ইলমে দীনের গুরুত্ব : মাওলানা আহমদ মায়মূন

আল্লাহ তাআলার আদেশ- নিষেধ ও বিধি- বিধান, যা পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে বা ইমাম- মুজতাহিদগণ তা যে ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করেছেন তার অবগতিকে ইলম বলা হয়। কুরআন ও হাদীসে ইলমে দীনের অপরিসীম গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যাদেরকে ইলম দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন। [সূরা মুজাদালা: আয়াত ১১]
উক্ত আয়াতের সারমর্ম এই যে, যারা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং নেক আমল করে ও শরীয়তের পুরোপুরি অনুসরণ করে নিজেদের ঈমানকে পূর্ণাঙ্গ করেছে এবং যাদেরকে দীনের ইলম প্রদান করা হয়েছে তাদের মর্যাদা আল্লাহ তাআলা অপরাপর ইলমবিহীন ঈমানদারদের মুকাবিলায় অনেক বৃদ্ধি করে দেন।
উল্লেখ্য যে, কুরআন ও হাদীসের যেখানেই ঈমানের মাহাত্ম ও ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই ‘ঈমান’ বলে পূর্ণাঙ্গ ঈমান উদ্দেশ্য। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে ইলমে দীনের ধারকদের বিশেষ মর্যাদার কথা ঘোষিত হয়েছে। আর যাদের উঁচু মর্যাদার কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন তাদের মর্যাদা যে কত বড়, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
কুরআন কারীমের অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে রাসূল! আপনি বলেদিন, যারা ইলমের অধিকারী, আর যারা ইলমের অধিকারী নয়, তারা কি সমান হতে পারে? [সূরা যুমার: আয়াত ৯]
অর্থাৎ, অবশ্যই তারা সমান হতে পারে না; বরং যাদের ইলম নেই তাদের অপেক্ষা যাদের ইলম আছে তাদের মর্যাদা অনেক বেশি।
হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইলম অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। [সুনানে ইবনে মাজা: হাদীস নং ২২৪]
উক্ত হাদীস শরীফে বর্ণিত ‘প্রত্যেক মুসলিম’ এর মধ্যে পুরুষ ও মহিলা উভয় সম্প্রদায় শামিল রয়েছে।
আর এটা জেনে রাখা কর্তব্য যে, যে কাজটি করা বান্দার উপর ফরয, সে কাজটি করার নিয়ম- পদ্ধতি জেনে নেওয়াও তার উপর ফরয। আর যে কাজটি করা মুস্তাহাব, তার নিয়ম- পদ্ধতি জেনে রাখাও মুস্তাহাব। সুতরাং যখন নামায ফরয হবে তখন নামাযের মাসায়েল শিখে নেওয়াও ফরয হবে। এমনিভাবে রোযার ক্ষেত্রেও। আর যখন চাকুরী, ব্যবসা ইত্যাদি করবে তখন সে সম্পর্কিত শরীয়তের বিধি- বিধান শিখে নেওয়া এবং সে মুতাবিক আমল করা কর্তব্য। এ তো হলো সেই ইলম সম্পর্কে আলোচনা, যা প্রত্যেকের উপর ফরয। তা ছাড়া কিছু ইলম এমনও আছে, যা প্রত্যেকের শেখা ফরয নয়। বরং কিছু লোক যদি তা শিক্ষা করে নেয় তবে অন্যদের উপর তা শিক্ষা করা আর জরুরী থাকে না। যেমন প্রত্যেক এলাকায় এমন একজন আলেম থাকা আবশ্যক, যিনি কুরআন- হাদীস, ফিকাহ ইত্যাদি দীনী ইলমে অভিজ্ঞ, যিনি ইসলাম বিরোধীদের বক্তব্য খ-ন করতে সক্ষম এবং যাকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার সঠিক উত্তর দিতে পারেন। তবে এ পরিমাণ ইলম সবার উপর ফরয নয়। হাঁ, কারও যদি সময়, সুযোগ ও আগ্রহ থাকে এবং ফরয না হওয়া সত্ত্বেও দীনী ইলমে পা-িত্য অর্জন করতে চায় তবে তা হবে মুস্তাহাব এবং অপরিসীম সওয়াবের কাজ।
এক হাদীসে রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন। আমি (ইলম) বিতরণকারী, আর আল্লাহ তাআলা তা দান করেন। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং ৭১, ৩১১৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮৯]
অপর একটি হাদীসে রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ যখন মৃত্যু বরণ করে তখন তার সকল আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। (অর্থাৎ, আমল করার কোনো সুযোগ ও শক্তি থাকে না এবং সওয়াব হাসিলের কোনো পন্থা থাকে না ।) কেবল তিনটি আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও জারি থাকে:
১. সদকায়ে জারিয়া (যেমন: নেক কাজের জন্য কোন সম্পত্তি আল্লাহর নামে ওয়াক্ফ করে যাওয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব, মুসাফির খানা, পানির নলকূপ ইত্যাদি স্থাপন করে যাওয়া।)
২. ইলম, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। (যেমন মানুষকে দীনী ইলম শিক্ষা দেওয়া, দীনী কিতাবাদী লিখে যাওয়া ইত্যাদি।)
৩. নেক সন্তান, যে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে। [সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ৪২২৩; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ৮৮৪৪; সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নং ২৮৮০]
মানুষের মৃত্যুর পর তার সকল আমলের সওয়াব হাসিলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, মৃত ব্যক্তি কোনো আমল করতে পারে না, তাই তার সওয়াব পাওয়ারও সুযোগ থাকে না। কিন্তু উক্ত হাদীসে উল্লিখিত তিনটি কাজ এমন যে, এগুলোর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। কারণ, এ তিনটি আমল মৃত্যুর পরও চালু থাকে। যেমন: সদকায়ে জারিয়ার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে। ইলমের উপকারিতাও মৃত্যুর পর নানা উপায়ে অব্যাহত থাকে এবং নেক সন্তান- সন্ততি পিতা- মাতার জন্য দোয়া করতে থাকে।
বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত কাছীর ইবনে কায়েস রহ. বলেন, আমি দামেশকের জামে মসজিদে হযরত আবু দারদা রা. এর কাছে বসা ছিলাম। তখন হযরত আবু দারদা রা. এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবু দারদা! আমি মদীনা শরীফ থেকে একটি হাদীস শোনার জন্য আপনার কাছে এসেছি। আমি জানতে পারলাম যে, আপনি সেই হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আমি আসিনি। হযরত আবু দারদা রা. বলেন, অবশ্যই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, দীনী ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি যে পথ অতিক্রম করে, আল্লাহ তাআলা তা তার জন্য জান্নাতের পথ অতিক্রম করার মধ্যে গণ্য করেন। (অর্থাৎ, ইলম হাসিল করার উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণে বা মাদরাসা- মসজিদ, খানকায় গমনে যে পথ অতিক্রম করা হয়, তা যেন জান্নাতেরই পথ অতিক্রম করা।) আর ফেরেশতাগণ দীন শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। এবং আসমান ও জমীনের সকল সৃষ্টি জীব দীন শিক্ষার্থীর জন্য মাগফেরাতের দোয়া করে। এমনকি পানির মাছ ও তাদের জন্য দোয়া করে। ইবাদতকারীদের তুলনায় আলেমের মর্যাদা এমনই, যেমন তারকা- রাজির মাঝে চতুর্দশীয় চাঁদ। আলেমগণ নবীগণের উত্তরসূরি। নবীগণ কাউকে কোনো সহায়- সম্পদ ও সোনা- রূপার উত্তরাধিকারী করে যাননি, তারা কেবল ইলমের উত্তরাধিকারী রেখে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করল সে অনেক বড় সম্পদ অর্জন করল। [সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নং ৩৬৪১; সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ২৮৭৭; সুনানে আহমদ : হাদীস নং ২১৭১৬; সুনানে ইবনে মাজা : হাদীস নং ২২৩]
উক্ত হাদীস শরীফে ইলমে দীনের শিক্ষার্থীদের জন্য ফেরেশতাগণ কর্তৃক নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরমানে ফেরেশতাগণ তাদেরকে সবিনয় শ্রদ্ধা করেন। অথবা এর অর্থ হচ্ছে, তাদের প্রতি ফেরেশতাগণ দয়া ও অনুগ্রহ করেন অর্থাৎ, তাদের সফলতার জন্য দোয়া করেন। এটা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রিয় হওয়ার আলামত। কারণ, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিষ্পাপ ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। সুতরাং তাদের কাছে প্রিয় হওয়া যেন আল্লাহ তাআলার কাছেই প্রিয় হওয়া। কেননা, বন্ধুর বন্ধুও বন্ধু বলে বিবেচিত হয়। তবে মাগফেরাতের দোয়াকারী সৃষ্টি জীবের মধ্যে কাফের সম্প্রদায় এবং শয়তান অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, যারা আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধাচারী তারা আল্লাহ তাআলার প্রিয়ভাজনদের কল্যাণকামী হতে পারে না। এটা যেহেতু সুস্পষ্ট কথা, তাই হাদীস শরীফে তা উল্লেখ করা হয়নি। হাদীস বিশারদ আলেমগণ বলেছেন যে, উক্ত হাদীসে ‘সকল সৃষ্টিজীব’ বলে সকল প্রাণী জগৎ বুঝানো হয়েছে। সৃষ্টিজীবের মধ্যে আবার বিশেষভাবে মাছের কথা উল্লেখ করার কারণ হল, আল্লাহ তাআলা আলেমদের অস্তিত্বের বরকতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। আর সেই বৃষ্টির পানিতেই মাছ বাস করে। পানি ছাড়া অন্যত্র মাছ বাস করতে পারে না। তাই মাছ আলেমদের জন্য দোয়া করতে থাকে। উক্ত হাদীস শরীফে আলেমকে চতুর্দশী চাঁদের সাথে এবং ইবাদতকারীকে তারকার সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ইবাদতকারীর ইবাদত দ্বারাও তো অন্যেরা উপকৃত হয়। যেমন ইবাদতকারীর ইবাদত দেখে অন্যেরা ইবাদত করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ইবাদতকারীর ইবাদতের বরকতে মানুষের উপর আল্লাহ তাআলার রহমত অবতীর্ণ হয়। এমনিভাবে তারকারাজি দ্বারা তো পৃথিবী কিছু না কিছু আলোকিত হয়। তার উত্তর হচ্ছে এই যে, ইবাদতকারীর ইবাদত দ্বারা মানুষ যতটুকু উপকৃত হয় এবং তারকারাজি দ্বারা পৃথিবী যতটুকু আলোকিত হয় তা আলেমের ইলমের অবদান ও চাঁদের আলোর তুলনায় অতি নগণ্য। তাই উভয় উপমা আপন আপন স্থানে যথার্থ। এতে আপত্তির কিছু নেই।
উক্ত হাদীস শরীফে ‘আলেম’ দ্বারা এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য, যিনি নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদত সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য যতটুকু ইলমের প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি ইলম রাখেন। আর ‘ইবাদতকারী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন ব্যক্তি, যিনি ইবাদত করার জন্য যতটুকু ইলম ও মাসায়েলের দরকার ততটুকু ইলম রাখেন এবং অধিক পরিমাণে ইবাদত করেন। ইলমের চর্চায় নিয়োজিত থাকেন না। এখানে এরূপ ইবাদতকারী উদ্দেশ্য নয়, যে ইবাদতের জরুরী মাসায়েল ও জানে না। কেননা, এরূপ মূর্খ ব্যক্তির ইবাদত তো সুষ্ঠু ও বিশুদ্ধভাবে পালিত হয় না। সুতরাং যিনি ইবাদতকারী হবেন তার ইবাদত সঠিকভাবে পালন করার জন্য যতটুকু ইলম রাখা প্রয়োজন, তা জানা তার জন্য আবশ্যক।
আলেমের সম্মান ও মর্যাদা জ্ঞাপন অনেক হাদীস রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হাদীস হযরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত। উক্ত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবাদতকারীর তুলনায় আলেমের মর্যাদা এরূপ, যেমন তোমাদের মধ্যকার একজন অতি সাধারণ ব্যক্তির তুলনায় আমার মর্যাদা। [তিরমিযী শরীফ : হাদীস নং ২৬৮৫; সুনানে দারেমী : হাদীস নং ২৯৭, ৩৫২; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ২১৭১৬]
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাতের কিছু সময় দীনী ইলমের চর্চার কাজে অতিবাহিত করা সারা রাত জেগে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম। [সুনানে দারেমী : হাদীস নং ২৭১, ৬৩৮]
উপরিউক্ত হাদীসের অর্থ এই নয় যে, নফল ইবাদত সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দিয়ে কেবল ইলম চর্চায় লিপ্ত থাকবে; বরং নফল ইবাদতও কিছু করা উচিত। তবে দীনী ইলম শিক্ষার্থীদের উচিত ইলমের চর্চায় বেমি সময় ব্যয় করা। কেননা, ইলমে দীনের চর্চা হল শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনল, তারপর তা আবার অন্যের কাছে পৌঁছে দিল। কেননা, অনেক ক্ষেত্রে এমন হয় যে, যার কাছে সে বাণী পরবর্তীতে পৌঁছানো হয় সে পূর্ববর্তী শ্রোতা অপেক্ষা অধিক আত্মস্থকারী হয়। [সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ২৮৪৮/ ২৬৫৭, সুনানে ইবনে মাজা : হাদীস নং ২৩২]
এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলমে হাদীসের শিক্ষাদানকারীদের জন্য বিশেষ দোয়া করেছেন। আলেমগণ বলেন, যদি হাদীস শেখা এবং অন্যকে হাদীস শিক্ষা দান করার জন্য রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উক্ত দোয়া প্রাপ্তি ব্যতীত আর অন্য কোনো ফায়েদা নাও থাকত তবু কেবল এ দোয়ার বরকত হাসিল করার স্বার্থে তা উপেক্ষা করার মত ছিল না। অথচ এ দোয়ার বরকত ছাড়াও এজন্য অপরিসীম সওয়াব রয়েছে। সুতরাং সকলের উচিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার মর্যাদা দেওয়া এবং ইলমে দীন হাসিল করার চেষ্টা করা।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যদি আলেমরা ইলমের মর্যাদা রক্ষা করে চলত এবং ইলমের যোগ্য উত্তরসূরিদেরকে ইলম শিক্ষা দিত, তবে তারা তাদের ইলমের দ্বারা সমকালীন লোকদের নেতৃত্ব দিতে পারত। কিন্তু তারা ইলমকে দুনিয়াদারদের মনোতুষ্টির কাজে লাগিয়েছে, যাতে তারা দুনিয়াদারদের নিকট থেকে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে পারে। ফলে তারা দুনিয়াদারদের দৃষ্টিতে লাঞ্ছিত হয়েছে। আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি অন সব চিন্তুা পরিত্যাগ করে কেবল আখেরাতের চিন্তা করে, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়ার যাবতীয় চিন্তা দূরীভূত করে দেন। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার নানা চিন্তায় ব্যস্ত হয়, সে পৃথিবীর কোন উপত্যকায় গিয়ে ধ্বংস হয়, আল্লাহ তাআলা তার কোন পরওয়া করেন না। [সুনানে ইবনে মাজা : হাদীস নং ২৫৭, ৪১০৬; মুসনাদে বাযযার : হাদীস নং ১৬৩৮, মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা : হাদীস নং ৩৫৩১৬]
অনেকে সাধারণত এমন ধারণা করে যে, দীনী ইলম শিক্ষা করলে সম্মান ও মর্যাদা কম হবে। উক্ত হাদীস শরীফে এরূপ দুনিয়ামুখী লোকদের সংশয় দূরীভূত করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত নিজে দীনের ইলম শিক্ষা করা এবং সন্তানদেরকে দীনের ইলম শিক্ষা দান করে তাদেরকে দীনী বিষয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করা এবং ইলম মোতাবেক আমল করা। বান্দা যখন ইলম শিখে সে মোতাবেক আমল করে তখন সে আল্লাহর মহব্বত এবং সাহ্যা লাভ করে। আর যার পক্ষে আল্লাহর সাহায্য থাকে, তার কোনো অভাব থাকে না। আর আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভ করা কেবল তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই সম্ভব।
সমাজে কিছু লোক এমন আছে, যারা দীনী শিক্ষাকে অতি তুচ্ছ ও নিন্দনীয় মনে করে। তারা বলে যে, দীনী ইলম শিখলে কি করে খাবে! জীবিকা উপার্জনের জন্য কি উপায় অবলম্বন করবে? ভিক্ষাবৃত্তি ব্যতীত আর কি কোনো উপায় থাকবে? এধরনের লোকেরা আধুনিক সভ্যতার নামে বিজাতীয়দের অনুসরণ- অনুকরণকে গর্ব- সম্মান ও উন্নতির উপায় মনে করে থাকে। অথচ এরূপ ধ্যান- ধারণার কারণেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আজাব- গজব নেমে আসছে। কখনও মহামারি, কখনও অভাব- অনটন ও দুর্ভিক্ষ, আবার কখনও মানসিক দুঃখ- কষ্টের চাপ প্রতি নিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতো হল জাগতিক বিপদাপদ মাত্র। পরকালের আজাব তো এর চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের প্রতি রহম করুন।
এর মানে এ নয় যে, মানুষ প্রয়োজন পরিমাণ জাগতিক জ্ঞান করবে না অথবা চাকুরী ও ব্যবসা- বাণিজ্য ইত্যাদি ছেড়ে দেবে। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেন দীনী শিক্ষা থেকে বঞ্ছিত না থাকে। নিজের দীন ও আমল নষ্ট না করে। সব কাজ শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক করতে সক্ষম হয়। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দীনী ইলম ব্যতীত শরীয়তের পুরোপুরি অনুসরণ কখনও সম্ভব নয়।
বাস্তবে দেখা যায় যে, যারা দীনের পুরোপুরি অনুসরণ করে তারা দুনিয়াতেও সসম্মানে ও সুখে- শান্তিতে বসবাস করে। কোনো খাঁটি দীনদার ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে না যে, সে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করেছে, অথবা লাঞ্ছিত- বঞ্চিত ও অপমানিত হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, দীনী ইলম শিখলে রিজিক ও সম্মানের অভাব হয় না। রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। এ পৃথিবী পরীক্ষার স্থান। পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। চিরকাল কেউ এ পৃথিবীতে থাকতে পারবে না। দুনিয়ার অবস্থান শুধু সরাইখানার মতোই সাময়িক। পরকালেই হবে চিরস্থায়ী ঠিকানা। সেখানে চিরকাল থাকতে হবে। সুতরাং অনন্তকালের আবাসস্থলকে সুখময় করে তোলার চেষ্টা ও ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ বলেন, (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) হযরত সুলায়মান আ. কে ইলম অথবা রাজ্য, এ দুটির কোনো একটি গ্রহণ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়। তখন হযরত সুলায়মান আ. ইলমকে গ্রহণ করেন। তাঁর ইলমকে এখতিয়ার করার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইলম ও রাজত্ব উভয়টি দান করেন। [জামেউল বায়ানিল ইলম, ২৬৬]
আল্লাহ তাআলা হযরত সুয়ায়মান আ. কে যে রাজত্ব দান করলেন সে তো এক অনুপম ও প্রবাদতুল্য রাজত্ব। কোনো উন্নত ও সমৃদ্ধ রাজ্যের দৃষ্টান্ত দেওয়ার জন্য তাকে সুলায়মানী রাজত্ব বলে অভিহিত করা হয়। হযরত সুলায়মান আ. এর পূর্বে কেউ এরূপ রাজ্য লাভ করেনি এবং কেয়ামত পর্যন্ত কেউ লাভ করতে পারবে না। অতএব, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যেহেতু তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট রাজ্য না চেয়ে ইলম চেয়েছিলেন, তাই এ ইলমে দীনের বরকতেই তিনি নজিরবিহীন রাজত্ব লাভ করেছিলেন।
হযরত সালেম ইবনে আবিল জাদ রহ. একজন বিশিষ্ট তাবেয়ী। তিনি এক সময় ক্রীতদান ছিলেন। পরে দাসত্ব থেকে মুক্ত হন। তিনি বলেন, যখন আমার মনিব আমাকে মুক্ত করে দেন তখন আমি ভবিষ্যতে কী পন্থা অবলম্বন করে দিন যাপন করব তা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। কারণ, এতদিন তো মনিবের কথা মতো চলতাম এবং তার পক্ষ থেকেই আমার জীবিকা নির্বাহ হত। এখন যেহেতু মুক্ত হয়ে গেছি, তাই এখন জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আমার মনে ইচ্ছা হল, ইলম শিখব। তাই করলাম। তারপর একবছর যেতে না যেতেই মদীনা মুনাওয়ার শাসনকর্তা আমার সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিন্তু আমি তাকে আমার সাথে দেখা করার অনুমতি দিইনি। (উল্লেখ্য যে, হযরত বিশেষ কোনো সমস্যার কারণে তিনি শাসনকর্তাকে দেখা করার অনুমতি দেননি। নতুবা অকারণে কারও সাথে এরূপ ব্যবহার করা দীনের আদর্শ ও শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ।) এখানে এ ঘটনা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, এ অল্প সময়ে আমার এরূপ সম্মান ও মর্যাদা লাভ হল যে, শাসনকর্তা ও তার মতো নেতৃস্থানীয় লোকেরা আমার সাথে দেখা করতে আসতে লাগল। আর আমিও নির্ভীকচিত্তে স্পষ্টভাবে আমার অসুবিধার কথা জানিয়ে দিয়ে সাক্ষাৎদান থেকে বিরত রইলাম। আসলে এটাই হল দীনের বরকত। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইলম শেখে এবং সে মোতাবিক আমল করে তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারও ভয় থাকে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে তাকে সবাই ভয় করে। এরূপ লোক লোভ- লালসার কারণে কোথাও লাঞ্ছিত হয় না এবং কারও নিকট থেকে কিছু পাওয়ারও আশা করে না। ইলমে দীন শিক্ষা করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ‘মুমিনদের সকলের একসঙ্গে অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা দীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং যখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে আসবে তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা সতর্ক হয়। [সূরা তাওবা : আয়াত ১২২]
অর্থাৎ, মুসলমানদের একটি দল দীনী শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদানের জন্য সর্বদা নিয়োজিত থাকবে। এটা ফরযে কিফায়া। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝে বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা। গ্রন্থ প্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight