ইসলামি অর্থনীতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভূমিকা কী? উমর মুহাম্মদ মাসরুর

ভূমিকা
“তাদের সম্পদ থেকে ‘সাদকা’ গ্রহণ করুন; তা দ্বারা তাদের পবিত্র করুন এবং পরিশোধিত করুন।”
“যারা তাদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিবসে, গোপনে ও প্রকাশে ব্যয় করে তাদের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তিরই মতো দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। তা এইজন্য যে, তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতো’। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতকালে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। তোমরা যদি তা না ছাড়ো তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচরিতও হবে না। যদি খাতক অভাবগ্রস্ত হয় তবে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া বিধেয়। আর যদি তোমরা ছেড়ে দাও তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। তোমরা সেইদিনকে ভয় করো যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যানীত হবে। তারপর প্রত্যেককে তার কর্মের ফল পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তাদের প্রতি কোনোরূপ অন্যায় করা হবে না।”
ইসলাম প্রথমত নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাই প্রদান করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সচ্চরিত্রতা পরিপূর্ণ করার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।” এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলাম নৈতিকতা ও সচ্চরিত্রতাকে আকিদা ও বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন : যার আমনত নেই, তার ঈমান নেই; যে তৃপ্তিসহ পানাহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে তারও ঈমান নেই। একইভাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া, চুরি করা, মদপান করা ঈমানবিধ্বংসী কাজ। অপরদিকে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, প্রতিবেশীকে সম্মান করা ও ভালো কথা বলা ঈমানের আবশ্যক অংশ। “আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি যার ঈমান রয়েছে সে যেনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়; আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি যার ঈমান রয়েছে সে যেনো অতিথিকে সম্মান করে; আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি যার ঈমান রয়েছে সে যেনো ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।”
চরিত্র ও নৈতিকতাকে ইবাদতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং একে ইবাদতের ফল ও পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন : “নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।” অথবা, “তার গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”
ইবাদত যদি আখলাক ও শিষ্টাচারম-িত না হয় তাহলে আল্লাহ তাআলার কাছে এর কোনো মূল্য নেই। যেমন : “কত রাত্রিজাগরণকারী (রাত জেগে ইবাদতকারী) রয়েছে, যারা অনর্থক রাত জেগে থাকে; কত রোযাদার রয়েছে যারা দিনের বেলা অনর্থক ক্ষুধার্ত থাকে।” অথবা, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও ধোঁকাপূর্ণ কাজ ছাড়তে পারলো না, তার রোযা রাখায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”
ইসলাম ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে মুআমালা ও লেনদেনকেও সত্যবাদিতা, সততা, আমানত, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকার, পারস্পরিক বন্ধন ও ভালোবাসার মতো চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। মুসলমানদের গোটা জীবনটাই নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত; সুতরাং জ্ঞান ও নৈতিকতা, রাজনীতি ও নৈতিকতা, অর্থনীতি ও নৈতিকতা, যুদ্ধ ও নৈতিকতা পারস্পরিক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
নৈতিকতার মতো মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটা ধর্মীয় মূল্যবোধ হতে পারে, মানবিক মূল্যবোধও হতে পারে। আল্লাহ তাআলার প্রতি, নবুওত ও রিসালাতের প্রতি এবং আখেরাতের ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা প্রধানতম ধর্মীয় মূল্যবোধ। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়, তাঁর প্রতি ভরসা ও একনিষ্ঠতাও এ মূল্যবোধের অংশ।
মানবিক মূল্যবোধ বলতে বোঝায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, সৌজন্যবোধ, ন্যায়নিষ্ঠতা, মধ্যপন্থা অবলম্বন ও ভারসাম্য রক্ষা, মানুষের মধ্যে সমতাবিধান ও অধিকার রক্ষা, দুর্বল ও দরিদ্রদের প্রতি প্রেম ইত্যাদি।

ইসলামি অর্থনীতিতে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকা- মানবিক মূল্যবোধ, চারিত্রিক গুণাবলি ও শরীয়তের বিধানাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও অন্যান্য বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য এই যে, ইসলাম অর্থনীতি ও নৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য করে না। এখানে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কর্মকা-ে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা তার সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেন। বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়নিষ্ঠতা, খরচ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা, অপচয় ও অতিব্যয়িতা নিষিদ্ধকরণ, সুদি কারবার ও মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গুদামজাত করা নিষিদ্ধকরণ, ধোঁকা ও প্রতারণা নিষিদ্ধকরণ, বৈধভাবে পুঁজি সংগ্রহ ও লগ্নিকরণ, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ইত্যাকার যাবতীয় বিষয় ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য, যা মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকা-ে নৈতিকতা ও মূল্যবোধেরই বহিঃপ্রকাশ। ইসলামি অর্থনীতি সমাজের একটি শ্রেণিকে সর্বোচ্চ ধনী ও মনিবে পরিণত করে না এবং অপর একটি শ্রেণিকে দারিদ্র্যকিষ্ট ক্রীতদাস বানায় না; ইসলামের অন্যান্য বিষয়ের মতো ইসলামি অর্থনীতিতেও রয়েছে ভারসাম্য ও সমতার মানদ-। ইসলামি অর্থনীতি কেবল বস্তুগত ও বস্তু-সমর্কিত কোনো ব্যাপার নয়; বরং এখানেও মানবিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় নৈতিকতা সর্বদা জাগরূক থাকে। ঔষধ বিক্রির জন্য রোগের বিস্তার ঘটানো, অস্ত্র বিক্রির জন্য যুদ্ধ বাঁধানো, ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য সমস্যা তৈরি করা, স্বাস্থ্যবিধি এবং সমাজ ও পরিবেশের সুরক্ষার প্রতি লক্ষ্য না করে পণ্য উৎপাদন, চটকদার ও মনভোলানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে অনর্থক জিনিস কিনতে ও অপব্যয় করতে ফুসলানো ইত্যাদি গর্হিত কর্মকা-কে ইসলামি অর্থনীতি কিছুতেই অনুমোদন করে না। ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তি হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতা, মানবিক কল্যাণকামিতা, পারস্পকি সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধ, ক্ষমা ও উদারতা।

মূল্যবোধ এবং ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য
ইসলামি অর্থনীতি ও লেনদেনে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে প্রথমেই আমাদের সামনে চার প্রকারের মৌলিক ও প্রধান মূল্যবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে : আল্লাহ সম্বন্ধীয় মূল্যবোধ, চারিত্রিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং মধ্যপন্থা। এ চার প্রকারের মূল্যবোধ ইসলামি অর্থনীতির প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে রূপায়িত করে; শুধু অর্থনীতিই নয়, ইসলামের যে কোনো কর্মকা-ে উপর্যুক্ত মূল্যবোধ চতুষ্টয়ের উপস্থিতি বিদ্যমান। এগুলো ইসলামি শরীয়া ও ইসলামি সভ্যতারও বৈশিষ্ট্য।
আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গেই এ কথা বলা যায় যে, উপর্যুক্ত মূল্যবোধের কারণে ইসলামি অর্থনীতি সাধারণ অর্থনীতির চেয়ে অনন্য; কারণ তা আল্লাহ নিবেদিত অর্থনীতি, মানবিক অর্থনীতি, নৈতিক অর্থনীতি এবং মধ্যপন্থার অর্থনীতি।
উপর্যুক্ত মূল্যবোধগুলো বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত এবং ইসলামি অর্থনীতি ও আর্থিক লেনদেনের সব ক্ষেত্রে উৎপাদনে ও ভোগে এবং বিনিময়ে ও বণ্টনে তাদের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিস্তৃত। এসব মূল্যবোধ অনুপস্থিত থাকলে অর্থনীতি ও আর্থিক লেনদেন ইসলামি বলে বিবেচিত হবে না, যদিও কেউ কেউ অনৈসলামিক কারবার ও ব্যবসাকে ইসলামি বলে প্রচার করার প্রয়াস পায়।
আল্লাহ নিবেদিত অর্থনীতি বলতে যা বোঝায় তা এই : এর সূচনা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং গন্তব্যও আল্লাহর উদ্দেশে এবং এর যাবতীয় উপায় ও পদ্ধতি আল্লাহর শরীয়ার সীমারেখার আওতাধীন। যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকা- আল্লাহ প্রদত্ত মূলনীতি ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সচেতন মুসলমানমাত্রই আল্লাহ তাআলার নি¤œবর্ণিত নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে উৎপাদনে ও সম্পদ অর্জনে তার শ্রম ও চেষ্টা ব্যয় করে :
“তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন; সুতরাং তোমরা তার দিগ-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে আহার গ্রহণ করো; পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট।”
চারা ও বৃক্ষ রোপণ, ফসল উৎপাদন অথবা কল-কারখানা স্থাপন ও পণ্য উৎপাদন অথবা ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থ লগ্নি ও মুনাফা অর্জন প্রতিটি কাজের সময় মুসলমানের অন্তরে এই চেতনা জাগরূক থাকে যে সে তার কর্মের দ্বারা আল্লাহর ইবাদত করছে। তার কাজের উপকারিতা ও কল্যাণ যতই বৃদ্ধি পাবে সে আল্লাহর কাছে ততটাই প্রিয়ভাজন হবে।
একইভাবে মুসলমান যখন উত্তম বস্তু পানাহার করে, পণ্য ভোগ করে, বস্তুরাশির উপকারিতা লাভ করে, আল্লাহ তাআলা নিদের্শ মোতাবেকই করে।
“হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্গ অনুসরণ করো না।”
“হে বনি আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে; কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। বলো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?”
“তুমি তোমার হাত তোমার গলায় আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না (কার্পণ্য বা অপব্যয় কোনোটাই করো না)। তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।”
মুসলমান কেনা-বেচার সময়, ভাড়ায় গ্রহণ ও ভাড়ায় প্রদানের সময়, অর্থ ও পণ্য বিনিময়ের সময় আল্লাহর বিধি-নিষেধের প্রতি লক্ষ রাখে ও মেনে চলে। হারাম সম্পদ অর্জন করে না, হারাম উপায়েও সম্পদ অর্জন করে না; সুদি কারবার করে না এবং মূল্যবৃদ্ধির লোভে পণ্য গুদামজাত করে রাখে না। কারো প্রতি জুলুম করে না, কারো সঙ্গে প্রতারণা করে না। জুয়া খেলে না এবং চুরি করে না। ঘুষ দেয়ও না, ঘুষ নেয়ও না।
মুসলমানের পদচারণা ও তৎপরতা হালাল ও বৈধ কর্মকা-ের বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সে স্পষ্ট হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। যথাসম্ভব সন্দেহযুক্ত বিষয় পরহেয করে চলে। এভাবে সে তার দীন ও ব্যক্তিগত সম্মানকে সুরক্ষা প্রদান করে।
মুসলমান সম্পদের মালিক হলে তা কুক্ষিগত করে রাখে না, নির্বোধের মতো অপচয় করে না, অপরাধ বা নাফরমানিমূলক কাজে ব্যয় করে না। কাউকে সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না।
ইসলামে অর্থনীতি মৌলিক কোনো উদ্দেশ্য নয়; বরং তা মানুষের জন্য প্রয়োজন ও আবশ্যক অবলম্বন এ কারণে যে, তাকে জীবনের মূল লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য কর্মক্ষম ও সুস্থ-সবল থাকতে হয়। অর্থনীতি হলো মানুষের সহায়ক; তাঁর বিশ্বাস ও দায়িত্বের সেবক।
ইসলাম মানবজীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ও সামষ্টিক জীবনকে সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য ইসলাম যাবতীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছে। জীবনের চিন্তাগত, আত্মিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মোটকথা জীবনের যত দিক আছে, সব দিকে ইসলাম তার ব্যবস্থাকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে। অর্থনৈতিক দিক জীবনের একটি অংশ, জীবনের একটি পর্যায় ও প্রেক্ষিত; কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, তা জীবনের মূল ভিত্তি নয়, জীবনের উদ্দেশ্য ও গন্তব্যও নয়।
ইসলামি ব্যবস্থা জীবনের জন্য অনন্য ও অসাধারণ ব্যবস্থা। ইবাদত এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষের আত্মাকে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করে। মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার এই ব্যস্থার অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষকে উন্নত করে, মানবীয় উৎকর্ষ সাধন করে, জীবনকে সৌন্দর্যময় করে। ইসলামি শরীয়ার বিধানাবলি হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য করে দেয়, ন্যায়নিষ্ঠা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে, জুলুম ও উৎপীড়ন নিষিদ্ধ করে; ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, পরিবারের, সমাজের ও উম্মাহর সম্পর্ক স্থাপন করে; ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতার নীতি প্রতিষ্ঠা করে, মানবম-লীর অধিকারের সুরক্ষা প্রদান করে।
কিন্তু ইসলাম ব্যতীত অন্যান্য জীবনব্যস্থা অনুরূপ নয়। সেখানে রুটি-রোজগারই জীবনের উদ্দেশ্য, ক্ষুধা নিবৃত্তিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়; অর্থনীতিই সকল সমস্যার সমাধান এবং পার্থিব কর্মকা-ই চিন্তাজগতের নিয়ন্ত্রক।
নৈতিক অর্থনীতি বলতে বোঝায় এখানে অর্থনীতি ও নৈতিকতার সমন্বয় থাকবে। কতিপয় অনারব গবেষক ইসলামি অর্থনীতির এ বৈশিষ্ট্যের প্রতি আলোকপাত করেছেন। ইসলামি অর্থনীতি নৈতিকতা ও অর্থনীতির মধ্যে সংশ্লেষ সৃষ্টি করেছে; অন্যদিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সেক্যুলার অর্থনীতিতে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই।
ফরাসি লেখক ঔধপয়ঁবং অঁংঃৎুঁ তাঁর ওঝখঅগ ঋঅঈঊ অট উণ্ঠঠঊখঙচচঊগঊঘঞ নামক গ্রন্থে বলেছেন : “ইসলাম একইসঙ্গে উন্নত আদর্শিক নৈতিকতা ও বাস্তবিক জীবনের সমন্বয়মূলক জীবনব্যবস্থা। এখানে এই দুটি দিক ওতপ্রোতভাবে জড়িত; একটি আরেকটি থেকে কখনো পৃথক হয় না। এ থেকে বলা যায় যে, মুসলমানরা কখনো সেক্যুলার অর্থনীতি গ্রহণ করে না এবং যে অর্থনীতি কুরআনের বাণী থেকে তার শক্তি সঞ্চয় করবে অবধারিতভাবে সেটাই হবে নৈতিক অর্থনীতি।
এই নৈতিকতা ‘মূল্য’ বলতে যা বোঝায় তাকে একটি নতুন অর্থদানে সক্ষম এবং ‘উৎপাদনের হাতিয়ার’ এর পরিণতিরূপে যে-চিন্তাগত বৈকল্যের সৃষ্টি হয় তাও পূরণ করতে সক্ষম।
আমরা যদি অনুশীলিত বাস্তবিকতার প্রতি লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো, অর্থনীতি ও নৈতিকতার যে সংশ্লেষ ইসলামের ইতিহাসে তার গভীর ও স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে যখন ইসলামই মুসলমানদের জীবনে প্রধান প্রভাবক ছিলো এবং তাদের কর্মকা-, তৎপরতা ও গতিবিধির প্রধান নির্দেশক ছিলো।”
ইসলামি অর্থনীতিতে মানুষই মূল লক্ষ্য। সুতরাং ইসলামি অর্থনীতির উদ্দেশ্য হলো মানুষের জন্য সুখকর জীবন নিশ্চিত করা। সুখকর জীবন বলতে যা বোঝায় তার প্রতিটি উপাদান ও প্রতিটি অনুষঙ্গের ক্ষেত্রে ইসলামি অর্থনীতি গুরুত্বারোপ করে থাকে। ইসলামি অর্থনীতি মানুষের শৈশব থেকে নিয়ে যৌবন পর্যন্ত, যৌবন থেকে নিয়ে বার্ধক্য এবং বার্ধক্য থেকে মৃত্যু প্রতিটি স্তরে ও প্রতিটি পর্যায়ে জীবনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করে থাকে।
ইসলামি অর্থনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থার অর্থনীতি। ভারসাম্য ও মধ্যপন্থাকে ইসলামি অর্থনীতির আত্মা বলা যায়। মানুষের যেমন আত্মা আছে, যা তাকে সচল ও সজীব রাখে, তেমনি প্রতি ব্যবস্থারও আত্মা থাকে, যার অভাবে সে অচল ও নির্জীব হয়ে পড়ে।
পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এখানে ব্যক্তিই সবকিছু; ব্যক্তির স্বাধীনতা, সুখ ও সমৃদ্ধি, ভোগ ও বিলাস, ব্যক্তির পুঁজি ও বাণিজ্য, লাভ ও মুনাফা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী অর্থনীতি যাতে কোনো মুনাফা নেই, যাতে আর্থিক লাভ নেই সেসব ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব প্রদান করে না। শুধু তা-ই নয়, সেসব বিষয়কে সমাজের জন্য উপকারী ও কল্যাণকরও মনে করে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যক্তিই অর্থনীতির চালিকাশক্তি, ব্যক্তিই লক্ষ্য, ব্যক্তিই উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রের কাজ হলো শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতা ও অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং ব্যক্তির ইচ্ছাধিকারকে যে-কোনো প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত রাখা। যাতে তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থনৈতিক কর্মকা- ও তৎপরতা অব্যাহত রাখতে পারে।
অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক বা মার্কসবাদী অর্থনীতি ব্যক্তিকে কোনো গুরুত্বই প্রদান করে না। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ব্যক্তি কিছু না; সমাজ ও রাষ্ট্রই সব। এখানে ব্যক্তির প্রতি রয়েছে অসৎ ও অন্যায় ধারণা, ব্যক্তিমালিকানার কোনো মূল্যও এখানে নেই।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকৃতি দেওয়াই সমস্ত অপরাধ ও অনাচারের প্রধান কারণ। সুতরাং ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ জরুরি, একইভাবে ব্যক্তিত্বে বিনাশও জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন হলে রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পথে হাঁটতে হবে, ব্যক্তিত্বপূজারীদের বিনাশ ঘটাতে হবে। যাতে সমাজে কার্যকরী অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে স্বৈরশাসন ও একনায়কতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাষ্ট্র থেকে তখন ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মানবিকতা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, দীন-ধর্ম-আদর্শ সবকিছু বিদায় নেয়। রাষ্ট্র একটি অর্থহীন যন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে ক্ষুধার নিবৃত্তি ছাড়া আর কোনোকিছুর কোনো মূল্য নেই।
এ কারণে ইসলামি অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভারসাম্য রক্ষা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন। কেবল ইসলামি অর্থনীতি নয়, মুসলিম উম্মাহর এটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন : “এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি।”
ইসলাম সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছে। শুধু এ ক্ষেত্রে নয়, সকল বিপরীতমুখী বিষয়ে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে, দেহ ও আত্মার মধ্যে, যুক্তি ও বুদ্ধির মধ্যে, আদর্শ ও বাস্তবের মধ্যে মোটকথা সকল বিপরীতধর্মী বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে।
ইসলামি অর্থনীতি সমাজের ওপর, বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির কোনো অন্যায় বা অনাচার চাপিয়ে দেয় নি, যা করেছে পুঁজিবাদী অর্থনীতি। একইভাবে ব্যক্তি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তির অধিকারেরও ব্যাপারে জুলুম করে নি, যা করেছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, বিশেষ করে মার্কসবাদী অর্থনীতি।
ইসলামি অর্থনীতি অতিশয় সচেতনতার সঙ্গে মধ্যপন্থা ও ইনসাফপূর্ণ নীতি অবলম্বন করেছেন; কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেনি, কোনো ক্ষেত্রে শিথিলতাও প্রদর্শন করেনি, কারো ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেনি এবং কাউকে ক্ষতিগ্রস্তও করেনি। যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
“তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এব ং স্থাপন করেছেন মানদ-, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না করো মানদ-ে। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিও না।”
ইসলামি অর্থনীতিতে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা
যে সকল মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং তাৎপর্য ও শিক্ষার কথা আলোচনা করা হলো তা ইসলামি অর্থনীতির প্রাণ ও আত্মা; এগুলো ইসলামি অর্থনীতির যাবতীয় কর্মকা-কে সজীব ও পরিশুদ্ধ রাখে। কারণ এ সকল মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মুসলমানের বুদ্ধি ও বিবেক, তাদের চিন্তাগত জীবন ও কর্মজীবনের একটি বড় ও গভীর অংশ দখল করে আছে।
এগুলো কোনো দার্শনিক চিন্তা নয়, কোনো সমাজসংস্কারকের সংস্কার নয়, কোনো আইনবেত্তার গবেষণা নয়, কোনো কবির কল্পনাও নয়; অর্থাৎ, মৌলিকভাবে এগুলো কোনো মানুষের চিন্তা ও বক্তব্য নয় যে আমরা ইচ্ছা করলে তার কিছু গ্রহণ করবো আর কিছু বাদ দেবো। বরং এগুলো আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনা এবং নববী শিক্ষা; আল্লাহর কিতাবে এগুলো বর্ণিত হয়েছে এবং নবীর সুন্নাহে এগুলো আলোচিত হয়েছে। মানুষের কল্যাণ ও সুখ-সমৃদ্ধির যাবতীয় পথনির্দেশনা কুরআন ও সুন্নাহে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “আল্লাহর পক্ষ থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুগ্রহে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদেরকে সরলপথে পরিচালিত করেন।”
মুসলিম রাষ্ট্র অর্থনীতি ও লেনদেনে উপর্যুক্ত মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে বাধ্যতামূলককরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। রাষ্ট্র চিন্তাকে কর্মে এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে আইনে পরিণত করতে পারে। নৈতিক ও চারিত্রিক আদর্শগুলোকে বাস্তবিক অনুশীলনে প্রয়োগ করতে পারে। রাষ্ট্র এমন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করতে পারে যারা অর্থনীতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচার-প্রসার, চর্চা, অনুশীলন, উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনের মতো কার্যগুলো সম্পাদন করবে।
কারবার ও লেনদেনের ক্ষেত্রে আবশ্যিক বিষয়গুলোর চর্চা করা এবং নিষিদ্ধ ও জনম-লীবিরোধী ব্যাপারগুলো থেকে বিরত থাকার ব্যাপারেও রাষ্ট্র তার আইনানুগ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের মধ্যে যাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের উদ্দেশে বলেছেন :
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ
“আমি যাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করেছি তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবেন ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।”
রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি প্রত্যেকেই ইসলামি অর্থনীতিতে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রচার ও প্রসার এবং চর্চা ও অনুশীলন, উম্মাহর মাঝে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তি দৃঢ়ীকরণ, উম্মাহর সন্তানদেরকে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষায় লালন-পালন এবং সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কর্মের দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন।
লেখক : বহুগ্রন্থ প্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight