীনতার প্রকাশ ঘটেছে হযরত রিবঈ ইবনে আমের রা. এর একটি বক্তব্যে। আরবের লোকেরা যখন ইরানে প্রবেশ করল এবং ইরানীরা সব জায়গায় আরবদের কাছে পরাজিত হতে লাগল তখন ইরানীদের সেনাপতি রুস্তম এর রহস্য বোঝার জন্য হযরত রিবঈ ইবনে আমের রা.-কে তার দরবারে ডেকে নেন। রোস্তম তার নিজ দরবারে সোনা-জহরতের মুকুট পরে বসেছিলেন। হযরত রিবঈ ইবনে আমের রা. অতি সাধারণ পোশাক পরে তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলে রুস্তম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা আমাদের দেশে কেন এসেছ? হযরত রিবঈ ইবনে আমের রা. উত্তরে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছেন। যাতে আমরা, তিনি যাকে ইচ্ছা করেন, তাকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি এবং দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে দুনিয়ার প্রশস্ততায় পৌঁছে দিতে পারি এবং অন্য সকল ধর্মের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করে ইসলামের ন্যায়-নিষ্ঠার ছায়াতলে নিয়ে আসতে পারি।
হযরত রিবঈ ইবনে আমের রা.-এর এ বক্তব্যে অতি সংক্ষেপে, কিন্তু অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় ইসলামের বিশ্বজনীনতা ফুটে উঠেছে। [মাওলানা ওহীদুদ্দীন খান কৃত নশরী তাকরীরে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight