ইসমাঈল যাবিহুল্লাহর এর গঠনা

পূর্ব প্রকাশিতের পর…..
আল্লাহর বাণী: এবং সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম, তিনি আমাকে অবশ্যই সৎ পথে পরিচালিত করবেন’ হে আমার প্রতিপলক! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান কর। তারপর আমি তাকে এক স্থির-বুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম আ. বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি বল? ‘পিতা! আপনি যাতে আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করল, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরু®কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে। আমি এটা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরু®কৃত করে থাকি। সে ছিল এক নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও, তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। [সূরা সাফফাত-৯৯-১১৩]
এখানে আল্লাহ বলেছেন যে, তার একনিষ্ঠ বন্ধু নবী ইবরাহীম আ. যখন নিজ সম্প্রদায় ও জন্মভূমি ত্যাগ করে চলে যান, তখন তিনি আল্লাহর নিকট একটি নেককার পুত্র সন্তান প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করেন। তিনি হলেন  ইসমাইল আ.। কেননা, তিনিই হলেন প্রথম পুত্র।
হযরত ইবরাহীম আ. এর ছিয়াশি বছর বয়সে তার জন্ম হয়। এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। ‘অর্থাৎ যখন যুবক হলো ও পিতার ন্যায় নিজের কাজকর্ম করতে পারে মত বয়সে পৌছল’ যখন ইবরাহীম আ. তার স্বপ্ন থেকে বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তার পুত্রকে যবেহ করার হুকুম দিয়েছেন। হযরত ইবন আব্বাস রা. থেকে এক মারফু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীদের স্বপ্ন ওহি। উবায়দ ইবন উমায়রও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ নির্দেশ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরাহীম খলীলের প্রতি এক বিরাট পরীক্ষা। কেননা, তিনি এই প্রিয় পুত্রটি পেয়েছিলেন তার বৃদ্ধ বয়সে। তাছাড়া এ শিশুপুত্র ও তার মাকে এক জনমানবহীন শন্য প্রান্তরে রেখে এসেছিলেন, যেখানে না ছিল কোন কৃষি ফসল, না ছিল তরুলত। ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন।  আল্লাহর উপর ভরসা রেখে তাদেরকে সেখানে রেখে আসেন। আল্লাহ তাদেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। এমন উপায়ে পানাহারের ব্যবস্থা করে দিলেন, যা ছিল তাদের ধারণাতীত। এর পর যখন আল্লাহ এই একমাত্র পুত্রধনকে যাবেহ করার নির্দেশ দেন তখন তিনি দ্রুত সে নির্দেশ পালনে এগিয়ে আসেন। ইবরাহীম আ. এর প্রস্তাব তার পুত্রের সামনে পেশ করেন। যাতে এ কঠিন কাজ সহজভাবে ও প্রশান্ত চিত্তে করতে পারেন। চাপ প্রয়োগ করে বাধ্য করে যবেহ করার চাইতে এটা ছিল সহজ উপায়। ইবরাহীম বলল, হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যাবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বল। ধৈর্যশীল পুত্র পিতার নির্দেশ পালন করার জন্য খুশি মনে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধর্যশীলই পাবেন।
এ জাবাব ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের আন্তরিকতার পরিচায়ক। তিনি পিতার আনুগত্য ও আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন তারা উভয়ে অনুগত্য প্রকাশ করল এবং তার পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল। এ আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে। ১. তারা উভয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ও মনোবল দৃঢ় করেন। ২. এখানে পূর্বের কাজ পরে ও পরের কাজ পূর্বে বলা হয়েছে। অর্থাৎ পিতা ইবরাহীম আ. পুত্র ইসমাঈল আ. কে উপুর করে শুয়ালেন। ৩. ইবরহীম আ. পুত্রকে উপুর করে শোয়ান এ জন্যে যে, যবেহ করার সময় তার চেহারার উপর যাতে দৃষ্টি না পড়ে। ইবন আব্বাস রা., মুজাহিদ, সাঈদ ইবন জুবায়ের, কাতাদা ও যাহহাক রহ. এই মত পোষণ করেন। ৪. লম্বাভাবে চিত করে শায়িত করান, যেমন পশু যবেহ করার সময় শায়িত করানো হয়। এ অবস্থায় কপালের এক অংশ মাটির সাথে লেগে থাকে। ‘আসলামা’ অর্থ ইবরাহীম আ. যবেহ করার জন্য বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলেন। আর পুত্র মৃত্যুর জন্য কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করেন।
সুদ্দি রহ. প্রমুখ বলেছেন, হযরত ইবরাহীম আ. গলায় ছুরি চালান কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কাটল না। কেউ বলেছেন যে, গলার নিচে তামার পাত রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও কাটা যায়নি। আল্লাহ সাম্যক অবগত।
এ সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, ‘ হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যই পালন করলে’ অর্থাৎ তোমাকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে। তুমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো। আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্যে তোমার আগ্রহ ও আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে। তুমি পুত্রকে কুরবানীর জন্য পেশ করেছ। যেমন ইতিপূর্বে তুমি আগুনে নিজের দেহকে সমর্পণ করেছিলে এবং মেহমানদের জন্যে প্রচুর অর্থ সম্পদ ব্যয় করেছিলে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে মুক্ত করে দিলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে’ অর্থাৎ একটি সহজ বিনিময় দ্বারা আমি ইবরাহীম আ. এর পুত্রকে যবেহ করা থেকে মুক্ত করে দিলাম। অধিকাংশ আলেমের মতে এ বিনিময়টি ছিল শিং বিশিষ্ট একটি সাদা দুম্বা যাকে ইবরাহীম আ. ছাবীর পর্বতে একটি বাবলা গাছে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight