ইবাদতে প্রভূর ধ্যান : মুফতি তানজিম আলম কাসেমি (ভারত)

quran

অনুবাদ : মুফতি মোস্তাকিম আমীর :
বান্দাকে বন্দেগির জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই বান্দার জন্য আবশ্যক হল সে স্বীয় প্রভূর ইবাদত করবে এবং ইবাদতের প্রকাশ ঘটাবে। তাঁর সামনে নিজেকে এমনভাবে পেশ করবে যে, নিজের কথা-বার্তায়, ওঠা-বসায় প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিনয়ী ও অক্ষমতার প্রকাশ ঘটাবে এবং মন মেজাজে যেন এই কথাটি ভালোভাবে বসে যায় যে, ঐ সত্ত্বার দরবার ছাড়া অন্য কোন দরবার বা আশ্রয়স্থল নেই। তিনিই সকল ক্ষমতার উৎস। তিনিই মহান। তিনিই পরাক্রমশালী। তিনি সকলের কথা শোনেন, সকলের উদ্দেশ্য পূরণ করেন।
ইবাদতে আল্লাহ তাআলার ধ্যান-মগ্নের ধরণ যদি কারো এমন হয় যে, সে আল্লাহকে দেখছে এবং তাঁর সাথে সে গোপনে প্রেমালাপ করছে, তাহলে মনে করতে হবে যে, সে ব্যক্তি বন্দেগির উঁচু স্তর লাভ করেছে। এটাই মূলত ইবাদতের রুহ বা জীবন। এটাই জীবন্ত ইবাদত। মুসলমানদেরকে এরূপ ইবাদতেরই তাগীদ দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত এভাবে কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও তাহলে মনে কর যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।” [বোখারী]
ইবাদত চাই তা নামায হোক চাই রোযা, হজ্জ হোক কিংবা যাকাত, কুরআন তেলাওয়াত হোক চাই তাসবীহ তাহলীলÑ সকল ইবাদতে স্বীয় প্রভূর সামনে নত হওয়ার অর্থ পাওয়া যায়। বান্দা এবং প্রভূর মাঝে সম্পর্ক যত গভীর হবে তত বেশি নত হওয়ার মধ্যে স্বাদ বেশি অনুভূত হবে। সকল কষ্ট ক্লেশ সহ্য করেও হৃদয়ে আনন্দ অনুভূত হবে। ইবাদতের পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকবে। যদি ইবাদতে প্রভূর এই ধ্যান সৃষ্টি না হয় তাহলে বাহ্যিকভাবে ইবাদত যত সুন্দরই হোক না কেন তা প্রভাবহীন হয়ে পড়বে।
কোন কোন বান্দা স্বীয় প্রভূতে এত বেশি নিমজ্জিত হয় যে, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব স্বীয় চোখে দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলার ধ্যান খেয়ালে এত বেশি নিমগ্ন হয়ে যায় যে, সে নিজেকে প্রভূর সন্নিকট অনুভব করতে থাকে। এই অবস্থার সাথে যে ইবাদত করা হয় তার পরিমাণ যদিও কম হয়, তারপরও শক্তি ও জীবন্ত হওয়ার দিক দিয়ে তা অস্বাভাবিক। এ জন্যই তো বলা হয়ে থাকে কখনো কখনো দু’টি সেজদা মানুষের জীবনে বিশাল পরিবর্তন সৃষ্টি করে। বান্দা যখন স্বীয় প্রভূকে রাজি করার জন্য দু’রাকাত নামায পড়ে, তাঁর প্রশংসা করে, অনুতপ্তের তপ্ত অশ্রু প্রবাহিত করে,  তখন আল্লাহ তাআলার রহমত জোশে আসে। আল্লাহ তাআলা বান্দার এই ধ্যানমগ্নতা ও অনুতপ্তের অশ্রু প্রবাহিতের কারণে তার জীবনের সকল গুনাহ মাফ করে দেন।
পক্ষান্তরে মনোযোগবিহীন যে নামায পড়া হয় মূলত তা এক প্রকার রসম বা রীতি মাত্র। এ নামায প্রভাবহীন ও বরকতহীন হয়ে পড়ে। এরকম মনোযোগহীন ধ্যানমগ্নহীন হাজারও সেজদা যদি আদায় করা হয় তারপরও জীবনে তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না।
ইবাদতের এই গুণাবলি তথা ধ্যানমগ্নতা, বিনয়ী ও অক্ষমতার ভাব শুধু নামাযের  ক্ষেত্রেই নয় বরং সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সকল ইবাদতে এটাই উদ্দেশ্য। এটাকে তাকওয়াও বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কাছে মূলত তাকওয়াই চান। সকল ইবাদতই তাকওয়া সৃষ্টির জন্যই হয়ে থাকে। যেমন রোযা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। রোযা ফরজ করার উদ্দেশ্য হিসেবেÑ কুরআনুল কারীমে তাকওয়ার কথা বয়ান করেছেন।………. [সূরা বাকারাÑ১৮৩]
রোযা অবস্থায় এক ব্যক্তি শুধু আল্লাহর ভয়ে ক্ষুধা পিপাসার কষ্ট সহ্য করে। রমযান মাসে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দেখছেনÑ এরূপ ধারণা এতো বেশি হয় যে, পিপাসায় মুখ শুকিয়ে যায়, ক্ষুধায় কাতর হয়ে যাই তারপরও মন চায় না যে, নিরালায় নির্জনে গিয়ে এক ফোটা পানি পান করি। এই ইবাদতে এমন কি শক্তি আছে যে, নির্জন একাকী ঘরে আমাদেরকে খাওয়া পান করা থেকে বিরত রাখছে। আমরা যদি নির্জন একাকী ঘরে বসে খাই তাহলে তো কোন ব্যক্তি আমাকে দেখবে না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে, আমার খাওয়া পান করাকে যদিও কোন ব্যক্তি দেখছে না, কিন্তু আমার রব তো ঠিকই দেখছেন। তার থেকে কোন জিনিস গোপন নেই। এই ভয়ভীতিতে এক মাস ক্ষুধা পিপাসায় অতিবাহিত হয়। তার উদ্দেশ্য হল তাকওয়া অর্জন অর্থাৎ আল্লাহর ভীতি অন্তরে সৃষ্টি করা। প্রতিটি মুসলমানের জন্য এটাই জীবনের লক্ষ্য। এই তাকওয়া যার যত বেশি অর্জন হবে তার জন্য তত বেশি ইসলামের বিধানের অনুসরণ করা সহজ হবে। তার জীবন ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হবে। লেন-দেনে উঠা-বসায়, আচার আচরণে মোটকথা, জীবনের প্রতিটি শাখায় স্বীয় প্রভূর উপস্থিতি ধারণার কারণে সকল কাজ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে।
যখন কোন ব্যক্তির জবাবদিহিতার অনুভূতি থাকবে না, নিজেকে যখন সে স্বাধীন ভাববে তখন বাস্তবতা হল তার আমলের মধ্যে রুহানিয়ত সৃষ্টি হবে না। সে স্বীয় নফসের পূজা করেই জীবন কাটিয়ে দেবে। এজন্য এ হুকুম দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর ইবাদত করার সময় এ কথা ভাবা যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের চোখের সামনে আর আমরা তাঁর সামনে এবং তিনি আমাদেরকে দেখছেন। আমাদের প্রতিটি নড়াচড়া শ্বাস প্রশ্বাস সম্পর্কে তিনি ভালভাবেই জ্ঞাত আছেন।
নামায একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর জন্য বিশেষভাবে তাগিদ এসেছে যে, “আল্লাহর সামনে এভাবে দাঁড়াও যেমন আনুগত্য গোলাম তার মনিবের সামনে দাঁড়ায়। [সূরা বাকারা -২৩৮] এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল খুশু খুজু তথা সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, মন মেজাজে অক্ষমতা ও বিনয়ীভাব। যখন মন মেজাজ আল্লাহ তাআলার ধ্যানে মগ্ন থাকবে তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে আসবে স্থীরতার ভাব। বলতে গেলে মন মেজাজের সাথে এই অঙ্গগুলোও আল্লাহ পাককে সেজদা করতেছে এবং আল্লাহ পাকের বড়ত্বের স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। এই ভাবে যে নামায আদায় করা হয় তার দ্বারা মানুষের জীবনে প্রভাব পড়ে এবং মনকে নির্মল প্রশান্তি দেয়। এরকম নামায মানুষকে খারাপ ও অশ্লীল কাজকর্ম থেকে দূরে রাখে। দিনরাতে যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আল্লাহকে সামনে রেখে পড়া হয় তাহলে তার মন মেজাজ পবিত্র না হয়ে থাকতে পারে না এবং তার মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি না হয়ে পারে না। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অনেক মুসলমান নামায পড়ছে কিন্তু তার লেনদেন পরিষ্কার নয়। তাদের কথা বার্তার ঠিক নেই। আখলাক চরিত্র ভাল নয়। খারাপ কাজকে ঘৃণা করে না। অথচ নামাযের আবশ্যকীয় প্রভাব তো এটাই যে, তার মন মেজাজে পরিবর্তন আসবে। তার আখলাক চরিত্রে পরিবর্তন আসবে। তার দ্বারা অশ্লীল ও গুনাহের কাজ হবে না।
নামায এবং অন্যান্য ইবাদতের দ্বারা আশানুরূপ পরিবর্তন না হওয়ার কারণ হলো, ইবাদতে ইখলাস, লিল্লাহিয়ত না থাকা, আল্লাহ পাকের ধ্যান খেয়াল নিয়ে আদায় না করা। যেভাবে আদায় করা হচ্ছে তা একটি রসম মাত্র। আমরা মসজিদে নামায পড়ছি ঠিক কিন্তু আমাদের মন, ধ্যান খেয়াল সারা দুনিয়ায় ঘুরছে। এটাই কারণ সারা জীবন নামায পড়ার পরও আমাদের জীবনে একজন খাঁটি মুসলামানের  গুণাবলির প্রকাশ ঘটে না। তার কথা বার্তায়, আখলাক চরিত্রে কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। বাজারে লেন করার সময় মুসলমান না অমুসলমান তা পার্থক্য করা যায় না। সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, চিটারি, ওয়াদা খেলাফিসহ সকল ঘৃণ্য কাজসমূহ যা কখনো কখনো অমুসলিমদের থেকে হয় নাÑ তা এখন মুসলমানদের নিদর্শন হয়ে গেছে। আল্লামা ড. ইকবাল বলেন, “জ্ঞানপাপীরা ঈমানের গরমে নির্মাণ তো করে মসজিদ, তবে সারা বছর নামায পরেও হতে পারে না সঠিক নামাযি।”
এক ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর নিকট এসে বলল, হুজুর! অনেক বছর হয়ে গেল আমি কিছু সম্পদ মাটির নিচে পুতে রেখেছি, কিন্তু কোথায় রেখেছিÑ তা মনে আসছে না। হুজুর একটা তাবিজ দেন বা তদবীর শিখিয়ে দেন যাতে আমার ভুলে যাওয়া জায়গাটার কথা স্মরণ হয়। ইমাম সাহেব রহ. বললেন, এটাতো কোন ফেকাহ’র কথা নয়। তারপরও এর একটা তদবীর তোমাকে দিচ্ছি, তুমি এখন বাড়ি ফিরে যাও এবং আজকে সারা রাত নামায পড়। আশা করা যায় ইনশাল্লাহ ভুলে যাওয়া জায়গাটা তোমার স্মরণে আসবে। ঐ ব্যক্তি চলে যায়। রাতের বেলা নামায পড়তে শুরু করে। রাতের এক চতুর্থাংশ যাওয়ার পর তার জায়গার কথা স্মরণ আসে। পরদিন সকালে ঐ ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর নিকট গিয়ে বলেন, হুজুর আপনার তদবীরে কাজ হয়েছে। আমার জায়গার কথা স্মরণ হয়েছে। আবু হানিফা রহ. তার কথা শুনে বললেন, আমার ধারণাও এটাই ছিল যে, শয়তান তোমাকে সারা রাত নামায পড়তে দিবে না। কিন্তু তোমার উচিত ছিল যে স্মরণ আসার পরও আল্লাহর শুকরীয়া স্বরূপ সারা রাত নামায পড়া।
বান্দা যখন স্বীয় মাবুদের ইবাদতে ডুবে যায় এবং মনে করে যে আল্লাহ পাক তার সামনেÑ এ অবস্থা যখন সৃষ্টি হয় তখন শয়তানÑ যে মানুষের চির শত্রুÑ আরামে বসে থাকতে পারে না। নামাযি ব্যক্তির এ অবস্থাকে নষ্ট করার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ কারণে নামায শুরু করার পর মনে হাজারও আজেবাজে কথা স্মরণ আসতে থাকে। ফলে যে অবস্থায় নামায পড়ার কথা ছিল তা আর হয়ে ওঠে না। এ কারণে ইমাম আবু হানিফা রহ. ঐ ব্যক্তিকে তদবীর হিসেবে বলেন যে, তুমি রাত জেগে নামায পড়তে থাক। কেননা এটা শয়তানের সহ্য হবে না যে, কোন ব্যক্তি রাতভর নামায পড়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করুক। তাই সে ভুলে যাওয়া স্থানকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সারা রাত নামায পড়ার আমলকে বন্ধ করে দেয়। শয়তান যতই আজেবাজে কথা স্মরণ করিয়ে দিকÑ তারপরও আমাদের উচিত হল সমস্ত ফিকির ও মনোযোগকে একত্র করে নামায পড়া। যে কোন ইবাদত করার সময় এ চেষ্টা করতে হবে যে, এর দ্বারা যেনÑ নামধাম, লোক দেখানো এবং অহংকারের উদ্রেক না হয়। এ রকম ইবাদতই আল্লাহ পাকের উদ্দেশ্য এবং এ রকম ইবাদতই  মানব জীবনে পরিবর্তন ঘটায়।
হযরত আয়েশা রা. বলেন যে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম বলেন, নামায পড়ার সময় যখন তোমার তন্দ্রা আসবে তখন নামায না পড়ে শুয়ে যাবে। এটা এ জন্য যে, যখন নামাযের মধ্যে তন্দ্রা বা ঘুম আসবে তখন হতে পারে যে, সে স্বীয় রবের কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে গালির শব্দ বের করবে।” [তিরমিযি, হা.-৩২৩]ঘুমের সময় মানুষ তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। না যবানের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না তার নফসের ওপর। নামায পড়ার সময় আল্লাহ পাককে সামনে মনে করার যে অবস্থার সৃষ্টি হওয়া উচিত তা তন্দ্রা এবং নিদ্রার মধ্যে হয়ে ওঠে না। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, শুধু সেজদা দ্বারা বন্দেগি অর্জিত হয় না যতক্ষণ না তার মধ্যে রুহ পাওয়া যায়। সমস্ত ইবাদত এবং বন্দেগির উদ্দেশ্য হল ইস্তেহজার তথা  ইবাদতে আল্লাহ পাকের উপস্থিতিÑ যেন আমি আল্লাহকে দেখছি অথবা আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এর দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টি এবং নৈকট্য লাভ হয়। যে বন্দেগি এই ‘ইস্তেহজার’ থেকে মুক্ত তা বাহ্যিকভাবে ইবাদত হলেও তা বরকতহীন ও জীবনহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে এই ইবাদত দ্বারা কাঙ্খিত ফল অর্জিত হয় না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে রুহ ওয়ালা নামায ও ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আলী রা. এর ঘটনা অনেকেরই জানা আছে যে, যখন জিহাদের ময়দানে তাঁর রানে তীর বিদ্ধ হয়। তখন তীরটি টেনে বের করা যাচ্ছিল না। হযরত আলী রা. ব্যথায় ককিয়ে ওঠছিলেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম পরস্পর পরামর্শ করলেন কী করা যায়। সিদ্ধান্ত হলো যখন তিনি নামাযে দাঁড়াবেন তখন তীর বের করা হবে। তিনি নফল নামায পড়তে শুরু করলেন। তার শরীর থেকে তীর বের করা হল। নামায শেষে তিনি অনেক লোক দেখে বললেন, তোমরা কি তীর বের করতে এসেছ? লোকেরা বলল, হযরত! আমরা তো তীর বের করে ফেলেছি। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আমি তো টেরই পাইনি।
হযরত আলী রা. নামায পড়ার সময় আল্লাহ পাকের ধ্যানে এত বেশি মগ্ন ছিলেন যে, দুনিয়া এবং দুনিয়াতে যা কিছু আছে তা থেকে তিনি বে-খবর ছিলেন। এমনকি যে তীরটি তার রানের মধ্যে শক্তভাবে গেঁথে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে টেনে বের করা যাচ্ছিল নাÑ নামাযের অবস্থায় সে তীর সহজেই বের করা হয় এবং তিনি তাতে টেরই পাননি।
আমাদের মধ্যে প্রথমত ধ্যান মগ্নতার এই ধরন তো সৃষ্টিই হয় না। যদিও আল্লাহর স্মরণ সামান্য আসে তবে তা এ পর্যায়ের যে, যদি পাশ দিয়ে একটি মাছি চলে যায় অথবা কোথাও থেকে সামান্য আওয়াজ আসে তাহলেই আমাদের থেকে আল্লাহ পাকের যে সামান্য ধ্যান মগ্নতা ছিলো তা ছুটে যায় এবং মনোযোগ শেষ হয়ে যায়। এটাই কারণ যে, সাহাবায়ে কেরাম দু’রাকাত নামাযের মাধ্যমে নিজের সমস্ত জরুরত পূরণ করে নিতেন। অথচ আজ হাজার সেজদা দ্বারাও আমরা আমাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারছি না।
হযরত আলী রা. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, যখন নামাযের সময় আসে তখন তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যেত। শরীরে কম্পন সৃষ্টি হত। এর কারণ জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ সেই আমানত আদায় করার সময় এসেছে যেই আমানতকে আসমান, যমীন উঠাতে সক্ষম হয়নি। পাহাড়ও তা উঠাতে অক্ষমতা প্রকাশ করে। আমার বুঝে আসে না যে, আমি তা আদায় করতে পারব কি না।”
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. যখন আযানের আওয়াজ শুনতেন, তখন এত বেশি কাঁদতেন যে, অশ্রুতে তাঁর চাদর ভিজে যেত। তাঁর দেহের শিরাগুলো ফুলে যেত। চোখ লাল হয়ে যেত। জনৈক ব্যক্তি হযরত ইবনে মাসউদ রা. কে বলেন যে, হযরত! আমরাও তো আযান শুনি, কিন্তু আমাদের মাঝে তো কোন প্রভাব পড়ে না। আপনি এত বেশি কেন পেরেশান হন? তখন ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যদি মানুষেরা জানত যে মুয়ায্যিন কি বলছে তাহলে তারা আরাম আয়েশ ত্যাগ করত, তাদের ঘুম চলে যেত।
বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরামের আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিন করে দেয়ার অসংখ্য ঘটনা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাদের দৃঢ়তা, ঈমানি শক্তি, আমলি জযবা দেখে বিস্ময় জাগে। যদি এসবের সূত্র অত্যন্ত শক্তিশালী না হত তাহলে এসব বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যেত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের জন্য এমন সব সৈনিক তৈরি করেছেন যারা রাতে দাঁড়িয়ে মহান রবকে স্মরণ করত আর দিনের বেলায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে দাওয়াতে তাবলীগ ও জিহাদের জন্য বের হত। প্রতিপক্ষ কাফেরদের হাজারও প্রতিবন্ধক মুকাবেলা করে, শত্রুদের প্রত্যক্ষ আক্রমণ প্রতিহত করে তারা তাদের ঈমানকে মজবুত করেছেন, তাজা করেছেন। এরই বদৌলতে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নিরাপত্তা, ন্যায়পরায়ণতার যুগ এসেছে। ইসলামি আদালত প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সর্বপরি আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক দুনিয়াতেই তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।
একটু চিন্তা করুন! আমরা কি তাদের মত কোন আমল করেছি? আমাদের ইবাদত বন্দেগিতে রুহানিয়ত পাওয়া যায় কি? কাল নয় আজই, এক্ষুণি এরূপ ইবাদতের জন্য নিজেকে তৈরি করা, নিজের মন মেজাজকে ইবাদত বন্দেগির জন্য এমনভাবে নিমজ্জিত করা যাতে তার প্রভাব জীবনের প্রতিটি শাখায় পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ পাক আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।
অনুবাদক :তরুণ আলেম, উপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রবন্ধকার।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight