ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব

মানুষ সত্তাগতভাবেই স্বাধীন। প্রতিটি মানুষ তার স্বাধীনতা নিয়েই এই পৃথিবীতে আসে। পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষের রয়েছে স্বাধীনতা ভোগ করার সমান অধিকার। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এক সহজাত স্বাধীনচেতা সত্তা দিয়ে গঠন করেছেন, তাই মানবসত্তা একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য মানুষের সামনে নতি স্বীকার করা বা অপরের অধীন হওয়া মেনে নিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন ‘আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই।’ [সূরা আর-রুম, আয়াত : ৩০] আল্লাহপাক একই কাঠামোতে ও একই রকম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৃথিবীর সব মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আর আল্লাহর প্রকৃতি এই যে, তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম, তাই মানবপ্রকৃতিও স্বাধীনচেতা ও সার্বভৌমত্বপ্রত্যাশী। তাই কোনো মানুষ অন্য মানুষ থেকে সত্তাগতভাবে শ্রেষ্ঠ নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ [সহীহ বুখারী]
ইসলাম মানুষের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বকে উৎসাহিত করেছে। অন্যায়-কর্তৃত্ব, জুলুম, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে এবং যারা এসব অন্যায় কর্মকা-ে জড়িত হয় তাদেরকে প্রতিহত করার আদেশ দিয়েছেন। মানুষকে কোনোরকম দাসত্বে শৃঙ্খলিত করা যায় না, নিগৃহীত করে রাখা যায় না, অন্যায়-কর্তৃত্বে আবদ্ধ করা যায় না, পরাধীনতায় বন্দি করে রাখা যায় না। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার হতে ও শৃঙ্খল হতে যা তাদের ওপর ছিল, সুতরাং যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে এর অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।’ [সূরা আল-আরাফ, আয়াত : ১৫৭]
মানুষ যেখানেই অত্যাচারিত হবে, জুলুমের শিকার হবে, তাদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা হরণ করা হবে, তাদেরকে জালেম ও অত্যচারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ- যার অধিবাসী জালিম, তা হতে আমাদেরকে অন্যত্র নিয়ে যাও; তোমার প থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার প থেকে কাউকে আমাদের সহায় কর।’ [সূরা আন-নিসা : আয়াত ৭৫]
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অনেক গুরুত্ব রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয়া পৃথিবী ও তার মধ্যকার সব কিছুর চেয়ে উত্তম।’ অন্য একটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তার আমল আর বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের সওয়াল-জবাব থেকে সে মুক্তি পাবে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)
যারা দেশকে ভালোবাসে, যারা দেশ রা করার জন্য সংগ্রাম করে তাদের সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘একদিন ও একরাতের সীমান্ত পাহারা ধারাবাহিকভাবে এক মাসের সিয়াম সাধনা ও সারারাত নফল ইবাদতে কাটানো অপো উত্তম।’ [সহীহ মুসলিম]
স্বাধীন ব্যক্তির স্বাধীনতা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেড়ে নেয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, ‘আমি কেয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধ আল্লাহর সামনে দাঁড়াব, তাদের মধ্যে একজন হলো যে অন্য স্বাধীন ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাকে বিক্রি করে দেয় । [সহীহ বুখারি : হাদীস ২২২৭]
স্বাধীনতা আল্লাহ তাআলা এক অসাধারণ দান। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্যের সমতুল্য আর কিছুই নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতা অর্জনে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে ও অপ্রত্যক্ষভাবে অবদান রেখেছেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদেরকে রক্ষা করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জন করা যতটা কঠিন, তার চেয়ে কঠিন হলো স্বাধীনতা রক্ষা করা। আমরা অবশ্যই এ-ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবো যে, এই দেশ ও রাষ্ট্রকে সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি-দুরাচার, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত রক্ষা করবো এবং সমৃদ্ধ ও সুখী করার জন্য অব্যাহতভাবে আন্তরিক চেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করে যাবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight